Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ১৬



        



          নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


            শুরু হল ধারাবাহিক উপন্যাস -- 















               কালের কারিগর
              

                               অর্ঘ্য ঘোষ

                           (  কিস্তি --- ১৬ )




তারপর মাথায় হাত রেখে বলে ,  কি ব্যাপর রে , হঠাৎ করে প্রনাম করে বসলি যে বড়ো ?  ছন্দা প্রথমে কিছু জবাব দেয় না ,  চুপ করে থাকে। তাই ফের তাড়া লাগায় সাধনা -- কি রে চুপ করে আছিস কেন , কিছু বল ?
অগত্যা মুখ খুলতে হয় ছন্দাকে। কিছুটা আমতা আমতা করে ছন্দা বলে , মা বলেছেন 
গুরুজনদের সঙ্গে শোয়ার আগে আর পরে প্রনাম করতে হয়। নাহলে ঘুমের ঘোরে পা ঠেকে গেলে পাপ হয়।
--- তাই বুঝি ?  মা ঠাকুমার সংগে যখন থাকিস তখন তাদেরও কি প্রনাম করিস ? 
---- না, তা কেন ? তারা তো ---  বলেই জিভ কামড়ে থেমে যায় ছন্দা।
---- বল , বল থামলি কেন ? তারা বাড়ির লোক, আপনার জন। তাই তাদের প্রনাম না করলেও চলে। আমি বাইরের লোক তাই না রে ? আজও আমি তোর কাছে আপন হয়ে উঠতে পারলাম না ? 
অমনি সাধনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ছন্দা। তারপর কান্না ভেজা গলায় বলে, বিশ্বাস করো কাকীমা আমি তোমাকে মায়ের মতোই ভালোবাসি। কি বলতে কি বলে ফেলেছি। তুমি রাগ করো নি বলো ?  
---- জানি রে জানি। বেশ এবার ছাড়। নাহলে এবার দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। তবে এরপর  অকারণে প্রনাম করলে কিন্তু সত্যিই রেগে যাব।
ভুবনের কাছে থেকে প্রায় একই রকম কথা শুনতে হয়েছিল সাধনাকেও। আজ হলো কি সাধনার ?  বারে বারে ঘুরে ফিরে শুধু পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ছন্দার কথা শুনে ফের পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যায় তার। বিয়ের পর দিন শ্বশুরবাড়ির আসার মুখে মা তাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন -- পতি পরম গুরু। রাতে শোওয়ার সময় তার গায়ে পা ঠেকে গেল প্রনাম কোর।
সে অবাক হয়েছিল , সে তো সবাইকে করতে হয়। নতুন করে বলার কি আছে ? 
--- এ পা ঠেকা সেরকম নয়। তোমার দিদিমা--ঠাকুমা বেঁচে থাকলে তারা তোমাকে সব বুঝিয়ে বলতে পারত।  তখন বিষয়টি উপলব্ধি করতে না পারলেও বুঝেছিল ফুলশয্যার রাতে। সব মেয়েদের মতোই সে রাতের কথাও সাধনার মনের মনিকোঠোয় অক্ষয় হয়ে আছে। মনে পড়লে আজও গায়ে পদ্মকাঁটা ফুটে ওঠে তার। ওড়না সরিয়ে ভূবন  তার মুখের কাছে মুখ নামিয়ে আনতেই লজ্জায় সে দুই হাত দিয়ে মুখ চাপা দিয়েছিল।
তারপর ভূবনের বুকে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। ভেঙে গিয়েছিল সমস্ত আগল। তারপর সব শেষে সেও সেই রাতে আচমকাই স্বামীকে প্রনাম করে বসে। ঘটনার আকস্মিকতায় ভুবন প্রথমে কিছু বুঝতেই পারে না। তারপর  তার হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে তার মতোই জিজ্ঞেস করে --  হঠাৎ প্রনাম করে বসলে কেন ?
---- মা বলে দিয়েছেন পতি পরম গুরু। তার গায়ে পা ঠেকলে প্রনাম করতে হয়।
---- করাচ্ছি প্রনাম। যত সব সেকেলে নিয়ম। এদিকে বলা হবে সহধর্মিণী। তার মানে তো সংসার ধর্মপালনে দুজনেই সহযোদ্ধা। তাহলে প্রনামের কি আছে ? কোন কোন গল্প উপন্যাসে পড়েছি বটে সেকালে সহবাসের পর স্ত্রীর স্বামীকে প্রনামের রীতি ছিল। কিন্তু আমি তো অত সেকেলে হতে পারব না। পরদিন প্রনাম করে তাকে আরও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। সে প্রনাম করার পরই ভূবন কিছু বুঝতে না দিয়ে তাকেও প্রনাম করে বসেছিল। আর সে প্রায় ককিয়ে উঠেছিল
--- একি করলে তুমি ? আমার পাপ হবে যে। 
---- হোক পাপ , আমি একাই বুঝি পাপের ভাগী হবো।  মানুষ মাত্রেরই গায়ে পা ঠেকলে কপালে হাত ছোঁয়াতে দেখেছি সবাইকে। তুমিও তো মানুষ। ওইসব করার পর তুমি যদি আমাকে প্রনাম করো তাহলে তো আমাকেও করতে হয়।



            অগত্যা তাকে প্রনাম করা ছাড়তে হয়। ভুবন মানুষটা বরাবরই ওইরকম। আলাদা একটা নীতি আর্দশ নিয়ে চলতে ভালোবাসে। আর সেই জন্যই তাকে এত ভালো লাগে তার। বলতে নেই জ্বর জ্বালা খুব একটা হয় না ভুবনের। ছোট খাটো অসুখ বিসুখ হলে জানতেও দেয় না। ওর শরীরে ওষুধ ঢোকে নি বললেই চলে। কালেভদ্রে কখনও অসুস্থতা ধরা পড়লে মাথা হাত পা টিপে দিতে গিয়েছে সাধনা। আর চপ করে তার হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে ভূবন বলেছে -- আমার সেবা নিতে খুব খারাপ লাগে।
--- কেন ? 
--- অন্যের সেবা নিলে আরাম হয় ঠিকই , কিন্তু রাত জেগে যে সেবা দেয় তার তো কষ্ট কম হয় না।আমি কি তোমাকে এইরকম করে সেবা দিতে পারব ? তার চেয়ে এসো গল্প করি।
ভুবনের কথা শুনে অভিভূত হয়ে যায় সাধনা। ক'জন এরকম করে ভাবতে পারে ?  যখন ঠাকুমা -- দিদিমা বেঁচেছিলেন তখন তাদের মুখেই শুনেছে সংসারের সব ঝক্কি সামালানোর পরও প্রতিদিন শোওয়ার আগে স্বামীর পায়ে তেল মাখিয়ে দিতে হত তাদের। যতই জ্বর জ্বালা , মন খারাপ থাক না কেন, কাজটি তাদের করতেই হত। কিন্তু তাদের কপালে কোনদিন তা জুটত না।ভুবন কিন্তু সেই ধারার নয়।সাধনার তো বটেই , বাড়ির অন্য কারও কিছু হলেই অস্থির হয়ে ওঠে সে। ডাক্তার , ওষুধ -- পথ্য , হাকডাক করে বাড়ি মাথায় করে তোলে।স্কুলেও অন্যরকম নীতি নিয়ে চলেতে ভালোবাসেন। ছেলে যেবার যে ক্লাসে পড়ে সেবার সেই ক্লাসের প্রশ্নপত্র তৈরি করেন না। ছেলেমেয়েরা কেউ নোট কিম্বা সাজেশান চাইলেই বলেন -- নোট করে নাও গোটা বইটাই আমার সাজেশান। বইটা তো দিয়েছে জ্ঞানার্জনের জন্য। খাবলে খুবলে পরীক্ষা পাশের জন্য নয়। তাবলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য দরদও কম নেই। একদিনের বেশি কেউ দুদিন স্কুলে না গেলেই ঠিক হাজির হন তার বাড়িতে। কারও বাড়িতে গিয়ে শোনেন  ফি দিতে পারে নি বলে স্কুলে যাচ্ছে না ছেলেমেয়ে। আবার কেউ জ্বরে বেহুঁশ হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছে। পয়সার অভাবে ওষুধ জোটে নি। সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে টাকা বের করে ফি কিম্বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।ছাত্রছাত্রীর রোগশয্যায় বসে চা খেতে খেতে হাত বুলিয়ে দেন তাদের মাথায়। স্কুল যাওয়া আসার পথে মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে পড়েন। চাষিদের সুখ দুঃখের  খবর নেন। কেউ বলেন , মাস্টারমশাই খুব দু্শ্চিন্তায় আছি। ধানে থোড় এসেছে। এ সময় জোরা দিতে পারলে  ফলনটা একটু ভালো হত। কিন্তু টাকার অভাবে দিতে পারছি না। কেউ বা বলেন - ভুবনদা , এবারে পথে বসতে হবে গো। কুয়াশার দাপটে ধ্বসায় আলুর গাছ  শেষ হতে বসেছে। প্রতিদিনই ওষুধ স্প্রে করতে করতে ধনেপ্রাণে শেষ হয়ে গেলাম।পয়সার অভাবে আর স্প্রে দিতেও পারছি না। পারলে হয়তো কিছু টাকা ঘরে ঢুকত।
শোনা মাত্রই সবার সব প্রয়োজন হয়তো মেটাতে পারেন নি , কিন্তু সাধ্যমতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। সে কে তার টাকা ফেরত দিল , আর কে  দিল না তার কোন তোয়াক্কাই করেন না। 


                          অন্যরা তো বটেই , তার এই গোপন দানের কথা ঘুণাক্ষরে কোনদিন সাধনাকেও বলেন নি।পরে সাধনা ওইসব চাষিদের কাছেই সব শুনেছেন।এলাকার মানুষ ভুবনকে খুব মান্য করেন। তাই তার ওইসব গোপন দানের প্রতিদান দিতেও ভোলেন না। কেউ জমির নতুন আলু , কেউ বা একটা কুমড়ো কিম্বা লাউ, কেউ আবার গাছের এঁচোর কিম্বা কলার মোচা তাদের মাস্টারকে না দিয়ে খাবেন না। সে নিতে ইতস্তত করে।তখনই ওইসব চাষিরা বলেন , সেদিন মাস্টারমশাই জোরার-ওষুধ কেনার টাকা না দিলে এই ফসল হত নাকি ? তারপর একরকম জোড় করে তাকে ওইসব ফসল গছিয়ে দিয়ে চলে যেত। আর স্কুলে থেকে ফিরে সে সব দেখে রীতিমতো রেগে গিয়ে ভুবন বলত -- নিলে কেন তুমি ওসব ? একে ওরা গরীব মানুষ , তার উপরে প্রতিবারই চাষে মার খেতে হয় , এই ফসলটুকু বিক্রি করে তবু তো কিছু টাকা ঘর ঢুকত ওদের।
সে কোন জবাব দিতে পারত না।কিন্তু ওই কারণে তাকে চরম দোটানায় পড়তে হত। কারণ মাস্টার বাড়িতে থাকলে যে  কিছুই ঘরে তুলবেন তা ভালোই জানতেন চাষিরা। তাই বেছে বেছে তার স্কুলে থাকার সময়টুকুই ওইসব নিয়ে আসতেন।সে ফিরিয়ে দিতে চাইলে তারা গলায় অভিমান ছড়িয়ে বলত , অঃ আমরা গরীব বলে বুঝি আমাদের দেওয়া কিছু নেবেন না ?
তাই ফের ওদের ভালোবাসার প্রতিদান নিতে হত তাকে। সমস্যার কথাটা একদিন ভুবনকে বলেছিল সে।তারপর থেকে অবশ্য আর কিছু বলত না। কেবল জেনে নিত কে কি দিয়ে গিয়েছে। তারপর সেইসব চাষিদের বাড়িতেও হয় ছেলেমেয়ের একটা জামা কিম্বা সোয়াটার পৌঁছে যেত। শুধু তাই নয় , বেশিরভাগ পরিবারে ঝগড়া বিবাদ থেকে শুরু করে ভোজকাজ সবেতেই মাস্টারমশাইকে ছাড়া কারও চলে না। কারণ ভুবন একদিকে যেমন দুইপক্ষকে বসিয়ে সুষ্ঠুভাবে ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে দেন অন্যদিকে তেমনি নিজের কন্যাদায়ের মতোই দাঁড়িয়ে থেকে ভোজকাজ উতরে দেন।সাধনার নিজেরই অভাবের সংসার। এক ছটাকও জমিজমা নেই। বেতনের টাকাতেই টেনেটুনে চালাতে হয়। তাই ভুবনের ওই গোপন দানের জন্য প্রায়ই তাকে খুব সংকটে পড়তে হয়। কিন্তু যখন কাউকে বলতে শোনে, ভুবন মাস্টার ছিল বলে এ যাত্রা মেয়েটাকে হাসপাতাল থেকে ফেরত আনতে পারলাম , তখন সব কষ্ট ভুলে যায় সে। স্বামীর জন্য তার গর্বে বুক ভরে যায়। একটাই অভিমান বোধ ছিল তার মনের মধ্যে। ভুবন তার ওই গোপন দানের কথা তার কাছেও গোপন রাখতেন। একদিন সে স্বামীকে জিজ্ঞেসও করেছিল --- আচ্ছা তুমি কাকে কি দাও , তা আমাকেও বলো না কেন ? তোমার কি মনে হয় আমি আপত্তি করব ? না গো না ,  তোমার ওই কাজে আমারও পূর্ণ সমর্থন আছে।
--- না, বিষয়টা তা নয়। আসলে আমি মনে করি ডান হাত যা দেয় , বাঁ'হাতেরও তা অজানা থাকা উচিত। অবস্থার বিপাকে পড়ে কতজনকে হাত পেতে অন্যের সাহার্য নিতে হয়। তাই জানাজানি হলে তাদের মনে অস্বস্তি হতে পারে। তাছাড়া কাউকে সাহার্য করাটা ঢাক পিটিয়ে বলার বিষয়ও নয়। আমি কোনদিন ভোটেও দাঁড়াব না , কারও প্রতিদানেরও প্রত্যাশা করি না , তাই লোক জানিয়ে কি লাভ বলো?
সেদিন স্বামীর কথার কোন জবাব দিতে পারে নি সাধনা। শুধু মনে মনে ভেবে ছিল , এত বড়ো হৃদয় মানুষটার ? সে সত্যিই ভাগ্যবতী।  স্বামীর কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে  পড়ে সাধনা। একসময় ছন্দার ডাকে ঘুম ভাঙে তার। চোখ খুলেই দেখে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে ছন্দা।



                               ( ক্রমশ )


  নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                              ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                      ( ৪ )


         



                       ( ৫ )

                          ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                     ----০----
        




No comments:

Post a Comment