( কিস্তি --- ২৮)
কিন্তু সেই আবেশ কাটতে না কাটতেই ছন্দাকে ঘিরে ধরে একরাশ লজ্জা। নাতনীকে বাইরে আসতে দেখেই টিপন্নী কাটেন শান্তিলতা -- কি ব্যাপার দিদিভাই , এতক্ষণ ডেকে ডেকে আমাদের গলা ব্যাথা হয়ে গেল তবু তোমার কোন সাড়া পেলাম না। আর মনোদাদা এসেই কি জরি দিল তোমায় , যে একেবারে উঠে চলে এলে ?
ঠাকুমায়ের কথায় ছন্দার চোখমুখ লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। ঠাকুমায়ের কথা তো মিথ্যে নয়। মা-ঠাকুমা অনেকক্ষণ থেকেই তাকে খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছিল। সে বিছানায় শুয়ে সব শুনেও রাগে অভিমানে সাড়া দেয় নি। তাই এখন ঠাকুমায়ের টিপ্পনীর জবাবে সে কোন কথা বলতে পারে না। ঠাকুমাই ফের মনোদাকে উদ্দেশ্য করে বলে , দাদুভাই তুমি কোন যাদুমন্ত্রে আমাদের দিদিভাইয়ের ঘুম ভাঙালে সেটা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যেও তো। এরপর জেগে ঘুমিয়ে থাকলে সেই মন্ত্র পড়ে আমরাও ঘুম ভাঙাতে পারি কিনা দেখব।
মনোতোষ কিছু বলার আগেই মুখ খোলে ছন্দা। ঠাকুমাকে বলে , সে না হয় আর একদিন হবে। আজ তো মনোদাকে এখনই ওবাড়ি যেতে হবে। ওষুধ খাওয়ার আছে।
সেই সময় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসেন অতসী। মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলেন , ভাতবেলা হয়ে গেল , না খেয়েই চলে যাবি তাই কখনও হয় ? রান্নাও শেষের মুখে।খেয়ে যা বরং। তোদের দেরি দেখে দিদিও ঠিক বুঝে নেবে আজ আমাদের এখানেই তোরা খাওয়াদাওয়া করেই যাবি।
আর না করতে পারে না ওরা। শান্তিলতাও সায় দেন বৌমায়ের কথায়। বলেন , একদিন ওষুধ না খেলেও এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
--- তা ঠিক , মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না সেকথা ঠিক। কিন্তু ওর শরীর খারাপ হতে পারে। ডাক্তারদাদুর কড়া নির্দেশ আছে , একদিনও ওষুধ খাওয়া বন্ধ রাখা চলবে না। আর কাকীমা সেই ওষুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব দিয়েছেন আমাকে। আমি তো সেই দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করতে পারব না।
--- বেশ ভাই , তুমি তাই করো । সকাল সকাল ভাত চাট্টি খেয়েই চলে যেও।
অগত্যা মা-ঠাকুমার কথা মেনে নিতে ছন্দাকে। তাদের সম্মতি পেয়ে বাকি রান্নাটুকু দ্রুত শেষ করতে বৌমায়ের সঙ্গে রান্নার কাজে হাত লাগান শান্তিলতাও। সেই সময় ছন্দার উপস্থিতি টের পেয়ে হাজির হয় খুঁকী। তাদের খাওয়াদাওয়া করার কথা শুনে বলে , চল ভাই গঙ্গাজল আজ রমণদীঘিতে নাইতে যাবি ? কতদিন যাওয়া হয় নি। তুই থাকিস না বলে আমারও যাওয়া হয়। চল না সই আজ যাই।
দীঘিতে নাইতে যেতে ছন্দারও খুব ইচ্ছে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দীঘিতে স্নান করতে যান। যাদের বাড়িতে কল-ইন্দারা আছে তারাও যায়। দীঘিতে স্নান করার আর্কষণই আলাদা। কালো টলটলে জল। দুইদিকে হাতির শুঁড় ওয়ালা জমিদারী আমলের ইট বেড়িয়ে যাওয়া বাঁধানো ঘাট। ধারে ধারে পদ্মডাটা। ভেসে থাকে কলাগাছের ভেলা কিম্বা আস্ত কলাগাছ।একসময় ছন্দারা রোজ দীঘিতে স্নান করতে যেত। হাতির শুঁড়ে দুদিকে পা ঝুলিয়ে দীর্ঘক্ষণ গল্প করত। তারপর বুকের নীচে কলাগাছ নিয়ে ভেসে বেড়াত দীঘিময়। ওইভাবে ভেসে ভেসে তুলত পদ্মফুলের বীজ। তারা অবশ্য পদ্মফুলের ফোঁপল বলে। কি মিষ্টি স্বাদ সেই ফোঁপলের। তারপর ডাটি সহ ফোঁপল হাতে ঝুলিয়ে চোখ লাল করে বাড়ি ফিরে নিত্য মায়ের বকুনি খেত। সেইসব কথা মনে পড়তেই রমণদীঘি তাকে যেন চুম্বকের মতো টানতে থাকে। তাই দোটানায় পড়ে সে।
মনোদার শরীরের যা অবস্থা তাতে তার পক্ষে দীঘিতে স্নান করা উচিত হবে না। তাকে ফেলে সেই বা কি করে খুঁকীর সঙ্গে দীঘিতে নাইতে যায় ? অন্যদিকে খুঁকীকেই বা কি করে বিমুখ করে ? এমনিতেই মনোদা এলে সে মাঝপথে খেলাঘর ভেঙে চলে যায় বলে খুকীর মনে অভিমান জমা হয়ে আছে। তার উপরে আজও যদি তার আবদার উপেক্ষা করে তাহলে হয়তো সে আর তার গঙ্গাজলই থাকবে না। মা অবশ্য খুঁকীর কথা শুনে সরাসরি নাকোচ করে দিয়ে বলে , না না মনোর এই অবস্থায় দীঘিতে স্নান করতে যেতে হবে না।
মায়ের কথা শুনে খুঁকীর চোখে মুখে অভিমানের ছাপ ফুটে ওঠে। সে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। খুব অসহায় বোধ করে ছন্দা। সে কোনদিক ফেলে কোনদিক সামলাবে ভেবে পায় না। তার অসহয়তা টের পায় মনোতোষ। সেই তাকে ওই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে। মায়ের উদ্দেশ্যে বলে, কাকীমা যাই না আমরা দীঘি। আমি স্নান করব না। ওদের সঙ্গে ঘুরে আসা হবে।
মনোদার কথা শুনে মা আর আপত্তি করেন না। হাসি ফুটে ওঠে খুঁকীর মুখে। ছন্দাও খুব খুশী। ঘাড়ে গামছা ঝুলিয়ে তেল সাবান নিয়ে রমণদীঘির পথ ধরে তারা। যেতে যেতে তারা যেন একেবারে ছেলেমানুষ হয়ে ওঠে।
যাওয়ার পথে পড়ে ছন্দাদের ছোলা আর আখের ক্ষেত।আখ ভেঙে আলে বসে খায় তারা। তারপর ছোলা খেতে খেতে পৌঁছোয় দীঘির বাঁধানো ঘাটে। দীঘিতে তখন তাদেরই বয়সী আরও অনেক ছেলেমেয়ে স্নান করতে নেমেছে। ছন্দা আর খুঁকী তাদের সঙ্গে ডুবসাঁতার আর হেলু দেওয়া খেলায় মেতে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ পর চোখ লাল করে বাড়ি ফিরতেই অতসী রে-রে করে উঠেন। কড়া গলায় ছন্দাকে বলেন, বলি তোর তো ভারি কান্ডজ্ঞান। সেই কখন গিয়েছিস, সে খেয়াল আছে। এখন জ্বরে পড়লে কে কাকে দেখবে শুনি ?
--- কেন , তুমি ?
--- তাহলে তো এবাড়ির পাট চুকিয়ে আমাদের সবাইকে ও বাড়িতেই ডেরা নিতে হবে। কারণ জ্বর জ্বালা হলে তোমার কাকীমা তো কাছ ছাড়া করবেন না।
---- তাহলে তুমি অত ভাবছো কেন ? কাকীমাই দেখবেন তাহলে।
---- হ্যা সেই বরং ভালো হবে। এখন খেতে এসো দেখি।
সেদিন খুঁকীকেও তাদের বাড়িতে খেতে বলে মা।খাওয়া দাওয়ার পর কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে ও বাড়ি যাওয়ার জন্য মনোতোষকে তাড়া লাগায় ছন্দা। তা দেখে ফুট কাটে খুঁকী -- গঙ্গাজল তোর তো দেখি সই , সেই যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়া পড়শির ঘুম নেই 'এর মতো ব্যাপার। নিজের বাড়ি যাওয়ার জন্য মনোদার কোন তাড়া নেই, আর তোর দেখছি তর সইছে না।
সত্যিই ছন্দার যেন তর আর সইছিল না। মনোদার ওষুধ খাওয়া তো ছিলই , তার মনের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধছিল অপরাধ বোধ। তখন রাগ করে কাউকে কিছু না বলে ওবাড়ি থেকে চলে আসাটা যে ঠিক হয় নি তা এখন উপলব্ধি করতে পারছে সে। এর আগে এমন কাজ তো সে করে নি। কাকীমা বিষয়টি কেমনভাবে নিয়েছেন তা না জানা পর্যন্ত কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না সে।রাস্তায় যেতে যেতে সে মনোদাকে সেই আশংকার কথাই প্রকাশ করে। উদ্বিগ্ন সুরে বলে
--- হ্যা গো মনোদা কাকীমা আমার উপরে খুব রেগে আছে না ?
মনোতোষও মজা করে বলে, খুব বলে খুব। একেবারে রেগে আগুন হয়ে আছে।
--- তা হলে কি হবে ?
---- সে আর হবে ? পুড়ে যাবি।
---- যা , তোমার সবেতেই মজা।
ওইভাবে মজা করতে করতে আসার সময় সৌমেনদের বাড়ির কাছে পৌঁছোতেই আটকে যায় তাদের চোখ।
রাস্তার পাশেই সৌমেনদের চোখ আটকে যাওয়ার মতোই ঝাঁ চকচকে দোতলাবাড়ি। কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকেই ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনোতোষরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু সেদিন আর চোখ ফেরাতে পারে না তারা। নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারে না তারা। সৌমেনদের বাড়িতে এ কাদের দেখছে তারা ? সেখানে তখন বারন্দায় মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসে সৌমেনের বাবা কুনালের সঙ্গে গল্প করছেন রামকাকু।
দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাসিঠাট্টায় মশগুল রীনা আর সৌমেন। তাদের দেখেই সবাই নিরাসক্তের মতো মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যেন তাদের চেনেই না কেউ। মনোতোষ ভেবে পায় না মানুষ এত দ্রুত কি করে বদলে যেতে পারে। সৌমেন কিম্বা তার বাবার কথা সে ধর্তব্যের মধ্যেই আনতে চায় না, কিন্তু যারা কিছুক্ষণ আগেই তাদের বাড়িতে ঘাঁটি গেড়েছিল তারাও যে তাদের দেখে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে তা সে ভাবতেও পারে নি।রামকাকুদের এখানে দেখবে তাও সে ভাবতে পারে নি।
ভেবেছিল তাদের বাড়ি থেকে রামকাকুরা বাড়ি ফিরে গিয়েছেন।তাই সৌমেনদের বাড়িতে তাদের দেখে কিছুটা আশ্চর্যই হয় সে। রামকাকুও সৌমেনের বাবার বন্ধুস্থানীয়।ব্যবসায়িক লেনদেনও নাকি রয়েছে তাদের। তবুও রামকাকুদের দেখে মনোতোষ কিছুটা যেন অস্বস্তিতেই পড়ে। মনে হয় তাদের দেখানোর জন্য রামকাকুরা সৌমেনদের বাড়িতে ডেরা নিয়েছেন। তাই অস্বস্তি এড়াতে সে জোরে সাইকেল চালিয়ে জায়গাটা পেরিয়ে আসে। দোরগোড়ায় ছেলের সাইকেলের আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে আসে সাধনা। কাকীমাকে দেখে সাইকেল থামার আগেই ক্যারিয়ার থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে ছন্দা। তা দেখে চিৎকার করে ওঠে সাধনা -- দাঁড়া দাঁড়া , সাইকেলটা থামতে দে আগে। পড়ে হাত-পা ভাঙবি যে শেষে। মনো সাইকেলটা থামা।
কিন্তু কে শোনে কার কথা ! ততক্ষণে ছুটে গিয়ে সাধনাকে জড়িয়ে ধরেছে ছন্দা। তারপর হাত দুটো ধরে আবদারের গলায় বলে , কাকীমা তুমি আমার উপরে রাগ করো নি তো ?
--- করছিই তো ? শুধু শুধু চড় খেয়ে কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে গেলি ? বাড়িটা রীনাদের না আমাদের ? ও বলল আর অমনই তুই রাগ করে পালিয়ে গেলি ? কেন আমাকে এককথা বলতে পারলি না?
কাকীমার কথা শুনে দুশ্চিন্তা দূর হয় ছন্দার। রীনাদের প্রসঙ্গ উঠতেই সৌমেনদের বাড়ির ঘটনাটা মাকে বলে মনোতোষ। ততক্ষণে সেখানে ভুবনবাবুও হাজির। সবশুনে তিনি বলেন , খুব খারাপ লাগছে। আমাদের উপরে রাগ করে রাম জেদ করে ভুল ঠিকানায় চলে গেল।
স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে সাধনা বলেন , তুমি বৃথাই মন খারাপ করছো। আমার তো মনে হয় এতদিনে ওরা ঠিক ঠিকানায় খুঁজে পেয়েছে।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment