( কিস্তি --- ২৫ )
আপনা থেকেই তার ঠোঁট নেমে আসে মনোদার ঠোঁটে। ছন্দার শরীরে সংবাহিত হয় অন্যরকম জ্বর।সেই জ্বরে পুড়তে এবং পোড়াতে খুব ভালো লাগে তার। আচমকা কাকীমার গলা পেয়ে দ্রুত সেই জ্বর নেমে যায়। কিন্তু জ্বরো ভাবটা থেকেই যায় দীর্ঘক্ষণ। কাকীমার ডাকে রান্নাঘরে আসে ছন্দা। তাকে দেখে কাকীমা বলেন , তুই স্নান করে খাওয়া দাওয়া করে নে। আমি ততক্ষণ মনোকে মাথা ধুইয়ে ,গা মুছিয়ে খাইয়ে দিই। তারপর তুই গিয়ে ওষুধটা খাইয়ে দিবি। সেই মতো সে স্নান খাওয়া করে ফের মনোদার কাছে গিয়ে বসে।
ওষুধ খাইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে মনোদা। আর সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে তার চোখও ঘুমে জড়িয়ে আসে তা সে টের পায় না। সেই ঘুম ভাঙে কাকীমায়ের ডাকে। চোখ মেলে চেয়ে দেখে মনোদার মাথার কাছেই সে এতক্ষণ ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে ছিল। সেটা দেখেই খুব লজ্জায় পড়ে সে। ইস কাকীমা কি ভাবলেন কে জানে। সে বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসেতেই কাকীমা বলেন -- খাওয়া দাওয়া করে মনোর জ্বরটা নামল কিনা দেখতে গিয়েই দেখি তুইও ঘুমিয়ে পড়েছিস।
--- ডাকলে না কেন আমাকে ?
--- ভাবলাম ঘুমোচ্ছিস ঘুমো। সারাদিন তোর উপরেও তো কম ধকল গেল না। তাই আর তখন ডাকি নি। কিন্তু এখন বিকাল গড়াতে চলল। আর ঘুমোলে তো শরীর খারাপ করবে। নে এবার মনোকেও ডেকে তোল। ওষুধ-টষুধ দেওয়ার আছে নাকি দেখ। আমি ততক্ষণ তোদের জন্য দু গ্লাস দুধ গরম করে আনি।
--- আমি কিন্তু দুধ খাব না আগে থেকেই বলে দিচ্ছি। তখন যেন খা--খা করে জোর করবে না।
---- কেন খাবি না কেন শুনি ?
---- দুধ তো খায় রুগী আর ছোটরা। আমি কোনটাই নয়।
---- একদিন বলেছি না বাবা- মায়ের কাছে ছেলেমেয়েরা সবসময় ছোটই থাকে।
ছন্দা বোঝে তর্ক করে লাভ নেই। দুধ তাকে খেতেই হবে। প্রকৃত ভালোবাসার জোরের কাছে তো অন্য কোন জোর খাটে না।বিকালের দিকেই মনোদা পুরোপুরি সুস্থ হয় যায়। কিন্তু নাকের ফোলা ভাবটা থেকে যায় না। সেটা স্বাভাবিক হতে লেগে যায় আরও চারটে দিন। চারদিনের মাথায় পুরোপুরি স্বাভাবিক দেখায় মনোদার নাক। চারদিন সমানে মনোদার পাশে থেকে সেবা করে যায় ছন্দা। আর সেই সুবাদে দুটি কিশোর হৃদয়ের বন্ধন যেন আরও অটুট হয়ে ওঠে। চারদিনই নিয়ম করে রুম্পাদি আর রাজীবদা দুবেলা মনোদাকে দেখতে এসেছে। দীর্ঘক্ষণ চারজনে গল্পগুজব করেছে।
ওদের মুখেই শুনেছে , শয়তানটা সেদিনের সেই ঘটনার কথা পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছে। সবার কাছে পড়ে গিয়ে আঘাত লেগেছে বলে লজ্জা ঢেকেছে। চারটে সেলাই লেগেছে। ডাক্তার নাকি বলেছে , চোখের নিচে ওই ক্ষতের দাগ আর মেলাবে না। সারাজীবন জনম দাগের মতো থেকে যাবে। শুনে ছন্দা মনে মনে বলে , ঠিক হয়েছে, যেমন কর্ম তেমনই ফল।দাগটা দেখলেই নিজের কুকর্মের কথা মনে পড়বে।
তাতে যদি কিছুটা শোধরায় তো শোধরাবে।শয়তানটা নিজের কুকর্মের কথা গোপন করলেও আসল ঘটনা অবশ্য জানতে কারও বাকি থাকে না। যারাই শোনে তারাই বলে , আচ্ছা হয়েছে। ওর দাঁত কটাও ঝরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। তবে শিক্ষা হোত। মনোদার মনটাই কেবল খুঁতখুঁত করে। ছন্দাকে সে বলে - ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে পড়েছি তো তাই সেদিন প্রথমদিকে ওর গায়ে হাত তোলার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তোর হাতে ধরে টানতে দেখে আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারি নি।
মনোদার কথা শুনে আরও একবার গর্বে বুকটা ভরে যায় ছন্দার। মনোদার মনটা কত নরম। অথচ তার সম্মান রক্ষা করার জন্য ছোটবেলার সহপাঠীর গায়ে হাত তুলতেও পিছুপা হয় নি। তাই মনে মনে সে বলে, তুমি সারাজীবনই এভাবেই আমার পাশে থেকো।মুখে কেবল বলে , তুমি মন খারাপ কোর না তো। যারাই শুনেছে সবাই তোমার প্রশংসা করছে। তুমি মন থেকে সব মুছে ফেলো।
ইচ্ছে করে মুছে ফেলতে হয় না। পর পর দুটি সুসংবাদ ভুলিয়ে দেয় সবকিছু। দেখতে দেখতে কয়েকদিনের ব্যবধানে ছন্দা আর মনোর রেজাল্ট বের হয়। সেই রেজাল্টের খবরেই দুটি পরিবারে যেন আনন্দের বন্যা ডেকে যায়। আর হবে না'ই বা কেন ? অমন রেজাল্ট কেউ আশাই করতে পারেনি। যে ছন্দা এতদিন টেনেটুনে পাশ করে এসেছে , সেই এবার অনেককে ডিঙিয়ে একেবারে চতুর্থ স্থান দখল করে বসেছে। ছন্দা
র বাবা - মা - ঠাকুমা তো বটেই , স্কুলের মাস্টারমশাইরাও ছন্দার উত্তরণের কৃতিত্ব ভুবনবাবুকেই দিয়েছেন। ভুবনবাবু অবশ্য বলেছেন , নিষ্ঠা আর অধ্যাবসায়ই ছন্দাকে এগিয়ে দিয়েছে।ছন্দা নিজের রেজাল্টের থেকেও মনোদার রেজাল্টে বেশি খুশী হয়েছে। রেজাল্টের খরব পৌচ্ছোনোর পর ধন্য ধন্য পড়ে যায় সর্বত্র। যাওয়ারই তো কথা। ৪০ বছরের স্কুলের রেকর্ড ভেঙে মনোদা রাজ্যের মেধা তালিকায় ১০ জনের মধ্যে নবম স্থান অধিকার করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এমন খবরে ছন্দা খুশী হবে না তো কে হবে ? সংবাদ মাধ্যমের লোকেরা দফায় দফায় ছবি তুলতে ভীড় জমিয়েছেন। সাংবাদিকদের কাকু বলছেন , ভালো রেজাল্ট হবে সেটা আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু ও যে মেধা তালিকায় স্থান পাবে তা আশা করি নি।
রেজাল্ট উপলক্ষ্যে দুই বাড়িতেই দুদিন বিস্তর খাওয়া দাওয়া হয়। কাকুর সান্ধ্য আসরের বন্ধু, ডাক্তারদাদুদের পাশাপাশি বাদ যায় না রাজীবদা - রুম্পাদিরা। রুম্পাদি-রাজীবদারাও সেকেণ্ড ডিভিশনে পাশ করেছে। গ্রামের মধ্যে যারা পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের মধ্যে শয়তানটাই কেবল অঙ্ক আর ইংরাজীতে কম্পার্টমেন্টাল পেয়েছে। সেই খবর শুনেই রুম্পাদি বলে , ঠিক হয়েছে। পড়াশোনা বাদ দিয়ে নোংরামো করে বেড়ালে তো ওই রকম রেজাল্ট হবেই। শয়তানটার খারাপ রেজাল্টে রুম্পাদিরা যতখানি খুশী তার চেয়েও বেশি খুশী হয়েছে মনোদার রেজাল্টে। রাজীবদাও একদিন তাদের বাড়িতে খাওয়াবে বলেছে। রুম্পাদিরই কেবল একটু মন খারাপ। তাকে আর বাড়ির বাইরে রেখে পড়ানো হবে না বলে ঠিক করা হয়েছে। সব শুনে ছন্দা বলে, রুম্পাদি তুমি একবার কাকুকে বলে দেখ না। কাকু বললে মনে হয় তোমার বাবা-মা আর না করতে পারবেন না।
--- সেটাই বলব ভাবছি।
---- তাই বোল , আমিও কাকুকে বলার জন্য কাকীমাকে বলব।
সেই কথা শুনে ছন্দাকে জড়িয়ে ধরে রুম্পা বলে , তুই আমাকে খুব ভালোবাসিস না ?
---- বারে তুমি আমার দিদি না ? দিদিকে বোন তো খুব ভালোবাসবেই।
---- আর তোর মনোদাকে ?
এবারে লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে ছন্দার মুখ। লজ্জা জড়ানো গলাতেই বলে -- সে তো অন্যরকম ভালোবাসা।
---- অন্য রকম ভালোবাসা আবার কি রে ?
---- জানি না যাও , তুমি না রুম্পাদি ---।
--- কি রে আমি ?
---- তুমি একটা যাচ্ছেতাই।
---- তাই বুঝি ?
ছন্দাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে রুম্পা। এক অনাবিল আনন্দে ভরে যায় দুটি মন। বর্হ্বিপ্রকাশ না ঘটলেও ছন্দা আর মনোতোষকে ঘিরে ভুবনবাবু আর সাধনাও কম খুশী নন। কিন্তু তারই মাঝে চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয় দুজনকে। খবরের কাগজে মনোদার রেজাল্টের খবর পড়ে একদিন সকালের দিকে একমাত্র মেয়ে রীনাকে নিয়ে হাজির হন ভুবনবাবুর মহুরাপুরের বন্ধু রামরতন ঘোষ। তাদের পেয়ে কাকু-কাকীমা তো মহাখুশী। রীনা ছন্দারই বয়সী। সেও এবারে নাইনে উঠেছে। সেবারে ধরণী পাহাড়ে পিকনিকে গিয়ে রামকাকুর মুখে এই রীনার কথাই অনেক শুনেছিল ছন্দা। সেই কথা শুনেই বুঝেছিল রীনা বড়োলোকের আদুরে মেয়ে। হবে নাই বা কেন ? বাবার পাথর খাদান, ট্রাকের ব্যবসা তো আছেই , রয়েছে জমিজমাও। আর বাবা-মায়েরও একমাত্র সন্তান সে। সে তো ছন্দাও বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
মনোদাও তাই। কিন্তু আর্থিক কৌলিন্যে রামকাকুর ধারেপাশেই লাগে না তারা। কিন্তু তা নিয়ে অবশ্য ছন্দার কোন হীনমন্যতা বোধ নেই। বরং রীনাকে সে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তু সে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করলে কি হবে , রীনার বড়োলোকি ভাব তাকে দূরে সরিয়ে রাখে। সবসময় মনোদাকে ঘিরে রাখে মেয়েটা। ভাবখানা এমন---- যেন মনোদা তারই সম্পত্তি। তাকে কাছে ঘেঁষতেই দেয় না। সব সময় কেমন যেন গায়ে পড়া ভাব। সে ঘরে গেলেই কখনও জল আনা , কখনও বা ঝালমুড়ি তৈরির ফাইফরমাশ দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। সবতেই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। ছন্দা অবশ্য সেসব গায়েই মাখে না। তার সেই স্বভাবই নয়। রীনারা তো বাড়ির অতিথি। অতিথিদের আবাদারে অসহ্য হলেও তাদের তা অবমাননা করাটা যে উচিত নয় সেই শিক্ষা সে ঠাকুমা, বাবা-মায়ের পাশাপাশি কাকু- কাকীমায়ের কাছে থেকেও পেয়েছে।কিন্তু সেদিনের ঘটনাটি সে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না।
( ক্রমশ )







No comments:
Post a Comment