( কিস্তি ---- ২২ )
তারপরই যেন ঘনিয়ে আসে বিষাদের ছায়া। আজই মা-বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাবে ছন্দা। তার ব্যবহার্য জিনিসও ব্যাগে গুছিয়ে রেখেছে সে। সাধনার মন খুব খারাপ। আগে থেকে তো অন্যরকম টান তো একটা ছিলই , এই কয়েকদিনেই মেয়েটা যেন নিজের পেটের সন্তান হয়ে উঠেছিল। কিছুতেই তাকে ছেড়ে দিতে মন চায় না সাধনার। কিন্তু আর তো আটকে রাখাও ভালো দেখায় না। উপায় থাকলে সে আজই পুত্রবধু হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে আটকে দিত ছন্দাকে। কিন্তু সেটা তো এখনই সম্ভব নয়।
দু'জনেরই পড়াশোনা শেষ হতে দেরি আছে। কিন্তু আজই সে সম্পর্কের গিটটা বেঁধে দিতে চায়। তাই ছন্দাকে কাছে ডেকে নিজের গলার হারটা খুলে পড়িয়ে দেয় তার গলায়। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে কেউ কিছু বলতে পারে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তীব্র আপত্তি জানিয়ে ছন্দা বলে -- একি তোমার হার আমার গলায় পড়ালে কেন ? না-না, খুলে নাও , খুলে নাও।
--- শোন বড়রা কেউ কিছু দিলে ফেরত দিতে হয় না। আমার মেয়েটা চোখের সামনে খালি গলায় ঘুরে বেড়াবে আর আমি বুঝি বুড়ি বয়সে হার পড়ে থাকব ?
--- আহা, তুমি মোটেও বুড়ি নও। কে তোমাকে বুড়ি বলছে , আমার সামনে বলুক তো দেখি একবার।
---- বা রে বুড়িকে বুড়ি বলবে না তো কি বলবে ? কবে ছেলেপুলের মা হয়েছি। আমাদের সময় হলে তো এতদিনে আমরা ঠাকুমা কিম্বা দিদিমা হয়ে যেতাম নাকি বলো ভাই অতসী ?
ইংগিতটা বোঝে ছন্দা। তাই লজ্জা এড়াতে মা কিছু প্রত্যুত্তর করার আগেই সে বলে , আমি অত সব জানি না। তোমার চুলও পাকে নি। দাঁতও ভাঙে নি।তাই তুমি বুড়ি নও।তাছাড়া মা বুঝি খালি গলায় থাকলে মেয়ের খুব ভালো লাগবে ? বলেই ছন্দা হারটা খুলতে যাওয়ার উপক্রম করেতেই তার হাত ধরে আটকান সাধনা। তারপর বলেন, মাও খালি গলায় থাকবে না রে। আরও একটা হার আছে , কাল বের করে পড়ে নেব , তাহলে হবে তো ?
সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়ে ছন্দা। কিন্তু তার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। নিজের বাড়ি ফিরে যাচ্ছে সে। আনন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু আনন্দ হওয়ার পরিবর্তে তার মন যেন বিচ্ছেদ ব্যাথায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। সেটা নজর এড়ায় না সাধনার। তাই ছন্দাকে কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলেন -- বাবা - মা ঠাকুমা এসেছেন, তাই তাদের সঙ্গে বাড়ি যাচ্ছ যাও , কিন্তু রোজ অন্তত একটিবার কাকীমায়ের সঙ্গে দেখা করে যেতে হবে। না হলে কিন্তু আমি খুব রাগ করব। আর কথাও কবলব না কিন্তু। কি মনে থাকব ?
ফের সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে কাকীমার বুকে মুখ গুঁজে বাচ্চা মেয়ের মতো আদর খেতে থাকে ছন্দা। আর সাধনা তার মাথায় বুলিয়ে দেন সোহাগের পরশ মাখা হাত। ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মনোতোষও। তারও মন কেমন করে। সেই পরীক্ষার আগে থেকে তাদের বাড়িতে রয়েছে ছন্দা। একসময় মেয়েটির বিষয়ে আলাদা কোন অনুভুতিই ছিল না তার। বাবার বন্ধুর মেয়ে , স্কুলের ছাত্রী। ব্যস ওইটুকুই। কিন্তু তারপর তার পড়ার জিনিস গুছিয়ে দেওয়া , বইপত্র খুঁজে দেওয়া থেকে হাতে হাতে জল, হরলিক্স এগিয়ে দিতে দিতে কখন যে মেয়েটা তার মনে জায়গা করে নিয়েছিল তা টের পায় নি সে। তারপর তো মন দেওয়া নেওয়া , শরীরের স্পর্শে কাছাকাছি চলে আসে দুজনে। যেন একটা অদৃশ্য সুতোর টানে বাঁধা পড়ে যায় তারা।
সেই টানটা মনোতোষ ভালোভাবে অনুভব করে পরীক্ষা দিতে গিয়ে। ক্ষণে ক্ষণে কেবলই ছন্দার কথাই মনে পড়ত তার। পরীক্ষার কথা ভেবে ছন্দার চিন্তা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করত।কিন্তু তা কি পুরোপুরি পারত ? পারত না। কেবলই মনে পড়ত ছন্দার দুষ্টুমি ভরা চোখে মুখ তুলে চাওয়া , মুখ টিপে টিপে হাসি কিম্বা প্রথম স্পর্শের কথা।
একই অনুভূতি হয় ছন্দারও। সেও ভাবে বাড়ি গিয়ে মনোদাকে ছেড়ে থাকবে কি করে ? এখন যে মনোদাকে সে চোখে হারায়। তবে দিনে একবার দেখা তো হবেই। কাকীমা তো সেই পথটা করেই দিয়েছেন। সময় সুযোগ মতো সেও মনোদাকে মাঝে মধ্যে তাদের বাড়ি যেতে বলবে। তাকে বলতে হয় না। অতসীই বলে উঠেন, মনো বাবা তুমিও কিন্তু যাবে আমাদের বাড়ি।
মনোতোষও এই কথাটাই শোনার জন্য যেন মুখিয়ে ছিল। কিন্তু বাবা -- মায়ের সামনে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। সাধনাই তার হয়ে বলেন , যাবে বইকি ভাই নিশ্চয় যাবে। ছন্দাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে তো ওকেই যেতে হবে। তারপর বাড়ির পথে পা বাড়ায় ছন্দারা। তাদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গিয়ে ছন্দার সঙ্গে এক পলক চোখাচোখি হয়ে যায় মনোতোষের। সেই এক পলকেই সবার অগোচরে দুজনের চোখে চোখে অনেক কথা হয়ে যায়। এক সময় পথের বাঁকে মিলিয়ে যায় ছন্দারা।
দোর দিয়ে ঘরে ঢোকেন সাধনা। মনটা তার সত্যিই খারাপ। অথচ এমন হওয়ার তো কথা নয় , আট দিন পর স্বামী - সন্তান ফিরেছে, তার খুশী হওয়ার কথা কিন্তু ওই একটি মেয়ের অভাব যেন সেই আনন্দ ম্লান করে দিচ্ছে। স্বামীকেও সে কথা বলেন সাধনা। স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়ে ভুবনবাবু বলেন, মনটা আমারও খারাপ। টানা এতদিন আমাদের বাড়িতে ছিল মেয়েটা। কিন্তু পরের মেয়েকে ধরে রাখব বললেও তো চলে না।
স্বামীর বুকে আরও কিছুটা ঘন হয়ে আবদারের গলায় সাধনা বলে , আর কিন্তু বেশিদিন ওকে পরের মেয়ে করে রাখতে পারব না তা বলে দিচ্ছি তোমাকে। তোমরা তো বাপ বেটা স্কুলে চলে যাও। আমার সময় কাটে না। মেয়েটা থাকলে তবু গল্পগুজব করে কেটে যাবে।
---- ওকে ছেলের বৌ করে ঘরে তোলার জন্য তোমার যে তর সইছে না তা তো গলার হার খুলে পড়িয়ে দেওয়া দেখেই বুঝেছি। কিন্তু ওদের পড়াশোনা শেষ করতে হবে তো। বিশেষ করে মনোর একটা চাকরি বাকরি না হলে বিয়েটা দেবে কি করে ?
---- চাকরির বাকরির কথা জানি না। ছন্দার ১৮ বছর বয়েস পূর্ণ হলেই কিন্তু ছন্দাকে আমি ঘরে তুলতে চায়। আমাদের তিনজনের যদি চলে যায় আর একটা পেটও চলে যাবে। তাতে দান-খয়রাতটা না হয় একটু কমাবে।
--- একটা পেটেই বুঝি থেমে থাকবে ? বলেই স্ত্রীর দিকে ইংগিতপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন ভুবনবাবু। আর সাধনাও যেন নতুন বউটির মতো স্বামীর বুকে আরও ঘন হয়ে বলে --- তুমি না। ভালোই তো হবে। তুমি দাদু আর আমি কেমন ঠাকুমা হয়ে যাব।
---- হ্যা গো, সময় কত দ্রুত চলে যাচ্ছে দেখ। মনে হচ্ছে এইতো সেদিন তুমি নতুন বৌটি হয়ে এলে।
--- কেন পুরনো হয়ে গিয়েছি বলে খুব আফশোষ হচ্ছে বুঝি।
স্ত্রীকে আরও কিছুটা কাছে টেনে নিয়ে ভুবনবাবু বলেন, মোটেই না। আমার সাধ তো চিরনতুন।
সোহাগের সময় একান্তে স্ত্রীকে সাধ বলেই ডাকেন ভুবনবাবু।সেই ডাক শুনেই সাধনাও আদুরে গলায় বলেন, তোমার মুখে ওই ডাকটা শুনলেই মনে হয় আমি তোমার কাছে সেই নতুন বৌটাই হয়ে আছি।
আরও কিছুক্ষণ নানান খুনসুটির পর একসময় ঘুমিয়ে পড়ে দুজনে।ও বাড়িতে অতসীও বিছানায় তখন মেয়েকে নিয়েই স্বামীর সঙ্গে নানা আলোচনায় মেতে ওঠেন। বলেন , দিদির মনটা সত্যিই খুব বড়। ছন্দাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসেন। নিজে থেকেই অত দামি হারটা খুলে ওর গলায় পড়িয়ে দিলেন।
---- আমি তো বলেই ছিলাম ওরা খুব বড়ো মনের মানুষ। নিজে থেকেই ছন্দাকে ছেলের বৌ করে ঘরে তুলবেন। কিন্তু তোমাদেরই সংশয় যাচ্ছিল না। এখন বিশ্বাস হল তো ?
--- তা হলো। দিদিকেই তো বলতে শুনেছি হারটা নাকি তার গলায় শাশুড়ি পড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন বংশ পরম্পরা ধরে হারটা বাড়ির বৌয়ের গলায় থাকে। সেই হিসাবে ধরতে গেলে দিদি তো আজ ছন্দাকে একপ্রকার আর্শিবাদ করেই বাড়ির বৌ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েই দিলেন। তবু মনটা কেমন যেন খারাপ করছে?
---- কেন, মন খারাপের আবার কি হলো ?
--- মনে হচ্ছে মেয়েটা যেন আজ থেকেই পর হয়ে গেল। আমাদের তো ওই একটাই সবেধন নীলমনি , ওকে ছেড়ে থাকব কি করে গো ?
স্ত্রীকে আরও কাছে টেনে নেয় মলয়। সোহাগের সুরে বলে , এতো ভাবছ কেন ? বরং ভাবো মেয়ে দিয়ে আমরা একটা ছেলেও পাচ্ছি। এপাড়া-ওপাড়ার তো ব্যাপার। মন কেমন করলেই দেখে আসতে পারবে। ওরাও আসতে পারবে। কিন্তু ভাব তো দূরে কোথাও বিয়ে হলে কি করতে?
--- তা বটে।
মেয়ের বিয়ের কথা ভাবতেই একসময় ঘুম নেমে আসে দুজনের চোখে। দীর্ঘক্ষণ ঘুম আসে না কেবল মনোতোষ আর ছন্দার চোখে।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment