Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৯৫




           

           অন্তরালে 



                      অর্ঘ্য ঘোষ 



      ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 





সকাল হতেই শুরু হয়ে যায় বিয়ে বিদায়ের প্রস্তুতি। চৈতী মালাকে ফের সুন্দর করেসাজিয়ে দেয়। মৌরিও তাকে সাহায্য করে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী নব দম্পতিকেছাদনাতলা তলায় দাঁড় করিয়ে শুরু হয় আর্শিবাদ পর্ব। সবার শেষে আর্শিবাদ করেআর্য। আর্শিবাদ শেষে সে একটা খাম সৌমিকের হাতে তুলে দেয়। খামটা দেখে সবাই অবাক হয়। কিছুক্ষণ আগেই বৈশাখী মালাকে সোনার হার আর সৌমিককে আংটি পড়িয়ে আর্শিবাদকরেছে। তারপরও আর্যকে মুখবন্ধ খাম দিয়ে আর্শিবাদ করতে দেখে অনেকে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। চৈতীও কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করে -- কি আছে গোবাবা খামটাতে ?
--- সেটা তো বলতে পারব না মা। যাকে খামটা দিয়েছি সে খুললে জানতে পারবে। চৈতীরকৌতুহল দেখে খামটা তার হাতে দিয়ে খুলতে বলে সৌমিক। খামটা খুলতেই ভিতর থেকেবেরিয়ে আসে একটা ছাপানো ফর্ম আর পাঁচটা এক হাজার টাকার নোট। সেটা হাতে নিয়ে সৌমিক জিজ্ঞেস করে -- এটা কি জ্যেঠু ?
---- এটা একটা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফর্ম। সেই সময় আমি শঙ্খর পড়ারব্যবস্থা করতে পারলেও বাড়িতে আর অন্য কেউ ছিল না বলে মালার মাঝপথে বন্ধ হয়েযাওয়া পড়াটা আমি চালু করতে পারি নি। তাই নিয়ে আমি আজও অনুশোচনা ভোগ করি। আমিচাই তুমি মালার পড়ার ব্যবস্থা করে আমাকে সেই অনুশোচনা থেকে মুক্তি দেবে। সেই
জন্য তোমাদের বিয়েতে আর্শিবাদ হিসাবে ভর্তি ফি আর বই কেনার টাকা সহ ফর্মটাতোমার হাতে তুলে দিলাম।
কথা শেষ হতেই সৌমিক আর মালা প্রণাম করে আর্যকে। ছলোছলো চোখে মালা বলে , জ্যেঠুআপনি আমার জন্য এমনি করে ভেবেছেন ?
মালাকে বুকে টেনে নিয়ে আর্য বলে , তুই যে আমার আর একটা মেয়ে রে মা। মেয়ের কথাবাবা ভাববে না তো কে ভাববে ?
আর্যর কথা শুনে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ে মালার চোখে। অন্যদেরও চোখের কোন চিক চিককরে ওঠে। সবাই বলে , এই রকম উপহার কেউ কাউকে দিয়েছে বলে শুনি নি। সর্বকালেরসেরা উপহারের স্বাক্ষী থাকল এই বিয়ে।
আর্শিবাদ পর্ব চুকতেই আসে বিদায় বেলা। শ্বশুরবাড়ি রওনা হওয়ার আগে বাবার ঘরেযায় মালা। দাদু -- ঠাকুমা আর মায়ের ছবিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেই কেঁদে ফেলেসে। মধুরিমা এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয় --আজকের দিনে আর কাঁদিসনে মা। তোকে কান্নাকাটি করতে দেখলে তোর বাবার মনের অবস্থাটা কেমন হয় বল দেখি ?
কোন সান্ত্বনাই বাধ মানে না। মালা কেঁদেই চলে। আজকের দিনটাতে রাজরানী হয়েগেলেও কোন মেয়েই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সেই সময় প্রিয় এসে মেয়ের পিঠে হাত রাখে। বাবাকে দেখে ফের প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে মালা। মেয়েকে বুকে টেনেসান্ত্বনা দিতে গিয়ে প্রিয় নিজেই কেঁদে ফেলে। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলে বলে ,আর কাঁদিস নে মা। বেরনোর সময় হয়ে এল।মেয়ের হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে প্রিয়। তারপর সবাই পায়ে হেঁটে তাদের সঙ্গে মাচানতলা পর্যন্ত  যায়।মাচানতলায় মায়ের বেদীর কাছে মেয়ে জামাইকে নিয়ে  যায় প্রিয়। তারপর প্রণাম করে বলে , মাগো তোমার নাতনী আজ আমার ঘর শুন্য করে শ্বশুরঘর করতে চলে যাচ্ছে। তুমিওদের আর্শিবাদ কর মা।
হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রিয়। সৌমিকের সঙ্গে মালাও বেদীতে প্রণাম করেবাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। চৈতী এসে মালার হাত ধরে। সে'ই তাকে গাড়িতে পৌঁছেদেয়। আস্তে আস্তে মাচানতলা থেকে বেরিয়ে যায় গাড়ি। গাড়ির ভিতর থেকে হাত নাড়তেথাকে মালা। মাচানতলায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকে অন্যরাও। গাড়িটা দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই সকলে বাড়ির পথ ধরে। 




                                   বাড়ি ফিরে আর্যদেরও ফেরার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়।মধুরিমা তাদের এবেলাটা থেকে যাওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি করে। কিন্তু আর্য জোড়হাত করে তাকে নিরস্ত করে। প্রিয়ও আর তাদের থাকার জন্য বলতে পারে না। হাতে তোআর সময় নেই।  তিনদিনের মাথায় ওদেরও তো বিয়ের বন্দ্যোবস্ত করে ফেলতে হবে। ফেরার আগে চৈতী শঙ্খর সঙ্গে দেখা করার জন্য সবার অগোচরে চুপি চুপি তার ঘরে যায়। শঙ্খতখন খাতাতে হিসাব লিখছিল। তাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তার চোখে মুখে খুশী যেন উপচেপড়ে। সেটা লক্ষ্য করে চৈতী বলে -- এই যে ছেলে শুভদৃষ্টি ছাড়া তো আর দেখা হবেনা। তাই তোমার মুখটা একবার দেখতে এলাম। শঙ্খর চোখে চোখ রেখে কটাক্ষ হানে চৈতী।শঙ্খ এগিয়ে এসে বাড়িয়ে দেয় তার চুম্বন পিয়াসী ঠোঁট। সেই ঠোঁটে  আঙুল রেখে চৈতীবলে , উহু বিয়ের আগে আর নয়। পরিবর্তে নিজের হাতে চুম্বন এঁকে শঙ্খর উদ্দ্যেশ্যহাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সে। আর্য ততক্ষণে সবাইকে চৈতীর বিয়েতেযাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ করে ফেলেছে। তারপর সবার কাছে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চাপে তারা। বাড়ির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গাড়ির দিকে চেয়ে শঙ্খ দেখতে পায় চৈতীও তারদিকে একই ভাবে চেয়ে আছে। সেই দৃষ্টি বিনিমিয়ের মধ্যেই দৃষ্টি সীমার বাইরে চলেযায় চৈতীদের গাড়ি। মালার বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়ে যায় শঙ্খর বিয়েরতোড়জোড়। প্রশান্তকাকাদের নিয়ে সৌরভ এদিকটা সামাল দিতে ঝাপিয়ে পড়ে। ওদিকে ডাক্তারবাবুর নেতৃত্বে সোমনাথরা বিয়ের জন্য দিনরাত এক করে  ফেলেছে। সেদিন থেকেআর্যর বাড়িতেই পড়ে রয়েছে তারা। এমন কি ডাক্তারবাবু পর্যন্ত অনিবার্য কারণেচারদিন চেম্বার বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ইকবালরাও প্রেস বন্ধ রেখে কাজে সামিল হয়েছে।
ভাইঝির বিয়ে সামলে আর বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠে না মধুরিমার। সৌরভ আর অভিজিতপালাক্রমে নিজেদের বাড়ি সামলাচ্ছে। অতসীকাকী, সুরোপিসিরাও পড়ে রয়েছেন। শঙ্খরবিয়েতে কাজকর্ম করার জন্য  ডাক্তারবাবুরাই ভানুমতীজ্যেঠি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিয়েসুরোপিসিকে ছুটি দিয়েছেন। সবার সহযোগিতায় দু'পক্ষের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়ে যায়। দেখতে দেখতেই বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। ব্যান্ডের পাশাপাশি ছেলের বিয়েতেনহবতখানাও বসিয়েছে প্রিয়। নহবতখানা বসেছে চৈতীদের বাড়িতেও। কোনপক্ষই আয়োজনেরকোন ত্রুটি রাখে নি। মনোহরপুর গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে মালা আর শঙ্খরবিয়ের কথা। বিয়ের দিন সকাল থেকে বেজে ওঠে সানাই। আগের দিনই দ্বিরাগমনে বাপেরবাড়ি এসে পৌঁচেছে মালা। এসে থেকে দাদার পিছনে পড়ে রয়েছে সে। সমানে খুনসুটিচলছে দু'জনের। চৈতীর গলা নকল করে বলছে --- এই যে ছেলে, অত মন উড়ু উড়ু ভাব কেন ?
শঙ্খও বলে , তুমিই বা কম যাও কিসে ? শেষের দিকে তো তোমার হাতে আর খাওয়াইযাচ্ছিল না। কার কথা ভাবতে ভাবতে সব নুন পোড়া করে ফেলতে তা তো আর জানতে বাকি নেই ?
--- কি, আমি সব নুন পোড়া করে ফেলতাম ? তাহলে খেতিস কি ?
---- কি করব ?  কোন উপায় ছিল না বলেই যা দিতে তাই খেতে হত।
---- তবে রে , দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।
কপট রাগে দাদাকে তাড়া করে মালা। শঙ্খ গিয়ে মধুরিমার পিছনে আশ্রয় নেয়। মধুরিমাদুজনকে দুই বুকে টেনে নিয়ে হাসতে হাসতে বলে -- তোদের দুটিকে নিয়ে আর পারি নাবাপু। এখন যা দেখি , রাজ্যের কাজ পড়ে রয়েছে। আমাকে সেগুলোকে সামলাতে দে।





                  পিসিমনির কথায় দু ভাইবোন হাত ধরাধরি করে চলে আসে। তা দেখে হেসে ফেলে সৌমিক।অমনি মালা বলে, অ্যাই তুমি হাসলে কেন ? আমাদের দুই ভাইবোনের মধ্য হচ্ছে। তুমিথার্ডপার্সন হয়ে নাক গলাচ্ছ কেন ?
---- বারে, আমার শ্যালকের ব্যাপার, আর আমি থার্ড পার্সন হয়ে গেলাম ?
---- কিন্তু মশাই খুব যে শ্যালক শালক করছ , তা শ্যালকটা এল কোথা থেকে ? আগেস্ত্রী তবেই না শ্যালক।
--- সেটা তো সবাই জানে , তবু তুমি আমাকে থার্ড পার্সন বললে কেন শুনি ?
নিজের কথার জালে জড়িয়ে গিয়ে মালা বলে , জানি না যাও।
হাসি ঠাট্টা চলে চৈতীকে ঘিরেও। চৈতীর কলেজের কয়েকজন বন্ধু সকাল সকাল চলেএসেছে। তাদের মধ্যে অন্তরাও রয়েছে। অন্তরাই অন্য বান্ধবীদের বলে , জানিস তোভাই , আমাদের চৈতীর বাবা আর ছেলে পেল না , শেষে কিনা মাসতুতো দাদার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিল।
---- সে কি রে ?
----- তবে আর বলছি কি ? জিজ্ঞেস কর না ওকে ?
চৈতীর তখন শঙ্খদার সঙ্গে  কলেজে যাওয়ার প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ে যায়। লজ্জায়লাল হয়ে ওঠে তার মুখ। সে কিছু বলতে পারে না। ততক্ষণে অন্তরাই ব্যাপারটা খোলসাকরে দেয়। সেটা শুনে বান্ধবীরা বলে -- বলিস কি রে ?
এবারে চৈতী বলে , তখন ওই কথা না বলে উপায় ছিল ? কে কখন ছোঁ মেরে তুলে নিত তারঠিক আছে ?
---- তবে যাই বলিস ভাই , ছোঁ মেরে তুলে নেওয়ার মতো জিনিসই একখানা বটে।
হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটির মধ্যে দিনটা কেটে যায়। মনোহরপুরে তখন শুরু হয়ে গেছেবরযাত্রী যাওয়ার তোড়জোড়। সুরোপিসি, অতসীকাকী, ভানুজ্যেঠি সহ গ্রামের প্রতিটিবাড়ি থেকে একজন করে বরযাত্রী যাবে। তাদের যাওয়া আসার জন্য বাস ভাড়া করা হয়েছে।বিয়ে যাবে গাড়িতে। বিয়ে দিতে বরকর্তা হিসাবে যাবে সৌরভ। ওই গাড়িতেই সৌমিক , মধুরিমা , মালা,  অভিজিৎরাও যাবে। কোলবর করা হয়েছে ঋজুর নাতিকে। সেও দিব্যিসেজেগুজে হাজির। মালা দাদার পাশাপাশি তাকেও চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দেয়।রওনা হওয়ার আগে ছেলেকে নিজের ঘরে নিয়ে যায় প্রিয়। বাবা-মা আর স্ত্রীর ছবিরসামনে তাকে দাঁড় করিয়ে বলে, আগে ওদের প্রণাম করে আর্শিবাদ চেয়ে নে।
একে একে দাদু-ঠাকুমার পর মায়ের ছবিতে মাথা ঠেকিয়ে কেঁদে ফেলে শঙ্খ। ছেলেকেবুকে টেনে নিয়ে আর্য বলে -- আজকের দিনে কাঁদতে নেই বাবা। তুই কাঁদলে ওরা যেকষ্ট পাবে। ছেলেকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তার বুকটাও ফেটে যায়। তবু নিজেকে সামলেছেলের হাত ধরে বেড়িয়ে আসে সে। ছেলের হাত ধরেই মাচানতলায় পৌঁছোয়। সেখানে মায়েরবেদীতে মাথা ঠেকিয়ে বলে , মাগো তোমার নাতি নাতবৌ আনতে চলল। তুমি ওকে আর্শিবাদকর। শঙ্খ বেদিতে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই তার হাত ধরে গাড়িতে তুলে দেয় প্রিয়।





               গ্রাম ছেড়ে যায় গাড়ি। যথাসময়ে গাড়ি পৌঁছে যায় বিয়ে বাড়িতে। সানাইয়ের মুর্চ্ছনায় তখন ভেসে যাছে বিয়ে বাড়ি। আলোর রোশনাই চারিদিকে।  বিয়ের গাড়িথামতেই বেজে ওঠে ব্যান্ড। ডাক্তারবাবু এগিয়ে এসে বরযাত্রীদের আপ্যায়ন করে নিয়েযান। অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে জামাই বরণ করে নিয়ে যায় বৈশাখী। তারই ফাঁকে অন্যান্য বান্ধবীদের সঙ্গে অন্তরা বরবেশে শঙ্খকে দেখে গিয়ে চৈতীকে বলে , তোরবরটাকে বড্ড বেমানান লাগছে রে।
অন্তরার কথা শুনে চৈতীর মুখটা চুপসে যায়। সে ভেবেছিল সবাই বরবেশে শঙ্খকে দেখেএসে প্রশংসা করবে। কিন্তু উল্টো কথা বলায় শংকিত হয়ে পড়ে সে। ধরা গলায় জিজ্ঞেস করে , কেন রে কি হলো আবার ?
----- চলে এসেছে একটা গাড়িতে ? গাড়িতে কি ওকে মানায় বল ?
---- কিসে আসতে হত তাহলে ? পালকিতে ? গাঁয়ের ছেলে বলে পালকিতেই আসতে হবে তার কি মানে আছে ?
---- অমনি রাগ হয়ে গেল না ? ওরে বুদ্ধুরাম আজকের দিনে আর পালকি চলে না তা আমিওজানি। আর চললেও অত দুর থেকে পালকিতে বিয়ে করতে আসা যায় না তাও আমি জানি। আসলেওকে আসতে হত ময়ূরে। কারণ দেখাচ্ছে তো ময়ূর ছাড়া কার্তিকের মতো, তাই বললাম।
কথাটা শুনে হাসি ফোটে চৈতীর মুখে। বান্ধবীদের দিকে লাজুক চোখে চেয়ে বলে --ধ্যাত , তোরা না একটা যাচ্ছে তাই।
অন্তরা বলে , থাক খুব হয়েছে। আর ' লাজে রাঙা হল কনে বৌ ' হতে হবে না তোমাকে।হবু বরের নিন্দা শুনে এতক্ষণ তো মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। ধন্যি পতিপ্রেম , এ যেদেখি মহাদেবের সতীকেও হার মানাবে।
অন্তরার কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। চৈতীও না হেসে পারে না। হাসি ঠাট্টার মধ্যেদিয়ে নির্ধারিত লগ্নে নির্বিঘ্নেই বিয়ে হয়ে যায়। বিঘ্ন ঘটে কেবল শুভদৃষ্টিরসময়। বরকনেকে কাপড় ঢাকা দিতেই শঙ্খ মুগ্ধ দৃষ্টিতে চৈতীর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মুগ্ধতা ঝড়ে পড়ে চৈতীর চোখেও। সেই সময়ও তার মাথায় মজা করার দুষ্টুবুদ্ধি জেগে ওঠে। শঙ্খর চোখে চোখ রেখে সে বলে ওঠে -- এই যে ছেলে, কি দেখছ অমনকরে ?
প্রত্যুত্তরে শঙ্খও বলে ওঠে --- এই যে মেয়ে , তুমি কি দেখছ অমন করে ?
সেই কথা শুনে ফিক করে হেসে ফেলে চৈতী। হেসে ফেলে শঙ্খও। আর হাসির শব্দ শুনেমালা আচমকা কাপড়ের ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে বলে , হবে না , হবে না।ডিসকোয়ালিফাই ,শুভ দৃষ্টির সময় হাসার নিয়ম নেই। ফের শুভ দৃষ্টি করতে হবে।
তার পীড়াপীড়িতে আবার শুভদৃষ্টি করাতে হয়। মজাটা বাকিরাও উপভোগ করে। ওই রকমছোটখাটো মজা করে বিয়ে বাড়ি জমিয়ে রাখে মালা। বাসর ঘরেও তার ব্যতিক্রম হয় না।রেহায় পায় না চৈতীও। তার পীড়াপীড়িতে বিয়ের পোশাকেই নাচতে হয় তাকে। চৈতীরবান্ধবীদের আবদারে একের পর এক কবিতা পড়তে হয় শঙ্খকে। এমন কি সৌমিকও চুটকি বলেজমিয়ে দেয় আসর। সবাই হাততালি দিয়ে ওঠে তার চুটকি শুনে। তাই দেখে মালা বলে , আমার বরটার মধ্যেও যে এত গুণ ছিল তা জানা ছিল না। বলেই সে হাওয়ায় স্বামীরউদ্দেশ্য ' উউম ' বলে চুম্বন উড়িয়ে দেয়। তার চুমু দেওয়ার ভঙ্গিমা দেখে সবাইশব্দ করে হেসে ওঠে। সেই সময় বাইরে থেকে গঙ্গাধর বাবাজী বলে ওঠেন , বাবা-মায়েরাসব , অনুমতি করেন তো আমি একবার যুগলে হরপার্ব্বতীকে দেখে নয়ন সার্থক করে আসি।
মালা ভিতর থেকে বলে , হ্যা- হ্যা , নিশ্চয়।  আপনিই হরপার্বতীর মিলনের সেতুবেঁধে দিয়েছেন , আর আপনি  দেখবেন না তাই কখনও হয় ?আসুন ভিতরে আসুন।
অনুমতি পেয়ে ঘরের ভিতরে ঢোকেন গঙ্গাধর বাবাজী।  নবদম্পতির দিকে চেয়ে বলেন ,নয়ন সার্থক হলো গো। তারপর আচমকায় গেয়ে ওঠেন , ' চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরাভেবে করব কি।' সেই  গান মোহিত করে তোলে সবার মন। ভোরের বাতাসে মিশে যায় সেইগানের রেশ। বাসর শেষে শুরু হয় বিয়ে বিদায়ের পালা। যাবতীয় স্ত্রী আচার সেরেচৈতী  ' মা তোমার সব ঋণ শোধ করলাম ' বলে মায়ের আঁচলে একমুঠো চাল ছুড়ে দিতেই প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে বৈশাখী। মধুরিমা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে , কেঁদ না ,এটাই জগতের নিয়ম।
কিন্তু কোন সান্ত্বনা শান্ত করতে পারে না বৈশাখীকে। সেকেঁদেই চলে। বাবার বুকে কান্নায় ভেঙে পড়ে চৈতীও। রওনা দেওয়ার লগ্ন বয়ে যায়।মেয়ের হাত ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায় আর্য। চৈতীর জন্য গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল মালা। তার হাতে চৈতীর হাতটা তুলে দিয়ে আর্য বলে , মা গো তুমি একদিনতোমার মাকে ফিরিয়ে দিতে বলেছিলে। তোমার মাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারি নি মা। তাইআজ আমার মাকে তোমাদের হাতে তুলে দিলাম।
প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে আর্য। বাবাকে কাঁদতে দেখে চৈতীও স্থির থাকতে পারে না। মালা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে গাড়িতে তোলে। গাড়ি এগিয়ে যায়। সেদিকে চেয়ে থাকেআর্য আর বৈশাখী। এক সময় মিলিয়ে যায় গাড়ি। স্ত্রীর হাত ধরে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়আর্য। তার বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। তবুও মনে এক অনাস্বাদিত প্রশান্তি বিরাজ করে। কখনও কখনও শুন্যতা পূর্ণতাকেও ছাপিয়ে যায়।




                ( সম্পূর্ণ )





                                       
              আমার কথা 
             





' অন্তরালে ' নিছক একটি গল্প নয়। পেশা সূত্রে খুব কাছে থেকে দেখা একজন মানুষের জীবনের কাহিনী। আবার বলা যেতে পারে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি বিশেষেরও জীবন কাহিনী নয়। আরও অনেক মানুষের জীবন যন্ত্রণার সঙ্গে এই কাহিনীর মিল থাকতে পারে। সাধারণত দেখা যায় কেউ কোন সাজানো অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই সংবাদ মাধ্যমের ' সৌজন্যে ' সেই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই অপরাধী হিসাবে পরিগণিত হয়ে যান। এরফলে সমাজ , সংসারের মুলস্রোত থেকে ছিটকে যেতে হয় তাকে এবং তার পরিবারকে। সমাজ  তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, বাবা- মা সহ সকলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে ,  ' ওই দেখো ওরা সেই লোকটার ----- '। এর ফলে কার্যত একঘরে হয়ে জীবন কাটাতে হয় তাদের। আদালতে দোষ প্রমাণ হয়ে শাস্তি দেওয়ার আগেই এভাবেই অভিযুক্ত আর তার পরিবারের সামাজিক শাস্তি হয়ে যায়। আমরা সর্বত্র তাকে অপরাধী হিসাবে দাগিয়ে দিই। পরবর্তীকালে আদালত অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করে দিলেও সামাজিক শাস্তি ভোগ তার হয়েই যায়। হারিয়ে যায় তার আত্মীয় - পরিজন, সংসার, সামাজিক সম্মান এমন কি মানসিক ভারসাম্যও। দাগ আর সারাজীবনে মোছে না। সেই দাগের যন্ত্রণা কি বাইরে থেকে আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু ভুক্তভোগী মানুষ মাত্রেই সেই  যন্ত্রণা হাড়ে হাড়ে টের পান। তেমনই এক ভুক্তভোগী মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কতটুকু পেরেছি তা আপনারা বলবেন। আপনাদের মতামত চলার  পথে প্রেরণা যোগাবে। 'অন্তরালে' ইতিমধ্যেই কলকাতার দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ইচ্ছা হলে সংগ্রহ করতে পারেন। ভালো থাকবেন।আর খুব - খুব আনন্দে থাকবেন। নমস্কার।

                                                                                                         

                                                                                     

                                                                                                               অর্ঘ্য ঘোষ










     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  







দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----






                   ----০---


No comments:

Post a Comment