অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
সেখানে তখন রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সংবাদ মাধ্যমের ও,বি ভ্যান। তাকে দেখেই এগিয়ে আসে সাংবাদিক - চিত্র সাংবাদিকেরা। ডাক্তারের দাবির আন্দোলনের সময় এদেরই সে এই গ্রাম চিনিয়েছিল। আজ তার মাসুল তাকে দিতে হচ্ছে। শৌভিককে দেখে তার সেই কথাটাই মনে পড়ে যায়। ওর জন্যই তো চেষ্টা করেও প্রিয়র খবরটা আটকাতে পারেনি। শৌভিকই খবরটা করার লোভ জয় করতে পারে নি। তাই তাকে দেখে রাগে তার গা'টা যেন জ্বালা করে ওঠে। কিন্তু সেটা কাউকে বুঝতে না দিয়ে বলে , কি ব্যাপার সব ?
---- দাদা , তুমি তো রাতারাতি এত বড়ো একটা কান্ড ঘটিয়ে আমাদের সবাইকে শুইয়ে দিলে। এজেন্টের ফোন পেয়ে সকাল থেকে অফিস আমাদের মাথা খারাপ করে দিল। তাই তো ছুটে আসতে হল। আমাদেরও তো একবার বলতে পারতে দাদা।
---- বলতে হয়তো পারতাম। কিন্তু আর একজন নিরপরাধ মানুষকে দাগিয়ে দিয়ে এর মতো অবস্থা করতে পারতাম না বলেই তোমাদের বলি নি।
বলে মোটরবাইকের পিছনে বসে থাকা প্রিয়কে দেখায় আর্য। প্রিয় তখন ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়েছিল সেটা লক্ষ্য করে শৌভিক বলে -- কেন কি হয়েছে ওর ?
-- আমরা কেমন সাংবাদিক দেখ , আমাদের খবরের জেরে কার কি হল সেই খবরটুকুও আর রাখার প্রয়োজন মনে করি না। খবরের প্রয়োজনটুকু মিটে গেলেই হল।
জানো , আমাদের সেদিনের সেই খবরের জেরে ও আজ মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলেছে। এর দায় আমরা কি এড়িয়ে যেতে পারি ?
--- ওঃ মাই গড। তবুও তুমি খবরটা বললে পারতে। তুমি একাই করে দিলে খবরটা।
--- ওই যে বললাম , একজন মানুষকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার আগেই সংবাদ মাধ্যম তাকে মিথ্যা কলঙ্কের কালি মাখিয়ে সামাজিক শাস্তি দিয়ে দিক তা আমি চাই নি। তাছাড়া আমি তো ওদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার খবর করেছি। তোমরা যে সব মিডিয়ায় কাজ কর সেখানে তো এইসব খবরের কোন 'নিউজ ভ্যালুই ' নেই। আমিও এতদিন যেখানে কাজ করতাম সেখানেও ছিল না। তাই আমি সেখান থেকে সরে এসেছি। বেশ পরে কথা হবে।আমরা এখন আসছি।
--- আসছি মানে ? ওকে নিয়ে কোথাই যাচ্ছ ? ওকে ধরে খবরটা করব বলেই তো ছুটে এলাম।
---- কিন্তু আজ তো সেসময় হবে না। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সময় নেওয়া আছে। তাই ওকে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। তাছাড়া এই অবস্থায় ওকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করা হলে ওর খারাপ হবে। তাই সেটা করাও ঠিক হবে না।
আর্যর কথা শুনে এবারে যেন ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে শৌভিক। কিছুটা মেজাজের সঙ্গেই বলে , এটা কিন্তু তোমার ঠিক কথা হল না। ও তো তোমার নিজের কেউ নয়। তোমাকে কেউ ওর ঠিকাদারিও দেয় নি যে তুমিই সব কিছু ঠিক করে দেবে ?
--- ঠিকই বলেছো। ও আমার নিজের কেউ নয় , কেউ ঠিকাদারিও দেয় নি। কিন্তু একটা ব্যাপার কি জানো আমি ' মাই গড ' বলে সব কিছুতেই দায় খালাস করতে পারি না। তাই এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কিছু কাজ করতে হয়। ঠিক আছে , ওর ছেলেও রয়েছে। তোমরা বরং ওর সঙ্গে আগে কথা বলে নাও। ও অনুমতি দিলে তো আর আমার আপত্তি করার কিছু থাকবে না।
শঙ্খকে দেখিয়ে দেয় আর্য। শৌভিক তার কাছে কথাটা পাড়তেই তীব্র শ্লেষের সঙ্গে শঙ্খ বলে ওঠে -- বাবাকে নিয়ে অনেক খবর করেছেন। দোহাই আপনাদের , আর খবর করে বাবার মাথাটা আরও খারাপ করে দেবেন না।
কথা শেষ করে আর্যকে তাড়া দিয়ে বলে -- কি হলো জ্যেঠু চলুন। বাবাকে দেখিয়ে আবার ফিরতে হবে আমাদের। আর দেরি করলে ফিরতে সমস্যা হবে।
শঙ্খর তাড়ায় মাচানতলা ছেড়ে বেড়িয়ে আসে তারা। আসার সময় দেখতে পায় শৌভিকরা হতভম্ভের মতো তাদের দিকে চেয়ে আছে।এককালের সহকর্মীদের এভাবে ফেলে আসতে খারাপই লাগে তার।
কিন্তু প্রিয়র কথা ভেবেই কাজটা করতে হয় তাকে। তবে সংবাদমাধ্যমের এভাবে গ্রামে ছুটে আসাটাকে তার ইতিবাচক বলেই মনে হয়। তার মনের কথাটাই বলে ওঠে সোমনাথ। উচ্ছ্বসিত গলায় সে বলে , দাদা শেষপর্যন্ত আমাদের 'দায়বদ্ধ'এর গুঁতোয় সব ব্যাটাকে ছুটে আসতে হল।
--- তাই তো দেখছি।
--- শেষ পর্যন্ত ওরা তোমার প্রদর্শিত পথে গুরুত্বহীন খবরেও ' নিউজ ভ্যালু ' খুঁজে পেল।
---- আমাদের এভাবেই ওদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে হবে।
---- ঠিক বলেছো দাদা।
ওইসব কথা বলতে বলতেই তারা জেলাশাসকের দফতরে পৌঁচ্ছে যায়। সেখান থেকে যায় মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের দফতরে। দু'জায়গাতেই লিখিতভাবে প্রাপ্যের দাবি জানানো হয়। এতে বিশেষ কাজ হবে বলে মনে হয় না আর্যর। কিন্তু আদালতে যেতে হলে এইসব আবেদনের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র প্রয়োজন হবে। ডাক্তারবাবুও সেদিন একই কথা বলেছিলেন। আর্য ভাবে কি আশ্চর্য আমাদের দেশ। মানুষকে তার ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য আদালতে ছুটতে হবে ! সবাই তো আর উচ্চ আদালতে ছুটতে পারে না।তাহলে তাদের কি হবে ? আবার এও শোনা গিয়েছে আদালতের রায়ও অনেক সময় মানা হয় না। সেক্ষেত্রে ফের আদালত অবমাননা মামলা করতে হয় পাওনা আদায়ের জন্য। কতজন যে ওই দৌড়ঝাঁপ করতে পারেন নি বলে পাওনা টাকা পান নি কে জানে ? ওইরকম বঞ্চিত মানুষদের কথা সে তুলে ধরবে তার পত্রিকায়। সেই কথা ভাবতে ভাবতে তারা পৌঁছোয় সুশোভনবাবুর চেম্বারে। সেখানে পৌঁছেই অনেকখানি স্বাভাবিক দেখায় প্রিয়কে। সে নিজে থেকেই ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করে -- ভালো আছেন ?
--- হ্যা , তুমি ভাল তো ?
ঘাড় নেড়ে ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারে যায় প্রিয়। তারপর পরম যত্নে মেসিনগুলো মুছতে মুছতে আপন মনেই বলতে থাকে -- কত দাগ লেগে আছে। কেউ মোছে নি। দাগ লেগে থাকলে সব কিছু বিশ্রী দেখায়।
ডাক্তারবাবু ধীরে ধীরে প্রিয়র পিছনে গিয়ে দাঁড়ান। পরম যত্নে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন , তুমি থাকো না বলেই দাগ পড়ে আছে। কেউ দাগ মোছে না। তুমি আবার থাকবে এখানে ?
--- হ্যা।
---- বেশ , তাহলে এখন চলো ডাক্তারের কাছে থেকে ঘুরে আসি।
তারপর ডাক্তারবাবু গাড়িতে করে প্রিয়কে নিয়ে তারা সবাই পৌছোয় কিশোর রায়ের চেম্বারে। কিশোর রায় নাম করা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ডাক্তারবাবুর বন্ধু। সব কিছু শোনার পর তিনি আর্য আর ডাক্তারবাবুকে পাশে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বলেন , ওনার মন মধ্যে থেকে দাগ বাতিকটা মুছে ফেলতে পারলেই উনি পুরো সুস্থ হয়ে যাবেন। নিয়মিত কাউন্সিলিং এর মাধ্যমেই সেটা সম্ভব।
সেই সঙ্গে উনি যে কাজ করতেন অর্থাৎ ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারের কাজের মধ্যে যদি যুক্ত রাখা যায় তাহলে আরও ভালো হয়।বন্ধুর কথা শুনে ডাক্তারবাবু সংশয় প্রকাশ করে বলেন , পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ কি ওকে দিয়ে করানোটা ঠিক হবে ?
---- আরে ও ওর মতো পরীক্ষা করবে। পরে অন্য কাউকে দিয়ে ফের পরীক্ষা করিয়ে নিলেই হবে।
--- হ্যা , সেটা হতে পারে।
---- কিন্তু ওর পর যে অন্য কাউকে দিয়ে পরীক্ষা করানো হচ্ছে সেটা ওকে বুঝতে দিলে হবে না। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এক ধরনের হীনমন্যতা বোধ ওর মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে। তাই সব সময় ওর মতামতই যে গুরুত্বপূর্ণ , সেটাই বোঝাতে হবে ওকে। তাতে ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। সেই আত্মবিশ্বাসই ওকে দ্রুত সুস্থ করে তুলবে।
আর্য বলে , আমারও তাই মনে হয়। আজ তার প্রমাণও মিলেছে।
---- কি রকম ?
--- আগে ও তো ডাক্তারবাবুর ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারেই কাজ করত। এখানে আসার আগে যখন সেখানে যায় তখন প্রিয় নিজে থেকেই সেখানে ঢুকে মেসিন মুছতে শুরু করে। তখন ওকে অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছিল।
---- তাহলে তো ভালই হল। ওকে ওখানেই রাখা যেতে পারে।
সুশোভনবাবু বলেন , আমিও সেটাই ভেবেছি। আমার চোখের সামনে থাকবে। ওর সঙ্গে তো আমাদের অনেকদিনের চেনাশোনা। অন্য কর্মীরা ওকে ভালোবাসে। মনে হয় তাদের মাঝে ও নিজের জগৎটাকে খুঁজে পাবে।
কিশোরবাবু বলেন , একদম ঠিক কথা। ওকে ওর নিজস্ব জগতে ফিরিয়ে দিতে হবে।
ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে ফেরার সময় আলোচনায় সেটাই চূড়ান্ত হয়ে যায়। ঠিক হয় চিকিৎসা চলাকালীন বাবাকে নিয়ে আসবে শঙ্খ। তারপর তাকে ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারে পৌঁছে দিয়ে কলেজে চলে যাবে। যেদিন বাড়ি ফেরা সম্ভব হবে না সেইসব দিন আর্যর বাড়িতেই থেকে যাবে ওরা। ফোনে করে সেটা মালাকে জানিয়ে দিলেই হবে। শঙ্খর গ্রাজুয়েশনের প্রসঙ্গও ওঠে। আর্য প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশনের ব্যবস্থা করবে বলে ঠিক করছিল। সেটা শুনে ডাক্তারবাবু বলেন , ওকে যখন বাবাকে নিয়ে আসতেই হবে তখন প্রাইভেটে করতে যাবে কেন ?
--- তাহলে ?
--- ওর তো থার্ড ইয়ার চলছিল ?
--- হ্যা।
--- তাহলে বাবার চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে ও কলেজ লিভিং সার্টিফিকেট এনে দিব্যি এখানের কোন কলেজে ভর্তি হতে পারবে। সেক্ষেত্রে একবছরের মধ্যেই তো গ্রাজুয়েশানটা কমপ্লিট হয়ে যাবে। যেহেতু দু'টি কলেজ একই ইউনিভারসিটির অধীনে তাই কোন সমস্যা হবে না।
কথাটা যুক্তিপূর্ণ মনে হয় আর্যর। সত্যিই তো এই ব্যাপারটা ভাবে নি। অবশ্য প্রথমদিকে তো প্রিয়র ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্তও হয় নি।এখানে দুটি কলেজ রয়েছে। একটিতে চৈতী পড়ে। দু'টি কলেজের প্রিন্সিপ্যালই তার বিশেষ পরিচিত। তাদের ধরে যেকোন এক জায়গায় শঙ্খকে ভর্তি করতে সমস্যা হবে না। তাই সেই সিদ্ধান্তই নেয় সে।



No comments:
Post a Comment