Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ৩০


     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



         শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 












                কালের কারিগর
              

                              অর্ঘ্য ঘোষ



                         (  কিস্তি --- ৩০ )



সাধনার মুখটা আজও তার ঘোষেদের বাড়ির দুর্গা প্রতিমার মতো লাগে। এর আগেও বহুবার তাকে বহু দুশ্চিন্তার হাত থেকে উদ্ধার করছে সাধনা।এবারও তার অন্যথা হয় না।টাকার সুরাহা হলেও  সমস্যা দেখা দেয় বাড়িতে থাকা নিয়ে। বাড়িতে তো তারা মোটে তিনটি প্রাণী। তার মধ্যে মনো তো হোস্টেলে। এই ক'টা দিন মনোকে আনিয়ে নেওয়া যেত। 
কিন্তু তারও তো সামনেই পরীক্ষা। পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে ভেবেই সে তা করে নি। মনোর পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় সাধনার কাছে ছিল ছন্দা।  এবারে বাড়িতে তো আর কেউ থাকছে না। এই পরিস্থিতে সে সাধনাকে বাড়িতে একা রেখে যায় কি করে ? সেদিন সান্ধ্য আসরে ভুবনবাবু প্রসঙ্গটা তুলতেই মলয় বলে , ও নিয়ে তুমি কিছু চিন্তা কোর না দাদা। এই ক'দিন ছন্দার ঠাকুমাই এ বাড়িতে এসে থাকবে।বাকিরা বলেন, মনোর পরীক্ষার মতো আমরাও পালা করে রাতে থাকব। এবারে মলয়েরও তো অতসী বৌদিকে একা বাড়িতে ফেলে থাকা সম্ভব হবে না। থাকার দরকারও হবে না।সাতটা তো মোটে দিন।ও আমরাই যথেষ্ট।সান্ধ্য আসরের বন্ধুদের এই আন্তরিকতায় ভুবনবাবুর পাশাপাশি আবেগে আল্পুত হয়ে পড়ে মলয়। আবেগ আচ্ছন্ন গলায় তারা দুজনেই বলে , কি বলে যে তোমাদের ধন্যবাদ দেব ভেবে পাচ্ছি না।
সান্ধ্য আসরের বন্ধুরা বলেন, এতে ধন্যবাদ দেওয়ার কি আছে ? একদিন আমাদের ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা দিতে গেলে তোমাদেরও হয়তো বাড়ি আগলাতে যেতে হবে। বন্ধু হয়ে বন্ধুর জন্য যদি এটুকু না করতে পারি তা হলে আমরা কিসের বন্ধু ?
আর কোন কথা চলে না ভুবনবাবুদের। সান্ধ্য আসরের বন্ধুদের ভরসাতেই পরদিন সকালে ছন্দাকে নিয়ে রামপুরহাটের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন ভুবনবাবু। সেদিন সকালেই মা আর মেয়েকে ভুবনবাবুর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায় মলয়। যাওয়ার আগে সাধনা ছন্দার কপালে দইয়ের ফোঁটা পড়িয়ে দেয়। পরীক্ষা শুরু হবে অবশ্য পরের দিন।কিন্তু তখন তো আর ছন্দার কপালে ফোঁটা জুটবে না।তাই আজই ফোঁটা পড়িয়ে দেয়।হলোই বা একদিন পর পরীক্ষা , মায়ের আর্শিবাদে ওই টাতেই ছন্দার ভালো পরীক্ষা হবে। একেই বলে মাতৃস্নেহ। সন্তানের মঙ্গলকামনায় কোন যুক্তিবুদ্ধির ধার ধারে না মাতৃস্নেহ। সেই স্নেহের টানেই তো সন্তানেরাও জ্বর জ্বালা এমনি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যে শব্দটি উচ্চারণ করে  সেটি হল মা। ছন্দাও একে একে অন্যদের প্রনাম করার পর সাধনাকে প্রনাম করে বলে , আর্শিবাদ করো আমি যেন তোমাদের মুখ রাখতে পারি।
সাধনাও তার চিবুক ছুঁয়ে বলেন, আমাদের আর্শিবাদ তো সবসময় তো তোরই সঙ্গে রয়েছে মা।
নাতনিকে আর্শিবাদ করেন শান্তিলতাও।তারপরই মলয় বাক্সপত্র নিয়ে ছন্দা আর ভুবনবাবুকে রিক্সায় তুলে দিয়ে আসে। আর বার দরজায় দাঁড়িয়ে যতক্ষণ তাদের দেখা যায় ততক্ষণ সাধনা আর শান্তিলতা হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকেন। ছন্দাও পিছন ফিরে হাত নাড়তে থাকে। রিক্সাটা মিলিয়ে যেতেই ' দুগগা-দুগগা' বলে দুই হাত কপালে ঠেকান দুজনে।


                               
                            যথা সময়ে ছন্দাকে নিয়ে রামপুরহাটে পৌঁছোন ভুবনবাবু। তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার আগে থেকেই বাসস্টাণ্ডে একটি ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল মনোতোষ। তাদের থাকার জন্য মনোতোষকেই লজ হোটেলে দেখে রাখতে বলেছিলেন ভুবনবাবু।কিন্তু মনো লজ হোটেলের পরিবর্তে ওই ছেলেটির বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা করেছে। কথাটা শুনেই কিছুটা মনোক্ষুন্ন হন ভুবনবাবু। পারতপক্ষে কারও সাহার্য্য নেন না তিনি। তাই কিছুটা ক্ষুব্ধ স্বরে মনোকে তিনি বলেন , তোকে যে লজ হোটেল দেখে রাখতে বলেছিলাম তার কি হলো ? 
বাবার রাগের আঁচটা পায় মনোতোষ।তাই সে কোন কথা না বলে চুপ করে থাকে।মনোর পরিবর্তে মুখ খোলে ছেলেটি। অত্যন্ত বিনীতভাবে সে বলে , কাকু এতে মনোর কোন দোষ নেই। সে আমাকে লজ-হোটেল দেখার কথাই বলেছিল।আমিই ওকে বলেছিলাম , আমাদের তো তিনটে ঘর। একটা খালিই পড়ে থাকে। লজ - হোটেল দেখতে হবে না , আমাদের ঘরটাতেই বরং থেকে যাবেন।আমরা অবশ্য খুব গরীব।হয়তো খাওয়া দাওয়া উন্নতমানের হবে না। সেক্ষত্রে খাওয়া-দাওয়াটা প্রয়োজনে বাইরে থেকে করে নিতে পারেন।আর একান্তই যদি আপন ভাবতে না পারেন তাহলে হোটেলে যে ভাড়াটা দিতেন সেটাই না হয় আমাদের দিয়ে দেবেন।
ছেলেটার বলার ভঙ্গিতে কি ছিল কে জানে ভুবনবাবু আর না করতে পারেন না। দুটি রিক্সায় সকলে মিলে ছেলেটির বাড়ির উদ্যেশ্যে রওনা দেন।ছেলেটির নির্দেশ মতো একটি খড়ের চালের দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে থামে রিক্সা দুটি। আর সে তাদের জিনিসপত্র হাতে নিয়ে বলে , কাকু আসুন এটাই আমাদের বাড়ি। 
বাড়ির পরিবেশটা দেখেই ভালো লেগে যায় ভুবনবাবু। বাড়ির সর্বত্র দৈন্যতার ছাপ ফুটে উঠলেও কেমন যেন একটা লক্ষ্মীশ্রী বিরাজ করছে। তকতকে করে গোবর নিকানো উঠোনের একদিকে তুলসী মন্দির। ফুলভর্তি কাঠটগর আর বনবেলির ঝাড়। তারই সুগন্ধে ম-ম করছে সারা বাড়ি। পাশাপাশি মুখ গুঁজে ছাগলের সঙ্গে শুয়ে রয়েছে একটা লালুবাছুর। এতবড়ো শহরের মাঝে যেন একখন্ড গ্রাম।উঠোনে তাদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে বেড়িয়ে আসেন নীল বিহীন ধপধপে সাদা থান পড়া এক বিধবা।জীবন যন্ত্রনার ছাপ ফেলতে পারে নি তারও চোখে মুখে। কমনীয়তায় ভরা সেই মুখে যেন বিরাজ করছে চিরন্তনী মাতৃময়ী রূপ। দেখলে মাথা নত হয়ে আসে। তাই ছেলেটি মা বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর সে পায়ে হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করতে যেতেই শশব্যস্ত হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে বিধবা বলেন , করেন কি, করেন কি ? 
---- কেন দিদি হিসাবে কি আমি আপনাকে প্রণাম করতে পারি না ? 
সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর দিতে পারেন না বিধবা। কিছুক্ষণ পর অস্বস্তির সঙ্গে বলেন , আসলে ছেলে ছাড়া তো অন্য কেউ প্রণাম করতে আসে নি তো এতদিন। তাই আমি প্রণাম নেওয়ার যোগ্য কিনা তা জানি না। অন্য কারও প্রণাম নিতে কেন জানি না সংকোচ হয়।
--- অন্য কারও কথা বলতে পারব না, তবে আমার প্রণাম নিতে হবে আর আপনি বলাটা ভুলতে হবে, নাহলে যে এক বাড়িতে থেকে আমাদের পর পর মনে হবে।
আর আপত্তি করেন না বিধবা। ভুবনবাবু গিয়ে তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। প্রণাম করে ছন্দাও। বিধবা মাথায় হাত রেখে বলেন, বেঁচে থাকো। ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন।




                                                ভুবনবাবু ভাবেন মানুষের এই এক চিরন্তনী বিশ্বাস। নিজের হাজার দুঃখকষ্টের কথা ভগবানকে জানিয়েও কোন লাভ হোক বা নাই হোক অন্যের মঙ্গল কামনায় স্বভাব বশেই মানুষ তারই নাম নেয়। একথা - সে কথার পর ভুবনবাবু জিজ্ঞাসা করেন -- এ বাড়িতে আর কেউ থাকেন না ? 
---- থাকার মতো তো আর কেউ নেই ভাই। প্রভাতই আমার একমাত্র সন্তান।ওর বাবা পাথর খাদানে কাজ করত। একদিন ধ্বস চাপা পড়ে মৃত্যু হয় তার। খাদান মালিক ওর থেঁতলানো দেহ আর সৎকারের জন্য যৎসামান্য কিছু টাকা পৌঁছে দিয়েছিল। কানাকড়িও ক্ষতিপূরণ দেয় নি। আত্মীয় স্বজনেরাও ফিরে তাকায় নি। পরের বাড়িতে ঝিগিরি করে প্রভাতকে মানুষ করেছি। এখন আর অবশ্য প্রভাত আমাকে পরের বাড়িতে কাজ করতে দেয় না। টিউশানি পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ যোগড় করে। আর গরু-ছাগল পালন করে আমাদের সংসার চলে।
মায়ের কথায় অস্বস্তিতে পড়ে প্রভাত বলে, মা আবার তুমি শুরু করলে ? জানেন কাকু,  মায়ের এই এক স্বভাব। নতুন কাউকে একবার পেলেই হলো, ছেলের গুণকীর্তণ শুরু করে দেবেন। যেন তারই ছেলে একমাত্র এইসব করেছে।বিধবা বলে চলেন , কার ছেলে কি করে তা তো অত আমি জানি না বাবা। তবে বড়োলোক ছেলেরা অনেকেই নাকি বাবা-মা'কে দেখে না বলে শুনেছি। তাই ভাবি ওইসব বাবা-মায়ের তুলনায় আমি কত ভাগ্যবতী।
মা - ছেলের কথা শুনে প্রাণ জুড়িয়ে যায় ভুবনবাবুর। জীবনের প্রতিটি পরতে দৈন্যতা, অথচ মনে কোন মালিন্যতা নেই। ছেলেটির দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন তিনি। নিজের ছোটবেলাটাকেই যেন খুঁজে পান ছেলেটির মধ্যে। এতটা জীবনযন্ত্রনা তাদের  ছিল না ঠিকই কিন্তু জীবন যাপনে কোন মালিন্যও ছিল।একটা নির্ভেজাল আনন্দ ছিল জীবনে। সেই আনন্দটাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। তার ওইসব ভাবনার মাঝেই মনোকে হোস্টেলে পৌঁছে দিতে যায় প্রভাত। আর ভুবনবাবুর মনে হয় , তাই তো প্রভাত মনোর সহপাঠী কিনা জানা হোল না। প্রভাতের মা'ই তার ওই কৌতুহল নিরসন করেন। তার কথাতেই ভুবনবাবু জানতে পারেন মনোদের কলেজেই পড়ে প্রভাত। সে বি,এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে আসার সময় রুম্পার সঙ্গেই একদিন তাদের বাড়ি এসেছিল। তখন আলাপ পরিচয় হয়। এই পাড়াতেই রুম্পাদের আত্মীয় বাড়ি রয়েছে। ওই বাডির একটি ছেলে প্রভাতের সঙ্গে পড়ে। তাই প্রভাতের ওই বাড়িতে একসময় যাতায়াত ছিল।  ছোট থেকে রুম্পাও মাঝে মধ্যে সেই আত্মীয় বাড়ি আসত। সেই সূত্রেই রুম্পার সঙ্গে পরিচয় হয় প্রভাতের সঙ্গে। ভুবনবাবুর আর বুঝতে অসুবিধা হয় না রুম্পার সঙ্গে ছেলের ঘনিষ্ঠতার কথা অজানা নেই মায়ের। কিন্তু আর্থিক দৈন্যতা আর জাতিগত কারণেই যে সে কথা বলতে যে তার সংকোচ হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার। প্রভাতই যে রুম্পার মায়ের সেই তথাকথিত নীচুজাতের ছেলে তাও বুঝতে পারেন তিনি।  এখন তার মনে হচ্ছে তখন রাগ করে লজ হোটেলে চলে গেলে সত্যি বড়ো অন্যায় হত। এদের লড়াইয়ের কথা জানাই হোত না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন অন্তত একটি ক্ষেত্রে হলেও তিনি জাতের নামে বজ্জাতি  ঘোচাবেন।



                               ( ক্রমশ )



 নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                                   ( ১ ) 
                                  


                               ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                        ( ৪ )

            



                         ( ৫ )

                              ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                      ----০----
  








No comments:

Post a Comment