Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ৩১




     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



         শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 












                কালের কারিগর
              

                              অর্ঘ্য ঘোষ


                                   ( কিস্তি -- ৩১) 



মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন অন্তত একটি ক্ষেত্রে হলেও তিনি জাতের নামে বজ্জাতি ঘোচাবেন। কিন্তু এখনই বিষয়টা তিনি কারো কাছে খোলসা করতে চান না। সময় এবং সুযোগ এলেই সেটা করবেন ভুবনবাবু। প্রভাত আর তার মা সুধাদির মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই তাকে সেটা করতেই হবে। একটা দিনেই ওরা তাদের আপন করে নিয়েছে। ছন্দাও এই পরিবেশে স্বাছন্দ্য খুঁজে পেয়েছে। মনোর দেখাদেখি প্রভাতকে সে দাদা আর সুধাদিকে জ্যেঠিমা বলতে শুরু করেছে। ভুবনবাবু লক্ষ্য করেছেন মেয়েটার মধ্যে সবাইকে আপন করে নেওয়ার মতো একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে।যখন যেখানে থাকে তখন সেখানকার মানুষজনকে সে অনায়াসেই আপন করে নিতে পারে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না।ঘরে বসে বসেই ভুবনবাবু শুনতে পান সুধাদিকে ছন্দা বলেছে -- জানো তো জ্যেঠিমা আমার এখানে পরীক্ষা দিতে এসে একটা বড়ো লাভ হয়েছে।
--- কি লাভ রে ? 
---- আমার তো কোন জ্যেঠিমা ছিল না , সবই কাকীমা। এখানে এসে তোমাকে জ্যেঠিমা পেলাম।
--- ওমা তাই ? আমার তো দুটো একটা লাভ হল রে ? 
---- তোমার আবার কি লাভ হলো ? 
--- আমার ভাই ছিল না , ভাই পেলাম। আর পেলাম এই মিষ্টি মেয়েটাকে।
তারপর দুজনে মেতে ওঠে আলাপচারিতায়। তাদের টুকটাক কথা ভেসে আসে তার কানে।তারই ফাঁকে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে সুধাদেবী বলেন -- কাল থেকেই তো পরীক্ষা শুরু। সকাল সকাল বাজার থেকে মাছ নিয়ে আসবি।মাছের সাত ভালো। মাছের ঝোল করে দেব।কথাটা শুনে অস্বস্তিতে পড়েন ভুবনবাবু। এদের সংসার যে খুব কষ্টেসৃষ্টে চলে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুধাদিও তাদের কাছে লুকোন নি কিছু। তাই তারা এসে পড়ায় চাপ যে অনেকটাই বেড়ে গেল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেই চাপ লাঘব করার উপায়ও নেই। হাতে তুলে টাকা দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। মা-ছেলে দুজনেরই প্রখর আত্মসম্মান বোধ। হয়তো বলে বসবে -- তাহলে বরং আপনারা হোটেলেই খেয়ে নিতে পারেন।
প্রথমদিন বাড়িতে পা রেখেই তার নমুনা পেয়েছে সে। প্রভাতের মুখেই হয়তো প্রথমে তাদের বাড়ি আসার আপত্তির কথা শুনে থাকবেন। তাই বলেছিলেন -- কি ভাই খাওয়া-দাওয়াটা আমাদের বাড়িতেই করা হবে তো , না বাইরে থেকে খেয়ে আসা হবে ? জবাব দেবে কি , কথাটা শুনেই সে যেন মরমে মরে যান তিনি। কোন রকমে বলেন , কেন আর লজ্জা দিচ্ছেন ? আসলে আমি সচরাচর পরের সাহার্য নিতে চাই না। তাই আপনাদের সম্পর্কে না জেনেশুনে কথাটা বলে ফেলেছিলাম। আর সেটা মনে পড়িয়ে দেবেন না।
---- কিন্তু আমরা তো সেই পরই।
---- আর আপনাদের পর ভাবতে পারব না। মনে হচ্ছে যেন আপনার জন। তাই ভুবনবাবু ঠিক করেন যে কয়েকদিন এখানে থাকবেন সেই ক'দিন তিনিই বাজার করে দেবেন। সকালের দিকে হবে না , ছন্দাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। বিকালের দিকে ছন্দার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফেরার মুখে একেবারে বাজারটা করেই নিয়ে আসবেন।সেই মতো প্রথমদিন বাজার করে নিয়ে আসতেই সুধাদির ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় তাকে।সুধাদির অস্ত্রেই অবশ্য সেই রাগ প্রশমিত করেন ভুবনবাবু।


                        সেদিন ছন্দার সঙ্গে ষড় করেই একটা বাজারের থলে হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।যাওয়ার সময় তাদের মনো আর প্রভাত দুটি সাইকেলে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁচ্ছে দেয়।তারপর কলেজে চলে যায়।ছুটির সময় আবার এসে বাড়ি পৌঁচ্ছে দিতে চেয়েছিল।কিন্তু ভূবনবাবুই তাদের হয়রানির কথা ভেবে বারণ করেন।রিক্সা করেই ফেরেন তারা।সেইসময় বাজার করে নিয়ে আসেন। প্রথমে পরিচিত বাজারের থলেটা দেখে ভ্রূ কুঁচকে যায় সুধাদির। রাগ রাগ ভাব দেখিয়ে বলেন , উনি কি এমন রাজ কাজ করছেন কে জানে ? বাজারটা করে আর বাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় হলো না। তোমার হাত দিয়েই পাঠাতে হল ?  ভুবনবাবু ভেবেছিলেন তিনি আর মুখ খুলবেন না। সুধাদি যা বোঝার বুঝুক। ভুল ভাঙাতে যাবেন না। কারণ কথাটা বললেই তো আবার ক্ষুন্ন হবেন উনি। কিন্তু আসল কথাটা বলে ফেলে ছন্দা। তাকে অবশ্য কোন দোষ দেওয়া যায় না। কারণ তাকে তো কিছু বলা হয় নি। তাই সে বলে , জ্যেঠিমা তুমি বৃথাই প্রভাতদার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছ। বাজারটা তো কাকু করেছেন।
কথা শুনেই সুধাদি তো রেগে কাঁই। ভুবনবাবুর দিকে চেয়ে বলেন -- খুব তো দিদি - দিদি করছো , কিন্তু এখনও তো পরই রয়ে গেলাম।এইভাবে খাওয়ার দাম চোকাতে চাইছ ? আমরা গরীব ঠিকই , কিন্তু ভাইকে - মেয়েকে দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার জন্য এইভাবে দাম নিতে হবে ?
---- দিদি আপনিও তো কই আমাদের নিজের ভাবতে পারছেন না। নিজের লোকে বাজার করে আনলে কেউ রাগ করে বলে তো শুনি নি।সুধাদি বুঝতে পারেন নিজের কথার জালে তিনি নিজেই জড়িয়ে গিয়েছেন। তাই সেই জাল থেকে বেরোতে আমতা আমতা করে বলেন , বেশ তোমাকে আর বাজার করতে হবে না। যখন কিছু না দিয়ে খাবেই না তখন বরং নগদ টাকাই দাও। দেখি কত টাকা আছে দাও দেখি।তারপর যা খরচ খরচা হবে তা  বাদ দিয়ে যা থাকবে বাড়ির ফেরার দিন সেটা হিসাব করে ফেরত দিয়ে দেব। 
কথাটা শুনে কেমন যেন ধন্ধে পড়ে যান তিনি। মানুষ চিনতে কি তার ভুল হলো ? মুখে নিরাসক্তির ভাব দেখানোটা একটা ভড়ং ? আসলে পুরো টাকাটাই হাতিয়ে নেওয়ার তাল ? তাই বা কি করে হয় ? তার মানুষ চেনা অভিজ্ঞতাটা কি তাহলে ভুল ? 
তার দোটানা ভাব লক্ষ্য করে সুধাদি ফের তাগাদা দেন -- কই কি হলো ? দাও টাকা ক'টা এনে।
ভুবনবাবু দেখেন আর পিছানোর জায়গা নেই। মনে মনে ভাবেন লজ হোটেলে থাকলেও তো টাকা দিতে হত। এখানে একটু বেশিই মুল্য চোকাতে হচ্ছে এই যা। তাই সামান্য কিছু টাকা হাত বলে রেখে সবটাই তুলে দেন সুধাদির হাতে।  




                       তারা দুজনে ছাড়া বিষয়টি অবশ্য কেউ জানতেও পারে না। তাই যেমন চলছিল ঠিক তেমনি ভাবেই স্বাভাবিক গতানুগতিকতায় দিন কেটে যায়। ছন্দাকে খাইয়ে দাইয়ে বেরনোর আগে দইয়ের ফোটা দিয়ে দেন। প্রায় দিনই বন্ধুদের সাইকেল নিয়ে মনোতোষ হাজির হয়ে যায়। তাকেও জোর করে খাইয়ে দেন। তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ। সেইসব দেখেশুনে কিছুতেই সুধাদিকে মেলাতে পারেন না তিনি। কাউকে কিছু বলতেও পারেন না। যাকে দিদি বলে ডেকেছেন তাকে কি করে অন্যের চোখে ছোট করবেন। হয়তো অভাবের জন্যই লোভ জয় করতে পারেন নি। তাই বলে পাঁচকান হোক তাও তিনি চান না। কিন্তু অচিরেই তার ভুল ভেঙে যায়।মনে মনে ভাবেন মানুষ এমনও হয়। দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে আসে। শেষ পরীক্ষার দিন বিকালেই বাড়ি ফেরার কথা ছিল ওদের। কিন্তু সেদিন কিছুতেই তাদের বাড়ি যেতে দেন না সুধাদি। সেদিন রাতে মনোদাকেও খাওয়ার নিমন্ত্রণ করেন। অগ্যতা মনমরা হয়ে বাড়িতেই বসেছিলেন ভুবনবাবু। কারণ তার কাছে তখন বাড়ি ফেরার মতো টাকাও অবশিষ্ট নেই। সুধাদি কিছু টাকা ফেরত দেন তো ভালো , নাহলে মনোর কাছে নিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে তাদের। ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই সুধাদি হাজির হন সেখানে।তারপর রুমালে বাঁধা কিছু টাকা তার হাতে তুলে দিয়ে বলেন , দেখে নাও ভাই সব ঠিকঠাক আছে কিনা ?
ভুবনবাবু চেয়ে দেখেন সেদিন দেওয়া সমস্ত টাকাগুলোই রয়েছে। বিস্মিত হয়ে সুধাদির মুখের দিকে তাকান ভুবনবাবু। ম্লান হাসি ফুটে ওঠে সুধাদির মুখে। খুব ধীরে ধীরে বাস্পরুদ্ধ গলায় বলেন , তুমিও আমাকে এই চিনলে ভাই ? তোমাদের খাইয়ে আমি টাকা নিতে পারব ? ধর্মে সইবে ? আসলে আমি বুঝেছিলাম বারণ করলেও তুমি শুনবে না। প্রতিদিন টাকা খরচ করে সব কিনে আনবে। তাই সেটা আটকাতেই ওইভাবে কায়দা করে আমাকে টাকাগুলো চেয়ে নিতে হয়। এইভাবে তোমার সঙ্গে ছলনা করার জন্য দিদিকে তুমি ক্ষমা কোর ভাই।
কথাগুলো শুনেই বাকরুদ্ধ হয়ে যান ভুবনবাবু। নিজের গালেই চড় মারতে ইচ্ছে করে তার। কার সম্পর্কে কি ভেবেছিলেন তিনি ! অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খায় তাকে। তিনি যে ক্ষমার অযোগ্য। তাই ক্ষমাও সে চান না। কিছুটা পাপ স্খালনের জন্যে বাজারে ছোটেন। সন্ধ্যের মুখে বাজার থেকে সুধাদির জন্য সুন্দর একটা শাড়ি আর প্রভাতের জন্য একটা জামা প্যান্টের ছিট কিনে নিয়ে ফেরেন। তাই দেখে সুধাদি প্রথমদিন বাজার করার মতোই আপত্তি তোলেন। ভুবনবাবুও সেদিনের মতোই সুধাদিকে চুপ করিয়ে দেন।সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত গল্পগুজব করেই কেটে যায়।ঠিক হয় মনোতোষের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ও ভুবনবাবু  সুধাদিদের  বাড়িতেই থাকবেন। মনোতোষও পরীক্ষা কয়েকদিন হোস্টেল ছেড়ে এখানে এসেই থাকবে।রাতে আর হোস্টেলে ফেরা হয় না মনোতোষের। তাতে মনে মনে ছন্দা খুব খুশী হয়।খুশী হয় মনোতোষও। ভোরে ছন্দাদের ফেরার বাস। হোস্টেলে থাকলে হয়তো ফেরার আগে আর দেখাই হত না। কিন্তু এখান থেকে মনোদা আর প্রভাতদাই তাদের বাসে তুলে দিয়ে আসবে। সেদিন এক ঘুমেই রাত ভোর হয়ে যায়। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সবাই। ছন্দা দেখে তার অনেক আগে উঠে তাদের জন্য চা-জলখাবার তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছেন জ্যেঠিমা। চোখমুখ ধুয়ে ছন্দা তার কাছে গিয়ে অনুযোগ করে বলে , আমাকে ডাকলেই তো পারতে। দিব্যি হাতে হাতে করে নিতে পারতাম।
---- যা ধকল গেল তোর উপরে এই ক'দিন। তার উপরে কাল শুয়েছিস অনেক রাতে। তাই আর ডাকি নি। 
তারপরই তাদের খেতে দেন জ্যেঠিমা। খাওয়া দাওয়ার পর বেরনোর আগে জ্যেঠিমাকে সে আর কাকু প্রনাম করে। ছন্দাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জ্যেঠিমা বলেন, তোরা ছিলি এতদিন বাড়িটা যেন ভরেছিল। এরপর খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগবে রে বাড়িটা।  
জ্যেঠিমার কথাটা শুনে ছন্দার মনটাও খুব খারাপ হয়ে যায়। ছন্দা তার হাত ধরে বলে, আমাদেরও খুব মন খারাপ করবে তোমাদের জন্য। তারপরই তারা হাত নাড়তে নাড়তে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মনোদারা জায়গা করে তাদের বসিয়ে দিয়ে নীচে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কাকু পাশে থাকায় লজ্জায় মনোদার দিকে চোখ তুলে চাইতে পারে না ছন্দা। কেবল বাস ছাড়ার মুহুর্তে এক পলকের জন্য চোখাচোখি হয়। বাসের চাকা গড়াতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে ওঠে ছন্দার।


    
                              ( ক্রমশ )



 নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                                   ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                       ( ৪ )

            



                        ( ৫ )

                             ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                      ----০---


No comments:

Post a Comment