( কিস্তি --- ১৭ )
চোখ খুলেই দেখে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে ছন্দা। তাকে চোখ খুলতে দেখেই ছন্দা জিজ্ঞেস করে -- কি হয়েছে কাকীমা তুমি উঃ আঃ করছিলে ? জ্বর এলো নাকি আবার ?
তারপরই কপালে হাতে দিয়ে বলে --- ইঃ এ যে অনেক জ্বর।
সাধনাও অনুভব করে সেটা। মাথাতেও প্রচন্ড ব্যাথা। ওঠার চেষ্টা করতেই মাথাটা কেমন ঘুরে যায়। সেটা লক্ষ্য করেই বকাবকি শুরু করে ওঠে ছন্দা -- উঠো না, উঠো না। চুপটি করে শুয়ে থাকো তুমি।
---- শুয়ে থাকলে চলবে ? দুনিয়ার কাজ পড়ে আছে। তাছাড়া বাথরুম যেতে হবে। চোখমুখ ধুতে হবে তো নাকি ?
--- সে তুমি বাথরুমে যাবে চল। আমি ধরে নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তারপর নট নড়ন চড়ন।
--- তারপর সব কে সামলাবে শুনি ?
--- কেন আমি কি করতে আছি ? কাকু তো তোমাকে দেখার দায়িত্ব আমাকেই দিয়ে গিয়েছেন নাকি ?
--- ওরে আমার পাকা বুড়ি রে। নে ছাড় দেখি , বাথরুম থেকে তো ঘুরে আসতে দে।
ছন্দা তবু কাকীমাকে ছাড়ে না। হাত ধরে পৌঁচ্ছে দেয় বাথরুমের দরজায়। তারপর রান্নাঘরে ছোটে। চটপট দুজনের জন্য দু'গ্লাস হরলিক্স আর খান কতক বিস্কুট নিয়ে শোওয়ার ঘরে রেখে আসে। ততক্ষণে কাকীমাও বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছেন। হরলিক্স খেতে খেতে ছন্দা বলে, তুমি হরলিক্সটা খেয়ে চুপটি করে শুয়ে থাকো। আমি ওষুধ নিয়ে আসি। যাব আর আসব।
--- ওরে ওষুধ লাগবে না। এমনিই সেরে যাবে।
---- হ্যা , তুমি সব জেনে বসে আছো।
সাধনাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওপাড়ায় ছোটে ছন্দা। গ্রামে দু'জন ডাক্তার। ও পাড়াতেই দুজনের ডিসপেনসারি। তার মধ্যে শ্যামাকান্ত চ্যাটার্জী পাশ করা ডাক্তার। লোকে বলে গলাকাটা ডাক্তার। কেউ চিকিৎসা করাতে ডিসপেনসারিতে গেলেই জিজ্ঞেস করেন -- কত টাকা এনেছিস ? সেই মতো চিকিৎসা করেন। বেশি টাকাআদায় করার জন্য নাকি অপ্রয়োজনেও স্যালাইন দেন। অন্যজন দিবাকর সরখেল হাতুড়ে হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার মানুষ। টাকা পয়সার অত খাঁক নেই। লাউ - কুমড়ো, হাঁস-মুরগির ডিম, যে যা দেন তাই নেন। না দিলেও পরোয়া নেই। রোগীর বাড়ির লোকেদের বলেন , পারলে ঘোড়ার জন্য এক বোঝা ঘাস এনে দিস তাহলেই হবে।গরীব -গুর্বো মানুষেরা তাই তার কাছেই ভীড় করেন।তাদের বাড়িতে রোগ বালাই হলে দিবাকর দাদুকেই ডাকা হয়।কিন্তু কাকীমার চিকিৎসার জন্য কার কাছে যা
বে তা নিয়ে কিছুটা দোটানায় পড়ে সে। কাকীমাকে কিছু জিজ্ঞেসও করে আসা হল না। জিজ্ঞেস করে তো লাভ হোত না। কাকীমা তো বলেই দিয়েছিলেন, ওষুধ আনতে হবে না। এমনিই সেরে যাবে।শেষ পর্যন্ত সে দিবাকরদাদুর কাছেই যাওয়া ঠিক করে।
সেই মতো পৌঁছোয় তার ডিসপেনসারিতে। সেখানে তখন জনা চারেক লোক ওষুধ নেওয়ার জন্য বসেছিলেন। ডাক্তারদাদু তাদের জন্য খল নুড়িতে ওষুধ তৈরি করছিলেন। তাকে দেখেই বলেন --- কি খবর রে দিদিভাই ?
--- কাকীমায়ের রাত থেকে খুব জ্বর।
----- আচ্ছা দাঁড়া , একে ছেড়ে দিই। কাল রাত থেকে ওর ছোট ছেলেটার খুব বমি পাইখানা। তাড়াতাড়ি এক ডোজ ওষুধ পড়া খুব জরুরী।
তারপর বোতলে ওষুধ ভরে কাচি দিয়ে কাগজ কেটে ভাগ করে চিটিয়ে দিয়ে ছেলেটির বাবার হাতে তুলে দেন। লোকটি তিনটি টাকা বের করে ধরতেই দাদু বলেন, আর টাকা আছে , না এইটাই সম্বল ?
--- না বাবু , ওই টাকাটুকুই সম্বল। বিপদ আপদের জন্য আপনার বৌমা সরিয়ে রেখেছিল।
ওই কথা শুনে দাদু টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন , শোন আমাকে টাকা পরে দিয়ে যাস। যাওয়ার সময় বাবুদের কাছে থেকে গোটা কয়েক ডাব কিনে নিয়ে যা। এ সময় ডাবের জলটা পেটের পক্ষে উপকারী। আমাদের গাছে সব নারকেল হয়ে গিয়েছে। নাহলে তোকে কিনতে হত না।
লোকটি বোতল সহ দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে ' আসি বাবু ' বলে বিদায় নেয়। অভিভূত হয়ে যায় ছন্দা। এতদিন নানা জনের মুখে ডাক্তারদাদুর প্রশংসা শুনেছে। আজ স্বচক্ষে সে যা দেখল তাতে তার মনে হয় সত্যিই ডাক্তারদাদু অন্য ধারার মানুষ। এমন মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। ততক্ষণে ডিসপেনসারি ফাঁকা হয়ে এসেছে। ডাক্তারদাদু তার দিকে চেয়ে বলেন --- হ্যা বল তো দিদিভাই , বৌমায়ের হঠাৎ করে জ্বর হয়ে গেল কি করে ? ঠান্ডা লাগিয়েছে বুঝি ?
--- তা তো বলতে পারছি না দাদু। গতকাল বিকাল থেকেই গা ম্যাচম্যাচ করছিল। আর আজ সকাল থেকেই দেখছি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। তবে --
ঠোঁট কামড়ায় ছন্দা। কাকীমার শরীর খারাপ হওয়ার কথাটা ডাক্তারদাদুকে বলা উচিত হবে কি না কে জানে ? আর বলবেই বা কি করে ? তার মনের মধ্যে এক ধরণের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
মা --ঠাকুরমাদের মুখে সে শুনেছে ভগবান আর ডাক্তারের কাছে নাকি কিছু লুকোতে নেই। তাতে হিতে বিপরীত হয়। কাকীমারও যদি ওই কারণেই জ্বর হয়ে থাকে তাহলে ডাক্তারদাদু না জানলে তো ঠিকঠাক চিকিৎসা হবে না। সেই আশংকা থেকেই দোলাচল শুরু হয় তার মনে। তার মধ্যেই ডাক্তারদাদু প্রশ্ন করেন -- কি হলো তবে বলে থামলি কেন ?
---- না , মানে কাকীমার কাল ইয়ে হয়েছে।
---- ইয়ে হয়েছে মানে কি ?
কি বলে সে এখন ? শরীর খারাপ হয়েছে বলতে কেমন লজ্জা লাগছে। তাই সে বলে, ওই যে গো মাসে মাসে মেয়েদের যেটা হয় ---
কথাটা শুনে প্রথমে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন ডাক্তারদাদু। পরক্ষণে মাথা নেড়ে বলেন -- ও বুঝেছি , বুঝেছি। আর বলতে হবে না।
হাফ ছেড়ে বাঁচে ছন্দা। কথাটা বলতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে উঠেছিল সে। অস্বস্তি কাটাতে বলে -- তখন থেকেই তো বলছিল গায়ে মাথায় ব্যাথা।
---- ব্যাথা হয়তো হতে পারে। কিন্তু ওই কারণে জ্বর আসার কথা নয়। যাই হোক ওষুধ দিচ্ছি, গিয়েই এক দাগ খাইয়ে দে। বিকালের দিকে আমি বরং গিয়ে একবার দেখে আসব।
--- তাহলে খুব ভালো হবে দাদু। কাকীমাকে কি খেতে দেব ?
---- যা খেতে চায় তাই দিবি। তবে এসময় কয়েকটা দিন গোলমরিচ দিয়ে পেঁপে কাচা কলা আর কই কিম্বা মাগুর মাছের ঝোলভাত দিতে পারলেই ভালো হয়।
--- বেশ সেই ব্যবস্থাই করব। দাদু আপনাকে কত টাকা ----
---- আর একবার বল দেখি টাকার কথা --বলেই হাত তুলে তাকে চাটি মারতে আসেন ডাক্তারদাদু। আর সে ঝুপ করে বসে পড়ে দে ছুট। যেতে যেতেই বলে ---- বিকালের দিকে যেও কিন্তু দাদু।
--- যাব রে যাব।
ফেরার পথেই জেলেপাড়ার স্বাদেশ্বরী মাসীর কাছে থেকে দুটো কই আর মাগুর মাছ নিয়ে একেবারে বাড়ি ফেরে ছন্দা। তারপর মাছ ক'টা রান্নাঘরে রেখে ওষুধটা নিয়ে শোবারঘরে পৌঁছোতেই দেখে কাকীমা কাতরাচ্ছেন। গা জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে। সে দ্রুত ওষুধটা খাইয়ে দিয়ে ন্যাকড়া আর জলের বাটি নিয়ে কাকীমার মাথার পাশে বসে জলপট্টি দিতে শুরু করে।
জলপট্টি দিতে দিতে সে একবার তাদের বাড়িতে খবর পাঠানোর কথা ভাবে।নিজে তো আর কাকীমাকে ফেলে যেতে পারবে না। কাউকে পেলে খবরটা পাঠিয়ে দিতে হবে ও বাড়িতে। সম্ভবত ওষুধ আর জলপট্টি দেওয়ার ফলে জ্বরটা নেমে যায়। আর কাকীমাও ঘুমিয়ে পড়েন। সেই সুযোগে ছন্দা দ্রুত স্নান সেরে রান্না চাপিয়ে দেয়।রান্না শেষ হতেই ঘুম ভাঙে কাকীমার। সে দ্রুত গিয়ে কপালে হাত দিয়ে দেখে আর জ্বর নেই।তারপর কাকীমাকে গা মুছিয়ে দিয়ে ভাত বেড়ে নিয়ে শোওয়ার ঘরে আসে ছন্দা।
তার দৌড়ঝাঁপ দেখে সাধনা বলেন -- আমাকে নিয়ে আজ তোর খুব ধকল গেল তাই না রে ?
--- ধকল কিসের ? তুমি সুস্থ থাকলে এত সব করতে দিতে আমাকে ?
--- কিন্তু তুই একা হাতে আজ যা করলি তা বোধহয় আমিও পারতাম না রে।
--- না পারতে না ? বেশি বোকো না তো। খেয়ে নাও।
কাকীমাকে খাইয়ে নিজেও চাট্টি খেয়ে এসে ফের কাকীমার কপালে বুকে হাতে দিতে থাকে ছন্দা। তারপর ফের একদাগ ওষুধ খাইয়ে দিয়ে বলে , ভাবছি কাউকে দিয়ে একবার ও বাড়িতে খবরটা দিই ।
অমনি তার হাত চেপে ধরে কাকীমা বলেন , এখনই ও বাড়িতে খবর পাঠানোর দরকার নেই। ওদের ছোটাছুটি পড়ে যাবে। এখন তো একটু সুস্থ আছি। সন্ধ্যেবেলায় তো তোর বাবা আসবেই তখন বললেই হবে ক্ষণ।
অগত্যা ও বাড়িতে খবর পাঠানোর চিন্তা ছাড়তে হয় ছন্দাকে। সে কাকীমার পাশে শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। দেখতে দেখতে রোদ মরে আসে। আর বাইরে থেকে 'ঘোড়া এসেছে ঘোড়া এসেছে ' বলে চিৎকার শোনা যায়। ছন্দার মনে হয় ডাক্তারদাদুরই ঘোড়া। সে গিয়ে দরজা খুলে দেখে তার অনুমানই ঠিক। দরজার সামনে সাদা ঘোড়া থেকে নামছেন ডাক্তারদাদু। ঘোড়াটা সামনের একটি বটগাছের শিকড়ে বাঁধতে বাঁধতে ডাক্তারদাদু তাকে জিজ্ঞেস করেন -- এখন কেমন আছে বৌমা ?
--- এখন ভালো আছেন। তোমার দেওয়া ওষুধ খেয়েই কমে গিয়েছে।
--- কমতেই হবে। পাশ করা ডাক্তার না হতে পারি , ডাক্তারিটা যে বাপ-ঠাকুরদা হাতে ধরে শিখিয়েছেন। আর ওষুধপত্রের কোন দরকার হবে বলে মনে হয় না। তবে এসেছিই যখন তখন একবার দেখেই যায় চল।
ডাক্তারকাকুকে নিয়ে শোওয়ার ঘরে পৌঁচ্ছে দিয়ে রান্নাঘরে যায় ছন্দা। তারপর দ্রুত হাতে ডবল ডিমের ওমলেট আর চা বানিয়ে নেয়। ডাক্তারদাদুর পয়সার খাঁক নেই , কিন্তু খেতে খুব ভালোবাসেন। পেটুক হিসাবে সুনামও রয়েছে। তবে তাকে খাইয়ে সুখও আছে। কলাইবাটা দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ালেও লোকের কাছে এমনভাবে গল্প করেন যেন বিরিয়ানি খেয়েছেন।চা আর ওমলেট খেতে খেতে ডাক্তারদাদু বলেন -- আর জ্বর আসবে না বলেই মনে হয়।
ডাক্তার দাদুর কথা শুনে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে ছন্দার।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment