( কিস্তি ---- ২৬ )
কিন্তু সেদিনের ঘটনাটা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। রীনারা আসার পরের দিনই ঘটে ঘটনাটা। রীনা সেই সময় বাথরুমে গিয়েছিল। ছন্দা আর পারছিল না , মনোদার সঙ্গে কথা বলতে না পেরে হাঁফিয়ে উঠেছিল। রীনারা যে কবে যাবে তারও কোন ঠিকঠিকানা নেই। তাই মনোদাকে কিছুক্ষণ একান্তে পেয়ে মুখোমুখি বসে কথা বলছিল সে। রাগী গলায় বলে , কি ব্যাপার বলো তো ? মেয়েটা তোমার পিছনে পড়ে আছে কেন গো ?
---- পড়ে আছে কেন তা আমি কি করে বলব ? তুই ওকেই জিজ্ঞেস কর।
---- ও পরের মেয়ে , ওকে কেন জিজ্ঞেস করতে যাব ?
---- অঃ আমি বুঝি খুব আপন ?
---- জানি না যাও। এড়িয়ে যেও না, তুমিই বা ওকে অত পাত্তা দাও কেন বলো তো ?
---- ও কত বড়ো লোকের মেয়ে। কত ধন সম্পত্তি, ওকে পাত্তা না দিলে হবে ?
---- তবে থাকো তুমি তোমার রীনাকে নিয়ে। আমারই বা এখানে পড়ে থেকে লাভ কি ? অভিমানে ঠোট ফুলিয়ে কথাগুলো বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় ছন্দা।
আর তাই দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে মনোতোষ। ছন্দাকে রাগাতে গিয়ে এমন হবে সে ভাবতে পারে নি। তাই মান ভাঙাতে সে ছন্দার হাত দুটো ধরে কাছে টেনে বলে , রাগ করছিস কেন ? ঠাট্টা বুঝিস না ? রীনারা দুদিনের জন্য এসেছে।নেহাত বাবার বন্ধুর মেয়ে। তাই সৌজন্যের খাতিরে ওর গায়ে পড়া মেনে নিতে হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস কর আমারও খুব বিরক্ত লাগে। তোর সঙ্গে কথা বলতে না পারায় আমারও ভালো লাগছে না।কবে যে বিদায় হবে কে জানে ?
মনোদার কথায় ছন্দার অভিমান গলে জল হয়ে যায়। মুখে হাসি ফোটে। সে নিজের ঠোঁটটা এগিয়ে দেয় মনোদার ঠোঁটের কাছে। মনোদার ঠোঁটও নেমে আসে তার ঠোঁটের কাছে।ঠিক সেই সময় বাথরুম থেকে ফিরে আসে রীনা। তার উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দুজনে দুদিকে ছিটকে সরে যায়। কিন্তু তাদের ঘনিষ্ঠতার কিছুটা আঁচ হয়তো পেয়ে যায় রীনা।তাই বোধহয় তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সে। অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলে , তুই সব সময় এখানে ঘুরঘুর করিস কেন রে।কাজের মেয়ে কাজের মেয়ের মতোই থাকবি।
তা নয় যেন বাবার বাড়ি পেয়েছে।যা এই মুহুর্তে বেরিয়ে যা এখান থেকে।
আর নিতে পারে না ছন্দা। কাজের মেয়ে বলাতে তার তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না।কিন্তু বাবা তুলে কথা বলাটা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। শুধু সে কেন , পৃথিবীর অধিকাংশ মেয়েই বাবার নিন্দা সহ্য করতে পারে না। তাই সে'ও গলায় শ্লেষ ঝরিয়ে বলে --- বাড়িটা আমার বাবার যে নয় সে আমি জানি। কিন্তু তুমি কি জানো না বাড়িটা তোমার বাবারও নয়। তাই তুমি আমাকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলতে পারো না।
সেই কথা শুনে রাগে যেন ফেটে পড়ে রীনাও। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে -- কি যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা ? বাবা তোলা বের করছি দাঁড়া ? বলেই কেউ কিছু বোঝার আগেই সপাটে ছন্দার গালে একটা চড় কষিয়ে দেয় সে।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ভ হয়ে যায় মনোতোষ। তার সামনে কেউ ছন্দার গালে চড় মারবে তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। রীনার গালে পাল্টা একটা চড় কষার জন্য হাতটা নিশপিশ করে ওঠে তার।অন্য কেউ হলে এতক্ষণ সমুচিত শিক্ষা দিয়ে দিত সে।কিন্তু রীনাকে কিছু করতে পারে না।কারণ রীনা একে তাদের অতিথি , বাবার বন্ধুর মেয়ে , সর্বোপরি সে একটি মেয়ে। মেয়েদের গায়ে হাত তোলা দুরের কথা কটু কথা বলার শিক্ষা সে মা-বাবার কাছে থেকে পায় নি। বরং মেয়েদের সম্মান করতেই শিখিয়েছেন তারা। তাই সে কিছু করতে পারে না।
ওই পরিস্থিতিতে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ে। তাকে ওই অবস্থায় দেখে তীব্র অভিমানে ভিজে যায় ছন্দার দু'চোখ।চড়টাতে যতটা না ব্যাথা লাগে তার চেয়েও তাকে বেশি ব্যথিত করে তোলে মনোদার নীরব ভূমিকা। সে আশা করে ছিল মনোদা নিশ্চয় তার অপমান মেনে নেবে না। তখন ছন্দার চোখে পড়ে না মনোতোষের টানাপোড়ন। তাই তীব্রবেগে সে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজেদের বাড়ির দিকে ছুট লাগায়। আর তখন যেন সম্বিৎ ফেরে মনোতোষের।সে ছুটে গিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাকেই আটকে দেয় রীনা। তার হাত ধরে ঘরের ভিতরে টেনে আনে সে।প্রচন্ড রাগ হয়ে যায় মনোতোষের। বিরক্তি ঝড়া গলায় সে বলে , কাজটা কিন্তু তুমি ঠিক করলে না ?
---- তুমি -- তুমি বলছো একথা ? দেখলেই তো তোমার সামনেই ও আমার বাবা তুলে কথা বলল , আর আমি ওকে ছেড়ে দেব ?
---- ও কিন্তু আগে তোমার বাবা তোলে নি , তুমিই আগে সেটা করেছো।
---- তুমি একটা পাতি কাজের মেয়ের সঙ্গে আমার তুলনা করছো ?
---- তুমি ভুল ভাবছো , ও কিন্তু কাজের মেয়ে নয়।
---- কাজের মেয়ে নয় , তাহলে ?
রীনার ওই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে হোঁচট খায় মনোতোষ। কি বলবে সে এখন ? কি পরিচয় দেবে ছন্দার। রীনা তো প্রথমদিনেই ওর পরিচয় জানতে চেয়েছিল। সে বলেছিল , বাবার বন্ধু মলয়কাকুর মেয়ে। বাবার কাছে টিউশানি পড়তে এসে মাকে টুকটাক কাজে সাহার্য্য করে। শুনে রীনা বলেছিল -- ও, কাজের মেয়ে। সে আর ভুলটা ভেঙে দেয় নি সেদিন। আজ বুঝছে কি ভুলটাই না সে করেছিল। আফশোষে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে তার।ছন্দার জন্য খুব কষ্ট হয়।ছুটে গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আসতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু ছন্দার নাগাল কি আর সে পাবে ? সে তো অনেকক্ষণ আগে সবার অগোচরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গিয়েছে। ছন্দার কথা ভাবতে ভাবতেই কথা বলার ইচ্ছটাই হারিয়ে যায় মনোতোষের। সাধনারা ছন্দার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি জানতেও পারেন না।কারণ বৈঠকখানা ঘরে তারা তখন রামরতনের সঙ্গে নানান খোসগল্পে মেতেছিলেন। কিন্তু গল্প করতে করেতে তারাও একসময় মেয়ের মতোই বাবার কথায় বিড়ম্বনার মুখে পড়েন। একথা-সেকথার পর মনোতোষের প্রসঙ্গ তুলে রামবাবু বলেন --উচ্চমাধ্যমিকের পর মনোকে কি পড়াবে কিছু ঠিক করেছো তোমরা ?
---- না , সেই রকম কিছু ভাবি নি। আগে উচ্চ মাধ্যমিকটাই দিক। তারপর গ্র্যাজুয়েশান করে শিক্ষকতা করবে।
---- সেকি এত ব্রাইট রেজাল্ট , তাও ওকে স্কুলমাস্টার বানাতে চাও ? ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার করার কথা ভাবতে পারলে না ?
----- শিক্ষকের ছেলে শিক্ষক হওয়াই তো ভালো। আদর্শ শিক্ষকের আজ বড়ো অভাব। আমি চাই ও আদর্শ শিক্ষক হোক। তাছাড়া আমি ছাপোষা মানুষ। ডাক্তারি কিম্বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই।
--- তোমার যতসব বস্তাপচা সেণ্টিমেন্ট। আদর্শ শিক্ষক হয়ে তোমার লাভটা কি হবে শুনি ? সেই তো নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সংসারে সারাজীবন পুতুপুতু করে বাঁচতে হবে।একটা পাকাবাড়ি করে ঋণ শোধ করতে জীবন যাবে।
আত্মসম্মানে ঘা দেওয়া কথাটা যেন খট করে কানে লাগে সাধনার। মনে মনে প্রমাদ গোনে সে।স্বামী প্রচন্ড আদর্শবাদী মানুষ। বন্ধুর কথাটা কেমন ভাবে নেবেন কে জানে ? শেষে বন্ধু বিচ্ছেদ হয়ে না যায় !
তার আশংকা অমূলক করে দিয়ে হাসিমুখে ভুবনবাবু বলেন -- সবার ভাবনা তো ভাই এক নয়। আমি মনে করি আমরা সমাজবদ্ধ জীব। তাই সমাজের জন্যও কিছু করণীয় আছে। তাতে নাই বা হোল পাকাবাড়ি , নাই বা হোল গাড়ি। এইভাবে হেসে খেলে চলে গেলেই হোল। আর নিজের সামর্থ্যই যেখানে নেই , সেখানে তোমার কাছে ঋণ করে কোন ভরসায় ছেলেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানাব ? চারিদিকে যা সব শুনছি , ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পর অধিকাংশ ছেলের কাছে আর বাবা-মায়ের ঠাঁইই হয় না। সেখানে আমি তোমার ঋণ শোধ করব কি করে ?
--- আরে ঋণ ভাবছ কেন ? আর শোধ করারই বা অত দুশ্চিন্তা কিসের ?
---- তাহলে দয়ার দান ? কিছু মনে কোর না , সেটাও যে ভাই নিতে পারব না।
---- দয়ার দানও নয়।
---- তাহলে ?
---- জানোই তো , আমার একটাই মেয়ে। বিয়ের পর সব তো জামাই -- মেয়েই পাবে।আমি মনোকে জামাই করতে চায়।সেইজন্যই তো কাগজে মনোর রেজাল্টের খবরটা পড়ে একেবারে রীনাকে নিয়েই চলে এলাম। দেখাশোনাটাও হয়ে যাবে। আর এখন থেকেই কথাটা আটিয়েও রাখা হবে।
এতক্ষণে মেয়েকে নিয়ে হঠাৎ করে এসে রামরতনের ঘাটি গেড়ে বসার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হয় ভুবনবাবুদের কাছে।
কথাটা শোনার পর তাই হাসি মুখে ভুবনবাবু বলেন , সেটা হলে তো ভালোই হত ভাই। কিন্তু সে উপায় তো আর নেই।
--- কেন ? উপায় নেই কেন ?
---- সে গোঁড়া তোমার বৌদিই মেরে দিয়েছেন। ওই যে তোমার বৌদির হাতে হাতে সব করছে যে মেয়েটা , তাকে তো তুমিও পিকনিকের দিন দেখছো। সে আমার বন্ধু মলয়ের মেয়ে। ভারি লক্ষ্মীমন্ত। ওকেই মনোর বৌ করব বলে তোমার বৌদি স্থির করে রেখেছেন।
--- তোমার মলয় আর আমি এক হলাম ? আমার ইচ্ছের কোন দাম নেই তোমার কাছে ?
---- দেখ বন্ধু সবাই সমান বলেই আমি মনে করি। আর আমাদেরও তো একটা ইচ্ছে -- অনিচ্ছে আছে।
সেই সময় সেখানে হাজির হয় রীনা। আদুরে গলায় বলে , জানো বাবা ওই কাজের মেয়েটা না আমাকে বাবা তুলে কথা বলেছে আজ। আমি প্রতিবাদ করতেই আমাকে চড় মারতে আসে। তাই তার আগেই আমি দিয়েছি একটা সপাটে চড় কষিয়ে। কথাটা শুনেই আঁতকে ওঠে সাধনা।







No comments:
Post a Comment