Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৪১



  
                 

    

     লুপ্তপ্রায় খেলা 



                    অর্ঘ্য ঘোষ  



                লুডো 





এক সময় গ্রামগঞ্জে বিনোদনের তেমন কোন মাধ্যম ছিল না। বিশেষ করে ঘর বন্দী মানুষের কাছে সময় কাটানো ছিল বড়ো দুস্কর ব্যাপার। কারণ তখন অধিকাংশ গ্রামে না ছিল গ্রন্থাগার , না ছিল টিভি বা অন্যান্য বিনোদনের মাধ্যম। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন কেউ এলে তাদের সময় কাটানোর যে দুটি উপকরণ ছিল তার একটি হল বিয়ে কিম্বা কোন অনুষ্ঠানে পাওয়া গল্প- উপন্যাসের বই আর অন্যটি হলো লুডো। ওই দুটি উপকরণ নিজেদের বাড়িতে থাকলে ভালো। না থাকলে আত্মীয়স্বজনের মান রাখতে ছুটতে হত পাড়া প্রতিবেশীর বাড়ি। আসলে লুডোই তখনকার দিনে অন্যতম ইন্ডোর গেমস হিসাবে বিবেচিত হত। আগে গ্রামের দোকানেও লুডো কিনতে পাওয়া যেত। তখন লুডো এতই আর্কষনীয় ছিল যে দোকানের পাঁচ পয়সার টিকিটের লটারির প্যাকটে প্রথম পুরস্কার হিসাবে থাকত লুডো।


  
                                      শুধু গ্রামগঞ্জেই নয় , শহরের বাসিন্দাদের কাছেও লুডোর কদর কম ছিল না। সেই খেলাটি এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি হারিয়ে না গেলেও হারিয়ে গিয়েছে বিগত দিনের সেই আর্কষণ। এখনকার ছেলেমেয়েদের লুডো খেলতে বড়ো একটা দেখা যায় না। লুডো ছেলে - বুড়ো সকলেরই খেলা। ওই খেলা মূলত দু'ধরনের। ঘর এবং সাপ লুডো। একই লুডোয় সাপ এবং ঘর দুই ধরণের খেলার সুযোগ রয়েছে। ঘর লুডো নুন্যতম দুজন অথবা চারজন একক কিম্বা দুজন করে জুটি বেঁধে খেলা চলে। ঘরের ক্ষেত্রে যুগ্মভাবে খেলার জন্য অন্যান্য খেলায় প্রচলিত কোন পদ্ধতির মাধ্যমে জুটি নির্বাচন করে নিতে হয়। তারপর আলোচনা কিম্বা টস করে কে কোন ঘর এবং আগে দান নেবে তা স্থির করে নিতে হয়। ঘর লুডোতে চারটি করে খোঁপ কাটা চার রঙের চারটি ঘর থাকে। থাকে চার রঙের চারটি করে গুটি এবং একটি ছক্কা আর পাই। ছক্কার ছটি তলে এক থেকে ছয় পর্যন্ত ফুটকি আঁকা থাকে। খেলার পরিভাষায় ছয় ফুটকি যুক্ত দিকটি ছক্কা এবং এক ফুটকি যুক্ত দিকটি পুট হিসাবে পরিচিত।খেলার ক্ষেত্রে ওই দুটি দিকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে৷ 


                                     কারণ দান চেলে ওই দুটি দিকের একটি লুডোর উপরে ফেলতে পারলে তবেই ঘর থেকে গুটি বের করার সুযোগ মেলে। ছক্কা না পুটে গুটি বের করা হবে তা স্থির হয় দুপক্ষের আলোচনায়। রঙ নির্বাচনের পর জুটিদের মুখোমুখি ঘর নিয়ে খেলা শুরু হয় ৷ প্রথমে চার‍টি করে গুটি ঘরে বসিয়ে দানচালের অধিকারী খেলোয়াড় দান চালে। দান চালার অর্থ হলো পাইয়ের ভিতরে ছক্কাটি ভরে মুখ আঙুল চাপা দিয়ে বার কতক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লুডোর উপরে ছুড়ে দেওয়া। তাতে পূর্ব নির্ধারিত ছক্কা বা পুট পড়লে গুটি বের করার সুযোগ মেলে। অন্যথায় গুটি বের না হওয়া পর্যন্ত দান বৃথা যায়।নির্ধারিত ছক্কা বা পুট পড়লে অবশ্য গুটি বের করার পাশাপাশি ফের আরও একবার দান নেওয়ার সুযোগ মেলে। সেক্ষেত্রে পরবর্তী চালে যে সংখ্যা ফুটকি যুক্ত দিক পড়ে তত সংখ্যক ঘর গুটি চালার সুযোগ পাওয়া যায়। জুটির যেকোন একজনের গুটি বেরিয়ে থাকলে দু'জনের দানই কাজে লাগানো যায়। কিন্তু গুটি না বের হওয়া পর্যন্ত দান চালা বৃথা যায়। সবাইকে দান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। গুটি চালা যায় না। ওইভবে একে একে গুটি বের করে দান চালতে চালতে যারা নিজেদের পাশাপাশি শত্রুপক্ষের এলাকা অতিক্রম করে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারে তারাই জয়ী হয়। ঘর থেকে বের হওয়ার পর যখন গুটি কাছাকাছি থাকে তখন তাকে কাঁচা গুটি বলে। আর  ঘরমুখী গুটি পাকাগুটি হিসাবে পরিচিত। পাকাগুটি নিয়ে নিজের ঘরে ফেরাকে বলা হয় ঘরে ওঠা ৷ ৫৫ টি ঘর অতিক্রম করে তবেই ঘরে ওঠা যায়। প্রতিটি গুটি ঘরে ওঠার পর অতিরিক্ত আরও একবার দান নেওয়ার সুযোগ মেলে। কিন্তু গুটি ওঠানো খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। প্রতি পদে বিরোধীপক্ষের গ্রাসে পড়ে ফের ঘরে ফেরার আশংকা রয়েছে। গুটি চলার সময় যদি বিরোধী পক্ষের চালে তাদের গুটি একই ঘরে পৌঁছে যায় তাহলে প্রতিপক্ষের গুটি কাটা পড়ে। সেক্ষেত্রে  প্রতিপক্ষকে গুটি নিয়ে প্রথম অবস্থানে ফিরে ফের গুটি বের করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। আর গুটি কাটার কৃতিত্বের জন্য বিরোধীপক্ষ অতিরিক্ত দান নেওয়ার সুযোগ পায়৷


                  
                               বিরোধীদের গুটি আটকে রাখার জন্যও এক রকম নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। দুটি বা তিনটি গুটিকে একসঙ্গে চালনা করলে বিরোধীপক্ষ একটি গুটি দিয়ে জোড়া গুটি খেতে বা কাটতে তো পারেই না , জোড়া গুটির মাথায় না উঠে ডিঙিয়ে যেতেও পারে না। বিরোধী পক্ষ জোড়া না ভাঙা পর্যন্ত তাকে পিছনে অপেক্ষা করতে হয়। বিরোধী পক্ষকে জোড়া গুটি চালাতে হলে অবশ্য জোড়া দান চালতে হয়। অর্থাৎ দুই, চার, ছয় দানের ক্ষেত্রে যথাক্রমে এক, দুই বা তিন ঘর গুটি চালার সুযোগ মেলে। কিন্তু বিজোড় সংখ্যক দান পড়লে তখন সমস্যায় পড়ার আশংকা থাকে।সেক্ষেত্রে অন্য গুটি না থাকলে জোড়া ভেঙে গুটি চালাতে হয়। তখন পিছনে থাকা বিপক্ষের গুটির পেটে যাওয়ার আশংকা থাকে। তিনটি গুটি একত্রে চালানোর ক্ষেত্রে তিনে এক ঘর এবং ছয়ে দুই ঘর চাল দেওয়ার সুযোগ মেলে। তবে ওই ভাবে জোড়া বা ততোধিক গুটি দিয়ে পথ আটকে রাখার ঝুঁকিটাও কিন্তু কম নয়। পিছন থেকে প্রতিপক্ষও যদি সমসংখ্যক গুটি নিয়ে এসে জোড়া লাগাতে পারে তাহলেই বিপদ ঘনিয়ে আসে। তখন জোড়া বা তিনটি গুটি দিয়ে পথ আগলে বসে থাকা গুটির মাথায় পৌঁছানোর জন্য যদি প্রয়োজনীয় দান পড়ে তাহলে সমস্ত গুটি কাটা পড়ে যায়। তখন সব কটি গুটি নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় পথ আগলে বসে থাকা খেলেয়োড়দের। কাঁচা গুটি হলে তবু সামলে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু গুটি পাকা হলে তাদের কোমর ভেঙে যায়। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের তখন পোয়াবারো। কারণ একসঙ্গে বিপক্ষের একাধিক গুটি ঘরে ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি প্রতিটি গুটি কাটার জন্য একবার করে একাধিক দান নেওয়ার সুযোগ মেলে। লুডোয় তারকা চিহ্নিত আটটি ঘর রয়েছে। ওইসব ঘর নিরাপদ স্থান হিসাবে পরিচিত। কারণ ওইসব ঘরে অবস্থান কালে গুটি কাটা যায় না। সমস্ত বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে নির্বিঘ্নে যার বা যাদের সমস্ত গুটি সর্বাগ্রে ঘরে উঠে যায় সেই খেলোয়াড়  বা জুটি জয়ী ঘোষিত হয়। অর্থাৎ বিপক্ষ চিক খেয়ে যায়। চিকের পর ঘর বা দিকবদল করে ফের নতুন করে খেলা শুরু হয়। 



                                      সাপ লুডো অবশ্য একক ভাবে দুই বা ততোধিক খেলোয়ার নিয়ে খেলতে হয়।  সাপ লুডোয় ১০০ টি ঘর কাটা থাকে। সেইসব ঘরে ছড়িয়ে থাকে ৯ টি ছোট-বড়ো মই এবং সাপ। এজন্যই বোধহয় খেলাটির নাম সাপ লুডো। অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের মধ্যে কে আগে দান নেবে তা পচ্ছন্দ সই পদ্ধতি মাফিক নির্ধারণ করে নিতে হয়। তারপর শুরু হয় খেলা। ঘর লুডোর মতোই এক্ষেত্রেও খেলোয়াড়রা আলোচনার মাধ্যমে ছক্কা না পুটে গুটি বের করা হবে তা ঠিক করে নেয়। সেই মতো একে একে দান চেলে গুটি বের করার চেষ্টা চলে। গুটি বের হলে তাকে শীর্ষস্থান অর্থাৎ একশো ঘরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। চলার পথে দান চেলে গুটি নিয়ে মইয়ের নীচে পৌঁছোলে সেই খেলোয়ারের ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলে বিবেচিত হয়। সেক্ষেত্রে মই বেয়ে উপরে ওঠার সুযোগ মেলে। তখন অতিরিক্ত একবার দান চালার সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু চলার পথে বিপদও কম নেই। গুটি চালাতে চালাতে সাপের মুখে গিয়ে থামলেই সমূহ বিপদ। একেবারে সাপের লেজের নীচে নেমে যেতে হয়। কিন্তু সব বিপদ এড়িয়ে যার গুটি সবার আগে শেষ অর্থাৎ একশো ঘরে পৌঁছোতে পারে সে প্রথম নির্বাচিত হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে নির্ধারিত হয় বাকিদের অবস্থান। অন্যান্য লুপ্তপ্রায় খেলার মতোই লুডো খেলার চলও ক্রমেই কমে আসছে।

                                          -----০------

No comments:

Post a Comment