বালাগাড়ি ও চৌকিগাড়ি
বছর তিরিশেক আগেও গ্রামাঞ্চলে আজকের মতো পাকা বাড়ি তৈরি শুরু হয় নি। তাই সেই সময় গ্রামে লোহার শিকের টুকরোর খুব আকাল ছিল। কয়লার উনুন তৈরির জন্য প্রয়োজন হত ছোট ছোট শিক। গৃহিণীদের ভরসা ছিল ভাঙা বালতির হ্যান্ডেল। অর্ধবৃত্তাকার সেই হ্যান্ডেল সোঁজা করে উনুন পাতা হত।কিন্তু মাঝে মধ্যে পুরোপুরি ভাঙার আগেই বালতি উধাও হয়ে যেতে দেখা যেত। হাজার খোঁজ খবর করেও দেখা মিলত না বালতির। গৃহকর্তা থেকে গৃহিণী কেউ আর ভেবে পেতেন না এত জিনিস পড়ে থাকতে চোরকে ভাঙা বালতিটাই নিয়ে পালাতে হলো কেন ? দু/ তিনদিন পরেই অবশ্য রহস্য উন্মোচিত হত। দেখা যেত বাড়ির কোন ছেলে হাসি মুখে বালাগাড়ি চালাতে চালাতে ঢুকছে। চোটেপাটে ধরার পর ছেলেটি স্বীকার করে নিত সে'ই সবার অলক্ষ্যে বালতিটি নিয়ে গিয়ে কামারবাড়ি থেকে গাড়িটি তৈরি করেছে।
তখন গৃহিণীর আর আফশোসের অন্ত থাকত না। বালতি ভগ্নপ্রায় হলেই গৃহিণীর মতোই শেন্যদৃষ্টি থাকত বাচ্চাদেরও। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৃহিণী সেটা উনুন তৈরীর কাজে লাগানোর আগেই বাচ্চারা হাতিয়ে নিয়ে বালা গাড়ি তৈরি করে নিত ৷ আসলে বালাগাড়ি চালানো এককালে বাচ্চাদের একটি প্রিয় খেলা ছিল। মূলত ছেলেরাই বালাগাড়ি চালাত। কামারশাল থেকে লোহার শিক দিয়ে ১০/১২ ইঞ্চি গোলাকার একটা বালা তৈরি করিয়ে নেওয়া নিত তারা। যার গাড়ি যত বড় সে তত সৌভাগ্যবান হিসাবে বিবেচিত হত। শুধু বালাগাড়ি হলেই চলে না।
সেই গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজন 'ইউ'এর মতো বাঁকানো হ্যান্ডেলও। সেক্ষেত্রে বাতিল ছাতার শিক বাঁকিয়ে বাঁশের কঞ্চিতে গুঁজে সেই হ্যান্ডেল তৈরি করে নিতে হয়। হ্যান্ডেলের ইউ মুখে ঠেকিয়ে বালাগাড়ি ঠেলা মারলেই তা গড়িয়ে চলে রাস্তায় । গাড়ি চলার সময় হ্যান্ডেলের ঘষা লেগে ধারাবাহিক একটা চি-চি শব্দ হয়। সেই শব্দে বাচ্চারা যেন একটা ছন্দ খু্ঁজে পায়। সেই ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওইভাবে বালাগাড়ি ঠেলতে ঠেলতে তারা মুদিখানা থেকে রেশন দোকান , এমন কি এক গ্রাম থেকে পৌঁছে যেত অন্য গ্রামে। ভালো রাস্তা নেই তাতে কি ? ভাঙাচোরা রাস্তাতেই দিব্যি বালাগাড়ি চালাতে দেখা যেত কচিকাঁচাদের।
মাঝে মধ্যে নিজেদের মধ্যে বালাগাড়ির রেস প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত তারা। ওই প্রতিযোগিতায় যে একবারও চালানোয় ছেদ না ঘটিয়ে অর্থাৎ বালাগাড়ি না ফেলে নির্ধারিত দুরত্ব সব থেকে কম সময়ে পৌঁছোতে পারে সে প্রথম স্থান অধিকার করে। তারপর ক্রমান্বয়ে বাকি দুজন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান পায়। আজ আর গ্রামগঞ্জে লোহার শিকের অভাব নেই। অলিতে গলিতে তৈরী হয়েছে ঢালাই রাস্তা। কিন্তু বালাগাড়ি চালানোর সেই উৎসাহটাই হারিয়ে ফেলেছে বর্তমান প্রজন্ম। বালাগাড়ির মতোই ছেলেমেয়েদের আর একটি প্রিয় খেলা ছিল চৌকি বা তক্তা গাড়ি।
বালতির হাতলের মতোই এক্ষেত্রেও কাঠের পাটা বা তক্তা পেলেই বাচ্চারা ছুটত ছুতোরবাড়ি। তার কাছে থেকে তৈরি করে নিত মাঝে ছিদ্র যুক্ত চারটি ছোট চাকা। পাটা অভাবে বাঁশের দুটি পাবের মধ্যবর্তী গিঁটকে সমান করে কেটে মাঝে ফুটো করে নিয়েও চাকা তৈরি করে নেওয়া হতো। তারপর গাছের ডাল বা বাঁশ দিয়ে দুটি লিগে তৈরির করতে হতো। লিগের দুই মুখ চাকার মধ্যবর্তী ফুটোর মাপে মসৃণ করে চাঁচাই করে নেওয়ার পর তাতে চাকা গলিয়ে শেষ প্রান্ত পেরেক দিয়ে আটকে দিতে হয়।
চলার সময় চাকা যাতে লিগে থেকে বেরিয়ে চলে না আসে তার জন্যই ওইভাবে পেরেক দিয়ে আটকাতে হয়। এরপর দুটি লিগে পাটা এবং পেরেক দিয়ে তক্তার মতো যোগ করে গাড়ির আকার দেওয়া হয় ৷ পাটা অভাবে বাঁশের বাতা দিয়েও কাজ চালানো যায়। তক্তার মতো দেখতে বলেই বোধহয় ওই ধরণের গাড়িকে কোথাও কোথাও তক্তা বা চৌকি গাড়ি বলা হয়ে থাকে।বাড়ি
তে ছুতোর মিস্ত্রীর কাজ হলে অনেক সময় আবদার রাখতে অভিভাবকেরাও ছেলেমেয়েদের তক্তাগাড়ি তৈরি করিয়ে দিতেন। সেই গাড়িতে চাপিয়ে পালাক্রমে একে অন্যকে টেনে নিয়ে বেড়াত। ওই গাড়িতেই কচিকাঁচারা রথযাত্রার সময় রথ তৈরি করত। আজও তক্তাগাড়িতেই ছেলেমেয়েদের রথ তৈরি করতে দেখা যায়। কিন্তু তক্তা গাড়িতে তাদের চেপে বেড়াতে বড়ো একটা দেখা যায় না। শুধু রথের প্রয়োজনেই টিকে আছে তক্তাগাড়ি।
----০----


No comments:
Post a Comment