Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৭৩




   

   অন্তরালে 



          অর্ঘ্য ঘোষ 

    ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 





মাচানতলাতেও দেখা যায় একই দৃশ্য। সেখানে তখন বেশ কয়েকখানা কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন গঙ্গাধর বাবাজীও। তাকে দেখেই তিনি বলে ওঠেন , জয় জয়কার হোক বাবারা সব। আমার পেটে বিদ্যেবুদ্ধি খুব একটা নেই। কিন্তু কি বলব বাবা , তোমাদের লেখা খবর পড়ে মন ভরে গেল গো। এই রকম লেখার বড়ো দরকার ছিল। আমাদের মতো ভিখারি মানুষের কথাও ঠাঁই পেয়েছে কাগজে। হাতে করে খান কত কাগজ নিয়ে চললাম গাঁ বেড়াতে। একটা / দুটো করে দিয়ে বলব ' দেখ গো সব , কত সুন্দর করে আমাদের কথা লেখা আছে।
----- আপনার ভালো লেগেছে ?
---- শুধু আমার কেন গো বাবা ,  ভালো মানুষ মাত্রেই এ কাগজ যারা পড়বেন তাদেরই ভালো লাগবে।এই রকম লেখা যেন আরও পড়তে পাই। 
---- আর্শিবাদ করুন আমি যেন এইরকম লেখা লিখতে পারি।
---- উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করি তোমার কলমে যেন তিনি এমনই লেখার শক্তি দেন।
---- এরপর থেকে কোনদিন তোমার কাগজ বেরোবে আগে থেকে একটু জানিয়ে দিও। সবদিন তো আমার এ গাঁয়ে আসা হয় না। তোমার কাগজ যেদিন বেরোবে সেদিন আসব তাহলে। খান কতক করে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন গাঁয়ে দিয়ে আসব।
---- এখনও তো কোনদিন কাগজ বেরোবে তা কিছু ঠিক হয় নি।তবে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। যেদিনই বেরোক না কেন , আপনার আখড়ায় কিছু কাগজ পৌঁচ্ছে দিয়ে আসার  ব্যবস্থা করব।
---- তাহলে তো খুব ভালোই হবে। বেশ গো বাবারা সব আজ আসি। পরে আবার দেখা হবে। 
---- হ্যা আসুন। 
কাগজ ক'খানা পরম যত্নে ভিক্ষার ঝুলিতে ভরে নিয়ে ভিন গাঁয়ের পথ ধরেন বাবাজী। আর তার গমন পথের দিকে চেয়ে আর্য ভাবতে থাকে, তার কাগজ একজন বৈষ্ণব মানুষ তার ভিক্ষার ঝুলিতে ভরে  পৌঁচ্ছে দিচ্ছেন গাঁয়ে গাঁয়ে , এর চেয়ে বড়ো পাওনা আর কি হতে পারে ? না'ই বা থাক আর্থিক নিশ্চয়তা , এমন আন্তরিকতা সে কোথাই পাবে ? বাবাজীর কথাগুলো তার মনে অনুরণন সৃষ্টি করে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এমনি করেই মানুষের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁচ্ছে দেবে মানুষের কথা। গ্রামের বাঁকে বাবাজী মিলিয়ে যেতেই মাচানতলা থেকে প্রিয়দের বাড়ি অভিমুখে রওনা দেয় তারা। 




                                বাড়ি ঢুকেই আর্য  দেখতে পায় প্রিয়র স্নান হয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দিন সে এতক্ষণ হাসপাতালে গিয়ে দাগ মুছতে শুরু করে দেয়। আজ বোলপুর যেতে হবে বলেই বোধহয় তাকে বেরোতে দেওয়া হয় নি। মালা বাবার চুল আঁচড়ে কাটা দাগটাতে মলম লাগিয়ে দিচ্ছিল। আর্য কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মালা তাকে উদ্দেশ্য করে বলে , দেখুন তো জ্যেঠু বাবা কিছুতেই আমার কথা বিশ্বাস করতে চাইছে না। আপনিই বলুন তো দাগটা মিলিয়ে আসে নি ?
আর্যও ছোটছেলে ভোলানোর মতো করে মালার কথায় সায় দিয়ে বলে -- হ্যা , প্রায়ই তো মিলিয়ে এসেছে। আজ তো আমরা ডাক্তারের কাছে যাব। দেখবেন এবার পুরোপুরি মিলিয়ে যাবে।
--- একেবারে সব মিলিয়ে যাবে ? আর কেউ বুঝতে পারবে না ? 
--- হ্যা , সব মিলিয়ে যাবে। 
কথাটা শোনার পর বাচ্চা ছেলের মতোই প্রশান্তিতে ভরে ওঠে প্রিয়র মুখ। এই অবস্থায় বড়োরাও যেন ছোট ছেলের মতোই হয়ে যায়। সব কিছুই সরল মনে বিশ্বাস করে নেয়। আর্য মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এই বিশ্বাসের মর্যাদা তাকে রাখতেই হবে। বাইরের দাগ পুরোপুরি মুছে দিতে না পারলেও ভিতরের দাগটা পুরোপুরি মুছে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। বাবার চুল আঁচড়ে ' বসুন , চা করে আনি বলে ' রান্নাঘরের দিকে চলে যায় মালা। 
আর্য সঙ্গে করে আনা একটা কাগজ প্রিয়র হাতে তুলে দেয়। সেটা হাতে নিয়ে আর্যর মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে। আর্য বলে , পড়ে দেখুন আপনাদের সব কথা লেখা আছে কাগজে।
তার কথা শুনে কাগজটা খুলে পড়তে শুরু করে প্রিয়। আর্য লক্ষ্য করে পড়তে পড়তে প্রিয়র মুখের ভাব পরিবর্তন হচ্ছে। তখন স্বাভাবিক মানুষের মতোই মনে হয় তাকে। সে জিজ্ঞেস করে -- কেমন লাগছে ? 
স্বাভাবিক মানুষের মতোই সে বলে --- খুব সুন্দর।
--- কি সুন্দর বাবা ? চা দিতে এসে প্রশ্নটা করে মালা। তারপর বাবার হাতে কাগজটা দেখে আর্যকে জিজ্ঞেস করে -- এটা কি জ্যেঠু ? 
--- এটা আমার চ্যালেঞ্জ। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে আর্য।
---- আপনার চ্যালেঞ্জ মানে ? 
---- কাল তোমাকে কথা দিয়ে গিয়েছিলাম শয়তান দুটোর মুখোশ আমি খুলে দেব। এটা আমার সেই মুখোশ খোলার চ্যালেঞ্জ। এটা আমাদের সাপ্তাহিক পত্রিকা ' দায়বদ্ধ। '
মালার হাতেও একটা পত্রিকা তুলে দেয় আর্য। সেটাতে চোখ রেখেই মালা বলে ,  কিন্তু আপনি তো ' দৈনিক অন্তরালে ' পত্রিকায় লেখেন।
---- লিখতাম। কিন্তু তোমার বাবার মতো ডাক্তারবাবুকেও দাগিয়ে দিতে পারি নি বলেই সেই কাজে  ইস্তফা দিয়েছি।
---- কাজে থেকেই ইস্তফা দিয়ে দিলেন ? আপনিও না বাবার মতোই ছেলেমানুষ।
--- তোমার মতো মা থাকলে সব বাবারাই যে ছেলেমানুষ হয়ে যায় মামনি।
ততক্ষণে চারপাতার কাগজটাতে চোখ বোলানো হয়ে গিয়েছে মালার। তার চোখেও আর্য দেখতে পায় মুগ্ধতার আভাস। সে জিজ্ঞেস করে -- তোমার কেমন লাগল বললে না মামনি ? 
---- কি বলব জ্যেঠু অনেকদিন পর মনে বড়ো শান্তি পেলাম। আমার কথাকে যে আপনি এতখানি গুরুত্ব দেবেন তা ভাবি নি। থ্যাংক ইউ জ্যেঠু , থ্যাংক ইউ।
---- বাবাকে কি বুঝি মেয়েরা থ্যাংক ইউ বলে ?  
---- ওঃ  স্যরি জ্যেঠু। কিন্তু আপনাকে কি বলি বলুন তো ?
---- কি বলা যায় সেটা ভেবে রেখ। পরে কোনদিন এসে বরং শুনে নেব মামনি। 



                             সেই সময় এসে পৌঁছোয় সৌরভ। সেবার নবান্নের যাত্রার সময় সৌরভের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আর্যর। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই সৌরভ বলে , কালই খবরটা পেয়েছি দাদা। আপনি এগিয়ে এসেছেন শুনে খুব ভাল লাগল। আমরা তো ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে পড়েছি। কিন্তু কোনদিকে কিছু করতে পারি নি। আমার মন বলছে এবার কিছু একটা হলেও হতে পারে।
---- কি হবে না হবে , তা সময় বলবে। সব তো আমাদের হাতেও নেই। তবে আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। সবই ঠিক আছে , কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
---- কি সমস্যা ? 
---- আসলে এইসব চিকিৎসার জন্য নিয়মিত কাউন্সিলিং প্রয়োজন। বকেয়ার টাকা পয়সার জন্য বিভিন্ন দফতরে ঘোরাঘুরিও করতে হবে। তারপর আমি ভেবেছি ওখানেই প্রাইভেটে শঙ্খর গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট করার ব্যবস্থা করব। এইসব করতে গিয়ে সবদিন হয়তো ওদের বাড়ি ফেরা হবে না। তাহলে এদিকটা দেখবে কে ?
---- ওটা নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমার বাবা - মা শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রয়েছেন। তাই ওদের পিসিমনি আসতে পারবে না ঠিকই ,  কিন্তু আমি দু'বেলা  আসা যাওয়া করব। 
প্রশান্তকাকা বলেন , আমরাও রয়েছি। যেদিন ওরা ফিরতে পারবে না সেদিন রাতে ওদের ঠাকুমাও আগের মতোই এসে থাকবে না হয়।
--- যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। বেশ তাহলে এবার বেরিয়ে পড়া যাক। ডাক্তারের কাছে সময় নেওয়া আছে , অফিসের কাজকর্ম সব সেরে সময় মতো তার কাছে পৌঁছোতে হবে। শঙ্খ কাগজপত্র সব গুছিয়ে নিয়েছো তো ? 
---  হ্যা জ্যেঠু , বলে ফাইল হাতে সামনে এসে দাঁড়ায় শঙ্খ। বেরোতে যাবে এমন সময় আর্যকে পাশে ডেকে নিয়ে যায় সৌরভ। কিছু টাকা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে , কত কি খরচ হবে জানি না। এই টাকা ক'টা রাখুন।
আর্য টাকা সহ সৌরভের হাতটা মুঠো বন্ধ করে দিয়ে বলে , আপাতত এই লড়াইটা আমাকে লড়তে দিন। তারপর যদি ঠেকে যায় তখন আপনারা তো রইলেনই।
--- প্রয়োজন হলে বলবেন তো ? 
--- নিশ্চয়। তবে অন্য একটি প্রয়োজনের ব্যাপারে আপনার সঙ্গে দেখা করার কথা ভেবে রেখেছিলাম। আজ আপনি না এলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে হত।
--- অন্য প্রয়োজন ? 
--- আমি শুনেছি মালার নাকি বিয়ের ঠিকঠাক সব হয়েছিল। প্রিয়র ব্যাপারটার জন্য সব ভেস্তে যায়। সেই সমন্ধটা ফের জোড়া লাগানোর জন্য ছেলের বাড়িতে কথা বলতে যেতে চাই। আপনার মত কি ?
--- খুব ভালো কথা। বিয়ের কথা বলতে তো প্রিয় আর আমিই গিয়েছিলাম। বিয়ের জবাবটাও ওরা আমাকেই জানিয়েছিল। সত্যি বলতে কি আমিও অনেকদিন ওদের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু মালার আপত্তিতেই যেতে পারি নি।
---- মালার আপত্তির কারণ কি ? 
---- এমনিতে অন্য কোন কারণ নেই। এখনও ছেলেমেয়ে দুটো একে অন্যকে ভালোবাসে বলেই মনে হয়। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর বাড়ির লোকেরা ছেলেটির অন্য জায়গায় বিয়ের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শুনেছি নাকি ছেলেটি অন্য কোথাও বিয়ে করতে রাজী হয় নি।
--- তাহলে ? 
--- ওই যে প্রিয়র ওই ঘটনার সময় বাবা-মা আর পারিপার্শ্বিক চাপে ছেলেটি অন্যদের মতোই দুরে সরে গিয়েছিল বলেই অভিমানে মালাও দুরত্ব সৃষ্টি করতে চাইছে। তবে আপনি বুঝিয়ে বললে না করতে পারবে না।
--- সে ওকে পরে বুঝিয়ে বলব। আগে ছেলের বাড়ির সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। ওরা কি বলেন সেটা জানতে হবে।
--- আমার মনে হয় ওরাও আর আপত্তি করবেন না।
--- তাহলে তো ভালোই হয়। বেশ এখন এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। পরে আপনার সঙ্গে কথা বলে ওদের বাড়ি যাওয়ার একটা দিন ঠিক করে নেব।
বলেতে বলতেই বাইরের দরজার দিকে এগোয় আর্য। সেখানে তখন তাদের বিদায় জানানোর জন্য প্রশান্তকাকা, জীতেনকাকা, অতসীকাকীদের মতো অনেকেই হাজির হয়েছেন। বাবার হাত ধরে ছলো ছলো চোখে দাঁড়িয়ে রয়েছে মালাও। আর্য তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে , মন খারাপ করিস না মা। যত দ্রুত সম্ভব তোর বাবাকে সুস্থ করে তোদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যাব। 
কোন কথা বলতে পারে না মালা। সে বাবা আর আর্যকে প্রণাম করে। আর্য মাথায় হাত রেখে আর্শিবাদ করে তাকে।  দেখাদেখি প্রিয়ও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আর্শিবাদ করে ছোট্ট মেয়েটির মতোই মাথায় চুমু খায়। বাবার ওই অভিব্যক্তি দেখে কান্না ভেজা চোখেও মালার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অন্যদের সংক্রামিত করে সেই আবেগ। তাদের চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে। আর্যও আবেগে আপ্লুত হয়েই মোটরবাইকে স্টার্ট দেয়। কিন্তু মাচানতলায় পৌঁছোতেই থামতে হয় তাদের।




                  ( ক্রমশ )





     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---





No comments:

Post a Comment