Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ১৩



         নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


            শুরু হল ধারাবাহিক উপন্যাস -- 















           কালের কারিগর
              

                         অর্ঘ্য ঘোষ

                     ( কিস্তি -- ১৩ ) 



চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে সত্যেনবাবুই বিষয়টা খোলসা করেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন , তোমার মেয়েটিকে আমি আমার ছেলের বৌ করে নিয়ে যেতে চাই। অবশ্য তোমাদের যদি সম্মতি থাকে।
সত্যেনবাবুর কথা শুনে বাবা-মা যেন কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কথা হারিয়ে যায় তাদের। আর সে লজ্জা পেয়ে চুপিসাড়ে একটু আড়ালে সরে যায়। সেখান থেকেই সে শুনতে পায় বাবা গদগদ স্বরে বলছেন ,  কি যে বলেন দাদা! অসম্মতির প্রশ্নই ওঠে না। আপনার ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে সে তো আমাদের কাছে আকাশের চাঁদ পাওয়ার 
সামিল। কিন্তু আমি কি পারব কাঁধে কাঁধ রাখত ?
---- একথা কেন বলছো ?  তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ। 
--- তবু মেয়ের বিয়ে বলে কথা, আমি কতটা কি পারব না জেনেই - - -!
--- কতটা কি পারবে তা তো আমি জানতে চাই না। আমি ছেলের বিয়ে দিচ্ছি। হাটে গরু ছাগল বেচতে পারব না। সে যারা পারে তারা পারে। স্কুল যাওয়া আসার পথে তোমাদের মেয়েটিকে দেখে আমার আর আমার স্ত্রীর মনে ধরেছে। তাই ছেলের বৌ করে ঘরে তুলতে চাই।
বাবা তবু আমতা আমতা করে বলেন , কিন্তু ছেলের পচ্ছন্দ অপচ্ছন্দের একটা ব্যাপার আছে তো। সে নিজে বরং একবার  দেখে যাওয়াটাই কি ঠিক হবে না ? 
--- তার কোন দরকারই হবে না। ভুবন আমাদের সে রকম ছেলেই নয়। আমরা পচ্ছন্দ করে যার সঙ্গে বিয়ে দেব সানন্দে সে তাকেই স্ত্রী হিসাবে মেনে নেবে। আর পাশাপাশি গ্রামে যখন বাস তখন একেবারেই যে কেউ কাউকে দেখে নি তা তো নয় ? তবে তোমার মেয়ের যদি ছেলে পছন্দের ব্যাপার থাকে তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। সে স্বাধীনতা সবার থাকা উচিত বলেই আমি মনে করি।
----- ছিঃ  ছিঃ, কেন লজ্জা দিচ্ছেন দাদা, আপনার ছেলেকে দেখতে হয় ? আপনার মতো সজ্জন মানুষ ক'জন আছে এ তল্লাটে ?  আপনার কথায় মেয়ের বিয়ে কেন, চোখ বুজে আগুনে ঝাঁপ দেওয়াও যায়। তাছাড়া আমার মেয়েও সে রকম নয়। নিজের মেয়ে বলে বলছি না, মেয়ে আমার বড়ো লক্ষীমন্ত স্বভাব। যে ঘরে যাবে সে ঘরেরও আয় পয় যে বাড়বে তা হলফ করে বলতে পারি। আপনার ছেলেকেও তো আমি দেখেছি , বিয়ে হলে দুটিকে খুব মানাবে।
আড়ালে থেকে তখন নিজের প্রশংসা শুনতে শুনতে ঘেমে নেয়ে একসা হওয়ার মতো অবস্থা সাধনার। লজ্জায় সে নড়তে চড়তে পর্যন্ত পারে না। গলা শুকিয়ে কাঠ। খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। কিন্তু পাছে বাবা-মা টের পায় সে লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কথা শুনছে সেই আশংকায় সে বেরোতেও পারে না। নানা রকম চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে তার মাথার মধ্যে। ভুবনদাকে সে বেশ কয়েকবার দেখেছে। দেখতে শুনতে বেশ। সে যেবার হাইস্কুলে ঢোকে সেবারই শহরে পড়তে চলে যায় ভুবনদা। তারপর ছুটিছাটায় বাড়ি এসে যখন বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল নিয়ে পাড়ায় বেড়াতে বেরোত তখন স্কুল যাওয়া আসার পথে কতবার চোখে পড়েছে। সে তো বটেই , অন্য মেয়েরাও আড়চোখে তাকে দেখেছে। বন্ধুরা চোরা চাউনিতে তাদের দেখলেও ভুবনদা কিন্তু ফিরেও কোনদিন তাকায় নি। সেটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারত না মেয়েরা। এ যেন তাদের নারীত্বের অবমাননা। তারা কষ্ট করে সেজে গুজে স্কুলে যাবে আর ছেলেরা তাদের দেখবে না তাই মেনে নেওয়া যায় কখনও ?  তাই  বান্ধবীরা কত দিন রাগে নাক কুঁচকে বলেছে , বেশি বেশি , ওর ঠিক একটা খেদি পেঁচি বৌ জুটবে দেখিস।


                     কথাটা মনে পড়েতেই হাসি পেয়ে যায় তার। তাহলে সে কি খেদিপেঁচি নাকি ? কথাটা যখন শুনবে তখন কি বলবে বান্ধবীরা ? নিশ্চয় হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরবে। হিংসা হওয়ারই তো কথা। কয়েক মাস আগেই পাশের গ্রামের স্কুলে মাস্টারি পেয়েছে ভুবনদা। তাকে স্বামী হিসাবে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।ঠিক তখন সত্যেনবাবুর কথা কানে যেতেই ছিঁড়ে যায় সাধনার  চিন্তাজাল। সে শুনতে পায় সত্যেনবাবু বাবাকে বলছেন -- বিয়ে হয় মানে কি ? বিয়ে হয়েই গিয়েছে ধরো। আমি যখন বলেছি তখন এ বিয়ে হবেই। আর যার ঘরে যাবে মানেই বা কি ? মা আমার ঘরেই যাবে। 
আমার ঘরেই যে ওর আসন পাতা আছে। তোমাদের আপত্তি না থাকলে মাকে ডাকো , আমি আজই আর্শিবাদ করে যাব। তারপর তোমরা একদিন গিয়ে না হয় দিনক্ষণ পাকা করে আসবে।
এবারে সজাগ হয় সাধনা। সে আন্দাজ করে এবারে বাবা কিম্বা মায়ের কাছে থেকে ডাক আসাটা অবশ্যম্ভাবী। তাই সে গুটি গুটি পায়ে উল্টোদিক দিয়ে রান্নাচালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন মা। তারপর তাকে বলেন ,  চটপট সেজেগুজে নে তো মা। আমি তত ক্ষণ একটু ধান দূর্বা যোগাড় করে নিই।
মায়ের কথা শুনে সব কিছু জেনেও না জানার ভান করে সাধনা। মাকে বলে -- কেন এখন সেজেগুজে কি হবে ? 
---- ওরে তুই রাজরানী হতে চলেছিস, রাজরানী। ঠাকুরের তাই ইচ্ছা। এতবড়ো ভাগ্য খুব কম মেয়েরই হয়। নে মা নে, আর দেরি করিস না, উনি আজই তোকে আর্শিবাদ করেই যাবেন।
সাধনার মন এক পুলকানুভূতিতে ভরে যায়। ভালো ঘর বরের স্বপ্ন তো মেয়েদের সহজাত। সেই স্বপ্ন সত্যি হলে কার না আনন্দ হয় ? বিশেষ করে তাদের মতো পরিবারে মেয়েরা তো বিয়ের যোগ্য হলে বাবা-মায়ের চোখের বালি হয়ে ওঠে। বাবা-মায়ের সেই দুশ্চিন্তা দূর হতে চলেছে ভেবেও ভালো লাগে তার।  মায়ের তোলা কাপড়টা পড়ে হালকা একটু সাজগোজ করে মায়ের সঙ্গে ধীর পায়ে সত্যেনবাবুর সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে  দাঁড়ায় সাধনা।
বাবা বলেন , আজ থেকে উনিও তোমার আর এক জন বাবা হতে চলেছেন। ওনাকে প্রনাম কর।
সাধনা প্রথমে বাবাকে করতে যায়। বাবা দ্রুত পা সরিয়ে নিয়ে বলেন , আগে ওনাকে কর , তারপর আমাদের।
সত্যেনবাবু হাত তুলে বাবাকে থামিয়ে বলেন , ওকে বাধা দিও না। মায়ের যা মন চায় , তাই করতে দাও।
তখন সে একে একে বাবা-মা তারপর সত্যেনবাবুকে প্রনাম করে। সত্যেনবাবু তার মাথায় হাত রেখে আর্শিবাদ করতে করতে বলেন , তোমার নীতিবোধ আমাকে মুগ্ধ করেছে মা। বাবা-মায়ের চেয়ে বড়ো কেউ হয় না। আমার ছেলে যদি আমাদের সামনে তার শ্বশুর-শাশুড়িকে আগে প্রনাম করত তাহলে সেটা যেমন খারাপ লাগত ,  তেমনই তুমিও আমাকে আগে প্রনাম করলে ভালো লাগত না। এই নীতিবোধটাই সারা জীবন আঁকড়ে থেক মা। 
সে সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়তেই সত্যেনবাবু পকেট থেকে একটা হার বের করে তার গলায় পড়িয়ে দিয়ে আর্শিবাদ করে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে থাকতে বলেন -- মা যেন আমার স্বাক্ষাৎ লক্ষীর প্রতিমা। যাও তো মা এবার একটু মিষ্টি মুখ করিয়ে দাও।
সে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে মা ততক্ষণে লুচি - পায়েস তৈরি করে ফেলেছেন। দুটি প্লেটে লুচি পায়েসের সঙ্গে সত্যেনবাবুর আনা মিষ্টি সাজিয়ে দেন। সত্যেনবাবু--  কথাটা মনে মনে উচ্চারণ করতেই কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকে সাধনার। আর কি ওনাকে ওই সম্বোধন করাটা উচিত হবে ? তাহলে কি বলবে সে ? বরের বাবাকে তো মেয়েরা বাবাই বলে। ইঃমা বাবার সামনে বিয়ের আগে সে কিছুতেই বাবা সম্বোধন করতেই পারবে না। লজ্জায় মরে যাবে। মেয়েকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তে দেখে তাড়া লাগান মা -- কইরে কি হলো ?  খাবার গুলো নিয়ে যা। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে সব।
--- যাই মা। বলে দুহাতে খাবারের প্লেট দুটি নিয়ে সত্যেনবাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সাধনা। সাধনার স্মৃতিপটে যেন ছবির মতো ভেসে ওঠে সেই সব সুখ স্মৃতি।

                                                         ( ক্রমশ )





  নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                              ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                      ( ৪ )


         



                       ( ৫ )

                             ( খেলার বই )
     

                                                                                 


                             ----০---






No comments:

Post a Comment