Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৭৮






         অন্তরালে 



                   অর্ঘ্য ঘোষ 



         ( ধারাবাহিক উপন্যাস )  



বাবার মোটর বাইকটা দৃষ্টির বাইরে চলে যেতেই মনটা খারাপ হয়ে যায় চৈতীর। সেদিন আর পড়াশোনাতে মন বসাতে পারে না। কালই শঙ্খদার সঙ্গে দেখা হবে , একসঙ্গে কলেজে যাবে। তবু মন যেন কিছুতেই মানতে চায় না। সময়টাকে বড়ো দীর্ঘ লাগে তার। বিরহের কথা বইয়ে পড়েছে এতদিন। জ্বালা অনুভব করল এই প্রথম।কেবলই শঙ্খদার মুখটা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কাল এই সময় মুখোমুখি বসেছিল তারা। সেই সোফাতে বসেই যেন শঙ্খদার স্পর্শসুখ অনুভব করে সে। শঙ্খরও একই অবস্থা। বাড়ি ফিরে তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন শুন্য লাগে। এর আগে তো এভাবে কোন মেয়ের কাছাকাছি হয় নি সে। একটা রাতেই মেয়েটা তার বুকে অনেকখানি জায়গা করে নিয়েছে। বার বার মনে পড়ে যায় চৈতীর কথা বলার ধরণ। মনে পড়ে যায় তার সহমর্মিতা বোধের কথা। সেইসব কথা ভেবে মনটাও উদাস হয়ে যায় তার। সেটা লক্ষ্য করে খেতে বসে শঙ্খকে চেপে ধরে মালা -- মেয়েটা কেমন রে দাদা ?
----- কোন মেয়েটা ? 
---- ন্যাকামি করিস না দাদা। তুই ভালো করেই জানিস আমি কার কথা জানতে চাইছি ? 
---- কার কথা ? চৈতীর কথা ? 
---- এই তো ঠিক ধরেছিস।
---- কেমন আবার ভালোই।
---- ভালো তো বটেই। নাহলে এক রাতের গল্প করতে গিয়ে অতবার চৈতী চৈতী করিস ?   দেখতে শুনতে কেমন রে দাদা ? 
----- আমি যেন বসে বসে দেখছি।
---- দেখিস নি বলছিস ?  
----  দেখেছি , তোমার চেয়ে দেখতে শুনতে অনেক ভালো হলো তো ? মালাকে রাগাতেই ওইভাবে কথাটা বলে শঙ্খ। 
কথাটা শুনে চুপ করে যায় মালা। অভিমানে তার ঠোঁট কাঁপতে থাকে। সেটা দেখে শঙ্খ বলে , অমনি অভিমান হয়ে গেল তো ! আরে আমি তোকে রাগানোর জন্য বলেছি। আমার বোনের থেকে সুন্দরী আমি আর কাউকে দেখি নি।
--- থাক, আমাকে আর ভোগা দিতে হবে না। আমার অভিমান হয়েছে তোকে কে বলল ? আমার একমাত্র দাদার বৌ সবার চেয়ে সুন্দরী হবে ব্যস।
--- আর আমার একমাত্র বোনের --- , শেষ না করেই কথাটা গিলে নিতে হয় শঙ্খকে। 
সৌমিকের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ক্ষতটা আজও রয়ে গিয়েছে মালার বুকে। অজান্তেই সে সেই ক্ষতেই খোঁচা দিয়ে মালার বুকের ভিতরটা রক্তাক্ত করে দিল বলে তার নিজের বুকটাও যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে ওঠে। দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্য বলে -- জ্যাঠাইমা খুব ভালো মানুষ জানিস। সবাইকে অল্পক্ষণেই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তোকে একদিন নিয়ে যাব।  দেখবি তোরও খুব ভালো লাগবে।
---- হ্যা যেতে তো হবেই , আমার দাদার মুখে যে মেয়েটির নাম এতবার শুনলাম তাকেও দেখতে যে আমার খুব ইচ্ছা করছে।
---- জ্যেঠিমাদের আসতে বলব।
---- সে তো বলতেই হবে। ওরা আমাদের জন্য যা করছেন তা আজকের দিনে কেউ করবে না।
---- জানিস ডাক্তারবাবু বলেছেন বাবা কাজের মধ্যে থাকলে খুব তাড়াতাড়ি সেরে যাবেন। তাই শুনে বাবা যে ডাক্তারবাবুর কাছে কাজ করতেন তিনি তার ডায়্যাগনস্টিক্ সেন্টারে কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আর আর্যজ্যেঠু বলেছেন প্রয়োজনে মামলা করে বাবার পাওয়া গন্ডা এমনকি চাকরি পর্যন্ত সরকারের কাছে থেকে আদায় করে ছাড়বেন।
---- ওমা তাই , তাহলে তো খুব ভালো হবে রে। 
---  হ্যা , ঠিক বলেছিস। এবার নবান্নে আবার যাত্রা হবে বলছে। তা যদি হয় তাহলে জ্যেঠিমা আর ডাক্তারবাবুদের আসতে বলব।
--- তাহলে খুব আনন্দ হবে।




                        সত্যিই তাই। বাবার ওই ঘটনা আর মায়ের মৃত্যুর পর থেকে তাদের সংসারে আনন্দ হারিয়ে গিয়েছে। শুধু তাদের পরিবারেই কেন , বাবার ওই ঘটনার পর গ্রামেও সেই আনন্দের ছবিটা হারিয়ে গিয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যাত্রা। প্রসাদ মোড়লরা জেলে যাওয়ার পর আবার সবাই যাত্রার চিন্তাভাবনা করছেন। হারিয়ে যাওয়া আনন্দটাকে ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন গ্রামের মানুষ।বিষয়টি জানার পর শঙ্খরও খুব আনন্দ হয়। কিন্তু মালার কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। মালা এখনও সৌমিককে খুব ভালোবাসে। কিন্তু মুখে তার নাম নেয় না। এমন কি কেউ তার কথা আলোচনা করলে তীব্র আপত্তি জানায়। পিসেমশাই একবার ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা পেড়েছিলেন , মালা শোনার পর এককথায় না করে দিয়েছে। কথাটা আর্যজ্যেঠুকে বলতে হবে। পারলে একমাত্র জ্যেঠুই দু'পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধান সূত্র বের করতে পারবেন। তাহলে মালার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠবে।শঙ্খকে বলতে হয় না , সেদিন রাতে আর্যই কথাটা বৈশাখীকে বলে। শঙ্খরা চলে যাওয়ার পর মেয়ের মনমরা ভাব দেখে মায়ের আর বুঝতে কিছু অসুবিধা হয় না। তারও মা-মরা ছেলেটার উপর কেমন মায়া পড়ে যায়। তাকে আপন করে নিতে ইচ্ছা হয়। রাতে শোওয়ার পর স্বামীর কাছে কথাটা পাড়ে বৈশাখী। স্বামীর বুকের কাছটিতে শুয়ে সে বলে -- হ্যা গো ছেলেটাকে আমাদের আপন করে নেওয়া যায় না ?
--- কোন ছেলেটিকে ? 
--- ওগো আমি শঙ্খর কথা বলছি।
--- ওঃ তাই বলো ? তা আপন করে নিতে অসুবিধা কোথাই ? দুনিয়ার সবাইকে আপন ভাবতে পারলেই সবাই তোমার আপন। স্ত্রীর ইংগিত বুঝতে অসুবিধা হয় নি আর্যর। তবু স্ত্রীর সঙ্গে মজা করার জন্য না বোঝার ভান করে কথাগুলো বলে সে। মাঝে মধ্যে বৈশাখীর সঙ্গে মজা করার নেশায় পেয়ে বসে তাকে। বৈশাখী স্বামীর মজা করার বিষয়টি ধরতে পারে না। তাই সরল মনে সে বলে , এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি যে কি করে সাংবাদিকতা কর বুঝি না ! আরে আমি সেই আপন করা বলিনি।
--- সেই বুদ্ধি নেই বলেই তো শেষ পর্যন্ত আর সাংবাদিকতা করতে পারলাম না। তা বলো শুনি তুমি কেমন আপনকরা বলতে চাইছ ?
স্বামীর কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে যায় বৈশাখীর। সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ তুলে অজান্তে স্বামীর মনে আঘাত দিয়ে ফেলেছে ভেবে তার আক্ষেপের অন্ত থাকে না। তাই স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলে, রাগ করলে? বিশ্বাস করো তোমাকে আঘাত করার জন্য কথাটা আমি বলি নি।
স্ত্রীকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে আর্য বলে, ধুর পাগলি রাগ করব কেন ?  আমি তো তোমার সঙ্গে মজা করছিলাম। বেশ বলো এবার কি বলছিলে ?
---- বলছিলাম কি শঙ্খ ছেলেটিকে আমার খুব পচ্ছন্দ। আমাদের চৈতীর সঙ্গে মানাবেও ভালো। হ্যাগো ,  ওদের চার হাত এক করে দিয়ে ছেলেটিকে আপন করে নেওয়া যায় না ? 
---- তা হয়তো চেষ্টা করলে যায়। কিন্তু তোমার পছন্দ হলেই তো হবে না , মেয়ের মতটাও জানা দরকার।
--- সে আমি বুঝে নিয়েছি। মেয়ে আমাদের মন সঁপে দিয়ে বসে আছে গো।
--- তাহলে কাল খুব রাগ দেখাছিল যে ?  
--- ওটা রাগ নয়, পূর্বরাগ।  বোঝ না কেন ? 
--- বুঝব না কেন ? একদিন তো ওই সময়টা আমরাও পেরিয়ে এসেছি তাই না ? 





                                    স্ত্রীর নাকটা আলতো হাতে মুচড়ে দেয় আর্য। আর তাতেই বৈশাখী গালটা রক্তিম হয়ে ওঠে। আর্যর ঠোঁটের স্পর্শে গালটা আরও লজ্জারুণ হয়ে ওঠে। তাই দেখে স্ত্রীর মুখটা তুলে ধরে আর্য বলে ,  তোমাকে আজও সেই ' লাজে রাঙা হলো কনে বউ'টির মতো লাগে।
--- দেখো আবার !  
---- দেখছিই তো। বলে স্ত্রী'কে বুকে টেনে নেয় আর্য। আর বৈশাখী স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে দেয়। স্ত্রীকে জড়িয়ে  ধরে আর্য বলে , সে না হয় হলো। কিন্তু ওদের চার হাত এক করার ব্যাপারে কিছু সমস্যাও রয়েছে জানো ? 
---- কিসের সমস্যা ? 
---- দেখ প্রিয়র এই অবস্থায় তার ছেলের বিয়ে দেওয়াটা ভালো দেখায় না। প্রিয়র কি প্রতিক্রিয়া হবে কে জানে !  তাছাড়া পাঁচজনে পাঁচকথা বলতে পারে। আমরা সেইসব কথায় কান দিই বা নাই দিই , ওরা তো গ্রামে থাকে তাই কথার হুল ওদেরই বিদ্ধ করবে। কথার জ্বালাতেই প্রিয়র স্ত্রীকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে।
স্বামীর কথা শুনে হতাশ হয়ে চুপ করে যায় বৈশাখী। সেটা লক্ষ্য করে আর্য বলে, তবে ডাক্তার বলেছেন নিয়মিত কাউন্সিলিং হলে প্রিয় পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবে।
--- তাহলে তো ভালোই হবে। তার মধ্যে শঙ্খর গ্র‍্যাজুয়েশনটাও কমপ্লিট হয়ে যাবে।
--- সব থেকে বড়ো সমস্যা কি জানো ? 
---- কি ? 
----  সব থেকে বড়ো সমস্যা  শঙ্খর বোন মালাকে নিয়ে। ওর বিয়ে না দিয়ে শঙ্খর বিয়ে দেওয়াটাও ভালো দেখায় না। কিন্তু মালা বিয়ে করবে না বলে গোঁ ধরে বসে রয়েছে।
---- ওমা সেকি ! কেন বিয়ে করবে না ? কারও সঙ্গে ভাব ভালোবাসা রয়েছে বুঝি ? 
--- তা ধরতে পারো একরম তাই ! 
---- তাহলে আর সমস্যা কোথায় ? সেই ছেলেটির সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করলেই তো হয় ?  
---- আরে সমস্যা তো সেখানেই। নাহলে তো মিটেই যেত।
----- মানে ?  
----- ওর বিয়ে  ঠিক হয়েছিল পাশের গ্রামে। যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে আবার শঙ্খর সহপাঠী বন্ধু। বাড়িতে যাওয়া---আসা ছিল। সেই সূত্রে ওদেরও মন দেওয়া-নেওয়া হয়। বলতে পারো সেইজন্যই ছেলেটির সঙ্গে বিয়ের সমন্ধ হয়েছিল।
---- ঠিকই তো হয়েছিল ? 
----- হ্যা, কিন্তু সেইসময় বাবা বিয়েটা ভেঙ্গে দেওয়ায় ছেলে আর ওদের সঙ্গে লজ্জায় যোগাযোগ রাখতে পারে নি। চেষ্টা করে তার অনত্র বিয়েও দেওয়া যায় নি। এদিকে বাবার কথায় সেই সময় ছেলেটি ওইভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় মালাও অভিমানে তাকে তো বটেই , আর বিয়েই করবে না বলে পণ করে বসে আছে।
---- তার মানে দু'জন দু'জনকে ভালোবাসে। ওসব হচ্ছে মান-অভিমানের ব্যাপার। কেউ একজন সামনে এসে দাঁড়ালেই সব দূর হয়ে যাবে।
---- আমারও তাই বিশ্বাস। তবে সবার আগে ছেলেটির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মনোভাবটা জানাটা জরুরী। তবেই এগোনো যাবে।
--- সেটাই করো। চলো না হয়  আমিও যাই।
---- তুমি যাবে ?  
---- নিশ্চয় , নিজের মেয়ের বিয়েকে উপলক্ষ্য করে যদি একটি মেয়ের ভেঙে যাওয়া বিয়ে জোড়া লাগাতে পারি তাহলে তার মতো ভালো কাজ আর হয় কি ?
--- বেশ চলো তাহলে। কাল ঘুরে আসি। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। কেবল সৌরভকে ফোন করে জানিয়ে দিলেই হবে।
সমাধান সূত্র খুঁজে বের করার ব্যাপারে দু'জনের মনই আশাবাদী হয়ে ওঠে।



                    ( ক্রমশ ) 



     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                       ----০---



No comments:

Post a Comment