( কিস্তি --- ২৯ )
আমার তো মনে হয় এতদিনে ওরা ঠিক ঠিকানাই খুঁজে পেয়েছে।
--- কি জানি হবে হয়তো। স্ত্রীর কথার পিঠে নিরাসক্ত গলায় বলেন ভুবনবাবু।
স্বামীর গলায় বিষন্নতার সুর টের পায় সাধনা। তার মনটাকে অন্যদিকে ফেরানোর জন্য মনোর প্রসঙ্গ তোলে সে। কয়েকদিন আগেই ওকে রামপুরহাট কলেজে ভর্তি করে দিয়ে এসেছন ভুবনবাবু। কালই সে হোস্টেলে চলে যাবে। ভুবনবাবুই ওকে পৌঁচ্ছে দিয়ে আসবেন।রামরতনের দিক থেকে স্বামীর মনটা ঘোরেতে সেই প্রসঙ্গ তোলে সাধনা। মনোই যে স্বামীর সব থেকে দুর্বল জায়গা তা ভালোই জানে সে। তাই সেই প্রসঙ্গ তুলতেই ভুবনবাবু বলেন , কাল ছেলেটাকে একা হোস্টেলে রেখে আসতে হবে ভেবেই মন খুব খারাপ লাগছে।বাড়িটা একেবারে ফাঁকা হয়ে যাবে।
---- মনটা আমারও ভালো নেই। তবু ছন্দা আছে বলে কিছুটা ভুলে থাকতে পারব। ওকে এবার থেকে সকালেই এ বাড়িতে চলে আসতে বলব। তারপর তোমার কাছে পড়াশোনা করে আগের মতোই এ বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া করে স্কুলে চলে যাবে।ছুটির পর আবার স্কুলে থেকে তোমার সঙ্গে এ বাড়িতেই ফিরে আসবে। তারপর না হয় ওর বাবার সঙ্গে বাড়ি যাবে।
--- সেটাই ভালো হবে। এবার থেকে সান্ধ্য আসরের ফাঁকে ফাঁকে ওকে নিয়ে একটু করে বসতে হবে। মাধ্যমিকটাও যাতে ভালোভাবে পাশ করতে পারে তার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দিতে হবে।
সাধনাও সায় দেয় স্বামীর কথায়।তবে তার মাঝে মধ্যে ইচ্ছা হয় সব সময়ের জন্য মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখে।কিন্তু ও বাড়ির কথা ভেবে পারে না। ওদেরও তো এই একটাই মেয়ে। সেই মেয়েটাকে ওরাই বা ছেড়ে থাকে কি করে ? মনো বাইরে পড়তে যাওয়ার কথা ঠিক হওয়ার পর থেকেই সে টের পাচ্ছে সন্তানকে ছেড়ে থাকা কতটা কষ্টকর।কষ্টটা আরও দুঃসহ হয়ে ওঠে পরের দিন।ওইদিন সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় মনোর হোস্টেলে যাওয়ার তোড়জোড়।রাতেই ছন্দাকে নিয়ে ছেলের জন্য নানা রকম শুকনো খাবার তৈরি করে দিয়েছেন।
সেইসব খাবার বাঁধাছাঁদা করে ছন্দার হাতে তুলে দেয় সাধনা।ছন্দা জামা প্যান্ট, বইপত্রের সঙ্গে সেইসব খাবার আলাদা আলাদা বাক্সে সাজিয়ে দেয়। রওনা দেওয়ার আগে ছন্দা মনোতোষের সঙ্গে একান্তে দেখা করার জন্য তার ঘরে যায়। মনোতোষও যেন সেই প্রতীক্ষাতেই ছিল।ছন্দাকে একান্তে পেয়ে সে তার ঠোঁট এগিয়ে দেয়। ছন্দাও সেই ঠোঁটে মিলিয়ে দেয় তার ঠোঁট।
সেই সময় বাইরে থেকে ভুবনবাবু ছেলেকে ডেকে ওঠেন। আর দ্রুত হাতে ঠোঁট মুছে ছন্দা বলে , সাবধানে থাকবে।ছুটি পেলেই বাড়ি আসবে। আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকব। তারপর ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে তারা। বাড়ি ছাড়ার আগে মা-বাবাকে প্রনাম করে মনোতোষ। পায়ে ছেলের হাতের ছোঁওয়া পেতেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না সাধনা। তার দুচোখ জলে ভিজে যায়। ভিজে যায় ছন্দার চোখও। গলা বুজে আসে সবার। সাধনা কেবল ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন -- মানুষের মতো মানুষ হয়ে আয়।
তারপরই ছেলেকে নিয়ে রিক্সায় ওঠেন ভুবনবাবু। রিক্সাটা চলে যেতেই নিঃসীম এক শুন্যতা গ্রাস করে নেয় গোটা বাড়িটাকে। সারাদিন মন খারাপেই কেটে যায় সাধনার। সবে অসুখ থেকে ভুগে উঠল ছেলেটা। বাইরে একা কেমন থাকবে কে জানে ? একই অবস্থা ছন্দারও। তবু সে কাকীমাকে সান্ত্বনা দেয়।ছন্দাকে জড়িয়ে ধরে সাধনার মনটাও কিছুটা শান্ত হয়।সন্ধ্যার আগে ছেলেকে হোস্টেলে পৌঁচ্ছে দিয়ে বাড়ি ফেরেন ভুবনবাবু।তখন আবার মনটা খারাপ হয়ে যায়।এতক্ষণ স্বামী ছিলেন ছেলের সঙ্গে , তাই ছেলেকে একা মনে হয় নি।কিন্তু স্বামী ফিরতেই মনে হয় তারা তো একসঙ্গে সবাই আছে ছেলেটাই কেবল একা বাইরে পড়ে রইল।আস্তে আস্তে অবশ্য সবই সয়ে যায়।আসলে সহ্য করে নিতে হয়। কিন্তু রবিবার বা কোন ছুটি উপলক্ষ্যে বাড়ি এসে যখন আর হোস্টেলে ফেরে তখন আবার কয়েকদিন খুব মন কেমন করে ছেলেটার জন্য।
তখন শুন্যতাটা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। সেই শুন্যতা ভুলতে ছন্দাকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে সাধনা।ভুবনবাবুরও এখন বড়ো অবলম্বন হয়ে উঠেছে ছন্দা। তাকে নিজের মনের মতো গড়ে পিঠে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। সেই ফলও মিলেছে। এক ধাক্কায় ছন্দা অনেককে পিছনে ফেলে নাইন থেকে টেনে উঠেছে।তারপর থেকেই শুরু হয়েছে আরও চাপ।এখন ছন্দাকে আগের মতো আর তেমন কাজ করতে দেন না সাধনা। রান্নাঘরের ধারেপাশে দেখলেই বরং পড়ার ঘরে পাঠিয়ে দেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন , আর তো মোটে কয়েকটা মাস।একটু মন দিয়ে পড়াশোনা কর মা। নাহলে যে তোর কাকুর মুখ থাকবে না।
দ্বিতীয়বার আর বলতে হয় না। লক্ষ্মীমেয়ের মতোই পড়তে বসে ছন্দা। সাধনাও মনোতোষের মতোই তার মুখের সামনে বিস্কুটটা , হরলিক্সটা তুলে ধরেন। ভুবনবাবু একসঙ্গে দু শিশি হরলিক্স কিনে দিয়ে বলেছেন , এক শিশি ছন্দাকে ওদের বাড়ি নিয়ে যেতে বলবে।ভোরে পড়তে উঠে খাবে।
ছন্দার মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা যায় না ভুবনবাবুর। বার বার সংশয় হয় মনোর মতো ছন্দা তার মুখ রাখতে পারবে তো। যথাসময়ে ছন্দা ভুবনবাবুর সেই সংশয় অমূলক প্রমাণ করে দেয়। টেষ্ট পরীক্ষাতেও সে অন্যদের পিছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে উঠে আসে। তাই তার ভালো রেজাল্ট করা নিতে আর ভাবতে হয় না ভুবনবাবুকে। ভাবতে হয় না মনোকে নিয়েও।হোস্টেলে গিয়ে তার আরও উন্নতি হয়েছে। মাঝে মধ্যে হোস্টেলে গিয়ে শিক্ষকদের কাছেই সেই খবর পান ভুবনবাবু। ওইসব শিক্ষকদের তিনি সবিনয়ে বলে আসেন , সবই তো আপনাদের জন্য হয়েছে।আপনারাই এখানে
ওর আসল অভিভাবক। একটু দেখবেন।
শিক্ষকেরা আশ্বাস দেন -- নিশ্চয় , সে আপনাকে বলতে হবে না। মনো নিজের গুণেই সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। ওর মতো বিনয়ী ছেলে খুব কমই দেখা যায়।
ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে সেইসব গল্প করেন ভুবনবাবু। আর গর্বে বুকটা ভরে ওঠে সাধনার। দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেন , ছেলেমেয়ে দুটো যেন আমাদের মুখ রাখতে পারে তা তুমি দেখ ঠাকুর।
কাকু হোস্টেল থেকে ফিরলেই মনোদার কথা শোনার জন্য কান খাড়া করে থাকে ছন্দা। লজ্জায় সে মনোদার বিষয়ে সরাসরি তো কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারে না। তাই মনোদাকে ঘিরে কাকু-কাকীমায়ের কথাবার্তা সে মন দিয়ে শোনে। মনোদার প্রশংসায় তারও গর্বে বুক ভরে যায়। ওইভাবেই কেটে যায় দিন। দেখতে দেখতেই আগে পরে এসে যায় ছন্দার মাধ্যমিক আর মনোতোষের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। দুজনেরই সিট পড়েছে রামপুরহাটেরই স্কুলে। ছন্দার আবার মনোরা যে স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে দিয়েছিল সেই স্কুলেই সিট পড়েছে। বাড়ি থেকে যাওয়া - আসা করে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই একদিন সান্ধ্য আসরে ছন্দার বাবার কাছে কথাটা পারেন ভুবনবাবু। শুনেই কার্যত দু'হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে মলয় বলে উঠে , ওটা দাদা তুমি যা ভালো বোঝ করো। ছন্দা তো শুধু আমারই মেয়ে নয়, তোমাদেরও মেয়ে। আমাকে কি করতে হবে বলো।
অগত্যা ছন্দাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ভুবনবাবুকে নিজের ঘাড়েই তুলে নিতে হয়। মনে মনে তিনি অবশ্য নিজেও ছন্দাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবে রেখেছিলেন। মলয়ও যে তার ঘাড়েই সেই দায়িত্ব চাপাবে তাও একপ্রকার নিশ্চিত ছিল , কিন্তু হাজার হোক মেয়ের বাবা হিসাবে তাকে তো একবার বলতেই হয় , তাই কথাটা বলেন ভুবনবাবু। কিন্তু মলয় তাকে দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। সে যে ' আমাকে কি করতে হবে বলো ' বলতে পরোক্ষে টাকা পয়সার কথাই বোঝাতে চেয়েছে তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না ভুবনবাবুর। তার টানাটানির সংসার। কিন্তু ছন্দাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার বাবার কাছে সে কোনমতেই টাকা নিতে পারবে না। তাই কিছুটা দুশ্চিন্তাতেও পড়তে হয় তাকে। কারণ মনোর ক্ষেত্রে রামরতনের রামপুরহাটের বাড়িতে থেকেই পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।
এবারে তো আর সেই সম্ভাবনা নেই। সেই চলে যাওয়ার পর থেকে ওরা আর কোন সম্পর্কই রাখে নি। কিন্তু মাঝে মধ্যেই যে মেয়েকে নিয়ে তাদের গ্রামে আসে সে খবর তার অজানা নয়। একবার নাকি স্ত্রীকেও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তাদের ধারেপাশে মাড়ায় নি। সৌমেনের সঙ্গে নাকি রীনাকেও অনেকে ঘুরতে দেখেছে। কানাঘুষোয় শোনা যায় সৌমেনের সঙ্গেই নাকি রীনার বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রামরতন। ভুবনবাবুর মনে হয় তাকে দেখিয়ে দিতে গিয়ে রামরতন হঠকারি সিদ্ধান্ত নিতে চলছে। জেনে শুনে সৌমেনের মতো ছেলের হাতে কেউ মেয়ে দেয় ? কিন্তু তারও তো কিছু করার নেই।এবারে ছন্দাকে নিয়ে কোন হোটেল কিম্বা লজেই থাকতে।তাই খরচও অনেকটাই বেশি হবে। কথাটা স্ত্রীকে বলেন তিনি। কথাটা শোনা মাত্রই সাধনা বলে , ছন্দার বাবার তো আস্পর্ধা কম নয়। তুমি ওকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাবে আর ও টাকা দেবে তাই হয় নাকি ? না সেই টাকা নেওয়া যায় ? হলোই বা ও মেয়ের বাবা, আমরা কি কেউ নয় নাকি ?
আমাদের যদি আর একটা ছেলে মেয়ে থাকত তাহলে তাকে পড়াতে হত না ? আমি না একটা মাস টানাটানি করে চালিয়ে নেব। আর থাকার ঘরের জন্যও কাউকে ধরাধরি করতে হবে না। একটা লজ হোটেল দেখে নিলেই হবে। ক'টা টাকা আর বেশি খরচ হবে ?
---- কিন্তু , কি করে কি হবে তা ভেবে পাচ্ছি না।
---- অত দুশ্চিন্তা কোর না তো। আমি আছি তো নাকি ? আপদ বিপদের জন্য সংসার খরচ থেকে বাঁচিয়ে আমি কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছি। সেখান থেকেই ছন্দার পরীক্ষা দিতে যাওয়ার খরচের সংস্থান হয়ে যাবে।
কথাটা শুনেই যেন সত্যিই একটা পাষাণভার নেমে যায় ভুবনবাবুর বুক থেকে। মুদ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে স্ত্রীর মুখের দিকে। সাধনার মুখটা আজও তার ঘোষেরদের বাড়ির দুর্গা প্রতিমার মতো লাগে।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment