অন্তরালে
অর্ঘ্য ঘোষ
( ধারাবাহিক উপন্যাস )
আর্শিবাদ পর্ব চুকতেই চৈতীরা ফেরার জন্য তৈরি হয়। তাদের পায়ে পায়ে কিছুটা এগিয়ে দিতে যায় মালারা। অন্যদের এগিয়ে দিয়ে মালা আর চৈতী দুই সখীর মতো হাত ধরাধরি করে সবার পিছনে পিছনে হাঁটে। আর্শিবাদ হয়ে যাওয়ার পর তো দু'জনের একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়নি। তাই বিদায় মুহুর্তে মনের মধ্যে জমে ওঠা কথাটুকু বলে নেওয়ার জন্যই তারা ধীর পায়ে হাঁটে। অন্যদের কান বাঁচিয়ে মালা চুপিচুপি বলে -- খুব - খুব ভালো লাগছে জানো।
তোমাকে যখন দেখলাম তখনই মনে হয়েছিল দাদা আর তুমি পরস্পরকে খুব ভালোবাসো। সেটা সত্যি হওয়াতে খুব স্বস্তি পেলাম।
---- খুব বুঝি অস্বস্তিতে ছিলে ?
---- সত্যি কথা বলব কি ভাই , আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর থেকেই মনে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম। কেবলি মনে হত আমি শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে বাবা-দাদার কি হবে ? এবার তুমি এসে তোমার সংসার বুঝে নেবে ভেবেই নিশ্চিন্ত হলাম।
---- খুব না ? সংসারটা বুঝি আমার একার ? তুমি বুঝি এ সংসারের কেউ নও ?
--- বিয়ের পর যে ভাই মেয়েদের সংসার পাল্টে যায়। সেটাই যে চিরাচরিত নিয়ম।
--- আমি ও সব জানি না। তোমাকেও এই সংসারে চাই ব্যাস।
সেইসময় আর্য মেয়েকে ডাকে -- কই রে আয় , এবার যেতে হবে।
---- হ্যা যায় , বলে হাঁটার গতি বাড়ায় চৈতী। তার চোখ দুটো শঙ্খদাকে খোঁজে। শঙ্খও তখন অদুরে দাঁড়িয়ে তার দিকেই চেয়ে থাকে। চোখাচোখি হতেই দুজনেই চোখ নামিয়ে নেয়। মোটরবাইকে ওঠার আগে শঙ্খকে কাছে ডেকে আর্য জিজ্ঞেস করে --- তুমি গুনুটিয়া কুঠির খবরটা রেডি করে যদি পারো এর মধ্যে একদিন দিয়ে আসতে পারবে ? তাহলে আগামী সপ্তাহেই প্রকাশ করা যাবে।
--- চেষ্টা করব।
--- উহু , চেষ্টা নয়, পারতেই হবে। সাংবাদিকের অভিধানে দেখব , দেখছি, চেষ্টা করব বলে কোন শব্দ থাকতে নেই।
--- ঠিক আছে , যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রেডি করে পৌঁচ্ছে দিয়ে আসব।
--- গুড।
কথাটা শুনে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে চৈতীর। প্রথমে শঙ্খদার কথা শুনে খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল তার। সেই তো মালার বিয়ে ছাড়া আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। লেখাটা পৌঁছে দিতে যাওয়া উপলক্ষ্যে দেখা হবে , সেই আনন্দে কোথায় আটখানা হয়ে উঠবে তা নয় , বলছে কিনা দেখি। ছেলেরা কি একটু ক্যাবলাকান্তই হয় ? ভাগ্যিস বাবা চাপ দিয়ে বললেন তাই।যাক শেষ রক্ষা হয়েছে শেষ পর্যন্ত। তার মানে শঙ্খদার সঙ্গে একদিন কাটাতে পারবে ভেবে আসন্ন বিরহ যন্ত্রণা যেন অনেকখানি প্রশমিত হয়ে আসে।
সে হাত নেড়ে সবার কাছে বিদায় নিয়ে মোটরবাইকে উঠে। আর্যও হাত নেড়ে মোটরবাইকে স্টার্ট দেয়। গ্রাম ছাড়িয়ে বাইক এগিয়ে চলে। পিছন ফিরে চৈতী হাত নাড়তেই থাকে। মালা আর শঙ্খও হাত নাড়ে। একসময় গ্রামের রাস্তা ছাড়িয়ে পাকা সড়কের বাঁকে মিলিয়ে যায় চৈতীরা। আর শঙ্খর বুকের ভিতরটা যেন শুন্য হয়ে যায়। এই অনুভূতি আগে হয় নি তার। আসলে বোলপুর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তো এতদিন চৈতীকে ছেড়ে থাকতে হয় নি। ছুটিতে বাড়ি এলেও টিউশানি পড়তে যেতে হয়েছে। আজ সে অনুভব করছে চৈতীকে না দেখে বেশিদিন থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সে ঠিক করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লেখাটা রেডি করে নিয়ে চৈতীদের বাড়ি পৌঁছোবে।
ওইসব কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিল চৈতীরা কিছুক্ষণ আগেই দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছে। তবু সে অবচেতন মনে চৈতীদের গমন পথের দিকেই চেয়েছিল। সেটা লক্ষ্য করে মালা তার চোখের সামনে হাত নাড়তে নাড়তে বলে , কি রে দাদা তুই কি দিব্য দৃষ্টি পেয়েছিস নাকি ?
ইংগিতটা বুঝতে পেরে লজ্জা এড়াতে শঙ্খ বলে , যাঃ , কি উল্টোপাল্টা বলছিস ?
--- আমি মোটেই উল্টোপাল্টা বলছি না। চৈতীরা চলে গিয়েছে অনেকক্ষণ , অথচ তুই সেদিকেই চেয়েছিলি এতক্ষণ।দিব্য দৃষ্টি না থাকলে তো ওদের দেখা সম্ভব নয়।
ধরা পড়ে গিয়ে শঙ্খ বলে , তোকে অত ব্যাখা দিতে হবে না। বাড়ি চল তো।
---- আমি তো বাড়ি যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েই আছি। তোর জন্য যেতে পারছি না। আর সবাই এতক্ষণ বাড়ি পৌঁচ্ছে গেল।
ঘাড় ঘুরিয়ে শঙ্খ দেখে মালার কথাই ঠিক। পিসিমনিরা সব বাড়ির চৌকাঠ ডিঙোচ্ছে।সে মালার হাত ধরে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। শঙ্খর সঙ্গে চৈতীর বিয়েটা ফাইন্যাল হয়ে যাওয়ায় প্রিয়র মনটাএতক্ষণ খুশীতে ভরপুর ছিল। কিন্তু বাড়ির ভিতরে পা রাখতেই মনটা বিষন্ন হয়ে যায়। চোখ চলে যায় স্বাতীর দিকে। ফুলের মালা গলায় হাসি হাসি মুখে দেওয়ালে ছবি হয়ে ঝুলছে স্বাতী। সেদিকে চেয়ে মধুরিমাকে উদ্দেশ্যে বলে --- স্বাতী আজ থাকলে খুব খুশী হত জানিস।
---- নেই কে বললে ? ও আজও আমাদের সবখানে জড়িয়ে আছে।
---- ছেলেমেয়ের বিয়ে নিয়ে কত চিন্তা ভাবনা ছিল ওর। ও'ই আমাকে বলে বলে মালার সমন্ধ করার জন্য সৌমিকদের বাড়ি পাঠিয়েছিল। সেই মালার বিয়ে হতে চলেছে , শঙ্খর বিয়েও ফাইন্যাল হয়ে গেল অথচ স্বাতীই কিছু দেখে গেল না।
---- উপর থেকে ও সব দেখছে। তুমি আর মন খারাপ কোর না। ছেলেমেয়ে দুটোর কথা ভাব। বহু কষ্টে ওরা বুক বেঁধে আছে। তোমাকে মন খারাপ করতে দেখলে ওরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।
সেই সময় শঙ্খ - মালা বাড়ি ঢোকে। ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখে নিজেকে সামলে নেয় প্রিয়। বাড়ি ঢুকেই লেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শঙ্খ। পরদিনই লেখা সম্পূর্ণ হয়ে যায় তার। লেখা শেষ হতেই , কেমন হলো জানার জন্য মালাকে পড়ে শোনায় সে। মনোযোগ দিয়ে সেই লেখা শুনে মালা বলে , খুব সুন্দর হয়েছে রে দাদা। সব যেন চোখের সামনে ভাসছে।
--- তুই সত্যি বলছিস ?
---- হ্যা রে সত্যিই খুব সুন্দর হয়েছে।
পাশের ঘর থেকে ছেলেরমেয়ের কথোপকথন কানে যায় প্রিয়র। মনে পড়ে যায় সেও একদিন যাত্রার একটা দৃশ্য লিখে ওইভাবে মাকে শুনিয়েছিল। আজ তার মা নেই , ওদেরও মা নেই। কথাটা ভাবতেই বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে তার। ছেলেমেয়েদের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে নেয় সে।
সেই সময় মালা জিজ্ঞেস করে --- তা লেখাটা কবে দিতে যাবি কিছু ঠিক করেছিস ?
---- দেখি কবে যাওয়া যায়।
প্রথমে ঠিক ছিল শুক্রবারে লেখা নিয়ে চৈতীদের বাড়ি যাবে। রবিবারে কাগজ বেরোয়। শুক্রবারে পৌঁছে দিলে অনায়াসেই ছাপা হয়ে যাবে। কিন্তু লেখাটা সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তার যেন আর তর সইছে না। চৈতীর চোখ দুটো যেন সম্মোহনের মতো তাকে টানছে। তাই পরদিন সকালেই বোলপুর যাবে বলে ঠিক করে সে। সেই কথা শুনে টিপ্পনী কেটে মালা বলে , সে কিরে তখন যে বললি শুক্রবারে যাবি --- ?
---- হ্যা , কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম অত দেরী করলে স্থানাভাবে এ সপ্তাহের কাগজে লেখাটা নাও ছাপা হতে পারে। তাই মত বদলালাম।
---- কেন দাদা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছিস ? তার চেয়ে বল না বাবা , চৈতীকে না দেখে আর থাকতে পারছিস না।
---- তুমিই বা নিজের ধাত ধরে অন্যের চিকিৎসা করতে আসছ কেন ? সেদিন কুঠিতে কেমন হোঁচট লেগেছিল তা আমাদেরও জানতে বাকি নেই।
---- দাদা ভালো হবে না বলছি কিন্তু।
----- বেশ ঠিক আছে আর যুদ্ধ নয় , এবার সন্ধি।
শঙ্খ নিজের দুই হাতের তালু মালার সামনে মেলে ধরে। মালাও শঙ্খর হাতের তালুতে নিজের তালু মিশিয়ে দিয়ে বলে --- সন্ধি -- সন্ধি -- সন্ধি।
ওই ভাবে হাতে হাত মেলাতে গিয়ে দু'জনেরই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। মা তাদের ওইভাবে সন্ধি করতে শিখিয়েছিলেন। পিঠোপিঠি বলে তাদের দুই ভাইবোনে চুলোচুলি লেগেই থাকত। তখন মা তাদের ওইভাবে হাতে হাত মিলিয়ে সন্ধি করিয়ে দিতেন। মায়ের কথা মনে পড়তেই দুই ভাইবোনের চোখের কোন চিকচিক করে ওঠে। কিন্তু অন্যজন কষ্ট পাবে ভেবে নিজেকে সামলে নেয় তারা।
সেইজন্যই মালা বলে , হ্যাঁ রে কাল যে যাবি সেই কথাটা চৈতীদের ফোন করে জানিয়ে দিলে ভালো হত না ? চৈতীরও কত আনন্দ হত।
---- না , আগে থেকে কিছু জানাব না। হঠাৎ গিয়ে চমকে দেব ভাবছি।
---- ওঃ বাবা , তাহলে তো ঠিক ধরেছি। কাগজে খবর পৌঁছে দেওয়া উপলক্ষ্য মাত্র। আসলে একজনকে চমকে দিতেই এত তাড়াহুড়ো।
---- মালা আবার ?
---- বেশ বাবা সন্ধির পর আর কিছু বলব না। সেই সময়ও নেই। পিসিমনিরাও ফিরে যাবে। যাই দেখি ওদিকটা সামলায়।
রান্নাঘরের দিকে চলে যায় মালা। আর চৈতীর কথা ভাবতে থাকে শঙ্খ। কাল হঠাৎ তাকে দেখে চৈতীর খুশীতে ভরা মুখটা যেন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বাড়ি ফিরে চৈতীরও মন টেকে না। ঘুরে ফিরে তার মন চলে যায় মনোহরপুর গ্রামে। কেবলই মনে পড়ে কুঠিবাড়ির সেই নির্জনতায় শঙ্খদার ঘনিষ্টতা , যাত্রা মঞ্চে নাচ। শঙ্খদাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করে তার। কিন্তু সেই শুক্রবারের আগে তো শঙ্খদার সঙ্গে দেখা হবে না। আজ তো সবে বুধবার। ইস্ বুধবারটা যদি কোন যাদু বলে শুক্রবার হয়ে যেত ! মেয়ের মন উড়ু উড়ু ভাবটা চোখ এড়ায় নি বৈশাখীর।মনোহরপুর থেকে আসার পর মেয়েটা সব সময় উদাস হয়ে থাকে। ভালো করে খায় না পর্যন্ত। তার স্বভাব সুলভ সব কিছু নিয়ে মজা করার অভ্যাসটা পর্যন্ত উধাও হয়ে গিয়েছে। শঙ্খর বিরহই যে চৈতীকে এমন উদাসী করেছে তা বুঝতে পারে সে। তাই মেয়ের মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে , অযত্নে চুলটা কি করে রেখেছিস বল দেখি। চুল তো নয় যেন পাখির বাসা। চোখের কোনে কালি। যা দেখি মা চুলটা আঁচড়ে একটু সাজুগুজু করে নে।
---- এখন ভালো লাগছে না।
---- তুই আমাদের চোখের সামনে এভাবে ঘুরে বেড়ালে আমাদের বুঝি খুব ভালো লাগবে ? তাছাড়া সামনেই মালার বিয়ে। সেখানে যখন যাবি তখন তোকে দেখে সবাই যদি নিন্দা করে তখন বুঝি আমরা সইতে পারব ? না , শঙ্খদের ভালো লাগবে ? আয় দেখি চুলটা আঁচড়ে দিই। চৈতীও আর আপত্তি করে না। অনেকদিন পর মেয়ের চুল বাঁধতে বসে বৈশাখী। তার মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় এমনি করেই চৈতীর চুল বেঁধে দিয়েছে। সুগন্ধি তেল দিয়ে টেনে টেনে চৈতীর চুল বেঁধে দিত।
আর চুলে টান পড়লেই চৈতী উঃআঃ বলে চিৎকার করত। কখনও উঠে পালিয়ে যেত। তখন ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এসে আবার বসাতে হত। সেই মেয়েটাই চোখের সামনে দেখেতে দেখতে আজ কত বড়ো হয়ে গেল। আর কয়েকদিন পরেই তাদের ঘর শুন্য করে শ্বশুরঘর করতে চলে যাবে। কথাটা মনে হতেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে বৈশাখীর। সেটা গোপন করতে মেয়ের মুখটা তুলে বলে , দেখ দেখি কি সুন্দর দেখাচ্ছে আমার মেয়েটাকে।
মেয়ের চিবুকে হাত ছুঁইয়ে চুমু খায় বৈশাখী। সেইসময় দরজার কড়াটা নড়ে ওঠে।
( ক্রমশ )
----০---




No comments:
Post a Comment