( কিস্তি -- ১২ )
তীব্র আশ্লেষে ডুবে যায় দুজনে। দুজনেই চাইছিল দীর্ঘায়ত হোক সেই ক্ষণ , সেই মুহুর্ত। কিন্তু কাকীমার গলা পেয়েই দুজনে ছিটকে যায় দুদিকে। রান্না ঘর থেকেই কাকীমার গলা ভেসে আসে -- কই রে ছন্দা এখনও হলো না তোর ? আমার তো সব গোছগাছ সারা। ওই ক'টা জামা-কাপড় গুছোতে কেন যে এত দেরী বাপু কে জানে ?
মায়ের কথাটা মনোতোষের কানেও যায়। সে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে ছন্দার মুখের দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। আর ছন্দা হাতের চেটো দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে ভেংচি কেটে দেয় মনোদাকে। মনোদা ফের তাকে ধরার উপক্রম করতেই --- যাই কাকীমা , হয়ে গিয়েছে। বলেই মনোদার নাগাল এড়িয়ে সুটকেস নিয়ে বেড়িয়ে আসে। কাকুও ততক্ষণে তৈরি। বার দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে রিক্সা। রিক্সা করেই গ্রামের মোড়ে গিয়ে বাস ধরবেন ওরা। কাকীমা আর ছন্দা একে একে সব জিনিসপত্র রিক্সায় তুলে দিয়ে আসে।
রিক্সায় ওঠার আগে মনোদা কাকীমা আর কাকুকে প্রনাম করতে যেতেই কাকীমা এই এই করে ওঠেন -- একি অনাসৃষ্টি! যা আগে হরিমন্দিরে প্রনাম করে আয় তারপর অন্যদের করবি।
কাকীমার কথায় কাকু তীব্রআপত্তি জানিয়ে বলেন , কোন দরকার নেই। সন্তানের কাছে সব থেকে বড়ো আরাধ্য দেবতা হলো তার মা। তাই সর্বাগ্রে মাকে প্রণাম করাই উচিত। তারপর অন্যদের। শোন নি সেই যে গো , গনেশ মাকে প্রদক্ষিণ করেই বলেছিল ত্রিলোক পরিভ্রমণ করেছে সে। আর কার্তিককে স্বর্গ - মর্ত্য - পাতাল ঘুরেও হেরে গোহারা হতে হয়েছিল।
বাবা-মায়ের এই টানাপোড়নে দ্বিধায় পড়ে যায় মনোতোষ। সে কার কথা শুনবে ভেবে পায় না। কাকীমাই মনোদাকে দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন। কাকুর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন , ওই গল্প আর একদিন শুনব বরং।তোমার কথা অনুযায়ী মা'ই যখন বড়ো আরাধ্যা তখন মায়ের আদেশ নিশ্চয় শিরোধার্য।
---- নিশ্চয়, আমি তো সেটাই বলছি। মা'ই হলো সব।
--- তাহলে মায়ের আদেশ হলো আগে হরিমন্দিরে প্রণাম।
---- মানে ?
---- মানে, ওই যে বললাম মাতৃ আদেশ।
বেমালুম বোকা বনে গিয়ে কাকু আর কোন কথা বলতে পারেন না। মনোতোষ আর ছন্দা মুখ টিপে হাসে। মায়ের ইশারায় মনোতোষ হরিমন্দিরে প্রনাম করে আসে। তারপর বাবা-মাকে প্রনাম করে। সেসময় কাকীমা বলেন, ছন্দা যা তো ঠাকুর ঘরের সিংহাসনে একটা প্রসাদী ফুল রাখা আছে , ওটা এনে মনোর মাথায় ছুঁইয়ে ওর হাতে দে তো। কাকীমার কথায় কিছুটা আশ্চর্য হয় ছন্দা। কাকীমা নিজে হাতে ছেলের মাথায় ফুল না ছুঁইয়ে তাকে দিয়ে কেন কাজটা করাতে চাইছেন তা বোধগম্য হয় না তার। তবু কোন কৌতুহল না দেখিয়ে সে ঠাকুরঘর থেকে ফুলটা এনে মনোদার মাথায় ছুঁইয়ে তার হাতে তুলে দেয়। কাকীমা বলেন , এটা সবসময় সঙ্গে রাখবি। আর মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরীক্ষা দিবি।
তখন ছন্দা বলে, কাকীমা আমি তো প্রতিদিন বিকালে শিবমন্দিরে যায়। কাল মনোদার জন্য একটা প্রসাদী ফুল এনেছিলাম , সেটাও এনে দেব ?
-- দে, এতে বলার কি আছে ?
কাকীমার অনুমতি পাওয়ার পর সে ছুট লাগায় পড়ার ঘরের দিকে। মনোদার পরীক্ষার জন্য সে কালই বুড়ো শিবের কাছে প্রার্থনা করে ফুলটা এনে ঢুকিয়ে রেখেছিল বইয়ের পাতার ভিতরে। কাকীমার ফুল দেওয়ার কথা শুনে তারও দিতে ইচ্ছে হল। তাই ছুটে গিয়ে ফুলটা নিয়ে এসে কাকীমার মতোই ফুলটা সেই মনোদার মাথায় ছুঁইয়ে হাতে দিয়ে বলে --- মন দিয়ে পরীক্ষা দিও। আর সেটা দেখে কাকু-কাকীমা পরস্পরের দিকে চেয়ে মুখ টিপে হাসেন।
কাকু আর মনোদাকে নিয়ে রিক্সার চাকা গাঁয়ের রাস্তায় গড়াতে শুরু করে। কাকীমার হাত ধরে দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়ায় ছন্দা। কপালে হাত ঠেকিয়ে দু' জনেই বলে -দুর্গা - দুর্গা। রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত হাতজোড় করেই দাঁড়িয়ে থাকে দুজনে। তারপর রিক্সাটা মিলিয়ে যেতেই বাড়ির ভিতরে ঢোকে তারা। মনোদাদের অভাবে বাড়িটা কেমন নিঝুম হয়ে যায়। কাকীমাকেও যেন উদাস দেখায়। ছন্দা তাই কাকীমাকে বলে , বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে নয় বলো ?
--- হ্যা রে, মনো কোলে আসার পর থেকে আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে কোথাও রাত্রিবাস করিনি। তাই বাড়িটাই শুধু নয় , মনের ভিতরটাও কেমন খাঁ-খাঁ করছে।
তবু তুই আছিস তাই মন মানছে , নাহলে বাড়িতে আমি একা থাকতেই পারতাম না।
কাকীমার কথা শুনে তাকে জড়িয়ে ধরে ছন্দা। আর সাধনাও সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তার মধ্যেই ঝুপ করে যেন সন্ধ্যা নেমে আসে। সাধনা বলেন , যা তো মা আজ ঠাকুরকে ধুপসন্ধ্যাটা তুই দেখিয়ে দে। আমার ঠাকুর ঘরে যাওয়া হবে না।
আর বলতে হয় না। এবার ছন্দা বুঝতে পারে তখন কাকীমা কেন তাকে দিয়ে মনোদাকে প্রসাদী ফুল দেওয়া করালেন। ততদিনে সে জেনে গিয়েছে কেন মেয়েদের মাসে ৪/৫ টা দিন ঠাকুর ঘরে ঢোকা যায় না। ঠাকুরমার কাছেই জেনেছে সে। মা'ও তো কতো দিন তাকে কাকীমার মতো করেই ধুপসন্ধ্যা দেখানোর কথা বলেছিলেন।
সেদিন মা'কে কারণ জিজ্ঞেস করেছিল। মা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। পরে রাতের বেলা ঠাকুমা তাকে কারণটা বলেছিলেন। কিন্তু সে কিছুতেই ওই নিয়মের ব্যাখ্যা খুঁজে পায় নি। এখন তো তাকেও মাসের অস্বস্তিকর ওই ক'টা দিন কাটাতে হয়। ওই অবস্থাতেও শুধু সে কেন , অধিকাংশ মেয়েরাই স্কুলে যায়। স্কুলকে তো বিদ্যার মন্দির বলা হয়। সেই মন্দিরে যদি যাওয়া যায় , তাহলে বাড়ির ঠাকুর ঘরে ঢুকতে দোষ কোথাই তা ভেবে পায় না সে। তাহলে যাদের বাড়িতে অন্য কেউ নেই তাদের কি হবে ?
ছন্দা দেখেছে তারা পাশের বাড়ির কাউকে ডেকে কাজটা করিয়ে নেন। তাদের পাশের বাড়ির অতসীকাকীই তো কতবার তাকে ডেকে বলেছেন, মা আমার 'শরীর খারাপ' হয়েছে , এই ক'টা দিন ধুপসন্ধ্যাটা একটু দেখিয়ে দে মা। শরীর খারাপের কথা মনে পড়তেই হাসি পায় তার। এমনিতে তো কাউকে রুগ্ন দেখালে সবাই জিজ্ঞেস করে -- কি হয়েছে , শরীর খারাপ নাকি ? মাসের নির্ধারিত ওই সময়ের মধ্যে কোন মেয়েকে কেউ বিশেষত ছেলেরা যদি ওই ধরণের প্রশ্ন করে বসে তাহলে কি হবে ? তার চেয়ে বরং মিনতিকাকীদের কথাটা মন্দের ভালো।মিনতিকাকীরা গরীব মানুষ। তারা পরের বাড়িতে ঝিগিরি করে খান। তারা কেমন বলেন , ' গায়ে হয়েছে'। ওদের শ্রেনীর লোকেরা ছাড়া কেউ বুঝতেও পারে না কথাটার মানে। ওইসব কথা ভাবতে গিয়ে তার সন্ধ্যা দিতে কিছুটা দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসতে শুরু করেছে শঙ্খের আওয়াজ। তাই শুনে কাকীমা তাড়া লাগান , কইরে তো হোল ?
--- যাই কাকীমা, বলে দ্রুত গরদের শাড়িটা পড়ে হাতের তালুর আড়াল করে প্রদীপটাকে নিয়ে হরিমন্দিরের দিকে এগিয়ে যায় ছন্দা। বেজে ওঠে তার পায়ের ছন্দোবদ্ধ নুপুরের ধ্বনি।
সেই শব্দ শুনেই ফেলে আসা দিনে ফিরে যায় সাধনা। ছন্দার মতো করেই এ বাড়িতে সেও ধুপ-সন্ধ্যা দিত। কতই বা তখন বয়েস হবে তার।ছন্দার বয়সী কি তার থেকে কিছু কমই হবে হয়তো। খুব গরীব ঘরের মেয়ে ছিল সে। আহামরি সুন্দরী না হলেও দেখতে শুনতে খুব একটা মন্দ ছিল না।পাড়ার লোকে অন্তত সেই রকম কথাই বলত।সে নিজেও কতবার শুনেছেসেই কথা। পাড়ার কাকীমা- জ্যেঠিমারা কতদিন মাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন , সাধনার বিয়ের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না গো। দেখো কেউ না কেউ যেচে ছেলের বৌ করে নিয়ে যাবে।
তাদের কথাই যেন সত্যি হয়। বছর খানেকের মধ্যেই পাশের গ্রামের বিশিষ্ট ভদ্রলোক হিসাবে পরিচিত সত্যেনবাবু একদিন তাদের বাড়িতে এসে হাজির হন। তাকে দেখে বাবা তো মহা অস্বস্তিতে পড়ে যান। কোথাই বসাবেন , কি খাওয়াবেন ভেবে ছোটাছুটি শুরু করে দেন। সত্যেনবাবুর মতো বিশিষ্ট ভদ্রলোক তাদের বাড়িতে কেন তাও ভেবে কুলকিনারা পান না বাবা।সত্যেনবাবু সত্যিই ভদ্রলোক। কাছেই একটা মোড়া পড়েছিল, নিজেই সেটা টেনে নিয়ে বসে পড়েন। তারপর বাবাকে কাছে ডেকে বলেন -- খাবারের জন্যও ছোটাছুটি করতে হবে না। আমি সঙ্গে করে মিষ্টি নিয়েই এসেছি। কারণ আমি যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছি সেটাতে তোমরা সম্মত হলে তো মিষ্টিমুখ করতেই হবে। তখন আবার তোমাকে বাজারে ছোটাছুটি করতে হবে ভেবেই মিষ্টি নিয়ে এসেছি। বাবা তখনও সত্যেনবাবুর কথার কিছু মাথা মুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছেন তার মুখের দিকে। সাধনাও সেই সময় একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে'ও সত্যেনবাবুর কথার অর্থ খুঁজে পায় না। সেইসময় চা নিয়ে হাজির হন মা'ও। চায়ের কাপটা নিয়ে হাতে নিয়ে সত্যেনবাবুই বিষয়টা খোলসা করেন।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment