Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ১১



  


          নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                শুরু হল ধারাবাহিক উপন্যাস -- 















              কালের কারিগর

              

                            অর্ঘ্য ঘোষ


                       (  কিস্তি -- ১১ ) 




ভুবনবাবুর প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারে না মাধবী। মাস্টারমশাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে সে। সেটা লক্ষ্য করেই ভুবনবাবু ফের বলতে থাকেন -- এই মনোভাব শুধু তোমরই নয় , অধিকাংশ মা বাবাই একই মনোভাবের শিকার। আমরা ভুলে যায় অতীতে মহিলারাও দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ গ্রহণের পাশাপাশি  রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছেন। প্লেন থেকে পেন চালনা , সবেতেই আমাদের মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে সমানে টক্কর দিয়ে এগিয়ে চলেছংতাদের উত্তোরণের কথা শুনে আমরা হাততালি দিই , কিন্তু অধিকাংশ বাবা মা'ই নিজের মেয়েটিকে ওইসব ক্ষেত্রে এগিয়ে দিতে চান না। বরং  বিয়ে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে সংসারে জোয়ালে জুড়ে দিতে চান। ভুবনবাবুর কথা শুনে উচ্ছস্বিত হয়ে পড়ে  রুম্পার বাবা। আপ্লুত গলায় বলে -- সেই কথাটাই তো  আমি কাল থেকে রুম্পার মাকে বুঝিয়ে পারছি না। বলুন তো ,  মাস্টারমশাই আপনি ওকে একটু ভালো করে বুঝিয়ে বলুন দেখি।
ভুবনবাবু বলেন -- বোঝাবুঝির কিছু নেই। আজ একটা কথা বলে বলে যাচ্ছি ছেলেমেয়ের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। হঠাৎ করে সেটা হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করতে হবে। বলেই রুম্পার সঙ্গে আরও একবার দেখা করতে তার ঘরে ঢোকেন ভুবনবাবু। তারপর তার মাথায় হাত রেখে বলেন , আজকের এই ঘটনা মন থেকে মুছে ফেলে পুরোদ্যমে পড়ায় মন দাও। কোন সমস্যা হলেই আমাকে বলবে।
রুম্পা হ্যা সূচক ঘাড় নাড়ে। 


                     তারপর মনোতোষকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন ভুবনবাবু। বাড়ি ঢুকতেই উদ্বিগ্ন মুখে এগিয়ে আসেন সাধনা। স্বামী-ছেলেকে একসঙ্গে ফিরতে দেখেই অঘটন কিছু ঘটে নি বলেই আন্দাজ করেছিলেন তিনি। বড়ো ধরণের কিছু হলে বাপ-ছেলে এত তাড়াতাড়ি যে ফিরতে পারত না তা অজানা নয় তার। তবুও স্বামীর মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন তিনি। 
স্ত্রীর চোখে মুখে  উদ্বেগের ছাপ চোখ এড়ায় না ভুবনবাবুর। তাই তিনি নিজে থেকেই বলেন -- খুব সময় মতো শ্যামল খবরটা দিয়েছিল বলে সর্বনাশটা এড়ানো গিয়েছে।
ব্যস, ওইটুকু বলেই থেমে যান ভূবনবাবু। আর কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করে না। এ বাড়ির রীতিটাই হলো এই রকম।  হাজার কৌতুহল থাকলেও যে যতটুকু বলে ততটুকু শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। বাবা মায়ের কাছে সেই শিক্ষা পেয়েছে মনোতোষ। এই তো  অতবড়ো ঘটনার পরও বাবা রুম্পার বাবা-মায়ের কাছে একটিবারের জন্যও জানতে চান নি হঠাৎ মেয়ের পরীক্ষা দেওয়ায় এত আপত্তি কিসের ? বেশিরভাগ সময় এ বাড়ির পরিবেশে থাকতে থাকতে ছন্দাও অতিরিক্ত কৌতুহল দমন করতে শিখে গিয়েছে। কিন্তু তার কাছে অবশ্য বিষয়টি অজানা থাকে না।সেদিন ভোরে হরলিক্স নিয়ে পড়ার ঘরে যেতেই মনোদা নিজে থেকেই সব কথা তাকে খুলে বলে। সে টেবিলের সামনে বসতেই মনোদা বলে -- জানিস আজ কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছি না
-- ওমা , কেন কাল বাদ পরশু তোমার পরীক্ষা। শেষবারের মতো যতটা সম্ভব চোখ বুলিয়ে নাও।
---- খুব চেষ্টা করছি জানিস। কিন্তু কিছুতেই ঘটনাটা মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না। কেবলই চোখের সামনে ভেসে ওঠেছে দৃশ্যটা। ফ্যানের হুক থেকে ঝুলছ রুম্পার ফাঁস দেওয়া হলুদ রঙের ওড়নাটা।
---- ইস , শুনে আমারই গা'টা কেমন করে উঠছে।
--- তাহলেই বোঝ আমার কি অবস্থা। রুম্পার কিছু হয়ে গেলে আমি হয়তো ভালোভাবে পরীক্ষাই দিতে পারতাম।কাকীমাও পরীক্ষার আগে এতটা বাড়াবাড়ি না করলেই পারতেন।
সরাসরি কোন প্রশ্ন না করে মনোদার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে ছন্দা। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মনোতোষই ফের বলে,  রুম্পা তো তাদের নিশ্চিন্তপুরের  আত্মীয় বাড়ি থেকে পরীক্ষা দেবে। ছোটবেলা থেকেই ওই বাড়িতে রুম্পার মাঝে মধ্যেই যাওয়া আসা রয়েছে। সেই সুবাদে আত্মীয়ের প্রতিবেশী একটি ছেলের সঙ্গে রুম্পার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। কেউ সেটা জানতই না। কিন্তু কাল ছেলেটার পাঠানো একটা চিঠি রুম্পার মায়ের হাতে পড়ে যায়। সেই চিঠিতে ছেলেটি নাকি লিখেছিল সে রোজ পরীক্ষা সেন্টারে হাজির থাকবে। তারপর পরীক্ষা শেষ হলে সকলের চোখ এড়িয়ে কোথাও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফিরবে। সেটা জানার পরই কাকীমার মাথা বিগড়ে যায়। মেয়েকে সাফ জানিয়ে দেন আর পরীক্ষা দিয়ে কাজ নেই। মুখ পোড়ানোর চেয়ে সময় সময় বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হই।
--- কিন্তু ছেলেটির সঙ্গে মেলামেশাতে কাকীমার এত আপত্তি কেন ?
--- এমনি ছেলেটি ভালোই , রামপুরহাট কলেজে পড়াশোনা করছে।
--- তাহলে মেলামেশাতে আপত্তি কোথাই ? পড়াশোনা শেষ করে ওরা বিয়ে করলে তো সমস্যা মিটে যাবে।
--- সমস্যা তো সেখানেই , একে ছেলেটা নীচু জাত তার উপরে বাড়ির অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। কাকীমা তাই কিছুতে ওদের মেলামেশা মেনে নিতে পারছেন না। 
----  আচ্ছা আমাদেরও যদি এমন হত ?
---  মানে  ?  
---- এই ধরো আমরা সদগোপ, আর তোমরা চাষা। আমার মাও যদি বলত ওইরকম ছোটজাতের একটা বেকার ছেলের সঙ্গে মিশতে দেবে না।
---- ও: ভারি আমার সদগোপ , লোকে বলে শোল বুড়িয়ে শাল।
--- তবুও তো বলে। তাহলে কি হত বলোই না। 
----- কি হত রে তাহলে ?
----- জানি না যাও।অনেকক্ষণ পড়া কামাই হয়েছে এবার পড়ায় মন দাও।


           ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ছন্দা। আর তার ছন্দোবদ্ধ চলন উদাস করে তোলে মনোতোষকে।সেদিন সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় চরম ব্যস্ততা। বিকালের মধ্যেই কাকুরা রামপুরহাট বেড়িয়ে যাবেন। তাই কাকীমা তাদের জন্য নারকেল নারু, চিড়ে ভাজা জাতীয় শুকনো খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছন্দা হাতে হাতে সব এগিয়ে দেয়। তাদের ব্যস্ততা দেখে কাকু বলেন -- কেন যে তোমরা এত কষ্ট করছো কে জানে ? এখন বাজারে সব পাওয়া যায়। মোটে তো আটটা দিন। দিব্যি কেনা খাবারেই চালিয়ে নিতে পারতাম।কাকীমা কাকুর কথার আমলই দেন না। নাড়ু পাকাতে পাকাতেই বলেন -- হ্যা বাজারের খাবার খেয়ে বাপ-ছেলের একটা কিছু হয়ে যাক। তখন ভুগতে তো সেই আমাকেই হবে। তার উপরে ছেলের পরীক্ষা, সে খেয়াল আছে ?
--- হ্যা , তোমার ছেলে তো একাই পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, আর আমিই একমাত্র বাবা ছেলেকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাচ্ছি। আর বাড়ি ফিরে একটা কিছু যদি হয়ই তাহলে তোমাকে তো একা ভুগতে হবে না। এখন তো আমার মামনিও আছে গো।
--- তা আছে। কিন্তু তাই বলে অনিয়ম করে অসুখ বাঁধিয়ে আসবে আর  আমরা মা-মেয়ে ভুগব , তাহবে না। কি বল মা ?
ছন্দাকে স্বাক্ষী মানেন তিনি। ছন্দা কোন প্রত্যুত্তর করে না। মুচকি হেসে সে'ও নাড়ু পাকানোয় মন দেয়। আর কাকীমা ফের কাকুকে পাখি পড়া করতে শুরু করেন -- বাইরে ডাল ভাত ছাড়া কিছুটি মুখে দেবে না কিন্তু।
--- এ তো মহা মুশকিলে পড়লাম দেখছি। তার চেয়ে বরং তোমরা দুজনেও চলো। রান্নাবান্না আর আমাদের উপরে খবরদারি করবে।
--- সে উপায় থাকলে কি আর তোমাদের বাপ-ব্যাটাকে একা ছেড়ে দিতাম ? দুজনেই তো সমান উদাসীন । কিন্তু বাড়ি ফেলে যাই কি করে ?
--- তাহলে আর ভেবে লাভ নেই। বেলা হয়ে এল। এবার আমাদের বেরোতে হবে। গোছগাছ সব হয়ে গিয়েছে তো ? 
--- প্রায় হয়ে আছে। ছন্দা যা তো মা কালো সুটকেশটাতে তোর কাকুর আর মনোর খানকতক জামা-প্যান্ট, গামছা আর বিছানার চাদরটা গুছিয়ে দে। আমি ততক্ষণ খাবারদাবারগুলো গুছোচ্ছি।
ছন্দা এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে মনোদার সঙ্গে একান্তে একবার দেখা করতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার। কিন্তু নানান কাজের ভীড়ে কিছুতেই তা আর হয়ে উঠছিল না।  তাই কাকীমার কথা শেষ হতে না হতেই সে মনোদার ঘরের দিকে হাঁটা লাগায়। আর তা লক্ষ্য করে কাকীমা বলে ওঠেন --- দেখ মেয়ের কান্ড ! হাত না ধুয়েই কাপড় গুছোতে চলল। বলি গুড় হাতটা ধুয়ে যাও মা। না হলে পিঁপড়ে লেগে গেলে যে আর সেই জামা-কাপড়  আর ওদের পড়া হবে না মা।
কাকীমার কথায় লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে ছন্দার। মনোদার সঙ্গে একান্তে দেখা করার তাড়নায় সে হাত ধোওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। এ: মা ‌‌কাকু- কাকীমা ভাবলেন কে জানে !  লজ্জা এড়াতে সে হাত ধুয়ে ধীর পায়ে মনোদার ঘরে গিয়ে ঢোকে। তারপর শুরু করে গোছগাছ। সুটকেশের ডালা বন্ধ করতেই মনোদা তার হাত ধরে ঠোঁট  এগিয়ে দেয়। ছন্দা সভয়ে দু'পা পিছিয়ে গিয়ে বলে,  না , ছিঃ। বাইরে কাকু- কাকীমা রয়েছেন, তারা টের পেলে কি ভাববেন বলো তো ? আগে ভালো করে পরীক্ষা দিয়ে এসো, তার পর পাবে।
সেই কথা শুনে ছন্দার হাত ছেড়ে দেয় মনোতোষ।তারপর ছন্দার মুখের দিকে কেমন যেন করুণ চোখে চেয়ে থাকে। তা দেখে খুব কষ্ট হয় ছন্দার। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। আড়চোখে একবার দরজার দিকে চেয়ে মনোদার ঠোঁটে ঠোঁট নামিয়ে দেয় সে। তীব্র আশ্লেষে ডুবে যায় দু'জনে।



                            ( ক্রমশ )


  নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                              ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                      ( ৪ )


         



                       ( ৫ )

                         ( খেলার বই )


                                                                                 


                    ----০---


No comments:

Post a Comment