অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
ডাক্তারবাবু , সোমনাথও তার সিদ্ধান্তেই সায় দেয়। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে প্রিয় আর শঙ্খর মত নেওয়াটা জরুরী মনে হয় আর্যর। তাই গাড়িতেই সে বাবা-ছেলের কাছে কথাটা পাড়ে। প্রিয় সেই মুহুর্তে বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করার মতো অবস্থায় ছিল না। তাই কোন কথা না বলে শুধু আর্যর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। শঙ্খ অবশ্য বলে , জ্যেঠু আপনাদের যেটা ভালো মনে হয় সেটাই করবেন। কিন্তু রেগুলার কলেজ হলে যাওয়া আসা করে পড়া সম্ভব হবে ?
--- সেটা নিয়ে তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
ঠিক হয় প্রিয়রা বাবা - ছেলে সেদিনটা আর্যর বাড়িতেই থেকে যাবে। পরদিন প্রিয়কে ডাক্তারবাবুর ডায়্যাগনস্টিক্সে সেন্টারে পৌঁচ্ছে দিয়ে শঙ্খকে ভর্তি করাতে কলেজে নিয়ে যাবে আর্য। সেইমতো মনোহরপুরে সৌরভকে ফোনে কথাটা জানিয়ে দেয় সে। সৌরভ জানায় , কোন অসুবিধা হবে না দাদা। আজ যে ফেরা সম্ভব হবে না তা আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। সেইমতো ব্যবস্থাও করে রেখেছি। অতসীকাকী আর প্রশান্তকাকা এ বাড়িতে এসে থাকবেন। প্রশান্তকাকাদের বাড়ি পাহারা দেবেন জীতেনকাকা।
ওই ব্যবস্থার কথা শুনে খুব ভালো লাগে আর্যর। নিজের বাড়ি-ঘর ফেলে পড়শির বাড়ি আর মেয়ের দেখভাল করছেন স্বামী-স্ত্রী, আর তাদের বাড়ি আগলাচ্ছেন অন্য পড়শি। এইরকম সহমর্মিতা বড়োই দুর্লভ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার নিয়োগের আন্দোলন একদিন গ্রামবাসীদের সহমর্মিতার বন্ধনে বেঁধে দিয়েছিল। সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের মাঝেও সহমর্মিতার সেই ধারাটি বজায় রেখে সত্যিই নজির সৃষ্টি করেছে মনোহরপুর।
সৌরভকে সেই কথাটাই বলে আর্য। তার সঙ্গে কথা বলে বাড়িতে ফোন করে বৈশাখীকেও বিষয়টি জানায় সে। বৈশাখী জানায় , সে আন্দাজ আমি করেছিলাম।কোন অসুবিধা নেই। ওরা প্রথম আসছে , আসার সময় মনে করে কেজি খানেক মাংস নিয়ে এস। আর সময় মতো ফিরে এসো।
-- ঠিক আছে। আজ আর ভুল হবে না।
সময় মতো ফিরব বলেও কিন্তু সময় মতো ফেরা হয় না আর্যর। ডাক্তারবাবু কিছুতেই না খাইয়ে ছাড়লেন না। দুপুরে খাওয়া হয়নি কারও। টিফিন করেই কেটে গিয়েছে। তাই তিনি হোটেল থেকে রুটি - তড়কা আনিয়ে চেম্বারেই খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। খাওয়া দাওয়া চুকতে বিকেল গড়িয়ে যায়। খাওয়ার পর সোমনাথ বলে -- দাদা আজ আমাকে বিদায় দিতে হবে। দু'দিন বাড়ি ছাড়া। এরপর বাড়িতে ভাত বন্ধ হয়ে যাবে।
----আমাকে একা ফেলে চলে যেতে চাও যাও। কিন্তু ভাত বন্ধ হয়ে যাওয়ার অজুহাত দিও না। সেটা যে সত্যি নয় তা আমি জানি। আর বন্ধ হয়েই যদি যায় , আমার বাড়ির হোটেলটা তো খোলাই আছে। পোলাও মাংস না হলেও, দাদা - ভাইয়ের শাক ভাত ঠিক জুটে যাবে।
--- সে তো জানি দাদা। আর জানি বলেই তো এত বাউণ্ডুলেপনা করার সাহস পায়। যদি কোন কাজ থাকে তো বলুন , থেকে যাব। কোন সমস্যা হবে না।
---- আরে না না , মজা করছিলাম। পারলে কাল একবার এস। পরের সপ্তাহের পত্রিকা নিয়ে আলোচনা করব।
--- ঠিক আছে দাদা।
বিদায় নেয় সোমনাথ।প্রিয়দের নিয়ে আর্য যখন নিজের বাড়ির দরজায় পৌঁছোয় তখন বেলা গড়িয়ে গিয়েছে। অথচ বৈশাখী সময় মতো ফিরতে বলেছিল। কিন্তু ফেরা হল কই ? অবশ্য এটা এই প্রথম ঘটল এমন নয়। এর আগেও বহুবার একই ঘটনা ঘটেছে। আসলে ফিরব বলেও সময় মতো ফেরা হয় না। কারণ ফেরার পথে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে কতজনের সঙ্গে কত বিষয়ে যে কথা বলতে হয় তার কোন ঠিক থাকে না।কতজনের কত না সমস্যার কথা শুনতে হয়, সমাধানের উপায় বাতলে দিতে হয়। ব্যাপারটা এই পেশার অঙ্গীভূত বলেই মনে হয় তার। কোথাও কিছু কুলকিনারা না পেয়ে শেষে ভুক্তভোগী মানুষজন সাংবাদিকদের কাছে আসে। তাদের বিশ্বাস , সাংবাদিকরা লাগলে সমাধান সূত্র কিছু একটা মিলবেই। আর্য ওইসব মানুষের বিশ্বাসের অমর্যাদা করতে পারে না। তাই তাকে বাড়ি ফেরার পথে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়াতে হয়।
কোথাও বা চা খাওয়ার অনুরোধ রক্ষা করতে হয়। সেইসব করতে গিয়ে অবধারিত ভাবে অধিকাংশ দিন বৈশাখীকে দেওয়া সময়ে বাড়ির ফেরার কথা রাখা সম্ভব হয় না। বৈশাখীও তার বাধ্যবাধকতাটা বোঝে। এত মানুষ তার স্বামীর উপরে ভরসা করে বলে স্ত্রী হিসাবে তার ভালোও লাগে। তাই স্বামীর দেরিতে বাড়ি ফেরাটা বৈশাখীর গাসহা হয়ে গিয়েছে।আজও যে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে তাও সে জানত। অন্যদিন তবু কিছুটা রাগ দেখানোর সুযোগ থাকে। আজ তো আর ওদের সামনে সেই সুযোগও পাবে না। সেই ভেবেই বাইকের শব্দ পেয়ে সে হাসি মুখে দরজা খোলে। দরজার সামনেই বাবা- ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রিয়কে নমস্কার করে বলে -- আসুন।
প্রিয়ও প্রতি নমস্কার করে বাড়ির ভিতরে পা রাখে।
বৈশাখী তারপর শঙ্খকে বলে -- তুমি নিশ্চয় শঙ্খ। ভিতরে এসো বাবা।
--- হ্যা জেঠিমা।
একে একে সবাইকে প্রনাম করে শঙ্খ। বৈশাখী তাড়াতাড়ি তাকে তুলে ধরে চিবুক ছুঁইয়ে চুমু খেয়ে বলে -- থাক থাক বাবা। আর্শিবাদ করি মানুষের মতো মানুষ হও।
প্রথম দেখাতেই মা মরা ছেলেটিকে ভালো লেগে যায় বৈশাখীর। চোখমুখ এখনও বাচ্চাদের মতো। চেহেরাটা এত মিষ্টি যে দেখেলেই আপন করে নিতে ইচ্ছে করে। একটা পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা তার বহুদিনের। চৈতীর আসার পরই তারও কোলে এসেছিল একটা পুত্র সন্তান। কিন্তু জন্মের পর তাকে বাঁচানো যায় নি। শুধু তাই নয় , তারপর বৈশাখীর সন্তান ধারণ বিপদজনক হয়ে পড়ে। ডাক্তার জানিয়ে দেন , এরপর সন্তানের জন্ম দিতে গেলে মায়ের প্রাণ সংশয় ঘটতে পারে। তাই আর মা হওয়া হয়নি বৈশাখীর। শঙ্খকে দেখে তার বুবুক্ষ হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। মা মরা ছেলেটির মধ্যেই যেন সে তার হারানো সন্তানকে ফিরে পায়। সবকিছু ভুলে শঙ্খর হাত দুটি ধরে সে তার মুখের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।
বারন্দায় দাঁড়িয়ে ঘটনাটা চুপচাপ দেখছিল চৈতী। ছেলেটাকে ঘিরে মায়ের ওই আচরণ তার বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়। মায়ের ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে। ছেলেটাও তেমনি , এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন বিনয়ের অবতার। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে তার মায়ের আদরে ভাগ বসানোর মতলব! তাই সে রেগে রেগে বলে -- বাব্বা দেখে বাঁচি না। মনে হচ্ছে যেন নিমাই সন্ন্যাসে যাচ্ছেন। আর শচীমাতা তাকে হাত ধরে আটকে রেখেছেন।
মেয়ের কথা শুনে তার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় বৈশাখী। কিন্তু লক্ষ্য করে শঙ্খর হাত দুটো সেই ভাবেই ধরে আছে সে। কিন্তু মেয়ে পিছনে লাগবে বলে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়েও দিতে পারে না।
বরং কপট শাসনের সুরে বলে -- তুই থাম দেখি। বালাই ষাট, সন্ন্যাসে যাবে কেন ? সবার পিছনে লাগার স্বভাবটা তোর এখনও গেল না।
তারপর শঙ্খকে উদ্দেশ্য করে বলে , ওই বিচ্ছুটাকে চিনে রাখ। ও হলো চৈতী, আমার মেয়ে। খুব গেছো, একেবারে শাসন বারণ মানে না। অন্যের পিছনে লাগাই ওর স্বভাব। তুমি ওর কথা কিছু ধরো না। বেশি জ্বালাতন করলে আমাকে বলবে।
---- বয়েই গিয়েছে আমার কাউকে জ্বালাতন করতে।
শঙ্খ কিছু বলে না। চৈতীর দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।
আর সেটা দেখে চৈতী বলে ওঠে -- ক্যাবলা কার্তিকের মতো হাসার কি হলো ? দেখলে গা জ্বালা করে।
---- চৈতী কি হচ্ছে কি ? ছেলেটা সবে আজ আমাদের বাড়ি এলো আর তুই ওর সঙ্গে কি ভাষায় কথা বলছিস ? তুমি বাবা ওর কথায় কিছু মনে করো না। ও ওইরকমই।
শঙ্খ হেসেই চলে , কিছু বলে না। তাই যেন আরও চিড়বিড়িয়ে ওঠে চৈতী। বৈশাখীকে বলে , দেখছো মা আবার হাসছে । ওকে থামতে বলো , নাহলে এবার গোবরগনেশ , কুমড়ো পটাশ , হোদলকুতকুত বলব কিন্তু।
--- ওঃ তোকে নিয়ে আর পারি না। এসব শব্দ পাস কোথা থেকে বল দেখি ? লোকের পিছনে লাগার জন্য সব বেছে রাখিস নাকি ?
---- আরও আছে শুনবে ? ঘাঙাসুর , ঘটোৎকচ ------।
---- থাক, থাক আর শুনে কাজ নেই। কিন্তু যাকে বলবি বলছিস সে তো আদৌও ওইরকম দেখতে নাকি ? ছেলে আমার কি সুন্দর দেখতে বলতো ? শঙ্খর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে বৈশাখী।
আর সেটা দেখে চৈতী মুখ ভেঙিয়ে বলে -- কি সুন্দর দেখত বলতো! আহা যেন ময়ূর ছাড়া কার্তিক।
---- তুইই তো তাই বললি।
---- আমি আবার কখন বললাম ?
---- এই তো একটু আগে বললি না ঠিক যেন শচীমাতার কাছে বিদায় চাইছে নিমাই। ক্যালেন্ডারে নিমাইয়ের ছবি দেখেছিস ? কি সুন্দর বলত ?
নিজের কথার জালে জড়িয়ে এতক্ষণে কিছুটা যেন দপকে যায় চৈতী। তাই তো - তো করে বলে , আমি কি সেই ভেবে বলেছি নাকি ?
---- বেশ খুব হয়েছে। এবার ওকে নিয়ে ঘরে যাও দেখি। আমি চা-টা করি। বলেই রান্নাঘরের দিকে যায় বৈশাখী।
শঙ্খ এতক্ষণ তাকে কেন্দ্র করে মা-মেয়ের কথোপকথন বেশ উপভোগ করছিল।কিন্তু জ্যেঠিমা চলে যেতেই তার যেন কেমন ভয় করতে শুরু করে। সে শুনেছে শহরের মেয়েরা নাকি গ্রামের ছেলেদের একা পেলে কলেজে মতো র্যাগিং করে। তাই সে বাবা --জ্যেঠুরা যে ঘরে আছে সেখানে আশ্রয় নেওয়াই শ্রেয় মনে করে। কিন্তু সেই ঘরের দিকে পা বাড়ানোর উপক্রম করতেই যেন হোঁচট খেতে হয় তাকে।



No comments:
Post a Comment