Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

কালের কালিগর -- ২৪

        



          নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 



         শুরু  হল  ধারাবাহিক উপন্যাস -- 












                কালের কারিগর
              

                          অর্ঘ্য ঘোষ

                           


                       (  কিস্তি --- ২৪ )



কিন্তু কাউকেই কিছু করতে হয় না। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ডাক্তারের ব্যাগ ঝুলিয়ে দরজা ঠেলে বাড়ি ঢোকে ছন্দা। পিছনে পিছনে ঢোকেন ডাক্তার দিবাকর সরখেলও। তাদের দেখেই হাঁ হয়ে যান সাধনা। আর তা লক্ষ্য করে স্ত্রীকে  টিপ্পনী কাটতে ছাড়েন না ভুবনবাবু। স্ত্রীর দিকে চেয়ে বলেন , কি গো কেমন বুঝছো ? পরের মেয়ের কান্ড দেখ দেখি ,  পরের ছেলের জন্য একেবারে ডাক্তার এনে হাজির।
স্বামীর খোঁচাটা বিড়ম্বনায় ফেলে দেয় সাধনাকে। সত্যিই তো , এতদিনেও সে মেয়েটাকে চিনতে পারল না ! ছন্দা যে আর পরের মেয়ে নেই , সে এই পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছে তা বুঝতে তার এত বড়ো ভুল হয়ে গেল। তাই স্বামীর কথার কোন প্রত্যুত্তর করে না সে। নীরবে খোঁচাটা হজম করে।
স্ত্রীকে চুপ করে থাকতে দেখে ভুবনবাবুই ফের বলেন , আমি কিন্তু সাইকেল নিয়ে ওর হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে যাওয়া দেখেই আন্দাজ করেছিলাম ও ডাক্তারকাকার কাছেই যাচ্ছে। আর তুমি মা হয়ে সেটা ধরতে পারলে না ?
এবারে মুখ খোলে সাধনা। কিছুটা আমতা আমতা করে সে বলে , তা আমি কি করব ? তোমরা বাপ-ছেলে-মেয়ে তিনজনে একদিকে , আর আমি একা অন্যদিকে। সেইজন্যই তো মাথাটা গুলিয়ে গিয়েছিল।
সাধনার কথা শুনে স্ব-হাস্যে ডাক্তারবাবু বলেন , কে বললে মা তুমি একা ?  আমি তোমার দলে। চল তো দেখি মা দাদুভাইকে একবার দেখি।
মনোতোষ তখন বিছানা পড়ে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। নাক ফুলে ঢোল , যন্ত্রনার তাড়সে গায়ে জ্বরও এসেছে। জ্বরের ঘোরে মাঝে মধ্যে বিড়বিড় করে ভুলও বকে চলেছে। সেটা দেখেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সাধনা। উদ্বিগ্ন গলায় বলে --- কি হবে ডাক্তার কাকা ? 
ডাক্তারবাবু হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলেন , কি আবার হবে ? ভালো হয়ে যাবে। যন্ত্রনার তাড়সে জ্বর এসেছে। এক ডোজ ওষুধ পড়লেই জ্বর নেমে যাবে। আর জ্বর না নামিয়ে আমিও যাচ্ছি না।
ডাক্তার কাকার কথা শুনে আশ্বস্ত হয় সাধনা। সে বলে , আপনি আছেন, বলেই তো আমরা ভরসা পাই।
তারপরই  ডাক্তারবাবু সব দেখে শুনে বলেন , একটা ইঞ্জেকশান দিতে হবে। একটু গরম জল চায় যে মা।
জল গরম করার জন্য সাধনা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে দেখেন বাটিতে গরম জল নিয়ে ঘরে ঢুকছে ছন্দা।
সেটা দেখে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে সাধনা বলে -- ও তুই একেবারে গরম জল করে নিয়ে এলি ?
ছন্দা কোন উত্তর দেয় না। সে আস্তে আস্তে গরম জলের বাটিটা ডাক্তারদাদুর সামনে নামিয়ে রাখে। তা দেখে ডাক্তারবাবু বলেন , আমার যে গরম জলই লাগবে তা তুই জানলি কি করে ?
এবারে মুখ খোলে ছন্দা। সে বলে ,  ডিসপেনসারিতে বহুদিন এই রকম রোগীদের ইঞ্জেকশান দেওয়ার আগে সিরিঞ্চ পরিস্কার করার জন্য আপনাকে স্টোভে জল গরম করতে দেখেছি।
---- ওরে বাবা , তুই এত সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মনে রেখেছিস। তুই দেখছি শেষকালে আমার ভাতটা মারবি মনে হচ্ছে।



                    ডাক্তারদাদুর কথায় লজ্জা পায় ছন্দা। কোন প্রত্যুত্তর না করে সে গিয়ে মনোদার মাথার কাছে গিয়ে বসে। ডাক্তারবাবু ইঞ্জেকশান দেওয়ার পর ব্যাগ থেকে  কয়েকটা ওষুধ বের করে দেন। সেটা লক্ষ্য করে সাধনা বলেন , কাকা ওষুধগুলো কখন কি ভাবে খাওয়াতে হবে সেটা ছন্দাকে বুঝিয়ে দিন। আমি ভুলে যাব কিনা ঠিক নেই। ওই নিয়ম করে ওষুধটা খাইয়ে দেবে। আমি বরং ততক্ষণে একটু চা করে আনি।
তারপর আর কাউকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকেন সাধনা। স্ত্রীকে অনুসরণ করেন ভুবনবাবুও। সাধনা ততক্ষণে চায়ের জল চাপিয়েছে। সেইসময় পিছন থেকে ফুট কাটেন ভুবনবাবু --- হ্যা গো কাজটা কি ঠিক হল ?
---- কি কাজ ?
---- ওই যে, নিজের ছেলের ওষুধ খাওয়ানোর ভার পরের মেয়ের হাতে তুলে দেওয়া ?
---- আচ্ছা, আমি না হয় একটা কথা ভুল করে বলেই ফেলছি। তাবলে সেটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খোঁচা দিতে হবে ?  আমার পিছনে লাগা ছাড়া কি তোমার আর কোন কাজ নেই ? বিয়ে হয়ে আসা থেকে দেখছি আমার পিছনে পড়ে রয়েছো।
--- কি করব বলো, বিয়ের সময় কুলোতে খই দেওয়া থেকে পাল্কিতেও আমার ঠাই তোমার পিছনে। তাই তো আজও তোমার পিছনেই পড়ে আছি।
ওই পরিস্থিতেও পিছনে ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যায় সাধনার। লজ্জায় কিছুটা রক্তও জমে মুখে। মানুষটা বরাবরই ওইরকম। মজা করে কথা বলতে ভালোবাসেন। সেই জন্যই  ওকে আরও ভালো লাগে তার। ভিতরে ভিতরে স্বামীর জন্য একটা চাপা গর্বও বোধ হয়। কিন্তু স্বামীকে এইসময় সেটা বুঝতে দিতে চায় না। প্রশয় পেলে মানুষটা আর থামতেই চাইবে না। তাই সে বলে , আদিখ্যেতা আর কাকে বলে !  আজ বাদ কাল ছেলের বৌ আসবে ঘরে। আর উনি এলেন নিজের বিয়ের পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে। যাও দেখি বাপু মনোর ঘরে গিয়ে বসো। আমি সবার জন্য চা নিয়ে যাচ্ছি।
চা নিয়ে ঘরে পৌঁছোতেই সাধনা দেখে মনো সবে চোখ খুলেছে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ছন্দা। তার দিকে চোখ পড়তেই ম্লান হাসে মনো। সাধনার বুকের ভিতরটা  অজানা আশংকায় যেন কেপে ওঠে। সে দ্রুত সবার হাতে চায়ের কাপগুলো ধরিয়ে দিয়ে ছেলে মাথার কাছে গিয়ে  বসে।ছেলের মুখের কাছে ঝুকে পড়ে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করে , কি রে খুব কষ্ট হচ্ছে ?
মনোতোষ না সূচক ঘাড় নেড়ে আশ্বস্ত করে মাকে। সেটা লক্ষ্য করেই ডাক্তারবাবু বলেন , কষ্ট কেন হবে ? যে ভালো কাজ করে ভগবান তার কষ্ট উপশম করে দেন। তারপর মনোকে উদ্দেশ্য করে বলেন , আমি সব শুনেছি দাদুভাই। খুব খুশী হয়েছি। আচ্ছা কাজ করেছিস। বেচাল দেখলেই পেটাবি। তারপর ফেটেফুটে গেলে আমি তো আছিই।
ডাক্তারদাদুর কথা শুনে মনোতোষের মুখে ফের হাসি ফুটে ওঠে। তা দেখে সাধনা বলে , কাকা আপনিও ওকে আশকারা দিচ্ছেন ?
---- আশকারা নয় মা , আমি ওকে সাহস যোগাচ্ছি। অন্যায় দেখে প্রতিবাদ না করে সবাই যদি এড়িয়ে যায় তাহলে তো পৃথিবীতে আর বাস করাই যাবে না।



                        সহমত পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে   ভুবনবাবু বলেন , সেই কথাটাই তো আমি এতক্ষণ আপনার বৌমাকে বোঝাছিলাম। কিন্তু আমাকে তো উনি তিন তুড়িতে উড়িয়ে দিলেন।
ডাক্তারকাকার সামনে ওই কথা বলায় স্বামীর দিকে কটমট করে তাকায় সাধনা। আর সেটা লক্ষ্য করেই মুচকি হেসে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন ভুবনবাবু। তারপর প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বলেন , সৌমেনটা দিন দিন বখে যাচ্ছে। ওর বাবার কানে তো সব কথাই যায়। তবু ছেলেটাকে শাসন বারণ করতে পারেন না কেন কে জানে !
ডাক্তারকাকা বলেন , শাসন - বারণ করবে কি করে ? বাপও কি ধোওয়া তুলসী পাতা নাকি ভাবছ ? তার নামেও তো কম কুকথা কানে আসে না।কাউকে শাসন-বারণ করতে হলে তো আগে নিজেকে শোধন করতে হবে। তবেই না অন্যরা তোমার শাসন-বারন মানবে।
ভুবনবাবু বলেন -- ঠিক বলেছেন কাকা। বর্তমান প্রজন্মের এই অধোঃপতনের জন্য আমরাও কম দায়ী নয়। কোন আর্দশ আমরা তাদের সামনে তুলে ধরতে পারি না।
কথা বলতে বলতেই ডাক্তারবাবু মনোতোষের কপালে হাত দিয়ে দেখেন। তারপর বলেন , জ্বরটা নেমে গিয়েছে। মনে হয় আর  আসবে না। এখন বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। এবার তাহলে আমি আসছি বৌমা। আসার সময় ডিসপেনসারিতে কয়েকজন রোগী বসিয়ে এসেছি। যাই দেখি , এবার গিয়ে তাদের গতি করি। ডাক্তারকাকাকে এগিয়ে দিতে যান ভুবনবাবু। আর রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে সাধনা হাজির হন মনোর ঘরে। ছেলের কপালে হাত ছুঁইয়ে বলেন , জ্বরটা আর নেই মনে হচ্ছে , ঘুমোচ্ছে ঘুমোক।  তারপর ছন্দার উদ্দেশ্য বলেন , মনোর সুস্থ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত তোর তো মা আর ও বাড়ি যাওয়া চলবে না। সময় মতো ওষুধ-পথ্য দেওয়া, রান্নাবাড়া করা সব তো আমি একা সামাল দিতে পারব না। তোর কাকু বরং তোদের বাড়িতে খবরটা একসময় দিয়ে আসবে।
ছন্দা কোন কথা বলে না। তখন বকুনি খেয়ে তার মনের মধ্যে অভিমানের মেঘ পুঞ্জিভূত হয়ে আছে। সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না সাধনার। তাই ছন্দার অভিমান ভাঙাতে তৎপর হয় সে। উদাস সুরে সে বলে , মায়ের তাহলে মেয়েকে কিছু বলার অধিকার নেই তো ? বেশ আর কোনদিন বলব না তাহলে।
আর চুপ করে থাকতে পারে না ছন্দা। কান্না ভেজা গলায় বলে , আমি তাই বলেছি নাকি ?
---- তাহলে অমন সুন্দর মুখখানা ওই রকম মনমরা করে রেখেছিস কেন ?  আমার বুঝি কষ্ট হয় না ?
এবারে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না ছন্দা। নিজেকে সাধনার বুকে সপে দিয়ে সমস্ত অভিমান ঢেলে দেয়। সাধনা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। কাকীমার আদর খেতে খেতে ছন্দা বলে -- তুমি কষ্ট পেলে যে আমারও কষ্ট হয়।
---- সে আমি বুঝিরে। সেই জন্যই তো নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসি। লক্ষ্মী মা আমার , ভবিষ্যতে কোনদিন বকলে আমাকে যেন ভুল বুঝিস না মা। জানিসই তো আমার মাথা গরম। অল্পেই রেগে উঠি। তোর কাকুকে কত সময় বকাবকি করি।
--- সে আর জানি না। সেজন্যই তো তোমার বকা গায়ে মাখি না।
---- ওরে আমার মা। বলে ছন্দাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খায় সাধনা। তারপর বলে, তুই বরং মনোর কাছে বোস। আমি তাড়াতাড়ি রান্নাটা সেরে নি । ছন্দা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায়। সাধনা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। ছন্দা মনোতোষের দিকে মুখ ফেরায়। তার মুখের দিকে চাইতেই আশ্চর্য হয়ে যায় সে। এইতো কাকীমা যাওয়ার আগে পর্যন্ত চোখ বন্ধ ছিল তার। তারা ভেবেছিল ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু কাকীমা ঘর ছাড়তেই পিট পিট করে তাকিয়ে আছে। তার মানে এতক্ষণ ঘুমের ভান করে পড়েছিল সে। কথাটা তুলতেই দুষ্টুভরা হাসিতে মুখ ভরিয়ে মনোদা বলে , তাহলে যে তোদের মা-মেয়ের মান-অভিমানের দৃশ্যটা দেখা হত না। বলে একই ভাবে দুষ্টুমির হাসি হেসেই চলে।
হাসিভরা সেই মুখ দেখে সারা শরীরে রোমাঞ্চ অনুভব করে ছন্দা। তারই  সম্মান রক্ষার জন্যই মনোদার প্রতিবাদী ভূমিকার কথা ভাবতেই মনটা তার গর্বে ভরে ওঠে। আপনা থেকে তার ঠোঁট নেমে আসে মনোদার জ্বরতপ্ত ঠোঁটে।



                             ( ক্রমশ )



  নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 দেশ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার উপন্যাস ------
  

                                  ( ১ ) 
                                  


                           ( ২) 





                        ( ৩ )

                                       
                            


অর্পিতা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে সালিশির রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর কথা ও কাহিনী---  

                       ( ৪ )

            



                        ( ৫ )

                            ( খেলার বই )
         

                                                                                 


                     ----০----
       



No comments:

Post a Comment