( কিস্তি --- ২১ )
সেদিনের সেই রাতটা আজও স্মৃতিতে সঞ্চয় হয়ে আছে ছন্দার মনের মনিকোঠায়। সে রাতেই যে সে তার স্বপ্নের প্রথম সিঁড়িতে পা রেখেছিল। চোখের সামনে যেন রাতটা ছবির মতো ভেসে ওঠে। সেই রাতটা সবাই যে যার মতো করে কাটিয়েছিল।মনোতোষের পড়ার ঘরে যখন ছন্দারা খেলায় বিভোর তখন বসার ঘরে সাধনারাও নানা গল্প গুজবে মগ্ন। তারই মাঝে শান্তিলতা কেবল উসখুস করে চলেন। কিন্তু কি করে যে মনোতোষের সঙ্গে ছন্দার বিয়ের প্রসঙ্গটা তুলবেন তা ভেবে পান না। নানা দুশ্চিন্তা ভীড় করে তার মনের মধ্যে। সাধনা কথাটা কেমন ভাবে নেবে কে জানে ? কথাটা বলতে গিয়ে মুখ পুড়িয়ে বাড়ি ফিরতে হবে না তো ? সে বড়ো লজ্জার ব্যাপার হবে। বিশেষ করে আজকের দিনে বিষয়টা জানাজানি হলে ছেলের কাছে মুখ দেখাতে তো পারবেই না, সারা গাঁয়ে ঢিঢি পড়ে যাবে। তখন হিতে বিপরীত হবে।
আবার কথা না বলেও মনে কোন স্থিরতা পান না। কথায় আছে ঘি আর আগুন এক জায়গায় রাখতে নেই।অনর্থ হতে কতক্ষণ ? চরম দোটানায় পড়ে যান শান্তিলতা। সাধনাই শেষ পর্যন্ত তাকে সেই দোটানার হাত থেকে উদ্ধার করে। সে'ই বলে , মাসীমা এসেছেন ভালোই হয়েছে। অতসী আছে। একটা কথা কয়েকদিন ধরেই ভাবছি। সেটা আজ বলতে চাই।
সাধনার কথা শুনে তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান শান্তিলতারা।সাধনা ফের বলতে শুরু করেন , আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে ছন্দাকে আমার মনোর বৌ করতে চাই।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন শান্তিলতা। মনে মনে ভাবেন , এ যেন মেঘ না চাইতেই জল।মুখে শুধু বলেন , এতো খুব ভালো কথা মা। আমরাও তো এতদিন মনে মনে মনোর হাতেই ছন্দাকে তুলে দেওয়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু পাছে তোমরা কিছু মনে কর তাই সাহস করে কিছু বলতে পারি নি।
--- কেন মাসীমা , ভয়ের কি আছে ?
---- না , মানে মনোর বাবা যদি ছেলের বিয়ে নিয়ে অন্য কিছু ভেবে থাকেন।
---- না মাসীমা, উনি সে রকম মানুষই নন। ছন্দাকে উনি নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। তাছাড়া এই নিয়ে আমরা দুজনে আলোচনা করেই সব ঠিক করেছি।
এবারে মুখ খোলে অতসী। সে বলে --- নিশ্চিন্ত হলাম দিদি। মেয়েটার অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে শান্তি পেতাম না। মনোকে আমরাও নিজের ছেলের মতোই দেখি। বিয়ের পর দুটিতে দুই বাড়ির ছেলে মেয়ে হয়ে থাকবে।
---- কিন্তু একটা কথা আছে।
---- কি কথা দিদি ?
--- মনোর বাবা চান , কথাটা যেন এখনই পাঁচকান না হয়। উনি মনে করেন , এখন তো ওরা পড়াশোনা করছে। বিয়ের চিন্তা মাথায় ঢুকলে ওদের পড়াশোনার ক্ষতি হতে হতে পারে।
কথাটা বলেই সাধনার মনে হয় , এ আসলে ভাবের ঘরে চুরি করা হচ্ছে। চাঁদে গ্রহণ লাগলে ঢাকা থাকে না। তবু চেষ্টা করতে হবে।
অতসী বলে, পাঁচকান কেন হবে দিদি। তোমরা যেমনটি বলবে তেমনটিই হবে। আমরা আগ বাড়িয়ে কাউকে কিছু বলতে যাব না।
কথাটা বলার পরে সাধনার মতো অতসীও মনে মনে ভাবে জানতে কি আর ওদের কিছু বাকি আছে।মুখে অবশ্য কিছু বলে না। মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তাটা দূর হয়ে যাওয়ায় মনটা হালকা হয়ে যায় তার। স্বস্তি পান শান্তিবালাও। একসময় ডাক্তারবাবু বলে ওঠেন , আজকের এই আনন্দ অনুষ্ঠানে গান বাজনা না হলে যেন ঠিক মানাচ্ছে না।
ভুবনবাবুর সান্ধ্যআসরের বন্ধুরাও এক বাক্যে সায় দিয়ে ওঠেন -- ঠিক বলেছেন কাকা , দাদা -- বৌদির গলায় গান হয় নি বহুদিন। আজ হয়ে যাক এই উপলক্ষ্যে।ডাক্তারবাবু বলেন -- কি ভুবন হবে না কি ?
---- আপনারা চাইলে আমার সাধ্য কি না বলি।ডাকুন আপনার বৌমাকে।
ডাকতে হয় না , ডাক্তারকাকার গলা পেয়েই বারন্দায় ঢালাও শতরঞ্চ বিছিয়ে বসে গানের আসরের ব্যবস্থা করে সাধনা। একে একে ছন্দা, মনোতোষ , রুম্পারাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে সেই আসরে। ডাক্তারবাবু নিজেও গান পাগল মানুষ। ভাল তবলা বাজান। তিনিও একদিকে তবলা নিয়ে বসে যান। অন্যদিকে হারমোনিয়ামের সামনে সাধনা, ভুবন। সাধনা প্রথমেই ধরেন " আজি আনন্দধারা বহিছে ভূবনে।"
তারপর একের পর এক গানে কখনও গলা মেলান ভুবনবাবু , কখনও ছেলেমেয়েরা। সুরের মুর্ছনায় ভেসে যেতে থাকে দশদিক। ডাক্তারবাবু বলেন , মন ভরে গেল। দেখতে দেখতে সময়টা যে কি করে কেটে যায় তা কেউ টের পায় না। খাওয়ার ডাক পড়তেই সবার খেয়াল হয়। সবার মনে হয় রান্নাটা আর একটুক্ষণ দেরি হলেই ভালো হত। খাওয়া দাওয়ার পর অন্যান্যদের মতো রাজীব আর রুম্পাও বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ছন্দা আর মনোতোষ ওদের টর্চ দেখিয়ে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বের হয়। ভূবনের সান্ধ্য আসরের বন্ধুরাই এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মনোদাই দায়িত্বটা নিজের ঘাড়ে নেয়। তাই মনোদার সঙ্গে ছন্দাকেও যেতে হয়। তাকে সংগে যেতে দেখে রুম্পা মজা করে বলে , কি রে আজ আবার সাঁকো থেকে ফেলে দেওয়ার মতলব নেই তো তোর ?
সেদিনের সেই কথা মনে পড়তেই হো হো করে হেসে ওঠে মনোতোষরা। আর ভীষণ লজ্জায় পড়ে ছন্দা। লজ্জা ঢাকতে সে বলে --- রুম্পাদি তুমি না! এখনও সেই কথাটা মনে রেখেছো ?
---- আরে এতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে। তুই আমার বোন না। দিদি আর বোনে এই রকম তো হতেই পারে , তাই না ?
ওই কথা শুনে রুম্পাদিকে খুব ভালো লেগে যায় ছন্দার। অথচ মনোতোষকে ঘিরে এই রুম্পাদিই সেদিন যেন তার চোখের বালি হয়ে উঠেছিল। কথাটা মনে পড়তেই যেন মরমে মরে যায় ছন্দা। তাই নিঃশব্দে রুম্পাদির পাশে পাশে সে হাটতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য স্বাভাবিকতা ফেরে। মাধ্যমিক পাশের পর কে কোথাই পড়বে সে আলোচনায়
মশগুল হয়ে ওঠে রুম্পাদিরা।
তাদের স্কুলে এখনও উচ্চ মাধ্যমিক হয় নি। তাই মাধ্যমিকের পর এই এলাকার ছেলে মেয়েদের বাইরে কোথাও কোন আত্মীয়বাড়ি কিম্বা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে হয়। তাদের গ্রাম থেকে কাছাকাছির মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ানো হয় নলহাটির স্কুলে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের পর ফের সেই রামপুরহাট কলেজেই পড়তে যেতে হয় বলে অধিকাংশ ছেলেমেয়েই মাধ্যমিকের পর একেবারে রামপুরহাট কলেজেই ভর্তি হয়ে যায়। তাতে পরবর্তীকালে ভর্তি হওয়ার ঝামেলা থাকে না। মনোতোষ রামপুরহাটেই ভর্তি হবে ঠিক হয়েছে। তবে কোন আত্মীয়ের বাড়িতে নয় , হোস্টেলে থেকেই সে পড়াশোনা করবে। নিজের ছেলের পড়াশোনার দায় আত্মীয়দের ঘাড়ে চাপানো ভুবনবাবুর না পচ্ছন্দের। রাজীবদা অবশ্য কান্দীতে তার মামার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করবে। রাজীবদাদের ওই কথা শুনে দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে রুম্পাদির। অবরুদ্ধ গলায় সে বলে, আমার আর পড়া হবে কিনা কে জানে ? নেহাত স্যার ছিলেন বলে পরীক্ষাটা দেওয়া হলো। বাইরে রেখে আর আমাকে পড়াবে বলে মনে হয় না।
মনোতোষ বলে, সে কি কেন ?
---- যদি আমি কিছু অঘটন ঘটিয়ে বাবা--মায়ের মুখ পোড়ায় তাই। সব থেকে খারাপ লাগছে কোথাই জানিস ? এরপর কে কোনদিকে ছিটকে যাব তার ঠিক নেই। সেই প্রাইমারী থেকে একসঙ্গে আছি , হয়তো আর তোদের সঙ্গে দেখাই হবে না।
রুম্পাদির কথায় মুহুর্তের মধ্যে পরিবেশটা ভারি হয়ে ওঠে কেউ কোন কথা বলতে পারে না। নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় ওরা পৌঁচ্ছে যায় রুম্পার বাড়ি। তাকে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথেই পড়ো শিবমন্দিরটার কাছে আসতেই সেদিন সৌমেন শয়তানটার অসভ্যতার কথা মনে পড়ে যায় ছন্দার। একবার ভাবে কথাটা বলে মনোদাকে। বলে, কেমন বন্ধুর সঙ্গে মেশো তুমি ? মেয়েদের একা পেলেই যে নোংরামি করে ? পরক্ষণে ভাবে, থাক আজকের এই আনন্দের দিনে কথাটা বলে মনোদার মন খারাপ করে দিয়ে লাভ নেই। পরে কোন একদিন বললেই হবে।
সেই সময় শিবমন্দিরের পিছনের বট গাছটায় কিসের একটা ডানা ঝাপটানোর শব্দ শোনা যায়। লোকে বলে ওই গাছে নাকি বৈহ্মদৈত্যের বাস।
সেই কথাটা মনে পড়তেই ভয়ে কেঁপে ওঠে ছন্দা। তার হাত থেকে টর্চটা পড়ে নিভে যায়।
ছন্দা আরও ভয় পেয়ে মনোতোষকে জড়িয়ে ধরে। মনোতোষ ধরে তার হাত। তারপর দুজনে -- ' ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি / রাম লক্ষ্মণ বুকে আছে করবে আমার কি ?' আউড়াতে আড়তাতে বাড়ির দিকে দে ছুট। বাড়ি পৌঁছেও হাত ছাড়ার কথা ভুলে যায় দুজনে। ভুলে যায় ছড়া আউড়ানো বন্ধ করার কথা। ছেলেমেয়ের কান্ড দেখে বাবা--মায়েরা হেসে ওঠে।সাধনা এগিয়ে এসে ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন, হয়েছে তো বীরত্ব দেখানো। তখন কাকুরা
পৌচ্ছে দিতে চাইলেন , তা শোনা হোল না। এখন ভুতের ভয়ে --- ভুত আমার পুত বলা হচ্ছে ?
মনোতোষ বলে , আমি মোটেই ভয় পায় নি। ছন্দাই তো --- বলতেই ছন্দা তার হাতে সবার অলক্ষ্যে একটা চিমটি কাটে। আর তাতেই থেমে যায় মনোতোষের কথা। মনে মনে ভাবে -- কথার টানে কি বলতে যাচ্ছিল সে ? ছন্দার জড়িয়ে ধরার কথাটা বলে ফেললে লজ্জায় মাথা কেটে যেত। তাকে সজাগ করে দিয়ে সেই লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সপ্রশংস দৃষ্টিতে চায় মনোতোষ।
ছেলের সাফাই শুনে কটাক্ষ করে সাধনা বলেন, হ্যা তুমি কত সা্হসী তা আর জানতে বাকি নেই আমার।এই তো সেদিন পর্যন্ত মেঘ ডাকলে ঘুমের ঘোরেও আমার গলা জড়িয়ে ধরতে মনে নেই ?
---- মোটেই না ?
এইভাবেই মা--ছেলের অম্লমধুর উতোর চাপানে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়। তারপরই যেন ঘনিয়ে আসে বিষাদের ছায়া।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment