Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ২৭


    
    
            নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



          শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 












               কালের কারিগর
              

                           অর্ঘ্য ঘোষ   

                       (  কিস্তি -- ২৭ ) 



কথাটা শুনেই আঁতকে ওঠে সাধনা। তার মাথাটা যেন ঝিম ঝিম করে ওঠে। বলছে কি মেয়েটা ? নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারে না সে। রীনার কথা তার কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। ছন্দাকে সে যতদূর  চিনেছে তাতে কারও বাপ তুলে কথা বলবে বলে তার বিশ্বাস হয় না। নিশ্চয় এই মেয়েটাই কিছু একটা গন্ডগোল পাকিয়ে ছন্দার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে।সেটা ছন্দাকে ডেকে সবার সামনে পরিস্কার করে দেওয়াই ভালো।সেই জন্য ছন্দার নাম ধরে ডাকে সে। কিন্তু সাড়া মেলে না।তাই বিরক্তিতে তার স্বর কিছুটা চড়ে যায়। সেটা টের পেয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে আসে মনোতোষ। ছেলেকে দেখেই সাধনা বলেন , ছন্দা কোথায় রে ? 
মনোতোষ কোন জবাব দিতে পারে না। তাই দেখে সাধনার মনে সংশয় জাগে , তাহলে কি সে'ই এতক্ষণ ভুল ভাবছিল ,  রীনার অভিযোগই ঠিক ? ছন্দার দোষ ঢাকতেই কি মনো চুপ করে রয়েছে। এতদিন তাহলে কি তারা মেয়েটাকে কিছুই শেখাতে পারে নি ? নিজেকে ব্যর্থ মনে হয় তার।সেই ব্যর্থতা বোধ সাধনার মেজাজ আরও গরম করে দেয়।কড়া গলায় সে বলে -- মনো তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি , সেটা কি তোর কানে যায় নি ? না  কিছু এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চুপ করে রয়েছিস ? 
এবারে মনোতোষ আমতা আমতা করে বলে -- ছন্দা বাড়ি চলে গিয়েছে।
--- বাড়ি চলে গিয়েছে মানে ? ওর তো আজ বাড়ি যাওয়ার কথা নয়। তাছাড়া আমার সঙ্গে দেখা না করে সে বাড়ি চলে যাওয়ার মতো মেয়েও নয়। তাহলে হঠাৎ কি এমন ঘটল যে কাউকে কিছু না বলে তাকে বাড়ি চলে যেতে হল ? 
---- রীনা ওকে চড় মেরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে বলার পরই ছন্দা চলে যায়।
--- কিন্তু চড় মারার মতো পরিস্থিতি তৈরি হল কেন ? 
---- রীনা ওকে প্রথমে বাবা তুলে কথা বলে। তার জবাবে ছন্দা বলেছিল এই বাড়িটা যে তার বাবার নয় তা সে জানে। কিন্তু বাড়িটা রীনার বাবারও নয়। সেই কথা শুনেই আচমকা রীনা ওর গালে চড় বসিয়ে দেয়।
--- তুই কি করছিলি তখন ?  তোর সামনে একটা অন্যায় ঘটে গেল আর তুই মুখ বুঝে হজম করে নিলি ? প্রতিবাদটা কি শুধু বাইরেই সীমাবদ্ধ ?


                   একের পর এক প্রশ্নের তোড়ে কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে মনোতোষ। কোন জবার দিতে পারে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তা দেখে আরও মেজাজ চড়ে যায় সাধনার। চড়া গলায় বলেন , তাই তো বলি মেয়ে আমার সে রকম নয়। সে শিক্ষা না ওর বাবা - মা,  না আমরা দিয়েছি। সাত চড়ে যে রা কাড়ে না সে অন্যকে মারতে যাবে চড় ? তাই তো মা আমার অভিমান করে বাড়ি চলে গিয়েছে।
সাধনার কথার মাঝে ফুট কাটে রীনা -- কাকীমা ওকে আপনি চেনেন না তাই বলছেন। ও যে কি চিজ তা আমি এসেই বুঝে গিয়েছি। ডেনজারেস মাল একটা। 
রীনার কথা শুনে চিড়বিড়িয়ে ওঠে সাধনা। হাত জোড় করে বলেন ,  দোহাই মা। তুমি আমার পেটের মেয়ের মতো। তুমি আর আমাকে মানুষ চিনতে শিখিও না। ছোট থেকেই যে মেয়েটাকে চোখের সামনে বড়ো হতে দেখেছি সেই মেয়েটাকে তুমি চেনাবে আমাকে ? আর তুমি কেমন মেয়ে সেটা তো তোমার কথাবার্তাতেই স্পষ্ট। অন্য একটি মেয়েকে বড়দের সামনে বলছো চিজ , মাল। আমার ছন্দামায়ের মুখ থেকে কারও সম্পর্কে এমন কথা শোনা স্বপ্নেও ভাবা যায় না।
রীনা ফের কিছু বলতে যাচ্ছিল। সাধনা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন , তুমি তো অনেকের অনেক বিহিত কর। এবার এর একটা বিহিত  তোমাকেই করতে হবে। 
সাধনার কথা শুনে রামবাবু বলেন , এর আর বিহিত করার কি আছে ? আপদ বিদায় হয়েছে ভালো হয়েছে। আপনার কাজকর্ম ও যা করত রীনা তার চেয়ে ভালো করে দেবে। কি মা পারবি না ?
--- হ্যা, আমি মায়েরও তো কত কাজ করে দিই।
---- থাক ঠাকুরপো ,  আমার কাজ আর কাউকে করতে হবে না। আর কে আপদ তা সময়ই বলবে। আমি শুধু মনোর বাবার মুখ থেকে সেটাই শুনতে চাইছি।
স্ত্রীর তাড়নায় এবারে মুখ খোলেন ভুবনবাবু। রামবাবুর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন , ভাই তুমি যেমন আমার বন্ধু।ছন্দার বাবাও আমার সে রকমই বন্ধু। এক বন্ধুর জন্য আমি আর এক বন্ধুকে হারাতে পারব না। তোমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল সেটা যখন সম্ভব নয় জেনেই গিয়েছো তখন আর এখানে পড়ে থেকো না।ছন্দামাকে আমরা যতটুকু চিনি তোমরা এখানে থাকলে সে আর এবাড়ির চৌকাঠ মাড়াবে না। আর ছোট থেকে যাকে দেখে আসছি তাকে একটা দিন না দেখে আমরাও থাকতে পারব না। 
---- তুমি কি আমাদের চলে যেতে বলছ ? 
---- হ্যা, ভাই কিছু মনে কোর না। তোমরা আজ এসো। তোমরা থাকলে দুটি পরিবারের এতদিনকার সম্পর্কে ফাটল ধরবে।
--- আর আমার সম্পর্কটা বুঝি তোমার কাছে কিছুই নয় ?
--- তা কেন ? তুমি আমার বন্ধু ছিলে, বন্ধুই থাকবে। কেবল যে আশায় তোমরা এসেছিলে সেই আশাটা ত্যাগ করো। তোমার প্রচুর টাকা পয়সা আছে। তাই মেয়ের জন্য তোমার পাত্রের অভাব হবে না।
--- সে তো হবেই না। পৃথিবীতে তুমিই তো একমাত্র ছেলের বাবা নও। ভালো রেজাল্ট করা ছাড়াও অন্যদিকে ভালো ছেলে পাওয়া যায়। সেটাই তোমাকে দেখিয়ে দেব। 
---- দেখিয়ে দিতে হবে না ভাই। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি সেটাই যেন হয়।
---- তুমি প্রার্থনা না করলেও সেটা হবে।



                                       তারপর ব্যাগপত্র নিয়ে কাউকে কোন কিছু না বলেই হন হন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় বাপ-মেয়ে। তারা চলে যেতেই স্বস্তি ফেরে সাধনার মনে। স্বামীর মুখের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকায় সে। স্বামীর চোখে মুখে কেমন যেন বিষন্নতার ছাপ।হওয়াটাই স্বাভাবিক। এতদিনের বন্ধু , বিচ্ছেদ হলে মন তো খারাপ হওয়ারই কথা। তাই স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে সে বলে , একদম মন খারাপ কোর না। তুমি যা করেছে, তা ঠিক করেছো।
--- মন খারাপ করেও তো কিছু করার নেই। শুধু খারাপ লাগছে রাম আমাকে ভুল বুঝে চলে গেল।
--- ছাড়ো তো ওদের কথা। বাপ--মেয়ে টাকার অহংকারে একেবারে মটমট করছে। আমরা গরীবগুর্বো মানুষ। ওদের সঙ্গে তালমিল হবে কেন ? তার চেয়ে চলো দেখি মনোকে পাঠিয়ে মেয়েটাকে মান ভাঙিয়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করি। তারপরই ছেলের উদ্দেশ্যে হাঁক পাড়েন , মনো ও মনো ,  একবার ও বাড়ি যা বাবা।মেয়েটাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে আয় দেখি।
কিন্তু মনো কোথাই তখন ? সে ততক্ষণে সাইকেল নিয়ে ছন্দাদের বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে। যেতে যেতে ছন্দাকে ঘিরে তার মনে খুব সংশয় দেখা দেয়। কে জানে মেয়েটা তার ডাকে আসবে কিনা! যা অভিমানী ,  তারই সামনে চড় মারা স্বত্ত্বেও মনোর চুপ করে থাকাটা যে তার মনে সব থেকে বেশি দাগা দিয়েছে তা এখন বুঝতে পারছে সে। সেই দাগটা যে করেই হোক মুছিয়ে দিতে হবে। সেই কথা ভাবতে ভাবতেই ছন্দাদের বাড়ির চৌকাঠে পা রাখে মনোতোষ। অভাসবশেই তার চোখ চলে যায় ধানের গোলার দিকে।এর আগে যতবারই এ বাড়িতে এসেছে ততবারই গোলার কাছে ও বাড়ির খুঁকীর সাথে রান্নাবান্না খেলতে দেখেছে ছন্দাকে।কিন্তু আজ সেখানে কেউ নেই।পড়ে আছে খেলাঘর।গেল কোথাই ছন্দা ? রান্নাঘরের কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করতেই কাকীমা বলেন , ওই দেখ,  তোমাদের বাড়ি থেকে এসেই শুয়ে রয়েছে।কি হয়েছে কে জানে ?  কিছু বলছেও না , এত করে ডাকছি তাও মুড়ি খেতেও আসছে না।তুমি বাবা গিয়ে একবার দেখ তো কি হলো ? মনোতোষ বুঝতে পারে ঘটনার কথা এ বাড়ির কেউ জানেই না। এ বাড়ির  লোকেদের চোখে তারা ছোট হয়ে যেতে পারে সেই আশংকায় ঘটনার কথা ছন্দা যে বলবে না সে আন্দাজ মনোর ছিলই। এখন সেটা মিলে গেল। আসলে ভালোবাসার মানুষজনকে কেউই ছোট করতে চায় না। অথচ সে  ছন্দাকে রীনার কাছে ছোট করে দিল ? কিছুতেই তাই আক্ষেপ ঘোঁচে না মনোতোষের।মনে মনে সেই আক্ষেপ করতে করতেই সে ছন্দার ঘরে ঢোকে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে শোয় ছন্দা। ছন্দার মনে যে এখনও তীব্র অভিমান জমা হয়ে আছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না মনোতোষের। তাই  সে দ্রুত সেই অভিমান ভাঙাতে তৎপর হয়।ছন্দার কাছে গিয়ে তার গায়ে হাত দিতেই তার হাত সরিয়ে দিয়ে ফের উল্টো দিকে পাশ ফিরে শোয় সে। বার কয়েক ছন্দা ওইভাবে এপাশ-ওপাশ করার  মনো বোঝে এভাবে মান ভাঙানো যাবে অভিমানিনীর। অগ্যতা সে মোক্ষম অস্ত্রটা প্রয়োগ করে। নিরাসক্ত গলায় বলে , বেশ কথা বলবি না তো ?  আমিও তাহলে এই ঘরেই বসে রইলাম। তুই না খেলে আমিও খাব না।ভালোই হবে আমার ওষুধও খাওয়া হবে না। কে দেবে আমাকে ওষুধ ?  ডাক্তারদাদু তো বলেইছেন ওষুধ না খেলে আমার দুর্বলতা কাটবে না।
এবারে ফুঁপিয়ে ওঠে ছন্দা। অবরুদ্ধ গলায় সে বলে , কেন তোমার তো বড়োলোকের মেয়েটা আছে। তাকেই গিয়ে বলো গে যাও না ওষুধ দিয়ে দেবে। আমি গরীবের মেয়ে। আমাকে আবার জ্বালাতে এলে কেন ?
---- সে থাকলেই তো ? আর থাকলেই বুঝি এতদিন সে আমাকে ওষুধ দিয়েছে ?
এবারে চিত হয়ে শোয় ছন্দা।তারপর বলে , অঃ  সেই জন্যই বুঝি আমার কাছে আসা হয়েছে ? তা তিনি নেই কেন শুনি ?
ঘটনার কথা সবিস্তারে ছন্দাকে খুলে বলে মনোতোষ।শুনে ছন্দা বলে, আচ্ছা হয়েছে। 
---- বিশ্বাস কর এই কয়েকদিনে রীনার গায়ে পড়া ভাবে আমিও হাফিয়ে উঠেছিলাম। মনে মনে সবসময় তোকেই চাইতাম। নেহাৎ ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতে পারি নি। সেটা তুই টের পাস নি ? এই আমাকে ভালোবাসিস।
হাসি ফোটে ছন্দার মুখে। মনোতোষ দেখে কেঁদে কেঁদে ছন্দার দুচোখ লাল হয়ে গিয়েছে। চোখের পাতায় সে আলতো ভাবে ছুঁইয়ে দেয় তার ঠোঁট। আর তাতেই ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে ছন্দা। শশব্যস্ত হয়ে বলে , করো কি ?  দরজা খোলা আছে , কেউ দেখে ফেললে লজ্জার শেষ থাকবে না। চলো তাড়াতাড়ি কিছু মুখে দিয়ে ওষুধ খেয়ে নেবে চলো। এক লহমায় দুজনের মনে জমে থাকা মেঘটা অনুরাগ হয়ে যায়। কিন্তু সেই আবেশ কাটতে না কাটতেই ছন্দাকে ঘিরে ধরে একরাশ লজ্জা। 

                           ( ক্রমশ )


 নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                                   ( ১ ) 
                                  


                             ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                        ( ৪ )

            



                        ( ৫ )

                             ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                    ----০----
  


No comments:

Post a Comment