Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৯৩




        

          
         
         


             অন্তরালে 



                        অর্ঘ্য ঘোষ


     ( ধারাবাহিক উপন্যাস ) 




দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ভ্রু কুঁচকে ওঠে বৈশাখীর। সচরাচর দরজার কড়া কেউ নাড়ে না , কলিং বেলই বাজায়। একমাত্র চৈতীই ছোটবেলার অভ্যাস বশে কড়া  নাড়ে। আর তার দেখাদেখি কড়া নাড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে শঙ্খ। তবে কি শঙ্খই এল ? তার তো শুক্রবারে আসার কথা। আজ তো বুধবার। তাহলে আজ হঠাৎ বিপদ - আপদ হলো না তো কিছু ? একের পর এক বিপদ তো শঙ্খদের পরিবারের পিছু ছাড়ছে না। তাই অজানা আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে তার মন। সে মনে মনে বলে, তুমি দেখো ঠাকুর, ওদের আর যেন কোন বিপদ আপদ না হয়।
কড়া নাড়ার শব্দ শুনে চৈতীর বুকটাও দুলে ওঠে। কড়া নাড়ার ধরণে তারও শঙ্খদার কথাই মনে আসে। তারও মনে ঘনিয়ে আসে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। তাই সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলতে ছুটে যায়। দরজা খুলতেই দেখে দরজার বাইরে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে শঙ্খদা। শঙ্খদার মুখে হাসি দেখে দুশ্চিন্তা ঘোচে চৈতীর। খুশীতে ভরে যায় তার মন। ইচ্ছা হয় ছুটে গিয়ে শঙ্খদাকে আদরে সোহাগে ভরিয়ে দেয়। কিন্তু মা অদুরেই দাঁড়িয়ে আছে দেখে সেই ইচ্ছা তাকে ত্যাগ করতে হয়। মেয়ের মনের ভাবটা উপলব্ধি  করতে অসুবিধা হয় না বৈশাখীর। যে মেয়ের মুখ একটু আগেই কালো হয়েছিল সেই মেয়ের মুখই এখন যেন আলোয় ভরে উঠেছে। তার নিজেরও খুব ভালো লাগে। শঙ্খকে সে বলে , এসো 
বাবা ভিতরে এসো। বাড়ির সবার খবর ভালো তো ?
--- হ্যা সবাই ভালো আছে। লেখাটা রেডি হয়ে গেল তাই ভাবলাম জ্যেঠুকে পৌঁছে দিয়ে আসি। এরপর মালার বিয়ে নিয়ে ব্যস্ততার কারণে সময় পাবো কিনা ঠিক নেই তাই আজই চলে এলাম , বৈশাখীকে প্রণাম করতে করতে বলে শঙ্খ।
--- থাক বাবা থাক। খুব ভালো করেছো। ভিতরে গিয়ে বসো তোমরা। বলে রান্নাঘরে যায় বৈশাখী। মনে মনে ভাবে আজ একটু ভালো কিছু রান্না করতে হবে। এতদিন শঙ্খ ছিল শুধুই ঘরের ছেলে। এখন সে হবু জামাই। তাই জামাই আদরের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। শঙ্খকে চৈতী তার ঘরে নিয়ে যায়। প্রথম দিনের মতোই মুখোমুখি বসে তারা। 
সেদিনের মতো আজও চৈতী বলে --- এই যে ছেলে ---।
অমনি শঙ্খ বলে ওঠে --- তবে রে , আবার এই যে ছেলে ? আজ বাদ কাল আমার বৌ হতে চলেছে, আর আমাকেই বলে কিনা -- এই যে ছেলে!
---অ্যাই শোন , তোমাকে আমি এই যে ছেলেই বলব। এমন কি শুভদৃষ্টির সময়ও লোকজনের সামনে বলে দিতে পারি। তারপর সোহাগের সুরে গলা নামিয়ে বলে , তোমার শুনতে খারাপ লাগে ?
---- না গো , তোমার গলায় কথাটা খুব মিষ্টি শোনায়। ওই কথাটা শুনলেই আমার  রোমান্স জাগে। শুধুমাত্র আমাকে বলবে বলেই তুমি ওই কথাগুলি সাজিয়ে রেখেছো ভেবে আরো ভালো লাগে।
--- ওঃ তাই ? 
---- হ্যা গো।
---- তা একটা কথা বলো দেখি , তোমার তো আসার কথা ছিল শুক্রবারে। কিন্তু আমরা আসতে না আসতেই আজ হঠাৎ ধুমকেতুর মতো উদয় হলে কেন ? 
---- কেন , কি হয়েছে ? 
---- মা কি ভাববে বলো তো ? 
---- কেন কি ভাববে ? 
---- ভাববে ,  কি ছেলেরে বাবা, হবু বৌকে একটা দিনও না দেখে থাকতে পারছে না।
---- ভাবুক গে , ঠিকই তো আমি তোমায় না দেখে থাকতে পারছিলাম না।
---- এ মা, আমার লজ্জা করে না বুঝি ? 
--- তোমার লজ্জা রাঙা মুখটাও যে আমার খুব ভালো লাগে। এই , আমি এভাবে আসাতে তুমি খুশী হও নি ?
এবারে লজ্জা লজ্জা মুখ করে শঙ্খর দিকে তাকিয়ে থাকে চৈতী। তারপর কটাক্ষ হেনে বলে , জানি না যাও। শঙ্খর চৈতীর হাত দুটো ধরে বলে -- বলবে না তো ? 
এবারে গলার স্বর নামিয়ে চৈতী বলে , সত্যি গো আমারও বাড়িতে মন টিকছিল না। কেবলি তোমার কথা মনে হচ্ছিল ?
--- কি মনে হচ্ছিল সোনা ? 
---- বলব কেন , আমার বুঝি লজ্জা করে না ? তারপর দরজার দিকে চেয়ে আচমকা শঙ্খর মাথাটা বুকে টেনে নেয়। মুখটা তুলে ধরে চুমুয় চুমুয় ভরিয়ে দেয়। কানের কাছে মুখ 
নামিয়ে বলে ,  মনে হচ্ছিল কবে এই মুখটা দেখতে পাবো ?
----- সত্যি ? 
---- সত্যি-- সত্যি তিন সত্যি। জানো যে বাড়িতে বড় হয়েছি সেই বাড়িটাকেই কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। মনে হচ্ছিল কবে শুক্রবার আসবে। তারপর যখন দরজা খুলে তোমাকে দেখলাম তখন মনটা খুশীতে ভরে গেল। 
সেই কথা শুনে শঙ্খও দরজার দিকে চেয়ে চৈতীর ঠোঁটে তার ঠোঁট নামিয়ে আনে। ওই ভাবেই যুথবদ্ধ পাখির মতো কেটে যায় বেশ কয়েক মুহুর্ত। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠতেই ছিটকে সরে যায় তারা। চৈতী উঠে দাঁড়িয়ে বলে , বোধহয় বাবা এল। দাঁড়াও দরজাটা খুলে দিয়ে আসি।




                           চৈতীর ধারণাই ঠিক। প্রেস থেকে কাগজের প্রুফ নিয়ে ফেরে আর্য। শঙ্খ তাকে প্রণাম করে লেখাটা দেয়। সেটা হাতে নিয়ে আর্য বলে , বাহঃ এর মধ্যেই হয়ে গেল ? 
তারপর লেখাটাতে চোখ বোলাতে শুরু করে সে। তার মুখের দিকে চৈতী আর শঙ্খ উদ্বেগ ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। লেখাটা পড়তে পড়তেই আর্যর চোখে মুখে মুগ্ধতার ছাপ ফুটে ওঠে। পড়া শেষ করে সে বলে, প্রথম লেখাতেই তো তুমি কিস্তি মাত করে দিয়েছো। কোন দিকে কোন ফাঁকফোঁকর রাখ নি।  অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিকও এমনটা পারে না। আমি নিশ্চিত এভাবে এগোলে  একদিন তুমি বড়ো কাগজে বড়ো জায়গা পাবে। 
জ্যেঠুর কথা শুনে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে শঙ্খর।  কবিতা-গল্প লিখলেও সংবাদ তো এর আগে লেখে নি। তাই মনে একটা সংশয় ছিল। সেটা দূর হয়ে যাওয়ায় মনে আত্মবিশ্বাস জন্মায়।  আরও একবার আর্যকে প্রণাম করে বলে ,আর্শিবাদ করুন আমি যেন আপনার মুখ উজ্বল করতে পারি।
---- শুধু আমার মুখ নয় , তোমাকে সমাজের মুখ উজ্বল করতে হবে। অবক্ষয়ের অন্ধকার সমাজটাকে গ্রাস করে নিয়েছে। তোমাকে সেই অন্ধকার দূর করার ব্রত নিতে হবে। 
----- আমি পারব তো জ্যেঠু ? 
----- তোমাকে পারতেই হবে। আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে দেব। কারও একার পক্ষে সব অন্ধকার দুর করা সম্ভব নয় ঠিকই , তাই বলে হতাশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্ধকার দুর করার জন্য লড়ে যেতে হবে। তাহলে একদিন ঠিক সব অন্ধকার ঘুচে যাবে।
বাবার মুখে শঙ্খদার প্রশংসা শুনে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে চৈতীর। ইচ্ছা করে আরও একবার শঙ্খদার ঠোঁটে -----।
সেই সময় রান্নাঘর থেকে বৈশাখী হাঁক পাড়ে , কই রে তোদের হলো ? রান্না হয়ে গিয়েছে , স্নানটান  করে সব খেতে আয়। শঙ্খকে ফিরতে হলে আর দেরি করা ঠিক হবে না। শঙ্খদার ফেরার কথা শুনেই ফের মনটা খারাপ হয়ে যায় চৈতীর। শঙ্খদাকে আজকের রাতটা থাকার জন্য বলেছিল মা। কিন্তু মালার বিয়ের কাজের জন্য থাকা সম্ভব হবে না বলেছে শঙ্খদা।  তাই মা আর জোর করতে পারে নি। চৈতী নিজেও কিছু বলতে পারে নি। একবেলার জন্য হলে তবু তো দেখা হল, মনকে সেই বলে সান্ত্বনা দেয় চৈতী।



                    
                                                কিন্তু শঙ্খদার বাড়ি ফেরার সময় ফের তার মন বিষন্ন হয়ে ওঠে। সেটা বৈশাখীরও নজরে পড়ে। তাই সে বলে , এসময় তো এদিকে  রিক্সা পাওয়া যাবে না। বাসস্টপ পর্যন্ত ছেলেটাকে হেঁটে যেতে হবে।  যা না মা , সাইকেলটা নিয়ে শঙ্খকে বাস ধরিয়ে দিয়ে আয়।
মায়ের কথা শুনে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে চৈতীর।আরও কিছুক্ষণ শঙ্খদার সঙ্গ লাভের সুযোগ করে দেওয়ায় মাকে খুব ভাল লাগে তার। বেরনোর আগে হালকা প্রসাধনী সেরে নেওয়ার জন্য ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সে শুনতে পায় শঙ্খদা মাকে বলছে , ওকে আর কষ্ট করে যেতে হবে না। এইটুকু রাস্তা আমি দিব্যি হেঁটে চলে যেতে পারব।
কথাটা শুনে খুব রাগ ধরে যায় চৈতীর। শঙ্খদা যেন কি ?   দু'জনে একসঙ্গে যেতে পারবে ভেবে কোথায় তার যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাবে তা নয় , বলছ কিনা ওকে কষ্ট করে যেতে হবে না। ক্যাবলাকান্ত আর কাকে বলে ! পাছে যাওয়াটা  ভেস্তে যায় সেই আশঙ্কায় সে দ্রুত বলে ওঠে , না-না আমার কোন কষ্ট হবে না। কতবার তো বাবাকে বাস ধরিয়ে দিয়ে এসেছি।
কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সাইকেল বের করে ফেলে সে। মেয়ের আগ্রহের আতিশয্য দেখে মনে মনে হাসে বৈশাখী। দরজার বাইরে বেরিয়ে সাইকেলটা শঙ্খর দিকে এগিয়ে দিয়ে চৈতী বলে , এই যে ছেলে , নাও সাইকেলটা ধর। আমি সামনে বসছি।
---- বারে , আমি কেন ধরব ? তুমিই তো আমাকে পৌঁছে দেব বলে এসেছো।
---- হ্যা, তা এসেছি। কিন্তু আমিই যে সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাব তা তো বলি নি। তাছাড়া তোমাকে যদি আমি চাপিয়ে নিয়ে যায় তাহলে লোকে কি ভাববে ? লোকেরা আমার বরকে অক্ষম ভাববে, তা তো আমি সহ্য করতে পারব না।
---- অঃ তাই বুঝি ? বলে চৈতীকে সামনে বসিয়ে সাইকেলে ওঠে শঙ্খ। সাইকেলে যেতে 
যেতে চৈতী বলে -- আচ্ছা তুমি এত ক্যাবলাকান্ত কেন বলতো ? 
---- কেন , ক্যাবলাকান্তের মতো কি করলাম আবার ? 
---- মা যখন আমাকে পৌঁছে দিতে বলল তখন তুমি না বলতে গেলে কেন ? 
---- তোমার কষ্ট হবে ভেবেই বলেছিলাম।
---- তোমার সঙ্গ পাওয়া জন্য কোন কষ্টই আমার কাছে কষ্ট নয়, বুঝলে বুদ্ধুরাম ?  
শঙ্খর  নাকটা মুচড়ে দেয় চৈতী। শঙ্খ তার চুলে নাক ডুবিয়ে দেয়। বাসস্টপে পৌছোতে না পৌঁছোতেই বাস চলে আসে। সাইকেলটা চৈতীর হাতে দিয়ে বাসে উঠতে উঠতে শঙ্খ বলে - আসছি। তোমাদের প্রতীক্ষাতে থাকব।
---- এসো। সাবধানে যাবে। আমিও দিন গুনব।
বাসটা স্টপ ছেড়ে বেড়িয়ে যেতেই বিষন্ন মনে বাড়ি ফেরার পথ ধরে চৈতী।




                        ( ক্রমশ ) 




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  






                                      ----০---








No comments:

Post a Comment