Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

লুপ্তপ্রায় খেলা -- ৪৫





         
           


         ঘুড়ি ওড়ানো



                                 

                                   অর্ঘ্য ঘোষ 





হাততালির সঙ্গে সঙ্গে একসময় একদঙ্গল ছেলেমেয়েকে ' ভো-কাট্টা - ভোকাট্টা ' বলে চিৎকার করে উঠতে শুনে কপালে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকাতে দেখা যেত বড়োদেরও। কারণ তখন কাটাকাটির খেলায় গোত্তা খেতে খেতে মাটির দিকে নেমে আসতে দেখা যেত এক বা একধিক ঘুড়িকে। আর সেইসব ঘুড়ি ধরার জন্য পিছনে পিছনে ছুটে বেড়াত কচিকাঁচার দল। ছবিটা আজও অনেকেরই মনের মনিকোঠায় অক্ষয় হয়ে রয়েছে। হারিয়ে যেতে বসেছে ছেলেমেয়েদের সেই ভো-কাট্টা - ভো-কাট্টা চিৎকার। আসলে এখন আর ছেলেমেয়েদের ঘুড়ি ওড়াতে বড়ো একটা দেখা যায় না। শহরের আকাশে এমন কি বিদ্যুতের খুঁটিতে কিছু ঘুড়ি লাট খেতে দেখা গেলেও গ্রামের আকাশে আজ আর ঘুড়ির দেখা মেলে না বললেই চলে। অথচ একসময় ছেলেমেয়েদের প্রিয় খেলাগুলির মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল অন্যতম।




                       সাধারণত ছেলেদেরই ঘুড়ি ওড়াতে দেখা যেত। তবে বাচ্চা মেয়েদেরও ঘুড়ির পিছনে দৌড়াতে দেখা গিয়েছে। সাধারণত বিশ্বকর্মা পুজোর দিন থেকে ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হয়ে যেত। চলত অগ্রহায়ণ মাসের নবান্নের দিন পর্যন্ত। তার আগে পরেও আকাশে ঘুড়ির দেখা মিলত। ঘুড়ির পিছনেই পড়ে থাকতে দেখা যেত ছেলেমেয়েদের। ঘটনা এমনও ঘটত হয়তো স্কুলে যাওয়ার সময় ঘুড়ি মাঝ আকাশে উড়ছে। উড্ডীয়মান সেই ঘুড়িকে নামিয়ে আর স্কুলে যেতে ইচ্ছাই করত না। খিদে - তেষ্টা সব ভুলিয়ে দিত ঘুড়ির আকাশ বিচরণ। তারপর দুপুর গড়িয়ে বাড়ি ফিরে বকাবকি এমনি কি প্রহারও জুটত। কিন্তু ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা সব ভুলিয়ে দিত। পরদিন ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ফের সব হাজির হত মাঠে। এক সময় গ্রামগঞ্জের দোকানে ঘুড়ি, লাটাই এবং সুতো পাওয়া যেত না। কোথাও কোথাও পাওয়া গেলে তা কেনার মতো সামর্থ্য সবার ছিল না। কিন্তু তাতে কোন পরোয়াও ছিল না। খবরের কাগজ , নারকেল পাতার ঝাঁটার কাঠি , বেলের আঁঠা দিয়ে দিব্যি বানিয়ে নেওয়া হত ঘুড়ি। তারপর মা-কাকীমায়ের সেলাইয়ের বাক্স থেকে সুতো চুরি করে লাঠিতে জড়িয়ে নিতে পারলেই হলো।



                                        পর্যাপ্ত সুতো এবং উপযুক্ত নির্মাণ কৌশল অভাবে সেইসব ঘুড়ির মাঝ আকাশে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু তাতেই কত আনন্দ , কত উচ্ছাস , কত না হাততালি। পরবর্তীকালে অবশ্য ছেলেমেয়েদের ঘুড়ি ওড়ানোর চাহিদা মাথায় রেখে গ্রামগঞ্জের দোকানেও আমদানি হতে শুরু করে রঙবেরঙের ঘুড়ি, সুতো, লাটাই। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা সহ কত না  বিচিত্র নাম সেইসব ঘুড়ির। স্বভাবতই দোকানে ঘুড়ি পেয়ে উন্মাদনা বেড়ে যায় ছেলেমেয়েদের। খবরের কাগজের ফালি কেটে লেজ তৈরী করে জুড়ে দেওয়া হত ঘুড়ির নীচে। তাতে নাকি ঘুড়ি ভারসাম্য রেখে ভালোভাবে উড়তে পারে। গোত্তা অর্থাৎ পাক খেয়ে নিচে নেমে আসার প্রবনতা কম থাকে। শুধু লেজ তৈরীই নয় , সুতো ধারালো করার জন্য মাঞ্জা দেওয়া নিয়েও ব্যস্ততার অন্ত থাকত না। মাঞ্জার জন্য খল নুড়িতে কাচগুঁড়ো করে তার সঙ্গে সাগু কিম্বা শিরিসের আঁঠা মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করে নেওয়া হত। তারপর নির্জন দুপুরে আমবাগান কিম্বা পড়ো ঠাকুরদালানে সেই দ্রবণে বার কয়েক সুতো ডুবিয়ে নিয়ে মেলে দেওয়া হত। শুকিয়ে গেলে জড়িয়ে নেওয়া হত লাটাইয়ে।



                              ঘুড়ি ওড়ানোর খেলায় কাটাকাটি একটি আর্কষনীয় অঙ্গ। মাঝ আকাশে ওড়ার সময় সুতোর প্যাঁচে অন্যের ঘুড়ি কেটে দেওয়াটা পারদর্শিতার পরিচায়ক হিসাবে বিবেচিত হয়। তাই কাটাকাটির খেলায় যার মাঞ্জা দেওয়া সুতো যত ধারালো হত তার পারদর্শিতা প্রদর্শন তত সহায়ক হত। আর ওইভাবে কেউ কারও ঘুড়ি কেটে দিতে পারলেই সবাই একযোগে হাততালি দিয়ে ' ভো-কাট্টা - ভোকাট্টা ' বলে লাফিয়ে উঠত ৷ যার ঘুড়ি কাটা পড়ত তাকে অবশিষ্ট সুতো লাটাইয়ে গুটিয়ে নিয়ে মুখ চুন করে বাড়ি ফিরতে হত। ফের পয়সা যোগাড় করে ঘুড়ি কিনতে না পারা পর্যন্ত তাকে মন খারাপ করে দর্শক হিসাবেই থেকে যেতে হত। আর যে ঘুড়ি কাটত সে কাটা ঘুড়ির মালিক হয়ে যেত। কখনও কখনও অন্যরাও কাটা ঘুড়ি ধরে ওড়ানোর সুযোগ পেত। তবে কাটাকাটির খেলা গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলেই বেশি প্রচলিত ছিল ৷ এক ছাদ থেকে অন্য ছাদ ওড়ানো ঘুড়ি কাটাকাটির প্রতিযোগিতা ছেলেমেয়েদের কাছে খুব প্রিয় ছিল৷ সেই আকাশ আছে। আছে ঘুড়িও। প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে এখন মিলছে সিনথেটিক ঘুড়ি , উন্নতমানের লাটাই এবং মাঞ্জা দেওয়া সুতো। কিন্তু আগের মতো আর আকাশে  ঘুড়ি উড়তে দেখা যায় না। 'ভো-কাট্টা ' চিৎকারটাও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

                                                           -------০------





     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


শীঘ্রই দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে চলেছে আমার তৃতীয় উপন্যাস ------
  
                                  


                    


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  







দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে -----







                   ----০---





No comments:

Post a Comment