Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৯৪






          


            অন্তরালে 




                          অর্ঘ্য ঘোষ 




        ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 





বাড়ি ফিরে কোন কাজে মন লাগে না তার। ঘুরে ফিরে কেবলই শঙ্খদার কথা মনে পড়ে। তার আদর-  সোহাগের কথা মনে পড়তেই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে তার মুখ। অজান্তেই হাত চলে যায় গালে। গালে হাত দিতে যেন শঙ্খদার স্পর্শ পায় সে। শঙ্খদাকে কাছে পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে তার মন। সেটা তো মালার বিয়ে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই মালার বিয়ের জন্য উত্তেজনার আঁচে ফুটতে থাকে চৈতী। একদিকে শঙ্খদাকে কাছে পাওয়ার সম্ভাবনা অন্যদিকে বিয়ে উপলক্ষ্যে সাজগোজের পরিকল্পনায় বিভোর হয়ে উঠে তার মন। বিশেষ করে একমাত্র হবু ননদের বিয়ে বলে কথা।দারুন সাজবে সে , সেজে তাক লাগিয়ে দেবে শঙ্খদাকে। শঙ্খদার মুগ্ধ দৃষ্টিটা যেন স্পষ্ট দেখতে পায়। ভালোবাসার মানুষের ভালোলাগার জন্য সাজতে সব মেয়েরই ভালো লাগে। কিন্তু কি ভাবে সাজবে তা মনোস্থির করতে পারে না সে। কারও সঙ্গে আলোচনা করে নিতে পারলে একটু ভালো হত। কিন্তু কার সঙ্গেই বা আলোচনা করবে ? কলেজ বন্ধ , পাড়ায়ও সমবয়সী বন্ধু কেউ নেই। আলোচনা করার জন্য রয়েছে এক মাত্র মা। কিন্তু মা এখন রান্নাঘরে ব্যস্ত। বাবা বসে বসে কাগজ পড়ছিল। তাই বাবাকেই সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করে --- ও বাবা বলো না বিয়েতে আমি কি পড়ব ? কেমন ভাবে সাজব? 
মেয়ের কথা শুনে কাগজ থেকে  মুখ তুলে মুচকি হাসে আর্য। মনে মনে ভাবে মেয়েটি তার সেই ছোট্টটিই হয়ে রয়েছে। ছোটবেলায় পোশাক পড়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে মতানৈক্য হলে নিজের পচ্ছন্দের পোশাক পড়ার জন্য তাকে স্বাক্ষী মানত চৈতী। সেইসব কথা মনে আসতেই বুকের ভিতরটা যে হু-হু করে ওঠে। আর কয়েকদিন পরে সেই মেয়েটিই তাদের ঘর 
শুন্য করে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। চৈতীর মুখের দিকে চেয়ে দেখে সে তখনও তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। তাই দেখে মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন -- তুমি যাই'ই পড়বে আর যেমনই সাজগোজ করবে তাতেই তোমাকে মানাবে।
সেইসময় রান্নাঘর থেকে কাপড়ের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে আসে বৈশাখী। স্বামীর কথা শেষ হতেই সে বলে , তবে যাই পড়ো না কেন , তোমাকে মনে রাখতে হবে তুমি কিন্তু যেখানে যাচ্ছ  সেখানকার হবু বৌ। সেখানকার মানুষেরা তোমার আপনজন হয়ে উঠবে। তাই তাদের ভালো লাগা - মন্দ - লাগাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। 
স্ত্রীর কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে আর্য। আবহমানকাল থেকেই তো মায়েরা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে এ ধরণের উপদেশই দেন। পরম্পরাগত ভাবেই চলে আসছে ওই রীতি। চৈতীও মায়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থেকে।স্বামী এবং মেয়ের মুখের দিকে একটুক্ষণ চেয়ে বৈশাখী ফের বলতে শুরু করে , আমার মনে হয় সেদিন শঙ্খর বাবা যে পোশাকগুলো দিয়ে গিয়েছে সেগুলোই তোমার পড়া উচিত। কারণ বিয়ে উপলক্ষ্যেই পড়ার জন্যই তো ওগুলো দিয়ে গেছেন। তাই বিয়ের দিন সেগুলো পড়লে ওদের খুব ভালো লাগবে।
মায়ের কথা শুনে চৈতীর মনে পড়ে যায় কয়েকদিন আগে মালার বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে এসে কাকু তাদের সবার জন্য পোশাক দিয়ে গিয়েছেন। তার জন্য খুব সুন্দর একটা বেনারসি শাড়ী  দিয়ে গিয়েছেন। সেগুলো তার ঘরেই রাখা আছে। অথচ একদম মনে আসে নি। সত্যিই বিয়ের দিন ওই পোশাকটাই তার পড়া উচিত। তাকে মানাবেও ভালো। কাকু , মালা , পিসিমনিদের খুব ভালো লাগবে। আর শঙ্খদা ? সে নিশ্চয় তাকে চোখে হারাবে।  ভাগ্যিস মা কথাটা মনে পড়িয়ে দিল। সেই জন্য সে মাকে জড়িয়ে ধরে গালে দুটো চুমু খেয়ে নিয়ে বলে , সোনা মা আমার। একদম ঠিক কথা বলেছো।
স্বামীর দিকে চেয়ে বৈশাখী বলে , পাগলি মেয়ের কান্ড দেখ। এখনও সেই ছোট্টটিই রয়ে গেল।





                                            কথাটা বলেই বুকের ভিতর কেমন যেন আনচান করে উঠে তার। চোখের সামনে তিল তিল করে বেড়া ওঠা সেই ছোট্ট মেয়েটা যেদিন স্বামীর হাত ধরে শ্বশুরঘর করতে চলে যাবে সেদিন তারা সইবে কেমন করে তা ভেবে পায় না সে। দেখতে দেখতেই প্রতীক্ষা শেষ হয়। এসে পড়ে মালার বিয়ের দিন। ঠিক হয় একই গাড়িতে সোমনাথ , ডাক্তারবাবুরাও যাবেন। সেইমতো বিয়ের দিন সকাল সকাল মনোহরপুরের উদ্দেশ্য রওনা দেয় চৈতীরা।  যাওয়ার পথে প্রেস থেকে তুলে নেয় সেই সপ্তাহের 'দায়বদ্ধ ' পত্রিকা।  বিয়েবাড়িতে বিলির জন্য এ সপ্তাহে কিছু বেশিই কাগজ ছেপেছে আর্য। চেম্বারের কাছে গাড়িতে ওঠেন সোমনাথ আর ডাক্তারবাবু। গাড়িটা যখন শঙ্খদের বাড়ি পৌঁছোয় তখন সেখানে হাঁকডাক - চূড়ান্ত ব্যস্ততা। গ্রামের মুরব্বী থেকে ছেলে-ছোকরার দল কোমরে গামছা বেঁধে যেন কোন সর্বজনীন উৎসবে নেমে পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশেষ একটি পরিবার নয় , গোটা গ্রামের কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে। কেউচায়ের কাপ হাতে নিয়ে রান্নার তদারকি করছেন। কেউ বা ছাতনাতলা সাজাতে ব্যস্ত। বিষয়টি দেখে খুব ভালো ডাক্তারবাবুদের। তিনি বলেন , এত আন্তরিকতা আজকের দিনে দুর্লভ হয়ে উঠেছে। আর ভালো না বাসলে এমন ভালোবাসাও পাওয়া যায় না। প্রিয় সত্যিই মানুষকে ভালোবাসে বলেই সবাই এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। 
আর্য বলে , সত্যিই তাই। আমি যখনই এই গ্রামে এসেছি তখনই নানাভাবে সেই ভালোবাসার বর্হ্বিপ্রকাশ দেখেছি।তাছাড়া গ্রাম অনেক গ্রাম্যতা দোষে দুষ্টু হলেও আমাদের চিরন্তনী ভাবধারা আজও ধরে রেখেছেন গ্রামের মানুষ।
ডাক্তারবাবুদের দেখে প্রিয় এগিয়ে এসে বলে ,  আসুন আসুন। এই বুঝি আসার সময় হলো ? আপনারা আমার আপনজন , কোথায় একদিন আগে থেকে আসবেন , তা নয় এলেন একেবারে বিয়ের দিন।
ডাক্তারবাবু বলেন ,  অভিমান কোর না ভাই। তুমি তো জানোই আমার ব্যস্ততার কথা। তোমার হবু বেয়াইরা অবশ্য একদিন আগেই আসতে চেয়েছিল। একসঙ্গে যাব বলে আমিই ওদের আটকে দিই। বাদ দাও ওইসব কথা। ব্যবস্থাপত্র সব সম্পূর্ণ তো।
---- হ্যা তো একরকম সম্পূর্ণ বলতে পারেন। আমাকে অবশ্য তেমন মাথা ঘামাতে হয় নি। গ্রামের লোকেরাই মাথা হয়ে সব করেছেন।
---- সেই কথাই এতক্ষণ হচ্ছিল। ভালোবাসা না থাকলে এমন স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা মেলে না।  
মধুরিমার গলাতেও অভিমানের সুর শোনা যায়। বৈশাখী হাত ধরে সে বলে , আপনি কেমন শাশুড়ি ? জামাইয়ের একমাত্র বোনের বিয়ে বলে কথা। কোথাই মাস খানেক আগে থেকে এসে কোমর বেঁধে পড়ে থাকবেন তা নয় , এলেন একেবারে বিয়ের দিনে।
বৈশাখী হাত জোড় করে বলে, আর আমাদের লজ্জা দেবেন  না। চলুন দেখি, কি করতে হবে বলুন ?
---- দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আমাদের কিচ্ছুটি করার উপায় নেই ভাই। অতসীকাকী , সুরোপিসি, ভানুমতিজ্যেঠিরাই সব দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন। এখন আমাদের চাট্টি মুড়ি খেতে হলেও ওদের কাছেই হাত পাততে হবে।
মধুরিমার কথা বলার ধরণে সবাই হেসে ফেলে।মালা এসে চৈতীকে তার ঘরে নিয়ে যায়। চৈতীর উপরেই পড়ে মালাকে সাজানোর ভার। তাই নিয়ে দিনভর দুটিতে পরিকল্পনা আর খুনসুটি চলে। 
চৈতী বলে , তোমাকে এমন সাজাব না , দেখেই তোমার বরের চোখ টেরিয়ে যাবে।
----- কাজ নেই ভাই অমন সেজে। শেষে সবাই আমার বরকে ট্যারা বলবে।
শব্দ করে হেসে ওঠে মালা। চৈতীও সেই হাসিতে যোগ দেয়। হই-হুল্লোড় আর ব্যস্ততার মধ্যে দিনটা কেটে যায়। মাঝে মধ্যে শোনা  যায় গঙ্গাধর বাবাজীর উদাত্ত গলার বাউল গান। সন্ধ্যা নামতেই আলোর মালায় সেজে ওঠে বাড়ি। বেজে ওঠে ব্যাণ্ড। মালার গ্রামের কয়েকজন বান্ধবীকে নিয়ে কনে সাজাতে বসে চৈতী। সাজানো শেষ করে মালার হাতে আয়নাটা ধরিয়ে দিয়ে বলে , দেখ দেখি কি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে। শুভদৃষ্টিতে বর বাবাজীবন তো আর চোখ ফেরাতেই পারবে না।
--- ধ্যাত , সে বড়ো লজ্জার ব্যাপার হবে। দেরি হলে তখন তো তোমরাই পিছনে লাগবে।
---- কি করবে , আজ যে পিছনে লাগারই দিন ভাই।
---- কথাটা মনে রেখ কিন্তু। তোমার পিছনে লাগারও দিন আসছে। তখন কিন্তু ছেড়ে কথা কইব না ।
নিজের বিয়ের প্রসঙ্গে মুখে রক্ত জমে চৈতীর। লাজুক মুখে সে বলে , সে তখন দেখা যাবে। 
---- বেশ তাই দেখা যাবে। 
চৈতীকে বুকে জড়িয়ে ধরে মালা। চৈতী নিজেও সুন্দর করে সেজেছে। এখানকার দেওয়া শাড়িটা পড়েছে। খোঁপায় বেঁধেছে রজনীগন্ধার মালা। নাকছাবি থেকে আলো  বিচ্ছুরিত হয়ে মুখটা আরও কমনীয় দেখাচ্ছে। মুখটা তুলে ধরে 
মালা বলে , তোমাকেও কিন্তু আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। আর তোমার শ্রীমুখ দেখার জন্য একজন তো কখনও মোটরবাইকের চাবি , কখনও হিসাবের খাতা খোঁজার  ছুতোনাতায় কাজ ফেলে ছুটে ছুটে আসছে।
ইঙ্গিত বোঝে চৈতী। কথাটা মিথ্যাও নয়। মাঝেমধ্যেই শঙ্খদাকে তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিতে হচ্ছে তাকে। সেটা লক্ষ্য করেই মালা দাদাকে উদ্দেশ্য করে হাসতে হাসতে বলে --- এই যে ছেলে , এঘরে সব মেয়েরা রয়েছে। চাবি - হিসাবের খাতা পকেটে রেখে এখানে খুঁজতে আসছিস কেন রে ?  



                             

                          বোনের কথায় লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে শঙ্খর মুখ। সে পালিয়ে বাঁচে।অগত্যা চৈতীকেই আসরে নামতে হয়। সে বলে , ও কথা বোল না ভাই। বেচারা খেটে খেটে হয়রান হয়ে পড়েছে।
---- ওলে বাবালে। দাদার কথা বলেছি আর ওমনি গায়ে লেগে গেল না! বলি একমাত্র বোনের বিয়েতে দাদা খাটাখাটি করবে না তো কি তোমার বর এসে করবে ?
মালার কথায় সবাই হেসে ওঠে। 
চৈতী বলে , তা যদি বলো ভাই তাহলে বলতে গেলে আমার বরই তো করছে।
অমনি মালার বান্ধবীরা হাততালি দিয়ে বলে ওঠে -- ঠিক বলেছো।মালা কিছু একটা বলতে যায়। কিন্তু বলা হয় না। বাইরে থেকে ' বর এসেছে - বর এসেছে ' বলে শোরগোল শোনা যায়। মালার বান্ধবীরা সব বর দেখতে ছোটে। চৈতীও বলে , দাঁড়াও বর বেশে সে মূর্তিমানকে কেমন দেখাচ্ছে দেখে আসি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে মালার গলা জড়িয়ে ধরে বলে , তোমার বরটাকে একেবারে ফাটাফাটি দেখাচ্ছে গো।
---- ইঃ নিজের বরটা বুঝি ফেলনা ? 
ওই কথা শুনে চুপ করে যায় চৈতী। বর শব্দটাতে যত পুলক - তত লজ্জা। বাইরে তখন বর বরণের উলু আর শঙ্খ ধ্বনি শোনা যায়। উলুধ্বনি শুনেই মনটা বিষন্ন হয়ে যায় প্রিয়র। তার মনে পড়ে যায় বাবা-মায়ের কথা।  তারা থাকলে আজ কত খুশী হতেন।মনে পড়ে যায় স্বাতীর কথা। আজ তারই তো বরবরণ করার কথা ছিল।বিষন্ন মনেই সে নিজের শোয়ার ঘরে যায়। শোয়ার ঘরের দেওয়ালে পর পর টানানো রয়েছে বাবা-মা আর স্বাতীর ছবি। মালা প্রতিদিন ছবি তিনটিতে মালা গেঁথে পড়িয়ে দেয়। আজ সে রজনীগন্ধার মালা পড়িয়ে দিয়েছে। বাবা-মায়ের পায়ে হাত রেখে প্রিয় মনে মনে বলে -- আজ তোমাদের আদরের নাতনীর বিয়ে। আমি সম্প্রদান করতে যাব। তোমরা নাতনিকে আর্শিবাদ করে আমাকে সম্প্রদানের অনুমতি দাও। 
বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঝাঁপসা হয়ে ওঠে প্রিয়র চোখ। মনে হয় বাবা-মা যেন বলছেন , আমাদের আর্শিবাদ তো সবসময় তোদের সঙ্গে আছে। যা বাবা নির্ভাবনায় নাতনীকে সম্প্রদান কর। দেখবি ওরা খুব সুখী হবে। আর কোন অসুখ তোদের স্পর্শ করতে পারবে না।
বাবা-মায়ের পর ঝাঁপসা চোখে স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে প্রিয় বলে , ওগো শুনছ আজ তোমার মেয়ের বিয়ে। তোমার পচ্ছন্দ করা ছেলের সঙ্গেই বিয়ে হচ্ছে। তুমি খুশী তো ? 
ফের জলে ভরে ওঠে প্রিয়র চোখ। ততক্ষণে বরকে এনে বসানো হয়েছে বরাসনে। বিয়ের কাজ শুরু করার জন্য পুরোহিত মশাই তাড়া লাগান -- কই ,  সম্প্রদান কর্তা কই ?  এবার তো বিয়েতে বসতে হয়। নাহলে যে লগ্ন বয়ে যাবে।
পুরোহিত মশাইয়ের কথা শুনে সবার চোখ প্রিয়কে খোঁজে। কিন্তু কোথাই প্রিয় ? তাকে দেখা যায় না। মধুরিমা ব্যাপারটা আঁচ করতে পারে। সে দ্রুত দাদার ঘরে ছুটে যায়। 
প্রিয় তখনও বাবা- মা আর স্বাতীর চোখের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলে চলেছে। মধুরিমা তার কাঁধে হাত রাখতেই প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রিয়। মধুরিমাও নিজেকে সামলাতে পারে না। দাদাকে জড়িয়ে ধরে সে 'ও ভেঙে পড়ে কান্নায়। একসময় দাদার চোখ মুছিয়ে দিয়ে মধুরিমা বলে , আজ এই আনন্দের দিনে আর চোখের জল ফেল না। দেখ ওরাও কেমন হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছে। ছবি থেকে মুখ ফেরানো আগে প্রিয়রও মনে হয় ছবির ওপার থেকে সত্যিই ওরা হাসছেন। দাদার হাত ধরে বিয়ের আসরে পৌঁছে দেয় মধুরিমা। 





                                             নির্ধারিত লগ্নেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।একসময় সোমনাথ নিমন্ত্রিতদের হাতে ' দায়বদ্ধ ' পত্রিকা তুলে দেয়। পত্রিকা হাতেেপেয়ে অনেকেই বলেন , বাহ্ সময় কাটানোর জন্য এইরকম কিছু একটা দরকার ছিল। তারপর তারা পত্রিকায় চোখ বোলাতে শুরু করেন। খবর পরিবেশনের মুন্সীয়ানার প্রশংসাও করেন অনেকে। বিশেষ করে যারা শঙ্খর  পরিচিত তারা তো গুনুটিয়া কুঠির খবর পড়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। সামনাসামনি নিজের প্রশংসা শুনে অস্বস্তিতে পড়ে শঙ্খ। চৈতীর বুক গর্বে ভরে ওঠে। হবু বরের দিকে সে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চায়। হবু বৌকে দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে শঙ্খ। অন্য কারও চোখে পড়ার আশংকায় চোখাচোখি হতেই অবশ্য মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা। সেই সময় খাওয়ার ডাক পড়তেই পরিবেশনের জন্য প্যান্ডেলের দিকে ছুটে যেতে হয় শঙ্খকে। নির্বিঘ্নে খাওয়া-দাওয়াও চুকে যায়।  খাওয়ার সুখ্যাতি করতে করতে বরযাত্রীরা বিদায় নেয়। চৈতীরা নববধু আর বরকে নিয়ে বাসর বসায়। সেখানে মালার অনুরোধে চৈতীকে নাচতে হয়। সৌমিকের কথায় কবিতা পড়ে শঙ্খ। মালার বন্ধুরাও গান , চুটকি পরিবেশন করে। জমজমাট হয়ে ওঠে বাসর রাত। 
প্রিয় আর আর্য সবাইকে নিয়ে শঙ্খ - চৈতীর বিয়ের দিন ঠিক করার জন্য আলোচনায় বসে। 
প্রশান্তকাকা বলেন , এই বিয়ের রেশ থাকতে থাকতে ওদের বিয়েটা দিতে পারলে অনেক সুবিধা হবে।
প্রিয় জিজ্ঞেস করে --- কিসের সুবিধা ? 
---- যদি অন্য কোথাও ভাড়া না থাকে তাহলে প্যান্ডেল , রান্নার জিনিসপত্র ,  বাজনা সব অনেক কিছু আর আলাদা করে আনা নেওয়া করতে হবে না।
কথাটা শুনে প্রিয় বলে, শুধু আমার সুবিধা দেখলেই তো আর হবে না। উনি এই অল্প সময়ের মধ্যে সব দিক সামলে উঠতে পারবেন কি না সেটা দেখতে হবে তো।
----- সেটা অবশ্য ঠিক। 
কথাটা শুনে আর্য সোমনাথেকে জিজ্ঞেস করে , কি গো পারবে ? 
---- দাদা কোন চিন্তা করতে হবে না। আমরা তো আছিই , আপনাকে কত মানুষ ভালোবাসে , আপনি একবার ডাকলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আপনি দিন ঠিক করে ফেলুন।
ওসি, হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা বলেন , আমরা তো বরের ঘরের মাসি - কনের ঘরের পিসি , প্রয়োজনে আমরাও চলে যেতে পারি।
সবার ভরসা পেয়ে আর্য বলে , তাহলে কোন অসুবিধা হবে না। দিনটা বরং আজই ঠিক করে ফেলা যাক।
প্রিয় বলে , মালাদের দ্বিরাগমনের পরেই একটা ভালো দিন রয়েছে। ওই দিনটা হলে কোন অসুবিধা হবে?   
--- কিচ্ছু অসুবিধা হবে না।
দু'পক্ষের মত অনুযায়ী মালাদের দ্বিরাগমনের পর দিনই শঙ্খ - চৈতীর বিয়ে চূড়ান্ত হয়ে যায়। ওসি আর হাসপাতালের ডাক্তারবাবুর ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ান। আর্য তাদের হাত ধরে বলে , বুঝতেই তো পারছেন সব। আর আসার সময় পাব কিনা জানি না। তাই আজই বলে দিয়ে যাচ্ছি - আপনাদের আসা কিন্তু  চাই-ই চাই।
ওসিরা বলেন ,  আপনার একমাত্র মেয়ের বিয়ে আর আমরা যাব না তাই কখনও হয় ? আপনি না বললেও হাজির হতাম।
ডাক্তারবাবুরা বিদায় নেওয়ার পরও ঘুম আসে না প্রিয়দের।ঢালাও বিছানায় আধ শোওয়া হয়ে শঙ্খ - চৈতীর বিয়ের প্রস্তুতির আলোচনাতেই রাত ভোর হয়ে যায়।




           ( ক্রমশ ) 




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  






                                      ----০---









No comments:

Post a Comment