অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
কথাটা বলতেই প্রিন্সিপ্যাল বলেন , কোন ব্যাপার নেই। কালই চলে আসুন ভর্তির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনার কোন অনুরোধ রাখতে পারলে ধন্য হব।
--- কি যে বলেন দাদা। আমিই বরং কোনওভাবে আপনাদের কাজে লাগতে পারলে ধন্য হই। ঠিক আছে কালই ক্যান্ডিডেটকে নিয়ে আসছি।
বাবার ফোন শেষ হতেই চৈতী শঙ্খর দিকে চেয়ে বলে -- বলেছিলাম না তোমাকে , বাবা একবার বললেই হয়ে যাবে ? আমার কথা মিলল তো ?
শঙ্খ মনে মনেই ভাবে , যাঃ বাবা , এ কথা আবার কখন হল ?
তবু সে উচ্চবাচ্য না করে বলে --- তাই তো।
--- তাই তো মানে ?
শঙ্খ মনে মনে প্রমাদ গোনে --অ্যাই রে , ঘটনার গতিপ্রকৃতি কোনদিকে মোড় নেবে কে জানে ! ওই পরিস্থিতি থেকে তাকে উদ্ধার করেন জ্যেঠিমা। রান্নাঘর থেকে তিনি বলে ওঠেন , রান্না হয়ে গিয়েছে , সব খাবে এসো।
সেই ডাক শুনে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে শঙ্খর। সেও সঙ্গে সঙ্গে কেউ কিছু বলার আগেই বলে ওঠে --- হ্যা , যাই জ্যেঠিমা। বলে রান্নাঘরের দিকে কার্যত পালিয়ে বাঁচে শঙ্খ। সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না চৈতীর। তার ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠে হাসির রেখা। মনে মনে ভাবে ছেলেটাকে নিয়ে ভালোই কাটবে তার।খাওয়া দাওয়ার পর চৈতী অন্তাক্ষরী খেলার আবদার করে। এমনিতে তারা তিনজনে রাতে খাওয়ার পর খেলাটা মাঝেমধ্যে খেলে। আজ শঙ্খ আর প্রিয়কাকুকে পেয়ে তার খেলার ইচ্ছা জাগে।
আর্যও মেয়েকে সমর্থন জানিয়ে বলে ' হয়ে যাক'। সেই মতো খেলায় মেতে ওঠে তারা। বৈশাখীও হেঁসেল গুটিয়ে খেলায় যোগ দেন। প্রিয়কেও মাঝে মাঝে অন্তাক্ষর মিলিয়ে আবৃত্তির ঢঙে কবিতা কিংবা সুর করে গান গাইতে গেয়ে উঠতে দেখা যায়। তখন তাকে পুরো স্বাভাবিক মানুষের মতোই লাগে। বাবাকে ওই ভূমিকায় দেখে খুব ভালো লাগে প্রিয়র। ক্ষণিকের জন্য হলেও বাবাকে ওই অবস্থায় ফেরানোর সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য মনে মনে সে চৈতীকে ধন্যবাদ জানায়। প্রথম প্রথম লজ্জায় শঙ্খ কিছুটা এড়িয়ে চললেও চৈতীর তাড়ায় তাকে অংশ নিতে হয়। চৈতী পরোক্ষে তাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে -- কাউকে কিন্তু শুধু শুধু এখানে বসে থাকতে বলা হয় নি। অগ্যতা তালে তাল মেলাতে হয় শঙ্খকে। কিন্তু তাতেও হোঁচট খেতে হয় তাকে। শেষাক্ষর মিলিয়ে সে কোন কবিতা কিম্বা ছড়া বললেই চৈতী বলে ওঠে -- হবে না, হবে না। কোনদিন শুনিনি। বানিয়ে বলে দিচ্ছে।
শঙ্খ পড়ে বিড়ম্বনায়। কারণ কথাটা চৈতী মিথ্যা বলে নি। তাই কি বলবে সে ভেবে পায় না। এবারে তাকে ওই বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার করে আর্য। মেয়েকে উদ্দ্যেশ্য করে সে বলে -- তুই সব শুনে থাকবি তার কি মানে আছে। কত কবি - লেখক কত কিছু লিখে গিয়েছেন সব কি আমাদের পড়া হয় ? তাছাড়া তোর কথা অনুযায়ী বানানোই যদি হয় তাহলে সেটা তো খুব ইতিবাচক ব্যাপার। যে খেলায় সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে সে খেলা তো সার্থক রে। তুইও বানিয়ে বল না।
---- কিন্তু আমি যে বানাতে পারি না।
---- তা বললে তো হবে না মা। তুমি এতকিছু পার আর কবিতা - ছড়া বলতে পারবে না বললে কি করে হবে ?
চৈতী কিছু বলার আগেই বৈশাখী বলে ওঠে, তাহলে তুমি যেটা পারো সেটাই নাহয় করে
দেখাও কাকুদের।
আর্য বলে , ঠিক বলেছো, এবার মামনির একটা নাচ হয়ে যাক। অনেকদিন আমারও দেখা হয় নি, এই সুযোগে আমারও দেখা হয়ে যাবে।
চৈতী নাক কুঁচকে বলে --- এখন ?
--- কেন এখন অসুবিধা কিসের ?
--- না , অসুবিধা কিছু নেই। তাহলে মাকে গাইতে হবে।
প্রথমে না -- না করেও মেয়ের কথায় রাজী হতে হয় বৈশাখীকে। কিছুক্ষণের মধ্যে নাচের পোশাক পড়ে আসে চৈতী।মায়ের গানে ফুটিয়ে তোলে অপূর্ব নাচের মুদ্রা।
শঙ্খ নাচ ঠিক বোঝে না , কিন্তু মুগ্ধবিষ্ময়ে সে চৈতীর দিকে চেয়ে থাকে। তখন আর চৈতীকে কিছুক্ষণ আগে মুখোমুখি বসে গল্প করা মেয়েটির সঙ্গে মেলাতে পারে না। মনে হয় যেন ভিন্ন জগতের মানুষ। ইচ্ছা হলেও যাকে ছোঁওয়া যায় না। নাচতে নাচতেই শঙ্খর চোখ থেকে মুগ্ধতা উপচে পড়তে দেখে চৈতী। তাই সে মনপ্রাণ ঢেলে দেয় নাচে। আজ যেন শঙ্খর জন্যই নাচছে সে। নাচ শেষ হতেই শঙ্খর মুখ থেকে আপনা থেকেই উচ্চারিত হয় -- অপূর্ব।
সবার সামনে শঙ্খর ওই প্রতিক্রিয়া লজ্জায় ফেলে দেয় চৈতীকে। সে দ্রুত পোশাকপরিবর্তন করতে নিজের ঘরে চলে যায়। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম আসে না চৈতীর।ঘুমোতে পারে না শঙ্খও। তাদের মনের মধ্যে প্রবল অনুরাগের জন্ম হয়। বার বার একেরচোখে ভেসে ওঠে অন্যের মুখ। বহুদিন পর এইরকম একটি পরিবেশ শঙ্খর মনটাও যেন কিছুটা শান্তি খুঁজে পায়। জ্যেঠিমার ব্যবহার তাকে মায়ের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। মাযখন ছিলেন তখন তাদের বাড়িতেও এই রকম শান্তির পরিবেশ ছিল।
মা চলে যাওয়ার পরথেকেই সংসারটা কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। পড়াশোনা ছেড়ে মালাকে সংসারের হালধরতে হয়েছে। মালার কথা ভেবে খুব কষ্ট হয় শঙ্খর। মালাটা খুব স্নেহের কাঙাল।মালাকে একদিন এখানে আনতে হবে। তাহলে সে জ্যেঠিমায়ের স্নেহের পরশ পাবে।জেঠিমাকেও সে তাদের বাড়ি যেতে বলবে। পরদিন সকালে প্রিয়কে ডাক্তারবাবুরডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারে পৌঁছে দিয়ে আসে আর্য। তারপর স্নান খাওয়াদাওয়ার পরচৈতী আর শঙ্খকে নিয়ে কলেজে রওনা দেয়। বেরনোর আগে আর্য আর বৈশাখীকে প্রণাম করে শঙ্খ। দেখাদেখি সেদিন চৈতীও মা-বাবাকে প্রণাম করে। সেটা দেখে শঙ্খর মাথায় হাতরেখে আর্শিবাদ করতে করতে বৈশাখী মেয়েকে জিজ্ঞেস করে --- কি রে আজ তোরপরীক্ষা-টরীক্ষা আছে নাকি? হঠাৎ করে প্রণাম করে বসলি যে ?
---- একজন শর্ত ভঙ্গ করে একাই ফিভটি পার্সেন্টের উপরে সব নিয়ে নেবে বললে হবে ?
--- শর্ত, ফিভটি পার্সেন্ট, কি সব বলছিস মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।
তারপর মেয়ের মুখে সব শুনে আর হেসে বাঁচেন না বৈশাখী। হাসতে হাসতে বলেন -- তুই বাপু পারিসও বটে। তাও ভালো শঙ্খর দেখাদেখি বাবা-মায়ের উপরে ভক্তি - ভালোবাসা--।
বৈশাখীর কথা শেষ হয় না হয় না, অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে চৈতী বলে ওঠে -- বাঃ, বলোবলো। আমি বুঝি তোমাদের ভালোবাসি না ?
অমনি মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বৈশাখী বলে --তুই মা , আমাদেরআদরের ধন। বুঝিস না কেন তোর ওইভাবে ঠোঁট ফোলানো দেখার জন্যই তো তোকেমাঝেমধ্যে রাগিয়ে দিই। ছোটবেলায় তুই ওইভাবেই ঠোঁট ফোলাতিস। তোকে ঠোঁট ফোলাতেদেখলে আমি যে আমার সেই ছোট্ট মেয়েটাকে ফিরে পায়।
মায়ের কথা শুনে অভিমান গলে জল হয়ে যায় চৈতীর। মুখে ফুটে ওঠে হাসি। মায়ের দুইগালে চুমু খেয়ে বাবার মোটর বাইকে শঙ্খর পিছনে উঠে বসে সে।
কলেজে পৌঁছে চৈতীকে পড়তে হয় মহা বিড়ম্বনায়। তাকে নামিয়ে দিয়ে বাবা শঙ্খদাকে নিয়ে প্রিন্সিপ্যালেরঘরের দিকে যেতেই কলেজের বান্ধবীরা তাকে ঝেঁকে ধরে। অন্তরা পাশে ডেকে বলে --তোর বাবা ওটা কাকে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের ঘরে নিয়ে গেল রে ?
---- ও আজ আমাদের কলেজে ভর্তি হবে।
---- মালটা কে রে ?
---- ওকে মাল বলছিস কেন ?
---- যাঃ বাব্বা এ যে দেখছি সাত কান্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মাসির মতো কথাবলছিস ? আমরা তো এতদিন দিলখুস , দিওয়ানা , ফিদা- ফিদা টাইপের ছেলেদের ওইনামেই ডেকে এসেছি ? কে রে ছেলেটা - তোদের আত্মীয় কেউ ? দারুন দেখতে কিন্তুছেলেটা ? বল না রে বাবা ছেলেটা তোর কে হয় ?
শঙ্খদার কি পরিচয় দেবে তা চট করে ভেবে পায় না চৈতী। তাই বলে ফেলে -- দাদা।
---- দাদা ? মাসতুতো - পিসতুতো ?
---- মাসতুতো।
---- ওঃ দারুণ। তাহলে তো ওর সঙ্গে লাইন মারাই যায়। দে - না রে ভাই ওর সঙ্গে একটু পরিচয় করিয়ে। জায়গাটা বুক করে রাখি। নাহলে কে কবে বুক করে দেবে তার ঠিকনেই।
--- এই না , ও এখানে পড়াশোনা করতে এসেছে। খুব গরীবের ছেলে। পড়াশোনা করে ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
--- বাবা, দেখে বাঁচি না। এই কলেজের আর কেউ বুঝি গরীবের বাড়ির ছেলে নেই। তারাপড়াশোনা করে না , না প্রেম করে না ? হ্যা, তোর নিজের কোন ইন্টুমিন্টু ব্যাপারনেই তো ?
---- ধ্যাত , কি যে বলিস। তাছাড়া শঙ্খদার গ্রামে নাকি কেউ একজন আছে।
--- বাহঃ নামটাও কি সুন্দর রে। আমাদের পোড়াকপাল। অলরেডি বুকড হয়ে আছে। এইটাইপের ছেলেরা বেশিদিন খালি থাকে না যে। কি আর করা যাবে ?
-- ধ্যাত , করে অন্তরাকে চুপ করিয়ে দিলেও চৈতীর মনে প্রশ্ন জাগে সত্যি সত্যি কি শঙ্খদার সঙ্গে তার কিছুই নেই ? অন্তরাদের হাত থেকে শঙ্খদাকে বাঁচাতে গ্রামেএকজনের থাকার কথা বলল ঠিকই , কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি সে রকম কেউ থেকে থাকেতাহলে তারও কি মন খারাপ হয়ে যাবে না ?
কিছুক্ষণ পরেই শঙ্খদাকে ভর্তি করিয়ে ফিরে আসে বাবা। সেদিন আর ক্লাস ছিল না চৈতীরও। তাই সেও বাড়ির ফেরার জন্য শঙ্খদার পিছনে বাইকে উঠে বসে। বাড়ি ফেরারপথে সেটা দেখে অন্তররা আঙুলের রিঙ করে দেখায় তাকে।তাদের মুখে ফুটে ওঠে অর্থবহহাসি।অন্তরাদের কাঙ্খিত ছেলেটি তার একান্ত প্রিয়জন ভেবে মনে মনে এক ধরণের গর্ব অনুভব করে চৈতী। এবারে সুযোগ হল না। পরের বার সত্যিই শঙ্খদার তেমন বিশেষ কেউআছে কিনা তা জানার জন্য তাকে চেপে ধরতে হবে।
শঙ্খদা অবশ্য তার তেমন কেউ নেইবলেছে , কিন্তু সেটা প্রথম পরিচয়ে লজ্জার কারণেও অস্বীকার করতে পারে। যদি সত্যিই কেউ না থাকে তাহলে খুব খুশী হবে সে। অন্যথায় নিজেকে গুটিয়ে নেবে।কিন্তু সেটা খুব কষ্টকর হবে। একটা রাতেই যেন শঙ্খদা তার হৃদয়ে জায়গা করেনিয়েছে। শঙ্খদার হৃদয়েও তার জন্য কোন জায়গা হয়েছে কিনা কে জানে! বাড়ি পৌঁছোতেই চৈতী শঙ্খর ব্যাগটা এনে তার হাতে তুলে দেয়। ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে বাবাকে নিয়ে আজকের মতো বাড়ি ফিরে যাবে শঙ্খদা। কাল আবার বাবাকে ডাক্তারবাবুরচেম্বারে পৌঁছে দিয়ে তাদের বাড়িতে স্নান-খাওয়া করে তার সঙ্গে কলেজে যাবে। বাবাতাই তাকে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফের মোটরবাইক স্টার্ট করেন।শঙ্খদা মাকে প্রণাম করে হাত নাড়তে নাড়তে বাইকের উঠে বসে। যেতে যেতে সে পিছন ফিরে চায়। হাত নাড়তে নাড়তে চৈতীও সেদিকে চেয়ে থাকে।



No comments:
Post a Comment