( কিস্তি --- ১৯ )
সেই খবর আনতে গিয়েই একদিন বিপদের মুখে পড়তে হয় তাকে। ঘটনাটা ঘটে ছিল শেষ পরীক্ষার আগের দিন। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও রাজীবদার কাছে থেকে খবর নিয়ে ফিরছিল সে। বান্ধবীর বাড়ি হয়ে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এমনিতেই এই রাস্তায় মানুষের চলাচল একটু কম। তার উপরে হঠাৎ করে টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বুড়ো শিবমন্দিরের কাছটা আরও নির্জন হয়ে পড়ে। সেখানে পৌঁছোতেই হঠাৎ সৌমেনদা ধুমকেতুর মতো তার পথ আগলে দাঁড়ায়। মনে মনে প্রমাদ গোনে ছন্দা।
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সৌমেনদার দিকে। সৌমেনদাই তাকে জিজ্ঞেস করে -- মনোর পরীক্ষার খবর আনতে গিয়েছিলি বুঝি ?
--- হ্যা, কেন ?
---- মনোর সঙ্গে তোর অত আসনাই কিসের রে ?
---- কি যা তা বলছো ?
----- যা তা আমি বলছি , না তুই করছিস। নেকুরে নেকু খাই ঢুকু।
---- পথ ছাড়ো। তোমার সঙ্গে কথা বলতেও ঘৃণা হয়।
--- তা তো হবেই। মন জুড়ে যে তোর মনোদার বাসা।
---- জানোই যখন তখন উল্টো পাল্টা কথা বলতে তোমার লজ্জা করছে না ? মনোদা না তোমার বন্ধু ?
---- সে তুই মনোদাকে যত ইচ্ছে মন দে আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা ছিটেফোঁটা প্রসাদ পাব না তাই কি হয় ?
--- শুনেছি তুমি অনেক জায়গায় অপদস্থ হয়েছো , তাও তোমার লজ্জা হয় না ?
---- লজ্জা - ঘৃণা ভয়, আমার জন্য নয় -- বলেই আচমকা ছন্দার হাত ধরে শিবমন্দিরের পিছন দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সৌমেন।
আর সেই সময় যেন ছন্দার উপর এক অদৃশ্য শক্তি ভর করে। তারই জোরে এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সৌমেনের গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে দে ছুট।
ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় সৌমেন। গালে হাত বুলোতে বুলোতে সে বলে -- মনে থাকবে। সুযোগ পেলেই সুদে আসলে উসুল করে নেব।
কথাটা কানে যেতেই পিছন ফিরে একদলা থুতু ছুড়ে দিয়ে বাড়ির দিকে হাটা লাগায় ছন্দা।মনে মনে ভাবে , শয়তানটার খপ্পড়ে পড়ে কি ভাগ্যে সে মনোবল হারিয়ে ফেলে নি। না হলে কি যে হোত কেজানে। মনোদা কেন যে এইসব ছেলের সঙ্গে মেশে ? কতবার মনোদাদের বাড়ি যেতে দেখেছে ওকে। সেই হিসাবে মনোদার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক গড়ে উঠতে চলেছে তা তো সে আগেই জানত। তাস্বত্ত্বে তার দিকে হাত বাড়াতে বিবেকে বাধে না ? এদের মতো ছেলেদের কাছে বন্ধুত্বের কোন দামই নেই। মনোদাকে বলতে হবে শয়তানটার সঙ্গে যেন আর না মেশে। শয়তানটার স্পর্শে সারা শরীরটা যেন ঘিন ঘিন করে ওঠে। বাড়ি ফিরে সাবান গিয়ে হাত ধুয়েও মনে অশুচি ভাব যায় না। খাওয়া - দাওয়া সবই করে , কিন্তু মনের মধ্যে ঘটনাটা ঘুরপাক খেতে থাকে। বিষয়টি চোখ এড়ায় না সাধনার। ছন্দাকে চেপে ধরে
সে --- এসে থেকে দেখছি তোর মনটা উতলা হয়ে রয়েছে ? মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু যেন লুকাচ্ছিস আমার কাছে। মনোর পরীক্ষাও ভালো হয়েছে বললি। হ্যারে সত্যি তো ?
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না ছন্দা। সাধনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। কাঁদতে কাঁদতে ঘটনার কথা কাকীমাকে খুলে বলে ছন্দা। শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান সাধনা। ছন্দার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলেন , শয়তানটার সম্পর্কে নানা সময় কানাঘুষোয় নানা কথা শুনতাম। কিন্তু এতদুর অধঃপতন হয়েছে ভাবতেও পারিনি। কাঁদিস না , তোর কাকু ফিরুক, দেখ না ওকে বলে কেমন শায়েস্তার ব্যবস্থা করি।
তবু কান্না থামে না ছন্দার। সাধনাও ওকে কিছুক্ষণ কাঁদতে দেন। তারপর বলেন -- হারমোনিয়ামটা বের কর। আয় একটা গান করি। গানই মানুষের সমন্ত গ্লানি দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।সেইমতো দুজনে মন ঢেলে গায় --- " তুমি নির্মল করো --- "। গান শেষ হলেও বেশ কিছুক্ষণ তার রেশ থেকে যায়। কেউ কোন কথা বলতে পারে না। এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে যায় দুজনের মন। ঘুম নেমে আসে দু'জনের চোখে।
সকালে ঘুম ভেঙেও পুলকানুভুতিতে ভরে ওঠে দুজনের মন। আট দিন পর আজ ফিরছে দুজনের মনের মানুষ। আটদিন নয় যেন আট যুগ। এর আগে এতদিন ভুবনকে ছেড়ে থাকে নি সাধনা। মনোদাকে মন দেওয়ার পর ছন্দাও তাকে এতদিন না দেখে থাকে নি। তাই দুজনেই বিকালের প্রতীক্ষায় যেন ক্ষণ -- মুহুর্ত গুনতে শুরু করে। শুরু হয়ে যায় চূড়ান্ত ব্যস্ততাও। আটদিন পর ওরা বাড়ি ফিরছে , তার উপরে মনোদার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে তাই আজ বাড়িতে একটু ভালো খাওয়ার আয়োজন করতে চান কাকীমা। নিজের মনের ইচ্ছাটা ছন্দার কাছে ব্যক্ত করেন তিনি। ছন্দাও কথাটা শুনে যেন একপায়ে খাড়া।
সে বলে, কি কি বাজার করতে হবে চটপট বলে দাও। আমি সব কেনা কাটা করে নিয়ে আসি।
---- দাঁড়া আগে কতজন হচ্ছে ঠিক করে নিই।
---- অন্য কাউকে বলবে নাকি ?
---- বলতে তো হবেই রে। বাড়িতে ভালো কিছু হলে তোর কাকুর সান্ধ্যআসরের বন্ধুদের তো না খাইয়ে আমরা কিছু খাই না। ওই দলে তোর বাবা থাকলেও তোর মা-ঠাকুমাকে বলতে হবে।মনোর দুএকজন বন্ধুবান্ধব যেমন ধর রাজীব, এতদিন মনোর পরীক্ষার খবরাখবরএনে দিয়েছে , তারপর রুম্পাকেও বলতে হবে। নিমন্ত্রিতের তালিকায় রাজীবদা আর রুম্পাদির নাম শুনে মনটা কেমন যেন হয়ে যায় ছন্দার। ওরা থাকলে তো সে আর মনোদাকে নিজের করে পাবে না। ওদের নিয়েই তো মনোদাকে ব্যস্ত থাকতে হবে।
পরক্ষণেই সে মনকে সান্ত্বনা দেয়, একদিন বই তো নয়, তারপর মনোদা তো তারই থাকবে। তাছাড়া সত্যিই তো রাজীবদা নিয়মিত মনোদার পরীক্ষার খবর এনে দিয়েছে। পরীক্ষার আগে রুম্পাদির উপরে কত বড়ো ঝড় বয়ে গিয়েছে। এই আনন্দের দিনে ওদের নিমন্ত্রণ করলে ভালোই হবে। সেই কথা ভেবেই মনের মধ্যে জমাট বেঁধে যাওয়া অভিমানের মেঘটা সরে যায়। আয়োজনের চিন্তায় ছন্দার মনের এই পট পরিবর্তন অবশ্য চোখে পড়ে না সাধনার। ছন্দা বলে , কাকীমা আর একজনকে বললে হত না ?
--- কে রে , তোর কোন বান্ধবী ? তা বল না, যাকে বলতে চাস।
কাকীমার কথাটা শুনে খুব ভালো লাগে ছন্দার। এ বাড়িতে তার বান্ধবীদেরও নিমন্ত্রণ করার অধিকার রয়েছে ভেবে বুকটা একটা অন্যরকম অনুভূতিতে ভরে যায়। কিন্তু আজ সে মনোদার ভাগ আর কাউকে দিতে চায় না। তাই সে বলে -- না গো কাকীমা কোন বান্ধবী নয় , বলছি ডাক্তারদাদুকে বললে হতো না? উনি তোমার অসুখে ওষুধের পয়সা নেন নি। তাছাড়াখাওয়া দাওয়া করতে খুব ভালোবাসেন।
--- ইস, খুব ভালো মনে পড়িয়ে দিয়েছিস তো। ভুল হয়ে গেলে লজ্জায় আর মুখ দেখাতে পারতাম না। সেদিন আমাকে দেখতে এসে উনি নিজেই তো বলে গেলেন, ছেলে ফিরলে একদিন কবজি ডুবিয়ে খেয়ে যাব বৌমা।
তারপর আচমকা ছন্দাকে কাছে টেনে নেন সাধনা। একটু আদর করে দিয়ে বলেন, এইজন্যই তোকে আমার এত ভালো লাগে। ডাক্তারকাকার কথাটা মনে পড়িয়ে দিয়ে খুব বড়ো একটা লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলি আমাকে। খুব সজ্জন মানুষ উনি। তোর মনোদা যখন ছোট তখন এদিকে এলেই আমাদের বাড়ি একবার ঢুকতেন। আর মনো ঘোড়ায় চাপার জন্য কান্নাকাটি করত।
সেই কান্না থামাতে কখনও মনোকে নিজের কোলে বসিয়ে আবার কখনও বা একাই ওকে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে লাগাম ধরে কিছুটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসতেন। মনোকেও খুব স্নেহ করেন উনি। সেই মনোর পরীক্ষা উপলক্ষ্যে খাওয়াদাওয়ায় তাকে বলতে ভুলে গেলে আর আফশোসের অন্ত থাকত না। এবার যা দেখি মা , চটপট এইবেলা সবাইকে রাতে খাওয়ার কথা বলে দিয়ে আয়।
ছন্দাও যেন যাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল। বাবার সংগে রোজ সন্ধ্যায় দেখা হলেও টানা আট দিন সে মা-ঠাকুমাকে দেখে নি। এর আগে সেও বাড়ি ছেড়ে টানা এতদিন কোথাও থাকে নি। কাকীমার অসুখ আর কাজকর্মের ব্যস্ততায় এতদিন ভুলে থাকলেও বাড়ি যাওয়ার কথা উঠতেই যেন আর তর সই না তার। তাই যেন হাওয়ায় ভেসে বাড়িতে পৌঁছোয় সে। বাড়ি ঢুকেই সামনে পেয়ে যায় ঠাকুমাকে। তার হাত ধরে ' ঠাকুমা-ঠাকুমা ' বলে পাক কতক ঘুরে নেয়। ঠাকুমা বলেন -- ওরে ছাড় ছাড়, এবার পড়ে যাব।
ঠাকুমার গলা শুনে রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসেন মা'ও। তখন ঠাকুমাকে ছেড়ে মায়ের হাত ধরেও একই ভাবে চরকি পাক ঘুরে নেয় সে। ততক্ষণে বাবাও গোয়ালচালা থেকে এসে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছেন। ছন্দাকে কাছে টেনে নিয়ে ঠাকুমা বলেন -- মেয়ে তো আমাদের বেশ বড়ো হয়ে গিয়েছে গো। আমাদের ছেড়ে থাকতে তো আর কোন কষ্ট হয় না। এবার ওর বিয়ে দিয়ে দিলেও দিব্যি শ্বশুরঘর করতে পারবে।
বাবার সামনে বিয়ের কথা ওঠায় লজ্জা পায় ছন্দা। লজ্জা ঢাকতে বলে --- ঠাকুমা তুমি না --- তোমার সেই শুধু একই কথা।
--- সাধে কি আর এক কথা বলি ভাই ? বয়স হয়েছে , আজ আছি কাল নেই। যাওয়ার আগে বুঝি আমার নাতজামাইয়ের মুখ দেখে যেতে ইচ্ছা করে না ?
---- আবার সেই এক কথা ? বলেই ঠাকুমায়ের মুখে হাত চাপা দেয় ছন্দা। মনে মনে বলে , নাতজামাইকে দেখে নি যেন !
ঘটনার আকস্মিকতা কেটে যাওয়ার পর মা বলেন, হ্যা রে তাই তো বটে , দিদির শরীর ভালো আছে তো? তোর তো আজ আসার কথা নয়। মনোরা তো এখনও ফেরে নি। তাহলে হঠাৎ চলে এলি যে বড়ো? হ্যারে কিছু হয় নি তো ?
ছন্দা আসার উদ্দেশ্যটা খুলে বলে সবাইকে। তারপর যেমন এসেছিল তেমনি ঝড়েই মতোই বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে। ঠাকুমা চিৎকার করে বলে ওঠেন, এতদিন পরে এলি, কিছু একটা মুখে দিয়ে যা।
ছন্দাও চিৎকার করে বলে -- এখন সময় হবে না। আরও নিমন্ত্রণ বাকি আছে। আমি না ফেরা পর্যন্ত কাকীমা পথ চেয়ে বসে থাকবে।
ঠাকুমা বলেন, পিছু ডেকে ফেলেছি। লক্ষী ভাই আমার একটিবার ফিরে আয়।
ঠাকুমার কথা শুনে পিছিয়ে এসে ছন্দা বলে , পিছুই যখন ডাকলে তখন কিছু একটা খেয়েই যায়। বলেই ঠাকুরমায়ের গালে একটা চুমু খেয়ে ডাক্তারদাদুর ডিসপেনসারির পথ ধরে ছন্দা। ঠাকুমা আর কিছু বলার সুযোগ পান না। মেয়ের কান্ড দেখে শব্দ করে হেসে ওঠেন বাবা মা।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment