Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কারিগর -- ৩২





     নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



         শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 












                কালের কারিগর
              

                               অর্ঘ্য ঘোষ
        
                          (  কিস্তি --- ৩২ ) 



বাসের চাকা গড়াতেই বুকের ভিতরটা যেন হু হু করে ওঠে ছন্দার। সারা রাস্তা মনোদার জন্য খুব মন খারাপ করে তার।মন খারাপ নিয়েই মনোদাদের বাড়িতে পা রাখে তারা।আট দিন পরে বাড়ি ফিরছে। তার আনন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু কোথাই সেই আনন্দ ? বাড়ি ফিরলেও মনটা যে তার মনোদার কাছেই পড়ে রয়েছে। তাদের দেখেই বার দরজায় ছুটে আসেন সাধনা আর শান্তিলতা। ছন্দা দু'জনকে প্রনাম করে উঠে দাঁড়াতেই সাধনা তাকে হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে বলেন , আহারে আটদিনেই মায়ের আমার মুখখানা শুকিয়ে গিয়েছে।হবে না কেন ? বাইরে খাওয়া দাওয়া কি আর সহ্য হয় ? ভুবনবাবু স্ত্রীকে বলতে যাচ্ছিলেন বাইরে নয় , তার মেয়ে এতদিন নিজের বাড়ির মতো আদর যত্নেই ছিল। কিন্তু সাধনা তাকে সে কথা বলতে দিলে তো ? সে তখনও স্বামীকে উদ্দেশ্য করে সমানে বলে চলেছে -- আমি তো তবু যতটা পারি বাড়ি থেকে খাবার তৈরি করে পাঠানোর চেষ্টা করি। কিন্তু উনি তো আবার সে সব নিয়ে যাবেন না। বাজার থেকে পয়সা দিয়ে যা কিনতে পাওয়া যায় তা বাড়ি থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার নাকি কোন মানেই হয় না।নাও এবার দেখ বাজার থেকে কেনা খাবার খাওয়ার কি হাল ?
স্ত্রীর কথার তোড়ের মাথায় বার কয়েক কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন ভুবনবাবু। স্ত্রী থামলে সিরিয়াস মুখ করে বলেন , সত্যিই ভাবতে পারি নি বাজারের কেনা খাবারে শরীরের এমন হাল হয়।
স্বামীকে তার যুক্তি মেনে নিতে দেখে সাধনা দ্বিগুন উৎসাহে ফের বলতে শুরু করেন , শেষ পর্যন্ত মানতে হল তো তাহলে?  কথায় আছে না গরীবের কথা বাসি হলে মিষ্টি হয়।
স্ত্রীর কথা শুনে তখন ভুবনবাবু মৃদু মৃদু হেসেই চলছেন। কাকুকে যে মজা করার নেশায় পেয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না ছন্দার। কাকু ওইরকমই , মাঝে মধ্যেই কাকীমার সঙ্গে এই ভাবেই মজা করেন। আর শেষে বেমালুম বোকা বনে গিয়ে কাকীমা রেগে ওঠেন। কাকীমা অবশ্য কাকুর মুচকি হাসি দেখে কিছুই আন্দাজ করতে পারেন না। বরং ধরেই নেন কাকু পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। এরপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে কাকুরও শরীরের বেহাল দশা আবিস্কার করে ফেলেন। তারপর প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন , শুধু মেয়েটারই নয় , এই ক'দিনে নিজের চেহারাটার কি হাল হয়েছে একবার দেখেছো ? হবে নাই বা কেন ? বোধ হয় ঢালাও হারে বাইরের খাবার চলেছে।
আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না কাকু। হো হো করে হেসে ওঠেন। কাকীমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন , ওঃ সত্যি  তুমি পারোও বটে। ছন্দা বলে দে তো মা এই কয়েকদিন আমরা কি খেয়েছি না খেয়েছি।
--- ও কি বলবে ? আমার কি আর বুঝতে কিছু বাকি আছে ? 
---- না গো কাকিমা আমরা বাজারের খাবার খাই নি। আমরা তো মনোদার কলেজেরই এক দাদার বাড়িতে ছিলাম।
---- মানে ? 
----- মানে এবারেও তুমি ডাহা ফেল। তোমার আন্দাজের ঢিল ফসকে গেল।
বলেই হো হো করে ফের হেসে ওঠেন কাকু। আর রাগে যেন কাকীমার নাকের পাটা ফুলে ওঠে। সব তালটা গিয়ে এবার পড়ে ছন্দার উপর। রীতিমতো রাগী গলায় বলেন ,  তুই তো আচ্ছা মেয়ে। তখন থেকে তোর কাকু আমাকে নিয়ে মজা করছে আর তুইও সব জেনে চুপ করে থেকে মজা দেখছিস ? 
কাকীমার অনুযোগে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় ছন্দা। কি করে বলবে সে তো মুখ খোলারই সুযোগ পায় নি। তবে সত্যি কথা বলতে কি , কাকীমাকে নিয়ে কাকুর মজা করাটা সে এতক্ষণ বেশ উপভোগই করছিল। কিন্তু সেটা তো আর এ সময় বলা যাবে না।তাহলে পরিস্থিতি আরও খেপচুরিয়াস হয়ে উঠবে।তার ওই অসহায় পরিস্থিতি দেখে কাকুই বলেন , তুমি মেয়েটাকে শুধু শুধু দোষ দিচ্ছে। তুমি ওকে সুযোগ দেবে তবেই না ও তোমার ভুল ভাঙাবে। এতক্ষণ তো তুমি এক তরফাই বলে গেলে।
--- যাও যাও তোমাকে আর ওর হয়ে সালিশি মানতে হবে না। সবাইকে জানা আছে আমার।



                রাগে মুখ লাল করে  রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকেন সাধনা। শান্তিলতাও তাকে অনুসরণ করতে যাচ্ছিলেন। হাতের ইশারায় তাকে থামান ভুবনবাবু। তারপর ছন্দাকে বলেন , তুই গিয়ে আগে তোর কাকীমাকে সামলা। তারপর আপনি যাবেন।কাকুর কথা শুনে ঘাড় কাত করে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায় ছন্দা।ভুবনবাবু নিশ্চিত জানেন ছন্দা ঠিক ওর কাকীমায়ের রাগ ভাঙিয়ে তবে ছাড়াবে।ছন্দাই তো এখন সাধনার রাগ ভাঙানোর অব্যর্থ ওষুধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।আড়াল থেকে তিনি ওদের রাগ ভাঙানোর কৌশলটাও বেশ উপভোগ করেন।মেয়েটা এ বাড়িতে আসার পর থেকে তাই তিনি স্ত্রীকে রাগানোর ভরসা পান। কারণ প্রতিবারই ছন্দা সাধনার রাগ ভাঙিয়ে তাদের সম্পর্কটা আরও মধুর করে তোলে। এবারও তার অন্যথা হয় না। পা টিপে টিপে ছন্দা রান্নাঘরে পৌঁছে দেখে কাকীমা তখন রাগের চোটে কাজ করতে গিয়ে একটার পর একটা অকাজ করে ফেলছেন। লুচির ময়দা মাখতে গিয়ে বেশি জল দিয়ে ফেলছেন , নয়তো আলুভাজায় বেশি হলুদ। সেটা লক্ষ্য করেই ছন্দা বলে , তবে যাই বলো কাকীমা তোমার কাছে কিন্তু প্রভাতদার মায়ের রান্না কিছুই নয়।তাই আমরা তো পেট পুরে খেতে পারতাম না।সেইজন্যই বোধহয় আমাদের রোগা দেখাচ্ছে বুঝেছো ?
---- যা যা , আর আমাকে  তেল দিতে হবে না।
---- না গো কাকীমা সত্যি বলছি।
---- তাহলে তোর কাকু যখন আমার পিছনে লাগছিল তখন কথাটা বলতে কি হয়েছিল ? 
---- তুমিই তো বলেছো , যে যাই খেতে দিক না কেন কোনমতেই তার নিন্দা করা উচিত নয়। তাছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় কাকু তো মনোদাকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকবে। রান্না যাই হোক না , বাজারের মতো তো ক্ষতিকর হবে না বলো ?
কথাটা মনে ধরে সাধনার। তাই সে আর কোন প্রত্যুত্তর করে না। বরং স্বাভাবিক গলায় বলে , আয় দেখি হাতে হাতে জলখাবারটা বানিয়ে ফেলি। ততক্ষণে অবশ্য শান্তিলতাও রান্নাঘরে এসে খুন্তি ধরেছেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই সব জলের জল হয়ে যায়। দুপুরে খাওয়ার সময় প্রভাত আর তার মায়ের কথা শুনে সম্পূর্ণ ঘুরে যান কাকীমা। উচ্ছস্বিত গলায় বলেন , আজকের দিনে এমন আন্তরিকতা ভাবা যায় ? না-না অন্য কোথাও থেকে আর কাজ নেই , মনোর পরীক্ষার সময় ওদের বাড়িতেই থাকবে। ওদেরও আমাদের বাড়ি আসতে বলবে।
ভুবনবাবু বলেন , সে না হয় আসতে বলব ? কিন্তু ওদের বাড়িতে খেয়ে যদি আবার আমাদের শরীর-টরীর ---- 
কাকীমা চোখ পাকিয়ে বলেন -- আবার ?
ওদের কথা শুনে ছন্দা আর শান্তিলতা মুখ টিপে হাসেন। 



           সেদিন সান্ধ্য আসরের পর রাতে খাওয়া দাওয়া করে মলয়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেন  শান্তিলতা। ছন্দাও ঠাকুমায়ের সঙ্গ নেয়। যাওয়ার আগে শান্তিলতাকে প্রনাম করে সাধনা বলে , কবে মাকে হারিয়েছি। এই ক'দিন মায়ের অভাবটা ভুলেছিলাম। মনোর পরীক্ষার সময় আবার যেন আসবেন। 
শান্তিলতা তাকে আর্শিবাদ করে বলেন , আমার মনে হচ্ছিল যেন মেয়ের কাছে রয়েছি।
তারপর ছন্দাকে দেখিয়ে বলেন , এবার তো তোমার মেয়ে চলে এসেছে মা। আর কি মায়ের আসার দরকার হবে ?
--- তা কেন ?  আপনিও আসবেন , আমরা তিন মা--মেয়েতেই একসঙ্গে থেকে যাব।
ঠিক হয় কাল সকাল থেকে এবাড়িতে চলে আসবে ছন্দা।খুব শীঘ্রই তাকে উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাস পড়ানো শুরু করতে চান ভুবনবাবু। তাকে হয়তো বাইরে কোথাও রেখে পড়ানো সম্ভব হবে না। রুম্পার মতোই এক্সর্টান্যাল হিসাবেই পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রুম্পার জন্য তাকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয় নি।ওর বাড়ির লোক বিশেষ করে ওর মা মাধ্যমিকের পরই তো বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। রুম্পা এসে তাকে ধরেছিল।খুব করুণ গলায় বলেছিল , স্যার আমি পড়তে চাই। কিন্তু মা আমার বিয়ে দিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আপনি আমার পড়ার ব্যবস্থা করে দিন।রুম্পার আকুতি শুনে সেদিন খুব দোটানায় পড়েছিলেন তিনি। ছেলেমেয়ের বিয়ে দেওয়া না দেওয়াটা একেবারে পরিবারের নিজস্ব ব্যাপার। সেখানে নাক গলানোটা অনুচিত বলেই মনে করেন তিনি।আবার একটি মেয়ে পড়াশোনা করতে চাইছে জেনেও কি করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাবেন তিনি ? তাহলে যে নিজের বিবেকের কাছে জবাব দিতে পারবেন না। বিয়েটা অবশ্য তিনি আটকে দিতেই পারেন। নাবালিকার বিয়ে দেওয়াটা যে বেআইনী সেই কথা বলে রুম্পার বাবা-মাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করা যেতেই পারে। কিন্তু তার কথা কানে না তুলে যদি ওরা বিয়ের ব্যবস্থা করেন আর অন্য কোথাও খবর পেয়ে পুলিশ প্রশাসন যদি বিয়ের রাতেই হানা দিয়ে সব বন্ধ করে দেয় ? তাহলে কেউ বিশ্বাস করবে না সে কিছু করে নি। বরং তার ঘাড়েই চাপবে সব দায়। সে বড়ো মর্মান্তিক ব্যাপার হবে।এই তো গতবছরই তাদের পাশের গাঁয়ে বিয়ের দিন সকালে পুলিশ প্রশাসন সঙ্গে নিয়ে চাইল্ড লাইনের লোকেরা এক নাবালিকার বিয়ে আটকে দেয়। ততক্ষণে রান্নাবান্না সহ বিয়ের আয়োজন প্রায় সমস্ত সারা। আত্মীয় স্বজনে গিজগিজ করছে বাড়ি।সব বরবাদ হয়ে যায়। ১৮ বছরের আগে আর মেয়ের বিয়ে দেব বলে মুচলেকা দিয়ে রেহাই মেলে মেয়ের বাবার। তাই কান্নার রোল ওঠে বিয়েবাড়িতে। ওঠাটাই স্বাভাবিক। এই বাজারে মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে মাথার চুল পর্যন্ত বিকিয়ে যায়। তারপর একবার বিয়ে ভেঙে গেলে সেই মেয়েটি অপয়া বলে বিবেচিত হয়। তার বিয়ে দিতে তখন পরিবারের লোকেদের ভোগান্তির শেষ থাকে না।তাস্বত্ত্বেও জেনেশুনে কেন যে মানুষ বেআইনী কাজ করে কে জানে ?



                               ( ক্রমশ )



 নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                                   ( ১ ) 
                                  


                            ( ২) 





                      ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                                                                            ( ৪ )

            



                        ( ৫ )

                            ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                     ----০----


No comments:

Post a Comment