( কিস্তি -- ১৪ )
সাধনার স্মৃতিপটে যেন ছবির মতো ভেসে ওঠে সেই সব সুখস্মৃতি।মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা। অথচ দেখতে কত বছর পেরিয়ে গেল। কত প্রিয় মানুষ হারিয়ে গেল।দাদা - বৌদির স্তর পেরিয়ে তারা এখন কাকু - কাকীমা। অথচ সেদিনের কথা মনে পড়লেই অনাবিল আনন্দে ভরে যায় মন। সেদিন বিদায় নেওয়ার আগে তাকে ডেকে সত্যেনবাবু বলেছিলেন - পারবি না এই মা বুড়োবুড়ি দুটো আর ছেলেটাকে নিয়ে সংসারটা সামলে রাখতে ? সে লজ্জায় কোন কথা বলতে পারে নি। কেবল সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল।তাই দেখে সত্যেনবাবু ফের বলতে শুরু করেন - ছেলেটা আমার অবশ্য একটু উদাসীন গোছের।সংসারের খুঁটিনাটি নিয়ে অত আগ্রহ নেই।পড়াশোনা নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। তাই মা তোকেই সবদিক লক্ষ্য রাখতে হবে।তারপর বাবার দিকে চেয়ে বলেন , তাহলে ওই কথাই রইল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি গিয়ে বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করে আসবে।
বাবা হাত কচলে বলেন - তাই তো দাদা খুব চাপে পড়ে গেলাম। কোন প্রস্তুতিই নেই।কি করে কি সামলাব ভেবে পাচ্ছি না।
---- কোন চাপ নেই , ভাবাভাবিরও কিছু নেই। যা পারবে তাই দেবে। আমি কেবল আমার মাকে নিয়ে যাব। আমার বাড়ির লক্ষীকে আমি আর বেশি দিন তোমার বাড়িতে ফেলে রাখতে পারব না তা বলে দিলাম।
তারপরই দরজার দিকে পা বাড়ান সত্যেনবাবু। তারাও দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যায়।বাবা গ্রামের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসেন সত্যেনবাবুকে। মা বলেন , সত্যি দেবতুল্য মানুষ। আজকের দিনে এমন ভাবাই যায় না।
বাবা ফিরে আসার আগেই গোটা পাড়া যেন একে একে হামলে পড়ে তাদের বাড়িতে। এতক্ষণ উঁকিঝুঁকি চলছিল , কিন্তু পুরো ব্যাপারটা খোলাসা করে না জানা পর্যন্ত যেন সবার ভাত হজম হচ্ছিল না। পাশের বাড়ির সন্ধ্যাকাকীই সর্বপ্রথম মুখ খোলেন -- কি ব্যাপার গো বৌদি, ভুবন মাস্টারের বাপ কি করছিল গো তোমাদের বাড়িতে এতক্ষণ ?
মা তখন কন্যা গর্বে গরবিনী। বাড়ি বয়ে এসে মেয়েকে যেচে আর্শিবাদ করে গিয়েছেন ছেলের বাপ। বলে গিয়েছেন , কিচ্ছুটি লাগবে না, শাঁখা আর সিঁদুর হলেই চলবে।একি কম বড়ো কথা নাকি ? গর্ব হওয়ার কথা। কন্যা দায়গ্রস্ত যে কোন মা'ই মেয়ের এহেন সৌভাগ্যে গর্বিত হবেন। মা'ই বা তার ব্যতিক্রম হবেন কি করে ? তাই পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে সাতকাহন করে বলতে শুরু করেন - আর বলো কেন ভাই , আমার মেয়েটার মধ্যে যে ওনারা কি দেখেছেন কে জানে ? ছেলের বৌ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য যাকে বলে একেবারে ঝোলাঝুলি শুরু করে দিলেন। আমরা যত বলি , আমাদের একটু ভাবতে দিন উনিও বলেন ভাবাভাবির কিছু নেই। কিছুই দিতে হবে না , কেবল মা লক্ষীকে আমাকে
দিন তাহলেই হবে। তারপর দেখ না কত মোটা একটা সোনার হার দিয়ে একেবারে আর্শিবাদ করে দিয়ে চলে গেলেন। সাধনা হারখানা তোর কাকীদের একবার দেখা না মা।
দেখাতে হয় না , কাকীরা নিজেরাই এসে তার গলার হারটা নেড়েচেড়ে বলেন -- দেখে তো বেশ ওজনদার বলেই মনে হচ্ছে। পুরোপুরি সোনার বটে তো ? এখন তো ভড়ং দেখাতে সোনার জলের কাজ করা সব গয়না নিয়ে বড়োলোকি জাহির করার চল হয়েছে খুব।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠেন মা -- মোটেই না , তোমরা জানো না তাই বলছো। উনি সেরকম মানুষই নন। নাহলে অন্য জায়গায় মাষ্টার ছেলের বিয়ে দিয়ে উনি তো অনেক টাকা পণ নিতে পারতেন। বিনা পণে আমার মেয়েকেই ছেলের বৌ করে নিয়ে যেতে চাইবেন কেন ?
---- সেটাই তো ভাবাচ্ছে গো দিদি। দেশে তো বড়লোকের ঘরে সুন্দরী মেয়ের অভাব নেই।তা স্বত্ত্বেও তোমার মেয়েকেই কেন যে এত মনে ধরল সেটাই তো ভেবে পাচ্ছি না।
--- সেটা আমরাই বা জানব কি করে বলো ?
---- তা বিয়ের দিনক্ষণ, লগ্নপত্র কি সব ঠিকঠাক হয়ে গেল নাকি ?
--- সেটা এখনও হয় নি। তবে উনি বলেছেন আমরা যেদিনই যাব সেদিনই ঠিক হয়ে যাবে।
---- কি জানি বাপু , কথায় আছে লাখ কথা ছাড়া নাকি বিয়ে হয় না। কিন্তু তোমাদের তো দেখছি সেই উঠ ছুড়ি তোর বিয়ের মতো ব্যাপার।
----- তা যা বলেছো ভাই , আমাদের সাধনার বাবা তো সেটাই বলছিলেন , দাদা কয়েকটা দিন একটু সময় পেলে ভালো হত। কিন্তু সাধনাকে যে উনি কি চোখে দেখেছেন কে জানে , পারলে যে আজই যেন বিয়ে দিয়ে বাড়িতে তোলেন।
---- তা পারলে তো ভালোই , কই গো সব এবার বাড়ি টাড়ি যাবে নাকি ?
---- দাঁড়াও ভাই , শুভ দিনে এলে একটু মিষ্টিমুখ না করেই চলে যাবে তাই কখনও হয় ? সাধনার শ্বশুর ভালো মিষ্টি এনেছেন , একটা করে মুখে দিয়ে যাও ভাই। যা মা , সাধনা কাকীদের মিষ্টি এনে দে তো।
---- তা দাও, সে না হয় মিষ্টিমুখ করেই যাচ্ছি। কিন্তু মেয়ের বিয়ে না হতেই যে একেবারে শ্বশুর বানিয়ে ফেলেল ?
---- আমাদের সমাজে তো আর্শিবাদ হয়ে যাওয়া মানেই তো একধরণের বিয়ে হয়ে যাওয়া।
--- তা বলে বটে। কিন্তু আর একটা কথাও আছে দিদি, সেই যে বলে না - - - - - - না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
--- না ভাই , ওই কথা বলে আর ভয় ধরিয়ে দিও না। তোমরা আর্শিবাদ করো মেয়ের আমার বিয়েটা যেন ভালোয় ভালোয় পেরিয়ে যায়।
মা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সে ততক্ষণে একটা প্লেটে মিষ্টি আর ঘটিতে করে জল নিয়ে হাজির হয়। মা তখনও তার বিয়ে নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেই চলেছেন। তাই মিষ্টিমুখ করে কাকীদের মুখের অভিব্যক্তি কেমন হলো নজরে পড়ে না মায়ের। কিন্তু তার চোখ এড়ায় না। কাকীমাদের মুখগুলো কেমন যেন তেঁতো তেঁতো মনে হয় তার।কিছুদিন পরেই তার প্রমাণও মেলে। দিন চারেকের মধ্যেই মামা আর পিসেমশাইকে নিয়ে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়েছিলেন বাবারা।
সেখানে গিয়ে শুনে আসেন গ্রাম থেকে ৩/৪ জন নাকি ভাংচি দিতে গিয়েছিলেন। তার ভাবী শ্বশুরমশাই ভদ্রলোক বলেই তাদের নামগুলো আর বলেন নি। তবে জানিয়েছিলেন , ওরা নাকি বলেছিল, ওই বাড়িতে বিয়ে হলে জামাইয়ের কোন সম্মানই হবে না। ওইরকম হা'ঘরেদের ঘরে কি ছেলের বিয়ে দেয় কেউ ? দেশে কি আর মেয়ে নেই ? আমাদের বাড়িতেও তো মেয়ে রয়েছে। একবার দেখতে পারতেন। আমরা পণ যৌতুক সবই দিতাম।
প্রত্যুত্তরে তার ভাবী শ্বশুরমশাই বলেছিলেন , এই রে বড়ো ভুল হয়ে গিয়েছে। আগে জানাবেন তো। কিন্তু আর তো কিছু করার নেই। আর্শিবাদ হয়ে গিয়েছে। আমার আর ছেলেও নেই যে আপনাদের কথা ভেবে দেখব। কষ্ট করে এসেছেন যখন চা-টা খেয়ে যান।
ওই কথা শোনার পর অবশ্য আর তারা চা খেতে থাকেন নি। বাবার মুখে ভাবী শ্বশুরমশাইয়ের ওই রসবোধের কথা শুনে সেদিন খুব হাসি পাচ্ছিল তার। তারপর তো ২০ দিনের মাথায় বৌ হয়ে এ বাড়িতে এসে উঠে সে।
সত্যিই ভাগ্য করে শ্বশুরঘর পেয়েছিল সে। শ্বশুর যেমন ছিলেন মাটির মানুষ, শ্বাশুড়ি মা'ও ছিলেন মায়ের মতো। তার অভাবী বাবা বিয়েতে তেমন তো কিছু দিতে পারে নি। কিছু দান সামগ্রী আর হাল্কা ওজনের একটা হার, দু গাছা চুড়ি, কানের দুল আর একটা নাকফুল। কিন্তু তা নিয়ে কারও কোন অনুযোগ কিম্বা অভিযোগ ছিল না। বরং ছিল স্নেহ আর ভালোবাসা। মনে আছে , বৌভাতের দিন শাশুড়িমা শ্বশুরমশাইকে ডেকে বলেছিলেন , শোন নতুন বৌয়ের পায়ে নূপুর আর নাকে
নথ না হলে মানায় ? নতুন বৌ ঘুরে বেড়াবে আর নূপুরের শব্দ শোনা যাবে না তাই কখনও হয় ? তুমি বাপু এখনই নূপুর আর নথের ব্যবস্থা করো।তখনই শ্বশুরমশাই ছুটেছিলেন নলহাটির বাজারে। আর সে মনে মনে খুব অস্বস্তিবোধ করছিল। শ্বাশুড়িমা'ই তার সেই অস্বস্তি দূর করে দিয়েছিলেন। নিজে হাতে পড়িয়ে দিয়েছিলেন নথ আর নুপুর। পায়ে হাত দিয়ে নূপুর পড়ানোর জন্য সে যখন শাশুড়িমাকে প্রনাম করে তখন তিনি তার চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বলেছিলেন , ওরে বার বার অত প্রনাম করতে হবে না। ছোটবেলায় সব মা'ই তো মেয়েকে গয়নাগাটি পড়িয়ে সাজিয়ে দেয়। যতই বড়ো হোক না কেন মায়ের কাছে সে সেই ছোট্ট মেয়েটিই থাকে।
সেই কথা শুনে সেদিন থেকেই শাশুড়ি মাকে তার খুব ভালো লেগে যায়। তারপর তো হাতে ধরে সব কিছু শিখিয়েছেন। সন্ধ্যা দেওয়া, শাখ বাজানো, পাঁচালি পড়া, পৌষ আগলানো আরও কত কি। হাতে ধরে শিখিয়েছেন রান্নাও। গান শেখার জন্য হারমোনিয়ামও কিনে দিয়েছেন। নূপুর আর নথ নিয়ে ভুবনেরও পাগলামি কম ছিল না। সেসব কথা ভাবলেই আজও লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে তার মুখ। রাতে বিছানায় তার নূপুর পড়া পা দুটোকে কোলে তুলে নিত সে।
তারপর একবার তার মুখের দিকে আর একবার তার পায়ের দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। তার নথের আলো ঠিকরে যেত ভূবনের চোখে। আর সে আলতো ভাবে ঠোঁট রাখত পায়ে। সে অস্বস্তিতে পা সরিয়ে নিতে চাইত। বলত , আমার পাপ হবে না বুঝি ? কিন্তু কোন কথাই কানে তুলত না ভূবন। পা থেকে সে পৌঁছে যেত ঠোঁটে। সারা শরীর সিরসির করে উঠত তার। এক সময় একে অন্যের মধ্যে হারিয়ে যেত। কিছুতেই তাকে নথ আর নূপুর খুলতে দিত না ভুবন। মনো কোলে আসার পরও বহুদিন তাকে ভুবনের আবদারে ওই দুটি অলঙ্কার পড়ে থাকতে হয়েছে। মনো বড়ো স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তবে ছাড় পেয়েছে সে। কিন্তু অলঙ্কার দুটি আজও সযত্নে বাক্সে তুলে রেখেছে। বাক্স গোছগাছ করার সময় সে'দুটি দেখলে তার গালে আজও ফুটে ওঠে লাল আভা।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment