Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ১০





          নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


                শুরু হল ধারাবাহিক উপন্যাস -- 















              কালের কারিগর

              

                             অর্ঘ্য ঘোষ


                        (  কিস্তি --- ১০ ) 




উর্ধশ্বাসে ছুটে আসে রুম্পাদির ভাই শ্যামল। সেও তাদেরই স্কুলে সেভেনে পড়ে। তাকে ওই ভাবে ছুটে আসতে দেখে সবাই হতচকিত হয়ে পড়ে। পড়ার ঘর থেকে ছুটে বেড়িয়ে আসে মনোতোষও।
ভুবনবাবু শ্যামলকে জিজ্ঞেস করেন -- কি ব্যাপার রে ? 
---- স্যর আপনি তাড়াতাড়ি একবার আমাদের বাড়ি চলুন। না হলে খুব বড়ো সর্বনাশ হয়ে যাবে।
--- কেন কি হয়েছে ?
---- মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে দিদি ঘরে ঢুকে খিল লাগিয়ে দিয়েছে ?  
--- সেকি রে , ঝগড়া হয়েছে কেন ?
--- মা দিদিকে বলেছিল, খুব হয়েছে তোকে আর পরীক্ষা দিতে হবে না। আজিমগঞ্জে একটি ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথা  চলেছে। শীঘ্রিই ওরা দেখতে আসবে। পচ্ছন্দ হলেই বিয়ে দিয়ে দেব। দিদি বলেছিল লেখাপড়া শেষ না করে সে বিয়ে করবে না। কিন্তু মা সে কথা কানেই তুলছিল না। তাই দিদি পড়ার ঘরে ঢুকে খিল দিয়েছে। কারও ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। মা আপনাকে খবর দিতে পাঠাল। শুনলে  একমাত্র আপনার কথা শুনবে দিদি।
--- তাহলে তো এতক্ষণ দরজা ভাঙা উচিত ছিল।
--- সে চেষ্টাও চলছে। কিন্তু লোহার দরজা, সহজে ভাঙাও যাচ্ছে না।
--- বেশ চলতো দেখি।
তারপর শ্যামলের সঙ্গে কাকু দৌড়োন। পিছনে পিছনে ছোটে মনোতোষ। ছন্দা মনে মনে বলে , ঠাকুর খারাপ যেন কিছু না হয়। রুম্পাদিকে তুমি ভালো রেখো। ছন্দা দেখে কাকীমাও  হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে অস্ফুটে -- দুর্গা নাম জপ করছেন। সেও দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে বলে -- কি হবে কাকীমা ?
-- কিচ্ছু হবে না। তোর কাকু যখন গিয়েছেন তখন সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।
ছন্দাও মনে মনে বলে, তাই যেন হয় ঠাকুর, তাই যেন হয়। শ্যামলের সঙ্গে উর্দ্ধশ্বাসে তাদের বাড়ি পৌঁছোন ভুবনবাবু। মনোতোষও তাদের পিছন পিছন ঢোকে।  ততক্ষণে সেখানে অনেক লোক। কুড়ুল দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা চলছে। কিন্তু লোহার দরজা কুড়ুলে বাগ হচ্ছে না। তাই ঝালাই কারখানায় ওয়েল্ডিং মেশিন আনার জন্য লোক পাঠানো হয়েছে। সেও অনেকক্ষণ হয়ে গেল।  রুম্পার বাবা শান্তিু মন্ডল আর তার স্ত্রী মাধবী আক্ষেপে কপাল চাপড়াচ্ছেন। রুম্পার বাবা মাধবীকে সমানে দোষারোপ করে চলেছেন -- এখন কপাল চাপড়ালে কি হবে ? তখন পই পই করে বললাম, মেয়েটা পরীক্ষাটা দিতে চাইছে দিক। বেশি জোর খাটাতে যেও না। তখন আমার কথা পানি পানি লাগল। এখন আর কপাল চাপড়ালে কি হবে ?  
ভূবনবাবুকে দেখে দুজনেই তার পায়ে আছড়ে পড়েন। মাধবীদেবী বলেন, আমার মেয়েটাকে বাঁচান মাস্টার মশাই। ও আপনাকে খুব মান্য করে। শুনলে একমাত্র আপনার কথাই শুনবে। কিন্তু কে জানে এতক্ষণে ---- 
কথা শেষ হয় না তার। ডুকড়ে কেঁদে উঠেন তিনি। একসময় পাগলের মতো রুম্পাদির বন্ধ ঘরের দরজায় মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলে ওঠেন -- মরতে কি তুই একাই জানিস নাকি ?  এই দেখ, আমিও তোর দরজায় মাথা ঠুকে মরছি । ভালোই হবে মা-মেয়েতে এক চিতাতেই চলে যাব। 


               পাড়ার মহিলারা এসে তাকে জোর করে ধরে সরিয়ে নিয়ে যায়। ভূবনবাবু তাকে আশ্বস্ত করে  বলেন, তুমি শান্ত হও। চলো দেখি আমাকে দরজাটার কাছে পৌঁছোতে দাও। 
তারপর তিনি ভিড় ঠেলে এগিয়ে যান বন্ধ দরজাটার সামনে। দরজায় হাল্কা টোকা মেরে খুব মোলায়েম গলায় ভূবনবাবু বলেন -- এবার দরজটা খোল মা। আর রাগ করে থাকিস না। তোর বাবা - মা কেঁদেকেটে সাড়া হচ্ছেন।তুই যা চাইবি তাই হবে। আমি কথা দিচ্ছি তোকে।
তবু ভিতর থেকে কোন সাড়া মেলে না। সবাই খুব ভয় পেয়ে যায়। দোলাচলে পড়েন ভূবনবাবু। মনে মনে ভাবেন, তাহলে অঘটন যা ঘটার তা কি এতক্ষণে ঘটে গিয়েছে ? শেষ চেষ্টা হিসাবে ফের তিনি দরজায় টোকা মেরে বলেন -- মা রে আজ পর্যন্ত কোথাও আমায় ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয় নি। তুই কি আমাকে হারিয়ে দিবি মা ?
ভুবনবাবুর কথা শেষ হতেই ঘরের ভিতর থেকে যেন খাট নড়ার শব্দ ভেসে আসে। সেই শব্দ শুনেই উদ্বিগ্ন মুখগুলোতে যেন আশায় আলো ফুটে ওঠে। সবাই ছুটে গিয়ে দরজায় কান লাগায়।আর তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে আলুথালু বেশে দরজা খুলে বেড়িয়ে ছুটে গিয়ে ভুবনবাবুর বুকে আছড়ে পড়ে রুম্পা। কান্নার বাঁধ ভেঙে যায় তার। ভূবনবাবু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন -- কাঁদিস নে মা। তোরা যে মা ভগবতীর জাত। তোদের চোখের জলে যে সংসারের অকল্যাণ হয় মা।
রুম্পাকে সান্তনা দিতে গিয়ে ভূবনবাবুর চোখও জল ভিজে যায়। জল দেখা যায় অন্যদের চোখেও।রুম্পার বাবা-মা ভুবনবাবুর পা জড়িয়ে ধরেন। অবরুদ্ধ গলায় বলে ওঠেন -- মাস্টারমশাই আপনার এই ঋণ আমরা জীবনে ভুলব না।
ভূবনবাবু তাদের তুলে ধরে বলেন, ঋণ কিসের ?  রুম্পা কি শুধু তোমাদেরই মেয়ে ? আমার বুঝি কেউ নয় ? 
--- আমরা জন্মই দিয়েছি। কিন্তু আজ বুঝলাম আপনিই ওর আসল বাবা।
ততক্ষণে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভিড়টা কিছুতেই পাতলা হয় না। অন্যান্য জায়গায় যা হয়, এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়। কেন ওই বয়েসের একটি মেয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে ঘরে খিল দিয়েছিল তার অর্ন্তনিহিত কারণটা না জেনে কারও বাড়ি ফেরার গরজ দেখা যায় না। যেন কারণটা না জেনে কারও পেটের ভাত হজম হবে না। তাই সহমর্মিতা দেখানোর নাম করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানান প্রশ্ন করে সেটাই জানার চেষ্টা শুরু হয়। পাশের বাড়ির বলাই মন্ডলের বৌটা তো বলেই বসল , এখনকার ছেলেমেয়েদের মতিগতিই বোঝা ভার। এই তো গতবছর আমার সেজ ননদের খুড়শ্বশুরের মেয়েটাও বাবা-মায়ের পচ্ছন্দের ছেলেকে বিয়ে করবে না বলে বিষ খেয়েছিল।পরে পোষ্টমর্টেমের সময় ধরা পড়ে তার নাকি তিন মাসের ' পেট ' হয়েছিল। তাও ভালো নিজে মরে বাবা-মাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। না হলে বিয়ের পর জানাজানি হলে তো বাবা- মায়ের মুখে চুনকালি লেপা পড়ত।
তাকে সমর্থন করে আশা বৌদি বলে ওঠেন -- তা যা বলেছো ভাই। আমার মাসতুতো দিদির গাঁয়েই তো ঘটেছে ওই ঘটনা। বামুনের বাড়ির মেয়ে বেড়িয়ে গিয়েছে গায়েরই নীচু জাতের ছেলের হাত ধরে। তারপর থেকে সেই মেয়ের বাবা -মা, ভাই বোনকে চলতে হয় মাথা নিচু করে। তার চেয়ে তো ও মেয়ের মরে যাওয়াই ভালো ছিল।


                               ওইসব কথা বার্তা শুনে চরম অস্বস্তিতে পড়েন রুম্পার বাবা-মা। রুম্পারও মুখ নিচু হয়ে যায়। ভুবনবাবু বুঝতে পারেন পড়শিদের এখন উদাহরণের পিঠে উদাহরণ টেনে আনা শেষ হবে না। তাই তিনি ওইসব অতি উৎসাহীদের উপলক্ষ্য করে বলেন - এবারে রুম্পার একটু নিরিবিলিতে থাকা প্রয়োজন। আমাদের উচিত সেটার ববস্থা করে দেওয়া।
প্রকৃত কারণ না জেনে এভাবে মাঝপথে রণে ভঙ্গ দেওয়ার ইচ্ছা কারও ছিল না। কিন্তু ভূবনবাবুর ইংগিতটাও বুঝতে কারও অসুবিধা হয় নি। তাই কেউ ঠোট বেঁকিয়ে, কেউ বা নাক কুঁচকে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। আর বাড়ির সবাই যেন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচে।ভীড়টা পাতলা হতেই রুম্পাকে মনোতোষ তার ঘরে পৌঁছে দিতে যায়। ঘরে ঢুকতেই আঁতকে ওঠে মনোতোষ। সে দেখে ফ্যান থেকে তখনও ঝুলছে ওড়নার ফাঁস। তার নীচে টুল।সেইসব দেখেই আতঙ্কে চিৎকার করে সে। তার চিৎকার শুনে ভূবনবাবু সহ বাড়ির অন্যরা ছুটে আসেন ঘরে। তারও দৃশ্যটা দেখে হতভম্ব হয়ে যান। বলাবলি করতে থাকেন - মাস্টারমশাইয়ের আসতে আর একটু দেরি হলে কি সর্বনাশটাই না হত এতক্ষণ।
দ্রুত ফ্যান থেকে ওড়নাটা খুলে নেওয়া হয়। টুলটাকেও বাইরে সরিয়ে দেওয়া হয়। মাধবীদেবী মেয়েকে জড়িয়ে ফের কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসিক্ত গলায় বলেন -- একি সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলি মা ? রাগ করে মাকে এত বড়ো শাস্তি দিতে যাচ্ছিলি ? একবারও ভাবলি না আমাদের কথা ? 
রুম্পার চোখেও জল গড়িয়ে পড়ে।ভূবনবাবু ইশারায় সবাইকে বাইরে যেতে বলেন। ঘর ফাকা হতেই তিনি রুম্পার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন -- মা, তোর কাছে থেকে তো এমন আত্মঘাতী সিন্ধান্ত আশা করি নি। পড়াশোনা বজায় রাখার জন্য তোর জেদ আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু এই সিন্ধান্ত আমার ততটাই খারাপ লেগেছে। জীবনটা লড়াইয়ের ময়দান। সেই ময়দান ছেড়ে তো ভীতুরা পালায়। তুই তো তা নোস। জীবনে যাই ঘটুক না কেন , তার মোকাবিলা করার বদলে তুই আর কখনও এই রকম করবি না বল ?
রুম্পা হ্যা সূচক ঘাড় নাড়তেই ভূবনবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে যান। মনোতোষ রুম্পার বিছানার পাশে বসে টুকটাক কথা বলে। বাইরে বারন্দায় তখন চা খেতে খেতে রুম্পার বাবা-মাকে নিয়ে পড়েন ভুবনবাবু। তাদের উদ্দেশ্যে বলেন -- তোমরা তো ভালো বাবা মা , মেয়ে পড়তে চাইছে আর তোমরা জোর করে তার বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছ ? তোমরা কি জানো না ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা আইনত অপরাধ ?
রুম্পার বাবা স্ত্রীকে দেখিয়ে বলেন -- এই যে এনাকে বলুন। আমি তখনই বললাম , আমাদের একটাই তো মেয়ে অত তাড়াহুড়ো করতে হবে না। তা আমার কথা শুনলে তো। সেই থেকে লেগে আছে মেয়ের পিছনে।
--- হ্যা, এখন তো শুধু আমার দোষই হবে। কিছু একটা হয়ে গেলে তখন তো লোকে আমাকেই দুষবে। শুনলেই তো এতক্ষণ সব কি বলাবলি শুরু করেছিল। আমি যে মেয়ের মা। মেয়ের মায়ের যে কি জ্বালা তা পুরুষ মানুষ কি করে বুঝবে।
এবারে মুখ খোলেন ভূবনবাবু।  মাধবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,  লোকে কি বলবে তা ভাবলে তোমার সব কিছুতেই পায়ে বেড়ি পড়ে যাবে। কারণ বেশিরভাগ লোকের স্বভাবই হোল সবেতেই অন্যের ছিদ্র খুঁজে বের করা।
---কিন্তু মাস্টার মশাই মেয়েদের বেশি লেখাপড়া করে হবেটাই বা কি ?  সেই তো হেঁসেল সামলানো। 
--- এটা কিন্তু তুমি ঠিক বললে না। রান্না করাটাই মেয়েদের জীবনের একমাত্র কাজ নয়। তুমি নিজে একজন মেয়ে হয়ে নিজের মেয়ের ইচ্ছে-অনিচ্ছে গুলোর কোন গুরুত্বই দেবে না ? 
ভূবনবাবুর প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারে না মাধবী।





                             ( ক্রমশ )


        নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                              ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                      ( ৪ )


         



                        ( ৫ )

                             ( খেলার বই )


                                                                                 


                    ----০----


          

No comments:

Post a Comment