অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
দরজা খুলতেই আর্য দেখতে পায় কাগজের বান্ডিল হাতে মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি নিয়ে ইকবালরা দাঁড়িয়ে আছে। আর্য বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে --- এরই মধ্যে হয়ে গেল ?
---- হয়ে তো দাদা আরও একটু আগেই যেত কিন্তু একটা কারণে একটু দেরি হয়ে গেল।
---- কি কারণে ? মেশিনে কোন গন্ডগোল হয়েছিল?
--- না তা নয়। আপনাকে না জিজ্ঞেস করে একটা কাজ করে ফেলেছি ?
--- কি কাজ ?
---- দাদা আমরা আরও পাঁচ হাজার কপি কাগজ বেশি ছেপে নিয়েছি।
--- বলো কি , এত কাগজ কি হবে ?
---- বাড়তি কাগজ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি দিতে চাইলেও আমি তো কাগজ ছাপার জন্য টাকা নিতে পারব না। বাড়তি কাগজ থেকে ছাপার খরচটুকুউঠে যাবে। আমরাই হাতে হাতে বিক্রি করে দেব।কাল কাগজের চাহিদা হবেই।
--- বাহঃ এ-তো ভালো পরিকল্পনা। এ রকম হলে তো আমাদের কাগজ চালাতে কোন অসুবিধা হবে না।
---- দাদা আমি থাকতে আপনাকে কাগজ ছাপা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
--- বেশ বেশ , সে সব আলোচনা পরে হবে। ভিতরে এসো , চা খেয়ে যাবে।
--- না দাদা , এখন আর চা খাব না। ভোর হয়ে এল। আমাদের কাগজগুলো এখনও ভাঁজ করা হয় নি। সেগুলো গিয়ে ভাঁজ করতে হবে।
কাগজের বান্ডিলগুলো ঘরের ভিতর রেখে ইকবালরা ফিরে যায়। সোমনাথ আর সে বান্ডিল থেকে একটা করে কাগজ বের করে নিয়ে চোখ বোলাতে শুরু করে। চোখ বোলাতে বোলাতেই দু'জনেরচোখে মুখে ফুটে ওঠে খুশী খুশী ভাব। সোমনাথ তো আপ্লুত গলায় বলেই ফেলে , দাদা যা হয়েছে না, কি বলব! একেবারে মারকাটারি ব্যাপার। কাল সকালে দৈনিকের সাংবাদিকগুলো শুয়ে যাবে। আমাদের কাগজ বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত অন্য কাগজ কেউ ছোঁবে না।
--- অথচ কাজটা যে করে উঠতে পারব ভাবতে পারি নি। তবে সবার সাহায্য না পেলে কাজটা সম্ভব হত না।
--- কি বলব দাদা তুমি যখন কথাটা বললে তখন আমারও সংশয় ছিল।এখন বুঝতে পারছি তুমি অসাধ্য সাধন করতে পার।
--- বেশ শোন রাত শেষ হয়ে এলো। শুয়ে আর লাভ নেই। তুমি মনোহরপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাগজগুলো গুছিয়ে নিয়ে চন্দনদের ফোনে ডেকে নাও।
ওরাও কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ুক। স্নান করে চা-টা খেয়ে আমরাও বেরিয়ে পড়ব। অন্য কাগজ ঢোকার আগেই আমাদের পৌঁচ্ছে যেতে হবে।
---- বেশ দাদা।
বারন্দায় বেরিয়েই আর্য দেখতে পায় পাশের ঘরে মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে বৈশাখী। দেখে খুব মায়া হয়। কিছুতেই ওর ঘুম ভাঙাতে মন চায় না। কাল অতগুলো লোকের রান্নাবাড়া করতে খুব ধকল গিয়েছে বেচারির। তাই সোমনাথকে স্নান করে নিতে বলে সে রান্নাঘরে ঢোকে। গ্যাস জ্বালিয়ে চায়ের জল বসায়। একবারে চন্দনদের জন্যও চায়ের জল নেয়। চা হতে না হতেই চন্দনরাও এসে পৌঁচ্ছে যায়। চা'টা ছেঁকে নিয়ে বসার ঘরে যায় আর্য।
সবাই তখন কাগজ দেখতে মগ্ন। সে সবার জন্য কাপে কাপে চা ঢেলে দেয়। এগিয়ে দেয় বিস্কুটের কৌটো। চা খেতে খেতে সে বলে -- তোমাদের এত ভোরে ডাকতাম না। কিন্তু ভেবে দেখলাম সব জায়গায় অন্য কাগজ পৌঁছনোর আগে আমাদের কাগজ পৌঁছে দিতে হবে। তাহলে একটাও কাগজ অবিক্রীত থাকবে না। তোমরা যে যেখানে যেতে চাও সেই মতো কাগজ নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। যাওয়ার সময় ডাক্তারবাবুকেও কিছু কাগজ দিয়ে যেও।
চন্দন বলে , দাদা যদি কেউ স্থায়ী গ্রাহক হতে চায় তাহলে কি করব ?
---- করে নেবে। আমাদের তো আজ থেকেই পথ চলা শুরু হলো।
তারপর সোমনাথকে বলে , ঋজুকে ফোন করে আমরা না যাওয়া পর্যন্ত ওদের কাগজ কিনতে বারণ করে দাও। বলো আমরা কাগজ নিয়ে সকাল সকাল মাচানতলায় পৌঁচ্ছে যাব।
চন্দনরা কাগজ নিয়ে বেরিয়ে যেতে চটপট স্নান সেরে নেয় আর্য। ততক্ষণে বৈশাখী উঠে পড়েছে। রান্নাঘরে চায়ের সরঞ্জাম নামানো দেখেই সে বলে , আমাকে ডাকলেই তো পারতে।
---- তুমি ঘুমোচ্ছিলে। দেখে খুব মায়া লাগল। তাই আর ডাকলাম না।
---- দেখো আবার। কিন্তু যা কাজ বাড়িয়ে রেখেছো তার চেয়ে ডাকাই ভালো ছিল।
---- এই তো তোমার দোষ। নিজে হাতে চা করলাম , কোথায় উৎসাহ দেবে তা নয়, সব সময় হতাশ করে দাও।
---- বেশ বাবা ঘাট হয়েছে। তা কখন ফেরা হবে শুনি ?
--- কিছু ঠিক নেই। আসার সময় চিকিৎসা এবং কিছু কাজের জন্য প্রিয় আর ওর ছেলে শঙ্খ আনব ভাবছি।
---- শঙ্খ নামটা তো ভারি মিষ্টি।
---- শুধু নামটিই নয় , ছেলেটি এবং তার ব্যবহারটিও খুব মিষ্টি। দেখলেই বুঝতে পারবে।
--- তাই ?
--- হ্যা গো। একেবারে বাবার স্বভাবটা পেয়েছে ছেলেটা। যেমন বিনয়ী তেমনি ভদ্র। পারিবারিক বিপর্যয়ে কলেজের পড়াশোনাটা মাঝপথে বন্ধ হয়ে গিয়েছে এই যা। নাহলে লেখাপড়াতেও খারাপ ছিল না।
--- পড়াশোনাটা আবার শুরু করতে বলো।
--- সেই জন্যই তো ওকে আনা। এখানে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার মতো কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলতে হবে।
--- বেশ পারলে ওদের একবার এনো তো বাড়িতে।
--- একবার কি গো ? এখন তো মাঝে মধ্যেই বাপ ছেলেকে আনতে হবে। শোন , ফিরে এসে কথা হবে। এবার আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে।
--- বেশ এসো।
কাগজ নিয়ে সে আর সোমনাথ মনোহরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আর্যদের মোটরবাইক যখন মাচানতলায় পৌঁছোয় তখন সেখানে অনেক লোক। তারা এতক্ষণ তাদেরই প্রতীক্ষায় রাস্তার দিকে চেয়েছিলেন।মোটরবাইক থামতেই ঋজুরা এগিয়ে কাগজের বান্ডিলগুলো নামিয়ে নেয়। বান্ডিল খুলে কাগজ দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় তারা। ঋজু বলে , দাদা এতো সাপ্তাহিক কাগজ মনে হচ্ছে। আপনার কাগজ কই ?
---- আজ থেকে এটাই আমাদের কাগজ ভাই।
---- মানে ?
---- মানে ডাক্তারবাবুর খবরটা করব না বলেই আমি আর সোমনাথ ' দৈনিক অন্তরালে ' পত্রিকা থেকে ইস্তফা দিয়ে এই কাগজটা বের করেছি।
--- খবর করবেন না বলে চাকরি ছেড়ে দিলেন ?
---- চাকরিটা আমার প্রিয়র ওই ঘটনার সময়েই ছেড়ে দেওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু সেটা পারি নি। আসলে কাজটাকে ভালোবেসে সাংবাদিকতা পেশায় এসেছিলাম তো , তাই ছাড়তে পারি নি। কেমন একটা মোহে পড়ে গিয়েছিলাম। তাই বড্ড ভুল করেছিলাম। ভালোবাসা যখন মোহে পরিনত হয় তখন তা ত্যাগ করাই কাম্য।
ততক্ষণে কাগজটা প্রায় গোগ্রাসে গিলে ফেলেছেন সবাই। সবার চোখে মুখে খুশী খুশী ভাব।প্রশান্তকাকার অভিব্যক্তিতেই তা প্রকাশ পায়। তিনি বলেন , নামের সঙ্গে সাযুজ্য রয়েছে আপনার কাগজে। সত্যিই দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করছে প্রতিটি সংবাদ। গোটা গ্রামের ইতিহাসটাই যেন উঠে এসেছে। আজকের সংখ্যাটা এ গ্রামের দলিল হয়ে থেকে যাবে।
উচ্ছ্বসিত রাজু-- ঋজুরাও। তারা বলে , দাদা খবরগুলো পড়ে মনে বড়ো শান্তি পেলাম। অন্য কাগজ বাদ দিয়ে আজ সবাই ' দায়বদ্ধ'ই কিনবে। যাই কাগজগুলো বিক্রি করার ব্যবস্থা করি।
তারা কাগজগুলো নিয়ে হাসপাতাল মোড়ের দিকে চলে যায়। এভাবে গ্রামের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আর্যরও ভালো লাগে। তবুও একটা আক্ষেপ তার মনটাকে বিষন্ন করে তোলে।
বার বার মনে হয় প্রিয়র সময়ই যদি এটা করতে পারত , তাহলে হয়তো আজ তাকে অপরাধ বোধে ভুগতে হত না। তবুও মালাকে দিয়ে আসা কথাটা রাখতে পেরে তার মনে অপরাধ বোধের ভারটা অনেকখানিই লাঘব হয়ে যায়। কয়েকটা কাগজ নিয়ে সে আর সোমনাথ হাসপাতাল আর থানা অভিমুখে রওনা দেয়। ও,সি তখন সবে উঠেছেন। সাতসকালে তাদের দেখে বিষ্মিত হয়ে বলেন - 'গুড মর্নিং '। কি ব্যাপার এত সকাল সকাল ?
--- সুপ্রভাত। আপনাদের মতোই আমাদের কাজেও তো সকাল সন্ধ্যে নেই।
---- তা যা বলেছেন। আসুন চা খেতে খেতে কথা হবে।
--- আজ আর চা খাওয়ার সময় হবে না। এটা দিতেই আসা।
কয়েক কপি কাগজ ওসির হাতে তুলে দেয় আর্য। সেটাতে চোখ বুলিয়েই ওসি বলেন , করেছেন কি মশাই ! এক রাতেই কাগজ ছেপে নিয়ে চলে এসেছেন, তাও আবার দৈনিক কাগজ পৌঁছানোর আগে। আর তো আপনাকে চা না খাইয়ে ছাড়তে পারব না। আসুন আসুন চা খেতে খেতে খবর নিয়ে আলোচন হবে।
--- প্লিজ , আজ আর আটকাবেন না। প্রিয় আর তার ছেলেকে নিয়ে ফিরতে হবে আমাদের। ওরা অপেক্ষায় থাকবে।
--- ওদের নিয়ে কোথাই যাবেন ?
আর্য বিষয়টা খুলে বলে ওসিকে। কথাট শুনে ওসি বলেন , আপনাকে যত দেখছি তত অবাক হয়ে যাচ্ছি। কি বলি আপনাকে ? শুভকামনা রইল। এই কাজে পাশে থাকার সুযোগ যেন পাই।একই কথা বলেন ডাক্তারবাবুও। উচ্ছ্বসিত গলায় তিনি বলেন , বলার অপেক্ষা রাখে না আপনি একজন দায়বদ্ধ মানুষ। আপনার কাগজ ' দায়বদ্ধ 'ও একদিন মানুষকে দায়বদ্ধতার পাঠ দেবে।
ডাক্তারবাবুর কাছে থেকে বিদায় নিয়ে যখন বেরোচ্ছে তখন আর্য দেখতে পায় স্টলটাতে কাগজ এসে পৌঁছেছে। কোনও কাগজ খবরটা করেছে কিনা তা দেখার জন্য সোমনাথকে নিয়ে স্টলটার সামনে যায় সে। কাগজগুলোর পাতা উল্টেপাল্টে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে সে। না , কোন কাগজই খবরটা ছাপতে পারে নি। আজ মিডিয়া হাউস নির্ঘাত এজেন্টদের গুঁতো খাবে। তার ধারণাই সত্যি হয়। ততদিনে তার পরিচয় এজেন্টের জানা হয়ে গিয়েছে। তাই তাকেই সামনে পেয়ে সে বলে ওঠে , কি মশাই আপনারা কেউ খবরটা এক কলমও লিখলেন না। ওদিকে একটা সাপ্তাহিক চারপাতা জুড়ে খবর করছে। সবাই তো আমাদের কাগজ নেড়েচেড়ে দেখে ওই সাপ্তাহিক কিনে নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছে।
---- তাই নাকি ? তাহলে অফিসকে বলুন।
---- বলব তো বটেই। কাগজ বিক্রি না হলে পয়সাও দেব না।
---- ঠিকই তো। কাগজ বিক্রি না হলে পয়সা দেবেন কি করে ?
সেখান থেকে সরে আসে তারা। প্রিয়র বাড়ি যেতে যেতে দেখতে পায় বেশিরভাগ মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে 'দায়বদ্ধ'। খবর নিয়ে আলোচনায় মেতে রয়েছেন তারা। দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটানো রয়েছে ' দায়বদ্ধ'। ডাক্তার নিয়োগের আন্দোলনের সময় এভাবেই পোস্টারে পোস্টারে দেওয়াল ভরিয়ে তুলেছিলেন গ্রামের মানুষ। কাগজটাকে এভাবে মানুষের দরবারে পৌঁছে দিতে পেরে পরিশ্রমটা সার্থক মনে হয় আর্যর।
( ক্রমশ )



No comments:
Post a Comment