Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

অন্তরালে -- ৯১






      

       অন্তরালে




             অর্ঘ্য ঘোষ



   ( ধারাবাহিক উপন্যাস )






হাততালি দিতে দিতে সে দেখতে পায় মালা আর মৌরি কৌতুকভরা দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। তাই দেখে লজ্জায় হাততালি থামিয়ে তাদের মুখের দিকে চাইতেই তারা ফিক করে হেসে ওঠে। হেসে ফেলে চৈতীও। শঙ্খর কবিতা পড়া শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই শুরু হয়ে যায় যাত্রা। এবারের যাত্রাপালার নাম ' এই তো সমাজ। ' সবাই মন প্রাণ ঢেলেঅভিনয়ে করে। এক দুঃস্থ বাবার চরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় প্রিয়। প্রশংসিত হন গঙ্গাধর বাবাজীও। কয়েকজন যাত্রামোদী অভিনয় চলাকালীন স্টেজে উঠে তাদের দুজনের  পোশাকে টাকা গেঁথে দিয়ে পুরস্কৃত করে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাই অভিনয় দেখে। তাই যাত্রা শেষ হয়ে গেলেও অনেকে ধরতেই পারে না। সমবেত গলায় জাতীয় সংগীত শুনে সবাই বুঝতে পারে। তারপর সবাই উঠে দাঁড়ায়। গান শেষ করেই প্রিয় মঞ্চ থেকে নেমে এসে ওসি,  সুশোভনবাবুদের বাড়িতে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে যাওয়ার  অনুরোধ করে। ওসি , নার্স  এখানকার ডাক্তারবাবুরা হাতজোড় করে বলেন , রক্ষা করুন , এবার আমাদের রেহাই দিন। দিনে যা খাইয়েছেন তাতেই এখনও পেট ভার হয়ে আছে। এরপর খেতে হলে আর দেখতে হবে না। বলে তারা ফেরার পথ ধরেন। সুশোভনবাবু আর সোমনাথ অবশ্য সেই অনুরোধ এড়াতে পারেন না। তাদের একটুক্ষণ দাঁড়াতে বলে দ্রুত মেকাপ তুলে ফিরে আসে প্রিয়। সেই সময় গঙ্গাধর বাবাজীও সেখানে এসে হাজির হন। সবাইকে নমস্কার জানিয়ে আর্যকে জিজ্ঞেস করে , চৈতী তো তোমারই মেয়ে ?
আর্য বলে -- হ্যা , কেন ?
---- মেয়েটি বড়ো ভালো নাচে গো। আহা মন ভরে গেল। আমার একটা নিবেদন আছে।
---- কি নিবেদন ?
--- সেটা বলার ক্ষেত্র এটা নয়। তোমরা আজ থাকছ তো ?
--- হ্যা।
---- তাহলে কাল সকালে বরং আমি এসে সেই নিবেদনটা করব।
---- বেশ ,  তাই করবেন।
---তাহলে আমি এখন আসি গো বাবারা।
বাবাজী বিদায় নেন। প্রশান্তকাকাদের জানিয়ে প্রিয়ও সবাইকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। বাড়ি ফিরতেই খাওয়া দাওয়া শুরু করতে হয়। কারণ তারপর ডাক্তারবাবুদের ফিরতে হবে।   প্রিয় দু'জনকেই রাতটুকু থাকার জন্য খুব অনুরোধ করে। কিন্তু ডাক্তারবাবুর সকালেই চেম্বার আছে। সোমনাথের কাগজের কাজ রয়েছে। তাই আর জোর করতে পারে না প্রিয়।খাওয়ার দাওয়ার পর ডাক্তারবাবুদের এগিয়ে দিতে গিয়ে প্রিয় বলে , আজকে রাতে ছেড়ে দিলাম ঠিকই কিন্তুমালার বিয়ের দিন কিন্তু রাতে চলে যাওয়া হবে না।
ডাক্তারবাবু বলেন , তুমি ভাবলে কি করে আমাদের মেয়ের বিয়ে , অথচ মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি রওনা না করেই আমরা চলে যাব। বেশ , আজ আমরা আসছি।
ডাক্তারবাবুরা বিদায় নেন।খাওয়া দাওয়ার পাট চুকতে সেদিনও অনেক রাত হয়ে যায়। আগের রাতেও ভালো ঘুম হয় নি , তবু চৈতী আর শঙ্খর চোখে ঘুম নেই। কাল চৈতীরা চলে যাবে। মালার বিয়ের আগে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।  সেই কথা ভেবেই আসন্ন বিরহ ব্যাথায় ঘুম আসে না শঙ্খর। মনে হয় চৈতীও যদি থেকে যেত তাহলে কি ভালোই না হত। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। পাঁচজনে পাঁচকথা বলবে। এমনিতেই তার গ্রামের বন্ধুরা তাকে আর চৈতীকে জড়িয়ে নানা হাসি ঠাট্টা শুরু করে দিয়েছে। লজ্জা পেলেও ওইসব কথা শুনতে তার ভালোই লাগে। মন এক পুলকানুভুতিতে ভরে যায়। সবাই যে মেয়েটির দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেই মেয়েটিই তার একান্ত আপন ,  প্রিয়জন। সেই কথা ভাবেতেই বড়ো ভালো লাগে তার। একই অনুভূতি হয় চৈতীরও। আজ যখন শঙ্খদার কবিতা পড়ার পর সবাই হাততালি দিচ্ছিল তখন গর্বে তার বুকটা ভরে উঠেছিল। ভুলেই গিয়েছিল সে মা-পিসিমনিদের সঙ্গে বসে রয়েছে। তাই হাততালি দিয়েই যাচ্ছিল। ভাগ্যিস মালারা ওইভাবে তাকিয়েছিল।নাহলে সে হয়তো হাততালি দিয়েই যেত। সবাই তাকিয়ে দেখলে আর মুখ তুলে তাকাতে পারত না।  কি লজ্জা -- কি লজ্জা ! পরক্ষণেই ভাবে লজ্জাই বা কিসের ? এমন তো কতই হয়। অন্যদের তুলনায় যার একটু বেশি ভালো লাগে সে তো একটু বেশিক্ষণ হাততালি দেয়ই। এমন কি থামতেও ভুলে যায়। আর সে তার ভালোবাসার মানুষের জন্য একটু বেশিক্ষণ হাততালি দিলেই বা কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত। একদিন তো তাদের সম্পর্কের কথা সবাই জানতেই পারবে। সে কথা ভাবতেই তার মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। ভোর রাতে ঘুম নেমে আসে তার চোখে।




                                   সকালে চা - জল খাওয়ার পর চৈতীদের ফেরার তোড়জোড়  শুরু হয়। যাওয়ার সময় যত এগিয়ে আসে আর্য আর বৈশাখীর মন তত উশখুশ করতে থাকে। যে প্রস্তাব দেব মনে করে বাড়ি থেকে আসা , সেই প্রসঙ্গ তো তোলাই হয় নি এখনও। প্রস্তাবটা দেওয়ার জন্য চোখের ইশারায় স্বামীকে তাড়া লাগায় বৈশাখী। কিন্তু বলিবলি করেও কথাটা আর বলা হয় না আর্যর। সবার সামনে প্রিয় যদি প্রস্তাবটা নাকোচ করে দেয় , তাহলে যে খুব ছোট হয়ে যেতে হবে তাকে। সেই আশংকায় প্রস্তাবটা দিতে পারে না। একই অবস্থা হয় প্রিয় আর মধুরিমারও। কাল তারাও দুই ভাইবোনে একান্তে ঠিক করেছিল আর্যদের প্রস্তাবটা দেবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা আর হয়ে ওঠে না। তাদেরও একই আশংকা হয়। দু'পক্ষই চরম উদ্বেগের মধ্যে পড়ে। তাদের সেই উদ্বেগের হাত থেকে উদ্ধার করেন গঙ্গাধর বাবাজী। ' জয় জয় হোক বাবা-মা জননীরা সব ' বলে বাড়ি ঢোকেন তিনি। তারপর আর্যর দিকে চেয়ে বলেন , ঠাকুরের নিত্য সেবা দিয়ে  আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। আপনারা বেরিয়ে যাবেন ভেবেই একটা কথা বলব বলে ছুটতে ছুটতে আসছি।
---- কি কথা ?
---- কাল তোমার মেয়ের নাচ দেখে মোহিত হয়ে গিয়েছি। তেমনি আমাদের শঙ্খ ভায়ার লেখা কবিতা। দুটিকে দেখাচ্ছিলও ঠিক হর - পার্ব্বতীর মতো। তা হ্যা গো বাবারা দুটিকে মিলিয়ে দেওয়া যায় না ? আমার মনে হয় এ ঠাকুরেরও অভিপ্রেত। নাহলে এই পাড়া গাঁয়ে পার্ব্বতী মাকে টেনে আনেন তিনি! দেখ গো বাবা মা জননীরা সব , আমার কথাটা একবার ভেবে দেখ দেখি।
বাবাজীর কথা শুনে যেন স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে দু'পক্ষের। আর্য মনে মনে ভাবে , এত ক্ষণ যে কথাটা  বলি বলি করেও সে বলতে পারছিল না,  সেই কথাটাই গ্রামের একজন তথাকথিত অর্ধশিক্ষিত বৈষ্ণব কি সুন্দর ভাবে বলে দিলেন।এইজন্যই বোধ হয় বলে , সবার কাছে কিছু না কিছু শিক্ষণীয় আছে। প্রিয়ও গঙ্গাধর বাবাজীর দিকে কৃতজ্ঞ চিত্তে চেয়ে থাকে। সে বলতে যায় , আমি তো ----।
তাকে কথা শেষ করতে দেয় না আর্য। সেও বলে ওঠে --- আরে আমিও তো ---।
তাদের কথার সূত্র ধরে বৈশাখী আর মধুরিমা এক সঙ্গে বলে -- সেই কথাই ভাবছিলাম।
তাদের কথা শেষ হতেই শব্দ করে হেসে ওঠে সবাই।
---- এবার বরং হর-পার্ব্বতী দের একবার ডেকে দাও। দুটিকে জোড়ে একবার দেখে নয়ন সার্থক করি , মধুরিমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন বাবাজী।
---- হ্যা আনছি। আমার মনে হয় সবাই যখন এখানে আছে তখন আর্শিবাদ পর্বটা সেরে রাখাই ভালো। তারপর মালার বিয়ের ঝামেলা চুকে গেলে একটা দিন দেখে ওদেরও চারহাত এক করে দিলেই হল।
বৈশাখী বলে -- আমি মনে মনে সেই কথাই ভাবছিলাম।
আর্য বলে , কি ব্যাপার আজ যে দেখছি সবাই মনে মনে এক কথাই ভাবছে।
বাবাজী বলেন , হবে না কেন গো বাবারা , আজ যে এক মনের মানুষারা সব একত্র হয়েছেন। যাও মা এবার হর-পার্ব্বতী দের ডেকে আনো। ওদের আর্শিবাদটা দেখেই যায়।




                       ডাকতে হয় না , মালার সঙ্গে চা নিয়ে আসে চৈতী। মালার হাত থেকে চায়ের কাপগুলো নিয়ে সবাইকে দিতে দিতে মধুরিমা বলে ,  যা তো মা চট করে একবার তোর দাদাকে ডেকে নিয়ে আয়। ওই সঙ্গে একটা থালায় ধান, দুব্বো, শাঁখ আর কিছু শুকনো মিস্টি নিয়ে আয়। বড়োদের আলোচনা কিছু না শুনলেও কি ঘটতে চলেছে তা চৈতী কিম্বা মালার উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না। তাই চৈতীর মুখের দিকে হাসি মুখে চেয়ে থাকে মালা। লজ্জায় চৈতী মুখ নামিয়ে নেয়। মালা দ্রুত হাতে সব যোগাড় করে নিয়ে আসে। তারপর ডাকতে যায় দাদাকে। শঙ্খ তখন ঘরে একা উদাস হয়ে বসেছিল। সেটা লক্ষ্য করে মালা মজা করে বলে , এই যে নাও ওঠো, আর 'দেবদাস - দেবদাস' মুখ করে  বসে থাকতে হবে না। পার্ব্বতীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। দুটির মুখ দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটিও খেতে জানে না। এদিকে দেখ কেমন ডুবে ডুবে জল খায়।
--- অঃ আর তোরা বুঝি ভেসে ভেসে জল খাস ? বলে  বোনের  চুলের বিনুনু ধরে  টেনে ধরে শঙ্খ।
মালা চিৎকার করে ওঠে --- পিসিমনি দেখ দাদা আমার চুল ধরে টানছে।
মালার অনুযোগ শুনে মধুরিমা চিৎকার করে বলে , দুটিকে নিয়ে আর পারা যায় না বাপু। বলি, ওরে চুলোচুলি ছেড়ে এদিকে আয়। সবাই বসে রয়েছেন।
সেই কথা শুনে দুই ভাইবোন গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়ায়।  শঙ্খ লাজুক মুখে মাথা নিচু করে অদুরে দাঁড়িয়ে থাকে। মালা তাকে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেয় চৈতীর পাশে। শুরু হয়ে যায় আর্শিবাদ পর্ব। আর্যই প্রথমে শঙ্খকে ধান দুব্বো দিয়ে আর্শিবাদ করে। বৈশাখী তার গলার হারটা খুলে স্বামীর হাতে তুলে দেয়। আর্য সেটা পড়িয়ে দেয় শঙ্খর গলায়। আর্শিবাদ করতে বসে বিড়ম্বনা পড়তে হয় প্রিয়কে। আর্শিবাদ করে ভাবী পুত্রবধুকে দেওয়ার মতো তার কাছে সেই মুহুর্তে কিছুই নেই। তাই সে অসহায়ের মতো মালার দিকে চায়। দাদার অপ্রস্তুত ভাবটা লক্ষ্য করে মধুরিমা তার
গলার হারটা খুলে এগিয়ে ধরে। প্রিয় সেটা নিতে ইতস্তত করে। তা দেখে মধুরিমা বলে , দাদা শঙ্খ বুঝি আমার ছেলে নয় ?
আর আপত্তি করতে পারে না প্রিয়। বোনের হাত থেকে হারটা নিয়ে চৈতীর গলায় পড়িয়ে দিয়ে আর্শিবাদ পর্ব শেষ করে সে। তখন ঘন ঘন বেজে ওঠে মঙ্গল শঙ্খ।




              ( ক্রমশ )








     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  






                                      ----০---





No comments:

Post a Comment