পুতুল ও রান্নাবাড়ি খেলা
অর্ঘ্য ঘোষ
পুতুল খেলা কথাটি প্রায়ই মানুষের মুখে মুখে ফিরতে শোনা যায়। বিভিন্ন গান-গল্প-কবিতাতেও কথাটির উল্লেখ রয়েছে। সাধারণত নরনারীর বিশ্বাসভঙ্গেরপ্রসঙ্গে কথাটি ব্যবহৃত হয়। যে সম্পর্কের কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নেই তা পুতুলখেলার সামিল বলে গণ্য হয়। পুতুল খেলাতে সেই সার সত্যটিই যেন প্রতিভাত হয়।পুতুলখেলা কথাটি আজও নানা প্রসঙ্গে উচ্চারিত হতে শোনা যায়। কিন্তু চর্চারঅভাবে খেলাটিই হারিয়ে যেতে বসেছে। পুতুল মূলত মেয়েদের খেলা। একই পরিবার অথবাভিন্ন পরিবারভুক্ত দুই বা ততোধিক মেয়ে একক বা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে খেলা চলে।দুটি দলের মধ্যে একপক্ষ ছেলে অন্যদল মেয়ে পক্ষ হিসাবে বিবেচিত হয়। আলোচনারমাধ্যমে কে প্রথম ছেলেপক্ষ হবে স্থির করা সম্ভব না হলে টসের মাধ্যমে তানিস্পত্তি করে নিতে হয়। পরবর্তী রাউন্ডে অবশ্য মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষ হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
এক্ষেত্রে একটি বিয়ে পর্ব সমাধা হওয়াকে একটি রাউন্ড বলে ধরা হয়। খেলা শুরুর আগে দু'পক্ষকেই তালপাতা - ছেঁড়া চট দিয়ে দুটি ঘর বানিয়ে নিতে হয় ৷ ঘরতৈরী করে নেওয়া সম্ভব না হলে অবশ্য ধানের গোলার নিচের ফাঁকা অংশ কিম্বা পুতুলরাখার বাক্সও ঘর হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। খেলার জন্য দু'পক্ষকেই মাটি দিয়ে মানুষের আকৃতির ছোট ছোট পুতুল তৈরি করে নিতে হয়। অনেক সময় মা - কাকীমা কিম্বা মাসি-পিসিরাও মেয়েদের ওইসব পুতুল তৈরী করে দেন। কিম্বা তৈরীতে সাহায্য করেথাকেন।
পুতুলের মধ্যে একাধিক বিভিন্ন আকারের পুরুষ এবং নারীও থাকে। ছোট ছোট কাপড়ের টুুকরো দিয়ে শাড়ি-ব্লাউজ ধুতি-পাঞ্জাবি পড়িয়ে পুতুলগুলিকে সুন্দর করে সাজানো হয়। পুতুলের শোবার জন্য তৈরী করা হয় ছোট ছোট বিছানা বালিশও।ছোট ছোটমেয়েরা সময় পেলেই পুতুল সাজাতে ব্যস্ত থাকে। পুতুলখেলার অন্যতম আর্কষণ হলবিয়ে। মেয়েপক্ষের মেয়ে পুতুলের সঙ্গে অন্য পক্ষের ছেলেপুতুলের বিয়ের আয়োজন করাকরা হয়। নব সমন্ধ থেকে স্ত্রী আচার সহ ভুড়িভোজেরও ব্যবস্থা থাকে। তবে ভুড়িভোজবলতে অবশ্য কাঁঠাল কিম্বা কচু পাতায় পরিবেশিত হয় ইটগুঁড়ি , ধুলো - বালি কিম্বাকাদা দিয়ে তৈরী বিভিন্ন পদ। নিমন্ত্রিতরা সেই খাবার ভক্তিভরে খাওয়ার অভিনয় করে।
কখনও কখনও অবশ্য পুতুল বিয়ে উপলক্ষ্যে সত্যিকারের ভুঁড়িভোজের আয়োজনও যে হয় না তা নয়। মেয়েদের আবদারে বাবা-মায়েরা শুধু খাবারের আয়োজনই নয় , পালকি এমনকি বাজনারও ব্যবস্থা করে দেন। এমন অনেক পুতুলের বিয়ের কথা একসময় এলাকারমানুষের মুখে মুখে ফিরত। সেই খেলাটিই আজ আর চোখে পড়ে না বললেই চলে।
পুতুলখেলার মতোই আর একটি খেলা ছিল মেয়েদের বড়ো প্রিয়। মূলত মেয়েদের খেলা হলেওএকেবারে যে খেলাটিতে ছেলেদের প্রবেশাধিকার ছিল না এমনটা নয়। ছেলেরাও অংশ নিত।কিন্তু রাশ থাকত মেয়েদেরই হাতে। খেলাটির নাম রান্নাবাটি বা রান্নাবাড়ি। ওইখেলায় মেয়েরা মায়েদের নকল করে রান্না-রান্না খেলে। অর্থাৎ লতা-পাতা , ইট-পাথর, কাঠের গুঁড়ো প্রভৃতি জিনিস দিয়ে দিব্যি হাতা খুন্তি নেড়ে রান্না করে।রান্নাবাড়ি খেলার জন্য এক সময় মেলা এবং হাটবাজারে প্লাস্টিক কিম্বাঅ্যালুমিনিয়ামের ছোট ছোট হাঁড়ি, কড়াই , হাতা-খুন্তি এমন কি স্টোভ পর্যন্তকিনতে পাওয়া যেত।
মেয়েরা মেলা কিম্বা বাজার -হাট গেলে আর কিছু কিনুক না কিনুক, ওইসব রান্না করার সরঞ্জাম অবশ্যই কিনে আনত। সেইসব রান্না করার সরঞ্জাম নিয়েই মেয়েরা ওই খেলায় মেতে উঠত। পুতুলের বিয়ের মতোই খাবার তৈরী করত মেয়েরা। রান্নাকরতে করতে বড়োদের গলা নকল করে সঙ্গিনীদের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠত, ও বৌমা বাটনাটাবেঁটে দাও মা। নাহলে কখনই বা রান্নাবান্না হবে , আর কখনই বা ছেলেপুলের পাতে ভাত দেবে ? '
যাকে উদ্দেশ্য করে বলা সে হয়তো বলে উঠত , আমার হাত জোড়া রয়েছে মা। ছোটকে বলুন না মশলাটা বেঁটে দেবে।
ওইসব কথোপকথনের মাঝেই রান্না হয়ে আসত। কর্ত্রী হাঁক পাড়ত, কই রে সব গেলি কোথাই ? চটপট খেয়ে নিবি আয়। তোরা খেয়ে উঠবি তবে আমরা বসতে পাবো।
অমনি সব লাইন দিয়ে বসে পড়ত। তাদের পাতা পেড়ে খাবার পরিবেশন করা হত।রান্নাবাটি খেলায় এই স্তরেই ছিল ছেলেদের অংশগ্রহণ। খাওয়ার অভিনয় করতে করতে চলতবড়োদের মতো রান্নার গুণাগুণ বিচার। কেউ বা ঝাল লাগার ভান করে হু-হা করতে করতেবলত , কাকীমা মাছের ঝোলে আজ খুব ঝাল দিয়ে ফেলেছো।
যাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলা সেই কাকীমা নাম্নী মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে জলের গ্লাসএগিয়ে দিয়ে বলত , লক্ষ্মী বাবা আমার আজকের মতো একটু কষ্ট করে খেয়ে নে। কালথেকে আর একটুও ঝাল দেব না।
অলক্ষ্যে ওইসব কথোপকথন শুনে বাবা-মায়েরা যে কত মুচকি হেসেছেন তার ঠিক নেই।তাদের নকল করার প্রবণতাটা উপভোগও করেছেন তারা। মেয়েদের প্রচ্ছন্ন প্রশয়ওদিয়েছেন। সেই খেলাটিই আজ আর মেয়েদের বড়ো একটা খেলতে দেখা যায় না। কেউ কেউঅবশ্য খেলা দুটি নিয়ে বিরুদ্ধ মতও পোষণ করে থাকেন। তাদের মতে , খেলা দুটি মূলতমেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই খেলা দুটির মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মনের মধ্যে পুতুল সাজানোর মতো নিজেকে সাজানোর পাশাপাশি রান্নার ব্যাপারটি ঢুকিয়েদেওয়া হয় ৷ এতে মেয়েদের মনের মধ্যে অন্য ধরণের চিন্তাচেতনার প্রসার ঘটে না বলেই তাদের অভিমত।
-----০-----



No comments:
Post a Comment