( কিস্তি --- ১৫ )
বাক্স গোছগাছ করার সময় সে দুটি দেখে তার গালে আজও ফুটে ওঠে লাল আভা।ছন্দার নুপুরের শব্দ শুনে অতীতে হারিয়ে গিয়েছিল সাধনা। আবার ছন্দার নূপুরের শব্দে বর্তমানে ফেরে। গুটি গুটি পায়ে কখন যে মেয়েটি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে টেরও পায় নি।ততক্ষণে একে একে মনোর বাবার সান্ধ্যআসরের বন্ধুরাও এসে আসর জমিয়েছেন বৈঠকখানা ঘরে। তাই দেখে ছন্দা বলে , কাকুর বন্ধুরা সব এসে পড়েছে। ওদের চা করে দিতে হবে না ?
--- লক্ষী মা আমার যা তো , চট করে কাপ কতক চা করে বৈঠকখানা ঘরে দিয়ে আয়। ছন্দা চা করে বৈঠকখানা ঘরে দিয়ে আসার পর তাকেও এক কাপ ধরিয়ে দেয়।
সাধনা বলেন , তুইও একটু হরলিক্স করে নে। সেই কখন খেয়েছিস।
--- আমি আর কিছু খাব না এখন।
--- সে , কি কেন ?
--- ইচ্ছে করছে না
-- অমনি ইচ্ছে করছে না বললেই হবে।এই বয়েসে একটু ভিটামিন - টিটামিন না খেলে গায়ে পায়ে বাড়বি কেমন করে ? মেয়েদের একটু গায়ে পায়ে না হলে কেমন যেন লাগে। এখন আবার সিরিঙ্গে মেয়েদেরই নাকি বেশি কদর শুনেছি। কে জানে বাপু অন্য সব কিছুর মতো শারিরিক সৌন্দর্য্যেরও ধারণাও পাল্টে গেল কিনা। কিন্তু তোমার তো তা করলে চলবে না। আমার রোগা প্যাকাটি মেয়ে একদম পচ্ছন্দ নয়।
ছন্দা মুচকি মুচকি হাসে। কোন জবাব দেয় না।
তাই সাধনাই বলেন , বুঝেছি আবার জল গরম করতে তোমার বিরক্ত লাগছে। ঠিক আছে তোমাকে করতে হবে না। আমিই করে দিচ্ছি।
ছন্দা বোঝে হরলিক্স না খেয়ে তার নিস্তার নেই। তাই সে শশব্যস্ত হয়ে বলে , না -না, আমিই করে নিচ্ছি। তুমি চুপটি করে বসো তো ?
বলেই চটপট হরলিক্স করতে চলে যায় ছন্দা। সেটা দেখে খুব ভালো লেগে যায় সাধনার। ভারী বাধ্য মেয়ে। ওকে নিজের হাতে সে এই বাড়ির উপযুক্ত করে গড়ে তুলবে। তার শাশুড়ির মতোই পাঁচালি পড়া , পৌষ আগলানো, গান গাওয়া সব শেখাবে। মনোকেও সে গড়ে পিঠে দুজনকে দুজনের যোগ্য করে দিয়ে যাবে। ছন্দা মাধ্যমিক পাশটা দিলেই ওকে বৌ করে ঘরে তুলতে চাই সে। অবশ্য ছন্দা যদি আরও পড়তে চাই সে আটকাবে না। কিন্তু বিয়েটা যে আর না দিলেই নয়। এরই মধ্যে নানা কানাঘুষো শুরু হয়ে গিয়েছে। এরপর না কুকথা ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম বড়ো সাংঘাতিক জায়গা। অধিকাংশই তিলকে তাল করার ওস্তাদ। সে বড়ো লজ্জার ব্যাপার হবে। মনোর বাবাকে পাঁচ গাঁয়ের লোক মান্য করে। তার সম্মান নিয়েও টানাটানি শুরু হয়ে যেতে পারে।
তা থেকে রক্ষা পেতে হলে হয় বিয়েটা দিয়ে দিতে হবে, নয়তো বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ছন্দার এবাড়িতে আসা যাওয়া বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু ছন্দাকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হবে।ছন্দা যে তাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছে। সে আর মনোর বাবা তো ওকে নিজের মেয়ের মতোই দেখেন। কিছুতেই আর ওকে ছেড়ে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ছন্দা নিজেও কি পারবে ? সে রকম কিছু চোখে পড়ে নি বটে , তবে ওর ভাবগতিক দেখে মনে হয় মনোকে ও মন দিয়েই বসে আছে। মনের মানুষকে চোখের আড়াল করতে কি কেউ পারে ? সে নিজেই কি পেরেছিল ? বিয়ের পর বাপের বাড়ির জন্য মন কেমন করত ঠিকই , কিন্তু বাপের বাড়ি গিয়েই আবার বরের জন্য মন কেমন করত। ভুবনেরও বাড়িতে মন টিকত না। সেটা মালুম হত বাপের বাড়ি থেকে যেদিন সে ফিরত সেইদিন রাতে। আদরে সোহাগে তাকে অস্থির করে তুলত। উঃ কি দস্যিপনাই না করত।
আজ সেই মানুষটা চোখের আড়ালে থাকায় বার বার ফেলে আসা দিনের কথাগুলোই মনে পড়ে যাচ্ছে। আজ থেকেই সে ছন্দাকে মনের মতো করে গড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দেবে। এই ক'দিন তো মনো আর ওর বাবা নেই। তাই স্কুলের ভাতের তাড়া নেই। নেই অন্য কাজের চাপও। এই অবসরটা সে ছন্দাকে গড়ে তোলার কাজে লাগাতে চাই।
হরলিক্স খাওয়া শেষ করে তার পাশটিতে এসে দাঁড়ায় ছন্দা। তাকে দেখেই তার মনে পড়ে রাতের খাবার তৈরি করার কথা। আজ আর খাওয়ার খুব ইচ্ছে নেই তার। শরীরটাও ম্যাচম্যাচ করছে। কেমন যেন জ্বর জ্বর ভাব। গা- হাত পায়ে ব্যাথা। জ্বর আসবে কিনা কে জানে ? এমনিতেই মাসের এ'কয়েকটা দিন শুধু তাকে কেন , সব মেয়েকেই তো দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তার উপরে জ্বরে পড়লে তো একেবারে ষোলকলা পূর্ণ হবে।
বাড়িতে পুরুষ মানুষ কেউ নেই , ওইটুকু একটা মেয়ে সবদিক সামলাবে কি করে ? তার নিজের খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলে কি হবে ? রান্না তো কিছু একটা করতেই হবে। শুধু ছন্দা হলেও কথা ছিল , দুজনে জল ভিজিয়ে মুড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ত। কিন্তু আরও একজনের কথা ভাবতে হচ্ছে যে। ঠিক হয়েছে মনোরা যে ক'দিন রামপুরহাটে থাকবে সেই ক'দিন ভুবনের সান্ধ্য আসরের বন্ধুরা একজন করে পালাক্রমে এসে বৈঠকখানা ঘরে থাকবে। সে বলেছিল , কোন দরকার নেই , তারা দুজনে দিব্যি থাকতে পারবে। কিন্তু ওরা সে কথা কানেই তোলে নি। বলেছে, তাই হয় নাকি। কিছু একটা হয়ে গেলে আমরা মাস্টারকে মুখ দেখাতে তো পারবই না। নিজেকেও ক্ষমা করতে পারব না। যে থাকবে তারজন্য রান্নাবান্না তো কিছু একটা করতেই হবে।
ছন্দাকে বলেন , যা তো মা, বৈঠকখানা ঘর থেকে চট করে একবার জেনে আয় তো আজ রাতে কে থাকবেন , আর উনি রাতে ভাত না রুটি খাবেন ? সেই মতো চটপট খাবারগুলো তৈরি করে ফেলি।
ঘাড় নেড়ে বৈঠকখানা ঘরের দিকে চলে যায় ছন্দা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসে বলে , আজ বিষ্ণুকাকু থাকবেন।কিন্তু উনি বললেন, তার জন্য আর আর রান্না করতে হবে না। বাড়ি থেকে খেয়ে চলে আসবেন।
--- অমনি বললেই হোল ? আমাদের বাড়ি পাহারা দেবেন আর বাড়ি থেকে খেয়ে আসবেন ? চলতো দেখি ---
বলেই সাধনা বৈঠকখানা ঘরের সামনে গিয়ে বলেন --- বলি বিষ্ণু ঠাকুরপো তুমি কোন আক্কেলে কথাটা বললে ? তুমি থাকবে এখানে আর খেয়ে আসবে বাড়িতে ? তাহলে বাপু তোমাদের কাউকে আমাদের বাড়ি পাহারা দিতে আসতে হবে না তা বলে দিচ্ছি।
বিষ্ণুকাকু তখন আমতা আমতা করে বলে , না মানে আবার আমার জন্য কষ্ট করে রান্না করবেন তাই বলছিলাম আর কি ----
---- তোমাকে আর কিছুই বলতে হবে না। তোমাকে কে বলল ছেলেদের খাওয়ানোর জন্য রান্না করতে মেয়েদের কষ্ট হয় ? মেয়েরা ছেলেদের খাইয়ে নিজেরাও একধরনের তৃপ্তি পায়। বাদ দাও ওসব কথা , কি খাবে তাই বলো ?
---- সে আপনারা যা খাবেন , তাই খাবো।
----- এই হোল তোমাদের এক দোষ , একবারে স্পষ্ট করে কিছু বলতে জানো না। আমরা জল খাবো , তুমিও তাহলে জল খেয়েই থাকবে তো ?
তার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। সাধনা জিজ্ঞেস করে --- আমি জানতে চাইছি , ভাত না রুটি ?
এবারে বিষ্ণু বলে -- বাঙালির ছেলে , ভাতই হোক তাহলে।
---- হ্যা , ছেলেই বটে। দুই ছেলের বাপ আর বলছে কিনা বাঙালির ছেলে ! তাহলে ছেলেগুলো কি পিলে ?
সাধনার কথা ফের সবাই হেসে ওঠে।
সবার হাসি থামলে সাধনা বলেন , বেশ তোমরা সবাই একটুক্ষণ বসো। আর একদফা চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমরা মা-মেয়েতে ততক্ষণে রান্নাটা সেরে ফেলি। চা করে ছন্দার হাত গিয়ে বৈঠকখানা ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে দ্রুত হাতে রান্না সেরে নেয় সাধনা। ভুবনের সান্ধ্যআসরের বন্ধুরা চলে গেলে বিষ্ণুকে ডেকে খাইয়ে দেয় সে।
তারপর তারাও দু'জনে খেতে বসে। তার নিজের খুব একটা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সে না খেলে মেয়েটাও খাবে না। তাই অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও তাকেও খেতে বসতে হয়।খাওয়া শেষে দু'জনে হাতে হাতে হেঁসেল গুটিয়ে শোওয়ার ঘরে যায়। মুখে একটু জোয়ান নিয়ে সাধনা বলেন , ছন্দা খাটের তলা থেকে হারিমোনিয়ামটা একবার বের করত মা।
হারমোনিয়ামের কথা ছন্দাও জানে। একসময় মনোদা আর সে ওই হারমোনিয়ামেই কাকীমায়ের সঙ্গে গলা সেধেছে। তখন পড়ার শেষে প্রায় প্রতিদিনই কাকীমার সঙ্গে গলা সাধতে বসতে হত তাদের। কি সুন্দর গলা কাকীমায়ের। শুনলে যেন কান জুড়িয়ে যায়। মনোদাও যেন মায়েরই গলা পেয়েছে। মনোদা ক্লাস টেনে ওঠার পর পড়ার ক্ষতি হবে বলে হারমোনিয়ামটা ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল খাটের নিচে। আজ হঠাৎ কাকীমা হারমোনিয়ামটা বের করতে বলায় কিছুটা আশ্চর্য হয়ে ছন্দা বলে -- শরীর খারাপ বলছিলে, তাহলে এখন আবার হারমোনিয়াম বের করে কি হবে ?
---- আহা , কর না তারপর বলছি।
অগ্যতা হারমোনিয়ামটাকে টেনে বের করে ছন্দা।কাকীমা ততক্ষণে মেঝেতে একটা শতরঞ্জ বিছিয়ে ফেলেছেন। ছন্দা হারমোনিয়ামটা তার উপরে রাখতেই সাধনা সস্নেহে ধুলো মুছতে মুছতে বলেন , এটা আমার খুব আদরের জিনিস। শ্বাশুড়িমা কিনে দিয়ে নিজে আমায় গান শিখিয়েছিলেন। তোকেও আমি গান শিখিয়ে দেব। এখন থেকে প্রতিদিন সকাল - সন্ধ্যা তুই রেওয়াজ করবি।
আয় আজ শুরুটা আমি ধরিয়ে দিই। তারপর সুরেলা গলায় শুরু করেন "আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে "।
সঙ্গে সঙ্গে গলা মেলায় ছন্দাও। রাতের নিস্তব্ধতায় সেই সুরের মুর্ছনা যেন একটা অন্যলোকের সৃষ্টি করে।
গান শেষ করে কাকীমা বলেন -- আজ থাক। আয় এবার শুয়ে পড়ি।শোয়ার আগে সাধনাকে ঝুপ করে প্রমান করে বসে ছন্দা। অবাক হয়ে তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সাধনা। তারপর মাথায় হাত রেখে বলে , কি ব্যাপার রে , হঠাৎ করে প্রণাম করে বসলি যে বড়ো ?
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment