Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ২০

       


                   

          নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


            শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 












               কালের কারিগর
              

                          অর্ঘ্য ঘোষ


                        ( কিস্তি --- ২০)





মেয়ের কান্ড দেখে শব্দ করে হেসে ওঠেন বাবা -- মা।নাতনী বেরিয়ে যেতেই শান্তিলতা তার গমন পথের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলেন, মেয়েটা শরীরেই বড়ো হয়েছে। মনটা এখনও সেই শিশুর মতোই আছে।
--- হ্যাঁ তা আছে বটে , কিন্তু মা মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না। ওর বয়েসেই তো ওকে পেটে ধরেছিলাম আমি। এবারে তো ওকে নিয়েও কিছু একটা ভাবতে হয়। শাশুড়ির কথার পিঠে বলে অতসী।
--- আমাদের কালের কথা বাদ দাও। ছন্দার বয়সে আমার কোলেও তো মলয় এসেছিল। কিন্তু এখন কি আর সেই দিনকাল আছে মা ? এখন তো আর  ইচ্ছে হলেও আঠারো বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়াও যাবে না। তাতে নাকি মেয়ের স্বাস্থ্যহানি আর সাংসারিক অশান্তি বাড়ে। কি জানি আমাদের সময়ে তো এমনটা ছিল না।
এবারে মুখ খোলে মলয়। সে বলে , মা তোমাদের সময়েও বধু নির্যাতন, বধুহত্যা ছিল। কিন্তু সে সময় আইন এত কড়া ছিল না , সংবাদ মাধ্যমেরও এত প্রচার ছিল না। তাই জানা যেত না সব ঘটনা। নাহলে দেখ না আমাদের গ্রামেরই কত লোকের ৩/৪ টি করে বিয়ে। হয় আগের পক্ষের বৌদের মেরে ফেলা হয়েছে , নয়তো অল্প বয়েসে বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে।  বছরও ঘোরে নি , ওইসব লোকেরাই ফের ঘরে তুলেছেন নতুন বৌ। আর এখনও অল্প বয়সে যেসব মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে দেখছি তাদের তো রোগবালাই - এর অন্ত নেই। একটা ছেলেপুলের মা হওয়ার পর সব হাড় জিরজিরে কংকালসার চেহারা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 
--- তাও বটে। তোর বাবারই অনেক বন্ধুরও তো ২/৩ টি করে বিয়ে। সেইসময় তাদের নিয়েও নানা কানাঘুষো শোনা যেত। এখনও যা সব শুনি অপচ্ছন্দ কিম্বা পণের জন্য মেয়েকে মেরে কড়িকাঠে ঝুলিয়ে দিচ্ছে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা।
অতসী বলে , শুনেই হাড়হিম হয়ে যায়। আমার একটাই মেয়ে। দূরে অচেনা - অজানা কারও ঘরে পাঠাতে পারব না।
--- দূরে অচেনা - অজানা ঘরে পাঠানোর দরকার কি মা ? ঘরেই যখন আমাদের অত ভালো একটা ছেলে আছে , তখন ভাবনা কিসের ?
শাশুড়িমা যে মনোতোষের কথা বলছেন তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার। তাই সে বলে  ---  কিন্তু মা , সেই কপাল কি আর আমার মেয়ের হবে ? মনো বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। লেখাপড়া , আচার-আচরণ সবেতেই গ্রামের সেরা ছেলে। কত মেয়ের বাবা টাকা ঢেলে দিয়ে জামাই করতে চাইবে তাকে। তখন কি আর ছন্দাকে মনে ধরবে ?
--- তোমার মনে যদি সেই আশংকাই থাকে তাহলে তো  মেয়েটাকে ওদের বাড়িতে ফেলে রাখাটাই উচিত হয় নি।বিয়ের কথাটা অন্ততপক্ষে একবার ছুঁইয়ে রাখাটা উচিত ছিল। নাহলে একবার বদনাম রটে গেলে তখন তো অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়াও সমস্যা হবে।
মলয় আর চুপ করে থাকতে পারে না। মা আর স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সে বলে , আমার মনে হয় তোমাদের আশংকা অমূলক। আমি ওদের যতদুর চিনি, তাতে মনে হয় টাকা পয়সা ওদের কাছে কোন বড় ব্যাপার নয়। তাছাড়া ওরা ছন্দাকেও মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। আভাসে ইংগিতে যতটুকু বুঝেছি তাতে ওরাও মনে মনে ছন্দাকে ছেলের বৌ করে ঘরে তোলার কথাই ভেবে রেখেছেন। না হলে ওরা যা বিবেচক মানুষ তাতে মেয়েটাকে ওভাবে নিজেদের বাড়িতে আটকে রাখতেন না। তাই এখনই ওদের কাছে থেকে বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেওয়াটা ভালো দেখায় না।  আমি অন্তত পারব না।
---- ঠিক আছে তোকে কিছু করতে হবে না। আমরা তো আজ ও বাড়ি যাচ্ছি। এক সময় কায়দা করে আমিই বরং মনোর মায়ের কাছে কথাটা পাড়ব।



                                 সেদিন বিকাল থেকেই ও বাড়িতে চূড়ান্ত ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। শেষ বিকালেই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন ভুবনবাবু। তাদের সাড়া পেয়েই দরজার মুখে দৌড়ে যায় ছন্দা আর সাধনা। দুজনেই এক পলক নিজের নিজের মনের মানুষের দিকে চেয়ে থাকেন। দেখে যেন কারও আশ মেটে না। কিন্তু অন্যের চোখে ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকায় নিজেদের সংযত করে তারা। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের পর বাড়ির ভিতরে পা রাখে সবাই। পোশাক বদলেই স্ত্রীর সঙ্গে জমে থাকা আট দিনের গল্পে মেতে ওঠেন ভুবনবাবু। ছন্দারও মনোদার সঙ্গে একান্তে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু কাকু- কাকীমার সামনে লজ্জায় সেটা পারে না। কিন্তু কাকীমাই তাকে সেই সুযোগটা করে দেন। ছন্দা তখন দু'কাপ চা নিয়ে সবে বসার ঘরে পা রেখেছে অমনি কাকীমা বলেন , টেবিলে রাখ।মনো খাবে কিনা দেখ। ওই সঙ্গে তুইও খেয়ে নে। এরপর  মা--মেয়েতে কাজে লেগে পড়তে হবে তো।
এইজন্যই কাকীমাকে এত ভাল লাগে তার। ঠিক যেন সবার মনের কথাটা পড়তে পারেন। মন খারাপ থাকলে যেমন রবী ঠাকুরের গানের মাধ্যমে মনে প্রশান্তি ফিরিয়ে দেন , এখন তেমনই মনোদার জন্য তার মন উচাটন ভাব দেখেই বোধহয় পরোক্ষে সুযোগটা করে দিলেন। সে 'ও মনে মনে এতক্ষণ এটাই চাইছিল। তাই আর দেরি না করে দু'কাপ চা নিয়ে মনোদার পড়ার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু চৌকাঠের কাছে পৌঁছোতেই লজ্জায় যেন তার পা আটকে যায়। বিশেষ করে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় মনোটার সেই কান্ডটার কথা মনে পড়তেই তার পা যেন আড়ষ্ট হয়ে যায়। ঘরের ভিতর থেকেই সেটা উপলব্ধি করে মনোদাও।তাই বাইরে এসে একবার বাবা-মায়ের ঘরের দিকে চোখ বুলিয়ে নেয় সে। ছন্দার হাত থেকে কাপ দুটো নিয়ে টেবিলে রাখে। তারপর ছন্দার হাত ধরে নিয়ে যায় ঘরে। মুখোমুখি বসে দুজনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কেউ কোন কথা বলে না। কিন্তু দুটি হৃদয়ের স্পন্দন যেন এক হয়ে যায়। সেটা টের পায় দুজনেই। আজ নিজে থেকেই মনোদার কাছে ধরা দেয় ছন্দা।মাথাটা এলিয়ে দেয় মনোদার বুকে। মনোতোষ আদরে সোহাগে ভরিয়ে দেয় তাকে। এক সময়  মনোদার ঠোঁটের কাছে পৌঁছে যায় ছন্দার ঠোঁট। সেই ঠোঁটের  উপর নেমে আসে মনোতোষের পিপাসার্ত ঠোঁট। দুজনের ভুলে যায় চা খাওয়ার কথা। টেবিলে ততক্ষণে চা জুড়িয়ে জল। কিন্তু চা টা নিয়ে তো বেরনো যাবে না। কাকীমার চোখে পড়ে গেলে কি নির্ঘাত সব ধরা পড়ে যাবে। তাই জুড়িয়ে জল হয়ে যাওয়া চা'টাই সরবতের মতো ঢকঢক করে খেয়ে নেয় তারা। তারপর একে অন্যের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে ওঠে দু'জনে। তাদের হাসির শব্দে টনক নড়ে সাধনার। তাদের ঘরেও যে এতক্ষণ একই ঘটনার অবতারণা হয়।এর আগে তো এত দীর্ঘসময় তারা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকে নি। তাই  তারাও একে অন্যের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল এতক্ষণ। ছেলে-মেয়ে দুটোর হাসির শব্দে তাই লজ্জা পেয়ে যায় সাধনা।কাপড়ের আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে চায়ের খালি কাপ দুটো নিয়ে বেরিয়ে আসে সে। কাকীমায়ের চোখ মুখে লজ্জা-- লজ্জা ভাবটা চোখ এড়ায় না ছন্দার। সে বুঝে যায় তাদের মতো কাকু-কাকীমাও এতক্ষণ আদরে সোহাগে ডুবেছিল। এই জন্যই বোধহয় বলে মেয়েদের জহুরীর চোখ। এই সব বিষয়গুলো ঠিক অন্যের কাছে ধরা পড়ে যায়। 
ছন্দার মুখের ভাব পরিবর্তনও চোখ এড়ায় না সাধনার। সে লক্ষ্য করে ছন্দার চোখে মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ।তার বুঝতে কিছু বাকি থাকে না।মনে মনে ভাবে , নাঃ এবার ওদের বিয়ের কথাটা পাকা করে ফেলতে হবে।বিয়ে যেদিন হবে হোক, অন্তত ফাইন্যালটা হয়ে থাক।আজ তো ছন্দার বাড়ির সবাই আসবে, সম্ভব হলে আজই কথাটা একান্তে পেড়ে রাখবে। একে অন্যের মুখের ছাপ পড়ে ফেলায় আড়ষ্টতা দুজনকেই ঘিরে ধরে।অস্বস্তিতে কেউই কথা বলতে পারে না। ভুবনবাবুই সেই আড়ষ্ঠতা থেকে দু'জনে উদ্ধার করেন। 
দুজনকেই উদ্দেশ্য করে বলেন , মা-মেয়ে মিলে সবাইকে নিমন্ত্রণ তো করে এসেছো। 
কিন্তু এখন থেকে রান্নায় হাত না লাগালে ওদের খাওয়াবে কি ?
অমনি পরিবেশটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে কাকীমা বলেন -- আয় দেখি মা চটপট হাতে হাতে রান্নার যোগাড়টা করে ফেলি।




                          কিন্তু ছন্দাকে আর হাত লাগাতে হয় না। একে একে এসে পড়েন তার মা - ঠাকুমা , কাকুর সান্ধ্য আসরের অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে বাবাও। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই রুম্পাদি, রাজীবদার পাশাপাশি পৌঁছোন ডাক্তারদাদুও।সবার হাঁকডাক , কথাবার্তায় সরগরম হয়ে ওঠে গোটা বাড়ি। সেদিন আর মেয়েদের কাউকে হেঁসেলে ঢুকতে হয় না। কাকুর সান্ধ্য আসরের বন্ধুরাই হেসেলের দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে তুলে নেন।কাকুর বন্ধুদের মধ্যে নীলকণ্ঠ কাকুর রান্নার হাত খুব ভালো। গ্রামের গরীব মানুষের বাড়ির ভোজ কাজে তিনিই বিনা পয়সায় রান্না করে দেন। সেই কন্ঠকাকুই রান্নার দায়িত্ব নেন। বাকিরা কোমর বেঁধে যোগাড়যন্ত্র শুরু করে দেন।তদারকি করতে করতে কাকু আর ডাক্তারদাদু খোসগল্পে মেতে ওঠেন। ঠাকুমা আর মাকে বসার ঘরে নিয়ে গিয়ে গল্প জুড়ে দেন কাকীমাও। ছন্দারাও মনোর পড়ার ঘরে রামসীতা খেলায় মেতে ওঠে। প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময় তারা এই খেলাটা খুব খেলত। তারা সবাই সবুজকলি বিদ্যাপীঠে পড়ত। তাই রামসীতা খেলতে খেলতেই যেন প্রাইমারী স্কুলের দিনগুলোতে ফিরে যায় সবাই।ছন্দা জিজ্ঞেস করে , রুম্পাদি পণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ির পিছনে কাঁচা মিঠে আম পেড়ে খাওয়ার কথা তোমার মনে আছে ? 
---- মনে নেই আবার ? আম পেড়ে খেতাম আর পণ্ডিতমশাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে সুর করে বলতাম -- আম খাবার কোটাল কে ?  
উত্তরে ছন্দা বলে -- আমি।
--- মারব কাকে ?
--- যাকে খুশি তাকে।
রাজীব আর মনোতোষ বলে, আমরাও ' কাঁই রে কাঁই , পরের ছেলেকে লাগলে পড়ে নাম দোষ নাই ' বলে কাঁইটা ( অপুষ্ট আঁটি ) পন্ডিত মশাইয়ের বাড়ির দিকেই ছুড়ে দিতাম।
আর পন্ডিত মশাই প্রশয় মেশানো গলায় হাক পাড়তেন -- কে রে , যাই দাঁড়া ? তার হাঁক পাড়াই সার হত।আমরা কেউ গাছতলা ছেড়ে নড়তাম না। ততদিনে আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে , পন্ডিতমশাই ছাত্রছাত্রীদের নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসেন।মুহুর্তের মধ্যেই যেন মনোদার ঘরটা সবুজকলি বিদ্যাপীঠ হয়ে ওঠে।সেদিনের সেই রাতটা আজও স্মৃতির সঞ্চয় হয়ে আছে ছন্দার মনের মনিকোঠায়।



                           (  ক্রমশ  )


  নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                              ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                      ( ৪ )


         



                        ( ৫ )

                              ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                      ----০----
        





No comments:

Post a Comment