অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক )
পিছন থেকে তীক্ষ্ণ গলায় চৈতী বলে ওঠে --- এই যে ছেলে , মা কি বলে গেল কানে যায় নি ? তোমাকে আমার ঘরে যেতে বলা হয়েছে। আমার ঘরটা ওদিকে নয় , এদিকে। সুর সুর করে চলে আসবে না , চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসতে হবে ?
শঙ্খর ভয়টা এবার জাঁকিয়ে বসে। তাদের গ্রামে তো বটেই , কলেজেও সে এই রকম মেয়ে দেখে নি। এ কি রকম মেয়ে রে বাবা ! কলেজে পড়লেও তার চেয়ে তো জুনিয়ার হবে। কিন্তু কি অবলীলায় তাকে বলছে এই ছেলেটা , চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাব। তাদের গাঁয়ের রাধা, মল্লিকা, মালতি এমন কি তার বোন মালার মুখে ওইসব কথা শোনার কথা ভাবাই যায় না। তাকে চুপ থাকতে দেখে চৈতী ফের বলে ওঠে -- কি হলো , কথাটা কানে যায় নি ?
শঙ্খ ভয়ে ভয়ে বলে -- না না , কানে গিয়েছে তো।
---- বেশ , তাহলে আমার পিছনে পিছনে চলে এস।
নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় চৈতী। তাকে অনুসরণ করে শঙ্খ।ঘরের ভিতর ঢুকে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চৈতী বলে , কি হলো দাঁড়িয়ে আছ কেন ?
এটা কি সরকারি অফিস নাকি যে বসতে না বললে বসা হবে না। তবে সেই ম্যানার্সটাও থাকা ভালো। ঠিক আছে ওই সোফায় বসা হোক।
সেই কথা শুনে সোফায় বসে শঙ্খ। উল্টো দিকের চেয়ারে মুখোমুখি বসে চৈতী। এতক্ষণে তাকে দেখার সুযোগ হয় শঙ্খর। কিন্তু তাকে চেয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা কি বলতে কি বলে ফেলবে তার ঠিক নেই। তাই সে মুখ নামিয়ে বসে থাকে। তাকে মুখ নামিয়ে নিতে দেখে ফের ধমকে ওঠে -- কি হলো আমি কি আগুন না সূর্য যে মুখ তুলে চাইলেই পুড়িয়ে দেব ?
শঙ্খ মনে মনে ভাবে এ তো মহা মুশকিলে পড়া গেল দেখছি। সামনা সামনি তাকালে কি বলতে কি বলে দেবে তার ঠিক নেই , আবার মুখ নামিয়ে বসারও যো নেই।
ওদিক থেকে ফের তাড়া আসে --- কি হলো কোন উত্তর নেই কেন ?
অগত্যা ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে তাকাতে হয় শঙ্খকে। কিন্তু আর যেন চোখ ফেরাতে পারে না। মালার মতোই বয়স হবে। কাঁচ - কাঁচ গায়ের রঙ। মুখটা অপূর্ব সুষমা মন্ডিত। এ মুখের দিকে চেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সে সুযোগ মেলে না।চৈতী বলে ওঠে -- তুমি এত ক্যাবলাকান্ত কেন ?
--- কেন কি করলাম আবার ?
--- ওই যে আমার মুখের দিকে চেয়ে শ্রাবস্তীর কারুকার্য খুঁজতে লেগে গিয়েছ।
শঙ্খ কোন উত্তর দিতে পারে না। কথাটা নেহাৎ মিথ্যা তো নয়। সত্যিই মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল সে। গ্রামে কিম্বা কলেজে কোন মেয়েকে দেখে তার কখনও এমন অনুভূতি হয় নি। তাই সে চুপ করে থাকে। কিন্তু সে চুপ করে থাকলে কি হবে , চৈতী তাকে চুপ করে থাকতে দিলে তো ?তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলে --- কই কিছু বললে না তো ?
--- কি বলব ?
--- তোমার জ্যেঠিমায়ের কথায় তুমি তো ময়ূর ছাড়া কার্তিক। আমি লক্ষ্মী - সরস্বতী না হতে পারি খেঁদিপেঁচিও কিন্তু নয়।
---- সত্যি কথা বলব ?
---- আমি কি তোমাকে মিথ্যা কথা বলতে বলেছি ?
শঙ্খ মনে মনে বলে এ যে দেখছি শাঁখের করাত। যেতেও কাটে আসতেও কাটে। মাথার নাট-বল্টু ঢিলে নেই তো ?
---- কি হল থামলে কেন ?
---- তুমি সত্যিই রূপে লক্ষ্মীর মতো। আমাদের গাঁয়ে দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী হয় , আবার আলাদা করেও লক্ষ্মী ঠাকুর হয়। দুর্গার সঙ্গে যে ঠাকুরটা হয় সেটাই বেশি ভাল দেখতে হয়। তোমাকে দেখে আমার সেই ঠাকুরটার মতো মনে হচ্ছিল। কিন্তু তুমি কিছু বলবে বলে ভয়ে কিছু বলতে পারি।
--- ঠিক আছে , ঠিক আছে আর স্তুতি করতে হবে না। আর একটু আধটু ভয় থাকাও ভালো।
---- সেই ভালো।
---- যাক বুঝেছো তাহলে। তা শুনলাম তুমি নাকি আমাদের বাড়ি থেকে কলেজে পড়াশোনা করবে ?
---- জ্যেঠু সেই রকমই বলেছেন।
---- সে থাকবে থাকো, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আদিখ্যেতা করে আবার আমার বাবা -- মায়ের আদর-ভালোবাসায় ভাগ বসাতে যেও না। আচ্ছা তুমি এত হ্যাংলা কেন ? নিজের বাবা - মা থাকতে অন্যের বাবা-মায়ের আদর ভালোবাসায় ভাগ বসাতে চাও কেন ?
মায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই চোখে জল আসে শঙ্খর। নিজেকে সামলে কোন রকমে বলে , আমাদের তো মা নেই। তাই আমরা মাতৃস্নেহের কাঙাল।
সেই কথা শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসে চৈতী।
তারপর শঙ্খর সামনে হা্ঁটু মুড়ে বসে তার চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে --- স্যরি , না জেনে তোমাকে আঘাত করে ফেলেছি। প্লিজ ক্ষমা করে দাও।
--- না, না, এতে তোমার কি দোষ। তুমি তো ঠিকই বলেছ ? আমরা সত্যিই খুব হ্যাংলা।
শঙ্খর কথা শুনে তার হাত দুটো ধরে চৈতী বলে , প্লিজ - প্লিজ আর রাগ করে থেক না। ঠিক আছে , তোমার মা নেই তাই আমার মায়ের স্নেহ ভালোবাসার ভাগ ফিভটি - ফিভটি , হলো তো ?
কিন্তু বাবার স্নেহ ভালোবাসার ভাগ নিলে আমিও তোমার বাবার স্নেহ ভালোবাসায় ভাগ বসাব।
কথাগুলো শুনে মেয়েটাকে ভালো লাগতে শুরু করে শঙ্খর। কথাবার্তা একটু কাঠখোট্টা হলেও মনটা খুব সরল আর নরম।
তাই সেও হাসতে হাসতে মজা করে বলে , স্নেহ - ভালোবাসা যে ভাগ করে নেবে বলছ , তা মাপবে কিসে ? ফিতে দিয়ে না দাঁড়িপাল্লায় ?
---- এই দেখ, তুমিও একদিন এসেই মায়ের স্বভাব পেয়ে গিয়েছো ?
--- মানে ?
----- মানে , সব কথার খুঁত ধরা।
সেই সময় চা নিয়ে ঘরে ঢোকে বৈশাখী। ছেলেমেয়ে দুটোকে মুখোমুখি কথা বলতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। মেয়েটা শঙ্খকে কেমন ভাবে নেবে সেটা ভেবেই দুশ্চিন্তা ছিল তার। তবে এখন মেয়ের ভাব দেখেই মনে হচ্ছে শঙ্খকে তারও ভাল লেগেছে। ছেলেটার মুখে এমন একটা মায়া আছে , সবার ভালো লাগতে বাধ্য। তবু সেটা যাচাই করার জন্য সে শঙ্খকে জিজ্ঞেস করে -- এতক্ষণ চৈতীটা তোমাকে খুব জ্বালিয়েছে না ? মেয়েটাকে নিয়ে আর পারি না।
শঙ্খ কিছু বলার আগেই অভিমান ঝড়ে পড়ে চৈতীর গলায় -- খবরদার মা , তুমি শুধু শুধু আমার বদনাম দেবে না। ওকে জিজ্ঞেস করেই দেখ না।
--- ও কি, ওকে বলছিস কেন ? শঙ্খদা বলতে কি হচ্ছে ?
---- ইঃ ও তো পড়ে থার্ড ইয়ারে , আমি পড়ি ফার্স্ট ইয়ারে। ভারি তো আমার দু'বছরের বছরের বড় , তার আবার দাদা।
----- দুবছর নয় , শঙ্খ তোমার থেকে তিনবছরের বড়ো। মাঝে একবছর ওদের পারিবারিক ঝামেলার জন্য ওর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। তাছাড়া একদিনের বড়োও বড়ো।
---- ঠিক আছে ম্যাডাম , তোমার কথাই শিরোধার্য। দাদা বলব , তাবলে দাদাগিরি করলে কিন্তু মানব না।
---- ওকি কথা , মাকে ম্যাডাম ?
---- কেন ভুল কি বললাম ? তুমি তো ম্যাডামই। তোমার স্কুলে যখন পড়তাম তখন তো আমাকেও ম্যামই বলতে হত।
--- তোকে নিয়ে আর পারি না। তোর সঙ্গে বকর বকর করলে আমার চলবে না। রান্না বাকি আছে।
তোমার বাবা তো যথারীতি মাংস আনতে ভুলে গিয়েছেন।নিতাইকে ফোন করে আবার মাংস আনতে হল।যাই দেখি রান্নাটা সেরে ফেলি।
বৈশাখী চলে যেতেই আবার শঙ্খকে নিয়ে পড়ে চৈতী। সরাসরি তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে --- তা কলেজে তো পড়া হয় , সেখানে ক'টা আছে ?
--- কি ক'টা আছে ?
--- ইঃ ন্যাকাচন্ডী একবারে।বিড়ালতপস্বী , ভাজা মাছটিও যেন খেতে জানে না।বলছি গার্লফ্রেন্ড ক'টা আছে সেখানে ?
এ প্রশ্নে দুশ্চিন্তায় পড়ে শঙ্খ। সাগরিকা - অন্নেষা -- মৌলীদের সঙ্গে তার বইপত্র লেনদেন , টুকটাক কথাবার্তা হয়। কিন্তু তারা কি তার গার্লফ্রেন্ডর পর্যায়ে পড়ে ?
সেটাই বলে সে। শুনে চৈতী ফের জিজ্ঞেস করে -- আর গ্রামে ?
--- গ্রামেও কেউ নেই।
--- ইঃ খুব আফশোষ মনে হচ্ছে। না থাকাই ভালো। তাতে পড়াশোনার ক্ষতি হয়। এখানে পড়াশোনা করতে এসেছো , তাই করবে। মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর করতে দেখছি কি মরেছ। একেবারে ' গো - ব্যাক টু হোম '। মেয়েদের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা হলে আমার সঙ্গে করবে।
--- তাতে বুঝি পড়ার ক্ষতি হবে না ? তুমিও তো মেয়ে।
--- এই দেখ, ঠিক ধরেছি। মায়ের প্রভাব কাজ করতে শুরু করেছে। দিব্যি কথার খু্ঁত ধরতে শুরু করে দিয়েছো।আচ্ছা তুমি সত্যি বলছো তো -- কেউ নেই তোমার ?
--- কেন তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না ?
--- বিশ্বাস না হওয়াটাই স্বাভাবিক , যা একখানা মারকাটারি চেহেরা তোমার , যে দেখবে সেই ঘায়েল হয়ে যাবে।
---- স্বীকার করছ তাহলে ?
---- স্বীকার না করে উপায় আছে ? সেইজন্যই তো চোখে চোখে রাখতে তোমাকে আমাদের কলেজেই ভর্তির ব্যবস্থা করতে বলব বাবাকে।
--- কিন্তু আমি যদি তোমাদের কলেজে ভর্তি না হই ?
---- অমনি বললেই হোল, ভর্তি না হই ? চলো , আজই বাবাকে বলে ফাইন্যাল করে ফেলি।
একরকম তাড়িয়ে শঙ্খকে বাবাদের ঘরে নিয়ে যায় চৈতী। আর্য তখন প্রিয়র সঙ্গে গল্প করছিল। মেয়েকে ধুমকেতুর মতো ঢুকতে দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সে। চৈতি বাবার কাছটিতে দাঁড়িয়ে বলে , বাবা শঙ্খদাকে কি আমাদের কলেজে ভর্তি করাবে ?
--- কেন মামনি ?
--- এমনি , আসলে আমাদের কলেজে তো খুব চাপ। আগে থেকে বলে না রাখলে হয়তো ভর্তি করানোই যাবে না।
শঙ্খকে যে মেয়ের ভালো লেগেছে আর্যরও তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এমনিতে চৈতী ছেলেদের বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেয় না। ভালো না লাগলে তার কলেজে শঙ্খকে ভর্তির সুপারিশ করতে সে আসত না। এক হিসাবে ভালোই হবে। দিনকাল যা পড়েছে। সে তো বাইরে বাইরে পড়ে থাকে। তাই সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাকে। দুটিতে থাকলে সেটা অন্তত ঘুচবে। সেই কথা ভেবেই চৈতীদের কলেজের প্রিন্সিপ্যালকে ফোনে ধরে সে।
( ক্রমশ )
----০---



No comments:
Post a Comment