হা-ডু-ডু বা কবাডি
অর্ঘ্য ঘোষ
গ্রামবাংলায় একসময় আরও একটি বহুল প্রচলিত খেলা ছিল৷ খেলাটির নাম হা-ডু-ডু বা কবাডি। শারীরিক কসরতের খেলা বলে মূলত ছেলেদেরই হা-ডু-ডু খেলতে দেখা যেত। তবে কোথাও কোথাও মেয়েরাও হা-ডু-ডু খেলায় অংশ নিত। সাধারনত ছেলে এবং মেয়েদের আলাদা আলাদা ভাবে খেলতে দেখা যেত। গ্রামে গ্রামে ওই খেলার প্রতিযোগিতাও হত। খেলা দেখতে ভীড় জমাতেন দুর-দুরান্তের মানুষ। এখন আর সেই প্রতিযোগিতা হয় না বললেই চলে। কারণ খেলাটির চর্চাই আর আগের মতো চোখে পড়ে না। তবে পরবর্তী কালে কবাডি নামে খেলাটি জাতীয় খেলার স্বীকৃতি লাভ করে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন স্তরের প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়ে থাকে। হা-ডু-ডু'র সঙ্গে কবাডির কিছু নিয়মকানুনের পার্থক্য ছাড়া খেলা দুটি মূলত এক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কারণে স্কুল বা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক কবাডি খেলার চর্চা থাকলেও গ্রামের সেই হা-ডু-ডু খেলা আর নেই।
অথচ হা-ডু-ডু গ্রামের জনপ্রিয় প্রাচীন খেলাগুলির অন্যতম ছিল। রাখাল বালকদের সঙ্গে স্বয়ং শ্রীকষ্ণেরও ওই খেলায় অংশ নেওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। হা-ডু-ডু বা কাবাডি খেলার উদ্ভব সম্পর্কে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। ধারণাটি হলো বহু যুগে আগে এক গোষ্ঠীর মানুষ অন্য গোষ্ঠীর আস্তানায় হানা দিয়ে ধনসম্পদ , গবাদি পশু , এমনকি নারী ও শিশু লুট করে নিজের আস্তানায় নিয়ে যেত। শত্রুর আস্তানায় হানা দিয়ে নিরাপদে ফিরে আসার কৌশলের চর্চার পাশাপাশি ব্যক্তি ও দলগতভাবে শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করে প্রতি আক্রমণের কৌশল রপ্ত করার লক্ষ্যেই ওই খেলার উদ্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হয়। হা-ডু-ডু খেলা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। নিয়ম কানুনও বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। হা-
ডু-ডু খেলার জন্য তেমন কোন উপকরণ লাগে না। লাফালাফি করতে হয় বলে সাধরণত বালিযুক্ত জমি কুপিয়ে ওই খেলার জন্য আয়তকার মাঠ তৈরি করে নিতে নিতে হয়। মাঠের পরিমাপ খেলোয়াড়দের ইচ্ছানুযায়ী হতে পারে। তবে মাঠটিকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে নিতে হয়। দুই দিকের মাঠের মাঝ বরাবর একটি মধ্যরেখা টেনে নেওয়া হয়। সরু দড়ি দাঙিয়েও মধ্যরেখা করে নেওয়া চলে। খেলার পরিভাষায় মধ্যরেখাটিকে 'থোল বা চোল ' বলা হয়ে থাকে।দুই দিকের শেষ প্রান্তকে বলা হয় বর্ডার লাইন। সেই লাইনে মুখোমুখি দুই পক্ষের খেলোয়াড়রা পাশাপাশি সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রথমে সম সংখ্যক খেলোয়ার নিয়ে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে দুটি দল গঠন করে নিতে হয়। কোন দল কোন দিকে দাঁড়াবে এবং কারা প্রথম ডাক দেবে তা টসের মাধ্যমে তা স্থির করে নেওয়া হয়। ডাক দেওয়ার অর্থ হলো একপক্ষের একজন খেলোয়াড় মধ্যরেখা থেকে এক নিশ্বাসে 'চোল বা থোল' কবাডি কিম্বা হা-ডু-ডু ডাক ধরে বিপক্ষের ঘরে গিয়ে তাদের হাত বা পা দিয়ে ছুঁয়ে আসার চেষ্টা করে। একদমে কোনও ভাবে বিপক্ষের একজনকে খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারলেই হল। তাহলে ছোঁয়া পড়া খেলেয়াড় মরা পরিগণিত হয়। তখন তাকে খেলা ছেড়ে প্রাণ ফিরে পাওয়ার প্রতীক্ষায় মাঠের বাইরে গিয়ে বসে থাকতে হয়। একই সঙ্গে পা দিয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করার সময় যদি কোন খেলোয়াড়ের দুটি পা''ই বর্ডার লাইন ছাড়া হয়ে যায় তাহলে সেই খেলোয়াড়ও মরা বিবেচিত হয়। কিন্তু ডাক দেওয়ার সময় যদি কোন খেলোয়াড়ের দম ফুরিয়ে যায় তাহলেই বিপদ। নিজের ঘরে ফিরে আসার আগে যদি বিপক্ষরা তাদের ঘরে ডাকধারী খেলোয়াড়কে ছু্ঁয়ে দিতে পারে তাহলে সে মরা হয়ে যায়। একই ভাবে ডাক দেওয়ার সময় বিপক্ষদলের খেলোয়াড়দের হাতে ধরা পড়লেও বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের কবল থেকে ডাক ধরে নিজের ঘরে ফিরতে না পারলেও মরা হতে হয় ডাকধারীকে।
কোথাও কোথাও অবশ্য ধরা পড়ার পর মধ্যরেখা ছু্ঁতে কিম্বা কোমর পার করতে পারলেই বিপদ মুক্ত হওয়া যায়। সেক্ষেত্রে বিপক্ষের প্রথম যে খেলোয়াড় তাকে ধরেছিল সে মরা হয়ে যায়। হা-ডু-ডু খেলায় ' কোনাচি' , ' ডাকিয়ে ' , 'ধরিয়ে' , 'চেন ' প্রভৃতি শব্দ খুব চালু রয়েছে। উভয় পক্ষের দুই কোনে যে দু'জন খেলোয়াড় অবস্থান করে তাদের বলা হয় কোনচি। যে খেলোয়াড় ডাক দেয় সে ডাকিয়ে হিসাবে পরিচিত।কোনাচি সহ অন্য যে খেলোয়ার ডাকিয়েকে ধরার ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শী হয় সে ধরিয়ে হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ডাকিয়া ডাক ধরে বিপক্ষ দলের ঘরে দুই দিকে হাত প্রসারিত করে , কিম্বা দুই হাঁটুতে হাত রেখে , কখনও বালাথি ছুড়ে ছোঁয়ার জন্য এক কোনাচি থেকে অন্য কোনাচির কোল পর্যন্ত ছোটাছুটি করে।
সেই সময় তাকে ধরার জন্য ছোঁয়া বাঁচিয়ে কোনাচিরাও তাড়া করে। কোনাচি বা ধরিয়েরা ডাকধারীকে ধরতে পারলেই 'লে - রে - লে ' বলে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকার শুনে সহ খেলোয়াড়রা ডাকিয়েকে আটকানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেক সময় ধরা পড়ার পর ডাকিয়ে কোনাচি বা অন্যান্য খেলোয়াড়দের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে যায়। সে যাতে ওইভাবে ফিরে যেতে না পারে তার জন্য এক বা একাধিক খেলোয়াড় কোনাচি বা ধরিয়ের একটি পায়ে শক্ত করে ধরে থাকে। ধরিয়ের পা ধরে থাকার ওই প্রক্রিয়া বা খেলোয়াড়টিকে চেন বলা হয়ে থাকে। এক পক্ষের ডাকের পর অন্য পক্ষ ডাক দেওয়ার সুযোগ লাভ করে। ডাক দিয়ে এক পক্ষ অন্যপক্ষের খেলোয়াড়কে মেরে যেতে পারলে প্রতিটি মরার ক্ষেত্রে স্বপক্ষের একজন খেলোয়াড় প্রাণ ফিরে পেয়ে খেলায় সামিল হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
তবে সেক্ষেত্রে ইচ্ছা খুশি প্রাণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ মেলে না। প্রথম মরার ক্ষেত্রে বিপক্ষের প্রথম মরা হয়ে বসে থাকা খেলোয়াড়টিই প্রাণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ লাভ করে। সেই ভাবে ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয় মরার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় , তৃতীয় মরার ক্ষেত্রে তৃতীয় খেলোয়াড় প্রাণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায় । অনেক সময় মরার হিসাব গুলিয়ে দিয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো খেলোয়াড়টিকে বাঁচিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকে। তবে ওই চৌর্যবৃত্তি ধরা পড়লে সমূহ বিপদের আশংকা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ভালো খেলোয়াড়টির 'চিক' না হওয়া পর্যন্ত আর প্রাণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ ঘটে না। মরা হয়ে মাঠের বাইরে বসে 'চিকে'র প্রতীক্ষা করতে হয় তাকে। একের পর এক মরা হতে হতে যে পক্ষের সমস্ত খেলোয়াড় আগে মরা হয়ে যায় সেই পক্ষ চিক খেয়ে যায়। চিক খাওয়ার পর দু'পক্ষ পরস্পর ঘর বদল করে। অর্থাৎ একপক্ষের ঘরে গিয়ে অন্যপক্ষ খেলা শুরু করে। ' কারেন্ট ' কবাডি হিসাবে আরও এক ধরণের খেলা চালু আছে।
ওই খেলায় ডাকের সময় ডাকিয়া এক দমে বিপক্ষে দলের এক বা একাধিক খেলোয়াড় ছুঁয়ে মারতে পারে। আবার ধরা পড়ার পর টেনে হিঁচড়ে নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারলে বিপক্ষ দলের যে ধরিয়ে তাকে ধরেছিল সে তো বটেই , বাকি যেসব খেলোয়াড় তাঁকে ধরিয়েকে ছুঁয়ে থাকে তারাও মরা হয়ে যায়। কারেন্ট অর্থাৎ বিদ্যুৎপৃষ্ট ব্যক্তিকে ছুঁলে যেমন অন্যদেরও মৃত্যুর আশংকা থাকে এই খেলার ক্ষেত্রেও মরা খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে থাকার জন্যও বাকিদের মৃত্যু হয় বলেই সম্ভবত খেলাটি কারেন্ট কবাডি হিসাবে পরিচিত। সরকার স্বীকৃত কবাডি খেলায় অনেক নিয়মকানুন রয়েছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত হা-ডু-ডু খেলায় নিয়মের অত বাধ্যবাধকতা নেই। এলাকা ভেদে খেলোয়াড়রা নিজেদের ইচ্ছা মতো নিয়ম তৈরী করে নেয় ৷ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অবশ্য সর্বসম্মত ভাবে একটি নিয়মকে মান্যতা দেওয়া হয়। আজ আর সেই প্রতিযোগিতাও নেই। চোখে পড়ে না হা-ডু-ডু খেলার চর্চাও। শোনা যায় না ডাকিয়েদের সেই ' চোল কবাডি-কবাডি ' ডাক।
-----০------
দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----
দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----
----০---





No comments:
Post a Comment