অন্তাক্ষরী
অর্ঘ্য ঘোষ
শিক্ষকহীন ক্লাসরুম , ঘরবন্দী বৃষ্টিবহুল দিন কিংবা চড়ুইভাতির মজলিসি আড্ডায় একসময় বহুল প্রচলিত ছিল অন্তাক্ষরী খেলা। ছোটদের পাশাপাশি ওই খেলাই একদা বড়োদেরও সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম ছিল। নিছক সময় কাটানোই নয় , ওই খেলার মাধ্যমে মেধা চর্চার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তিরও বিকাশ ঘটত।একক বা দলগত ভাবে খেলাটিতে অংশ নেওয়া যায়। দল গঠনের ক্ষেত্রে অন্যান্য খেলায় প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে দুটি দল গঠন করে নিতে হয়। দুটি দল মুখোমুখি বসে খেলা শুরু করে।
একক ভাবে খেলার ক্ষেত্রে অবশ্য গোলাকারে বসে খেলা হয়। কে বা কোনপক্ষ আগে দান নেবে তা টসের বা অন্য কোন পদ্ধতি মাধ্যমে স্থির করে নেওয়া হয়। সর্বসম্মতিক্রমে খেলায় একজনকে পরিচালক নিয়োগ করা হয়। তার কাজ নিরপেক্ষভাবে খেলা পরিচালনার পাশাপাশি খাতায় পয়েন্ট লিপিবদ্ধ করা। তার নির্দেশ অনুযায়ী টসজয়ী খেলোয়াড় বা দল দান নেওয়া শুরু করে।
দান শুরু করার অর্থ হলো দান চালকারী দলের একজন খেলোয়াড় তার পছন্দ অনুযায়ী বহুল প্রচারিত কোন কবিতা, ছড়া কিম্বা গানের দু/চার লাইন আবৃত্তি করে কিম্বা গেয়ে থেমে যায়। আর সে যে পঙক্তি বা কলিতে থামে সেই পঙক্তি বা কলির শেষ শব্দের শেষ অক্ষর দিয়ে বিপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কবিতা , ছড়া , বা গান গাইতে হয়।
ধরা যাক যদি প্রথমপক্ষ গেয়ে ওঠে - ' ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো / তোমাতে আমরা লভিয়া জনম , ধন্য হয়েছি ধন্য গো। ' তা হল বিরোধপক্ষকে -' 'গগনে গরজে মেঘ , ঘন বরষা।কূলে একা বসে আছি , নাহি ভরসা।রাশি রাশি ভারা ভারাধান-কাটা হল সারা ,ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা–কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ " বা গ অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া কবিতা - ছড়া আবৃত্তি করতে কিংবা গান গাইতে হয়। ওই ভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পালাক্রমে উতোরচাপানের মতো আবৃত্তি কিম্বা গান গাওয়া চলতে থাকে। কিন্তু কোন পক্ষ যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারে তাহলে বিপক্ষ দল বা খেলোয়াড় এক পয়েন্ট অর্জন করে। তবে তাদের সেই কবিতা , ছড়া বা গানের থেমে যাওয়া পঙক্তি বা কলির শেষ শব্দের শেষ অক্ষরের পাদপূরণ করতে হয়। তবেই পয়েন্ট মেলে। নচেৎ ফের নতুন করে খেলা শুরু হয়। তবে কোথাও কোথাও পাদপূরণ না করেও পয়েন্ট পাওয়ার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। সেক্ষেত্রে অবশ্য পয়েন্টজয়ী দলই নতুন ভাবে দান নেওয়ার সুযোগ পায়।
কোথাও কোথাও আবার কবিতা , ছড়ার সঙ্গে গান ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ রয়েছে। সেক্ষেত্রে শুধু কবিতা-ছড়া কিম্বা শুধুই গান ব্যবহার করতে হয়। খেলায় জেতার জন্য চালাকির আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। পাদপূরণ করতে প্রচলিত কোন কবিতা-ছড়া বা গান মনে না পড়লে মুখে মুখে কবিতা - ছড়া বা গান তৈরি করে চালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পেরিয়ে গেলে ভালো।
কিন্তু বিপক্ষ চ্যালেঞ্জ করলে পুরো কবিতা, ছড়া কিংবা গান পরিবেশন করতে হয়। তখন চালকি ধরা পড়ে যায়। সেক্ষেত্রে চাতুরীর আশ্রয় নেওয়ার জন্য এক পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়। ফের দান নেওয়ার সুযোগ অবশ্য তারাই পায়। চাতুরীর জন্য পয়েন্ট হারালেও ওই প্রবণতার মধ্যে দিয়েই সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটে। একই সঙ্গে আবৃতি এবং গানেরও চর্চার বিকাশও ঘটায় ওই খেলা। অথচ সেই খেলাটির চর্চাই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
----০----





No comments:
Post a Comment