( কিস্তি ---- ১৮)
কথা শুনে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে ছন্দার। চা আর ওমলেট খেতে খেতে ডাক্তারদাদু বলেন , খুব ভালো হয়েছে রে। তুই করলি এসব ?
ছন্দা কিছু বলার আগেই মুখ খোলেন সাধনা। ছন্দাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন -- ও ছাড়া করার কেই বা আছে ? আজ যা করল তা বোধহয় পেটের মেয়েও করতে পারত না।
ডাক্তারদাদু বলেন , তা ভালোই তো মা। সবদিকে খেয়াল রাখার মতো এরকম একজন থাকা তো খুব ভালো।
--- তা যা বলেছেন কাকা। মা আমার একেবারে সাক্ষাৎ দশভূজা।
---- কাকীমা তুমি না , বলে লজ্জা ঢাকে ছন্দা।
ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে ডাক্তারদাদু বলেন --- আসি রে দিদিভাই। আর কিছু ওষুধ লাগবে না। ওতেই সেরে যাবে বলেই মনে হয়। তবু পারলে কেমন থাকে একবার খবর দিস।
---- নিশ্চয় দেব দাদু।
ডাক্তারদাদু বিদায় নিতেই মনোদার পরীক্ষা কেমন হলো জানার জন্য উতলা হয়ে পড়েন কাকীমা। সে নিজেও তো সমান উতলা হয়ে রয়েছে। পরীক্ষা কেমন হয়েছে তা একমাত্র রাজীব আর সৌমেনদার কাছেই জানা যাবে। ওরাই একমাত্র বাড়ির গাড়িতে যাতায়াত করে পরীক্ষা দিচ্ছে। রামপুরহাটে যাওয়ার সময় কাকীমা কাকু আর মনোদাকে বার বার করে বলে দিয়েছেন প্রতিদিন কেমন পরীক্ষা হচ্ছে সেই খবর যেন রাজীদের মাধ্যমে পাঠানো হয়।
রাজীবদের কাছে থেকে সেই খবরটা নেওয়ার জন্য সাধনা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু কাকেই বা পাঠায় এখন ? ছন্দাকে পাঠানো যেত, কিন্তু মেয়েটা সারাদিন তার জন্য যা দৌড়ঝাঁপ করে বেরিয়েছে তাতে মেয়েটাকে আর ওপাড়া পাঠাতে মন চায় না তার।কিন্তু সাধনাকে কিছু বলতে হয় না। ছন্দাই এক সময় বলে ওঠে, কাকীমা একবার ও পাড়ায় গিয়ে মনোদার পরীক্ষার খবরটা নিয়ে আসব ?
---- যেতে পারবি ? যা দেখি মা সৌমেনের কাছে খবরটা নিয়ে আয় দেখি। মনটা বড়ো উতলা হয়ে রয়েছে।
--- পারব না কেন ? মনোদার পরীক্ষা কেমন হলো তা জানতে আমারও জানতে খুব ইচ্ছা করছে।
---- অঃ তাই বুঝি ? যা তাহলে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে , ফিরতে দেরি করবি না কিন্তু।
--- না, না আমি যাব, আর আসব।দ্রুত পায়ে ওপাড়া অভিমুখে হেটে চলে ছন্দা। পাড়ায় ঢোকার মুখেই সৌমেনদাদের বাড়ি। রাজীবদাদের বাড়ি একেবারে শেষ প্রান্তে। সেই হিসাবে কাকীমা সৌমেনদার কাছেই খবরটা নিয়ে যেতে বলেছেন। কিন্তু তার কাছে খবর নিতে যেতে মন চায় না ছন্দার। তার দৃষ্টিটা কেমন যেন লাগে ছন্দার। তাছাড়া সৌমেনদার নামে নানা কথাও কানে এসেছে ছন্দার। বাড়ির কাজের মেয়েকে একা পেয়ে জোর করে নাকি চূড়ান্ত অসভ্যতা করেছিল সে।
তারপর আদিবাসী পাড়ায় একই নোংরামি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। আদিবাসীরা বেধড়ক মারধোর করে গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল।বাড়ির লোকেরা খবর পেয়ে জরিমানা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। সেই সব কথা ভেবেই ছন্দা সৌমেনদাদের বাড়ি পেরিয়ে রাজীবদাদের বাড়ি যায়। রাজীবদা তখন সবে গাড়ি থেকে নেমেছে। ছন্দাকে দেখে বলে, মনোর পরীক্ষার খবর নিতে এসেছিস তো ? খুব ভালো পরীক্ষা হয়েছে রে , বলে দিস
কাকীমাকে।
--- তোমার আর রুম্পাদির পরীক্ষা ভালো হয়েছে তো রাজীবদা ?
--- হ্যা রে, আমাদের পরীক্ষাও ভালো হয়েছে।
রাজীবের কাছে বিদায় নিয়ে খুশী মনে বাড়ি ফেরে ছন্দা।
কাকীমা যেন তার ফেরার প্রতীক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন।সেটা লক্ষ করেই ছন্দা বলে , কাকীমা রাজীবদা বলল মনোদার খুব ভালো পরীক্ষা হয়েছে।
তার কথা শুনে কাকীমা প্রথমে কপালে হাত ঠেকান তারপর বলেন, তুই আবার কষ্ট করে রাজীবের বাড়ি গেলি কেন ? সৌমেনের বাড়ি তো কাছেই ছিল।
কাকীমার প্রশ্নে ঠোট কামড়ায় ছন্দা। আসল কারণটা তো বলা সম্ভব হয় না। তাই সে বলে , আসলে রাজীবদার বাড়ির কাছেই আমার বান্ধবী সুজাতারও বাড়ি।তার সঙ্গে দেখা করা হবে বলেই রাজীবদার বাড়িই গিয়েছিলাম।
আর কোন প্রশ্ন করেন না কাকীমা। তারই মধ্যে সন্ধ্যা নামে। কাকীমার গরদের কাপড়টা পড়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখায় ছন্দা। ততক্ষণে কাকুর সান্ধ্যআসরের বন্ধুরা একে একে এসে পৌঁছোন। কাকীমার অসুখের কথা শুনে তাদের কিছু না জানানোর জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন সবাই। বাবা তো বকাবকিই শুরু করে দেন --- আমাদেরও তো একটা খবর দিতে পারতিস।
ছন্দা কোন কথা বলে না। তার পরিবর্তে মুখ খোলেন সাধনা।বাবার উদ্দেশ্যে কাকীমা বলেন , ওকে বকাবকি কোর না বাপু। ওর কোন দোষ নেই। ও খবর দিতেই চেয়েছিল। আমিই বারণ করেছিলাম।
---- আপনিই বা বারণ করলেন কেন ? বাড়াবাড়ি হলে ওইটুকু মেয়ে কি করে সামলাত ?
---- ওকে আর ওইটুকু মেয়ে বলো না। সারাদিন যা করল ও একাই , দেখে তো আমি 'থ' বনে গিয়েছি। তাছাড়া বাড়াবাড়ি হলে তো তোমাদের খবর দিতেই হত। আসলে জ্বরটা কমে গেল বলেই আর তোমাদের খবর দিলাম না। তোমরা শুধু শুধু দৌড় ঝাঁপ শুরু করে দিতে।
সেই সময় ছন্দা চা নিয়ে পৌঁছোতেই তখনকার মতো আলোচনাটা থেমে যায়। তারপর একা হাতেই রাতের খাবার তৈরি করে নেয় ছন্দা। সেদিন থাকার পালা ছিল বাবার।
বাবাকে খেতে দিয়ে তারাও দুজনে খেয়ে বিছানা নেয়।জ্বর আর ওষুধের ঘোরে কাকীমা শোওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন। দিনভর ছোটাছুটির ক্লান্তিতে ছন্দাও ঘুমিয়ে পড়ে।পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে বাবার ডাকে। চোখ খুলে দেখে বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। বাবা বোধ হয় বাড়ি যাবে। দরজা খুলে দিতে হবে। তার আগে চটপট একটু চা করে দিতে পারলে ভালো হয়। ততক্ষণে চোখ মেলে চেয়েছেন কাকীমাও।ছন্দা দ্রুত কাকীমার কপালে হাত ছুঁইয়ে দেখে বলে, জ্বরটা আর নেই। তবে এখন একটু শুয়ে থাকো। আমি বাবাকে চা করে দিয়ে আসছি।
--- চল আমিও যাই। শুধু শুধু শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। আজ আর তুই গিন্নি বুড়ির মতো শাসন বারণ করিস নে। দে না বাবা , আজ উঠে যেতে আমায়। বলেই করুন চোখে ছন্দার দিকে চেয়ে থাকেন সাধনা। সেই মুখ দেখে হাসি পায় ছন্দার। কাকীমাকে মনে হয় যেন ছোট্ট একটি মেয়ে। অগত্যা ছন্দাকে মেনে নিতে হয় কাকীমার আবদার। তবে কপট শাসনের সুরে বলে -- উঠছো উঠো , কিন্তু আজ তোমার একদম কিচ্ছুটি করা চলবে না। এক জায়গায় চুপটি করে বসে থাকতে হবে।
----- এটা কিন্তু তোর একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। জ্বরজ্বালা নেই, তবুও শুধু শুধু বসে থাকা যায় ?
---- ওসব শুনছি না। কাকুরা কেউ বাড়িতে নেই। তাই এখন আমি যা বলব তোমাকে তাই শুনতে হবে।
---- ওরে তোর কাকুও এমন ধারা শাসন আমাকে কোন দিন করেন নি।
সেই সময় তাদের কথবার্তা শুনে হাসিমুখে দরজার সামনে এসে দাঁড়ান বাবা। তাকে দেখে কাকীমা বলেন , দেখেছো ঠাকুরপো তোমার মেয়ের শাসনের বহর খানা একবার দেখেছো। একেবারে যেন মিলিটারি শাসন।
---- ওকি আর আমাদের মেয়ে আছে বৌদি ? ওতো এখন আপনাদের মেয়ে হয়ে গিয়েছে। আমি বাইরের লোক হয়ে আপনাদের বিষয়ে নাক গলাতে চাই না। যা হয় আপনারা মা মেয়েতেই করুন।
----- মেয়ে তো নয় , যেন মা মনসা।
----- হ্যা তাই মনে থাকে যেন, লেজে পা পড়লেই ফোঁস। বলে সাপের ছোবল মারার ভঙ্গিতে হাতটা সাধনার নাকের সামনে গিয়ে নাচাতে থাকে ছন্দা। আর সাধনা বলেন , আমার কাছেও ইশ্বরমূল আছে। মাথায় সেই জরি চাপিয়ে দিলে ফনা নামিয়ে পালানোর পথ পাবি না।
দুজনের রসিকতায় এক অপরূপ স্নিগ্ধতায় ভরে যায় পরিবেশ। ছন্দা আর কথা বাড়ায় না। মুখ হাত ধুয়ে চায়ের জল চাপায়। সাধনা বাথরুমে ঢোকেন। বাথরুম থেকে বেরোতেই বাবা আর কাকীমা চা বিস্কুট দেয় , নিজেও নেয়। চা খেতে খেতেই ছন্দা সাধনার উদ্দেশ্যে বলে , কিছু জিনিসপত্র ফুরিয়েছে। বাবাকে দিয়ে আনিয়ে হয় না ?
কাকীমা বলেন , হ্যা, আনিয়ে নে না। আলমারিতে টাকা আছে। কত কি লাগবে , আন্দাজ করে বের করে দে। দেখ বালিশের তলায় চাবি আছে।
কথাটা শুনে কেমন ইতস্তত করে ছন্দা। সে জানে আলমারিতে টাকা - পয়সা গয়নাগাটি সব সমস্ত দামি জিনিস থাকে। এর আগে তো কোনদিন সে আলমারিতে হাত দেয় নি। তাই কেমন যেন লাগে তার। সেটা লক্ষ্য করেই সাধনা বলেন, শুধু আমার উপরে খবরদারি করলেই হবে ? ওসব কে সামলাবে শুনি ? আর তুই তো নিজের কানেই শুনলি তোর বাবা বলেই দিলেন তুই এখন আমাদের মেয়ে হয়ে গিয়েছিস। আর নিজের মেয়ে থাকতে মা কেন ওইসব করতে যাবে ?
আর কোন কথা চলে না। ছন্দা গিয়ে বাজারের টাকা আর থলে এনে বাবার হাতে দিয়ে বলে - ওই সঙ্গে কই আর মাগুর মাছ এনো। ডাক্তারদাদু এখন কয়েকটা দিন কাকীমাকে ওইসব মাছের ঝোল করে দিতে বলেছেন।
তার কথা শুনে কাকীমা নাক কুঁচকে বলেন --- আবার সেই কই মাগুরের কষটে ঝোল ? তার চেয়ে আজ একটু অন্য মাছ দিয়ে কড়া করে তেঁতুল দিয়ে টক কর দেখি। জ্বরের মুখে খুব টক খেতে ইচ্ছে করছে।
---- ইঃ খুব আর কি ? টক খেয়ে অম্বল না বাঁধালে যে ষোলকলা পূর্ন হবে না।
ছন্দার কথা শুনে হাসি ফুটে ওঠে সাধনার মুখে। দুদিনেই মেয়েটা কেমন পাকাগিন্নির মতো কথাবার্তা বলতে শিখে গিয়েছে। মেয়েরা তো এইরকমই হয়। বয়েস যাই হোক না কেন , কর্তৃত্ব পেলে একেবারে যথার্থ কর্ত্রী হয়ে উঠে। সেও তো এই বয়েস থেকে শাশুড়িমায়ের প্রচ্ছন্ন প্রশয়ে সবার উপরেই কর্তৃত্ব করত। সস্নেহে বাকিরা তো বটেই , শ্বশুরমশাইও প্রশয় দিতেন তাকে।
ফেরার মুখে ছন্দা বাবাকে বলে, তুমি বরং একবারে ডাক্তারদাদুর ডিসপেনসারি ঘুরেই যেও।কাকীমার আর জ্বর আসে নি বলে দিও।
সাধনা বলেন , দেখছো ঠাকুরপো মায়ের আমার সবদিকে কেমন খেয়াল ?
---- সেই তো দেখছি , বলে হাসতে হাসতে বাবা ও পাড়ার পথ ধরেন। দেখতে দেখতে গতানুগতিক ভাবে দিনগুলো কেটে যায়। কেবল বিকালের দিকে উদ্বেগ শুরু হয়ে যায় দুজনের। মনোতোষের পরীক্ষার খবর না পাওয়া পর্যন্ত কেউ মনে স্বস্তি পায় না। ছন্দা নিয়ম করে প্রতিদিন রাজীবদার কাছে থেকে মনোদার পরীক্ষার খবর নিয়ে আসে। আর সেই খবর আনতে গিয়েই একদিন বিপদের মুখে পড়তে হয় তাকে।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment