অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
রাজু ভাইয়ের আসল নাম ছিল নাসিম আহমেদ।লোকে তাকে রাজু মিয়াঁ বলে ডাকতেন। আমি বলতাম রাজু ভাই। উনি আমাকে অর্ঘ্যদা বলতেন। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বর গ্রামে।যৎসামান্য বেতনে কাজ করতেন লোকপাড়ার হাইস্কুল চত্বরের একটি বেসরকারি মোবাইল টাওয়ারে। থাকতেন টাওয়ার লাগোয়া একটি ছোট্ট ঘরে।
রাজুভাই অবশ্য লোকপাড়ায় আসা যাওয়া শুরু করেছিলেন টাওয়ার নির্মাণের বেশ কয়েকমাস আগে থেকে। কালো রঙের একটি ব্যাগ কাঁধে সকালের দিকেই প্রতিদিন হাজির হতেন।তার পর লোকপাড়া মোড়ের দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতেন। কখনও বা কোন গাছতলা কিম্বা বন্ধ দোকেনের বেঞ্চে বসে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তেন , কিম্বা ডায়রি খুলে কি সব লিখতেন।কেউ পরিচয় জানতে চাইলে বলতেন টাওয়ারের কর্মী।কিন্তু লোকে সেই কথা বিশ্বাস করত না।কারণ সেই সময় টাওয়ার নির্মাণের কোন উদ্যোগই শুরু হয়নি। তার উপরে সেই সময় টাওয়ার বসিয়ে দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছিল।তাই ওই পরিচয় দেওয়ায় মাঝে মধ্যে তাকে অপদস্ত হতে হচ্ছিল।
একদিন তাকে সেরকমই অপদস্ত হতে দেখে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করি । উনি সেদিন টাওয়ার কোম্পানীর দেওয়া একটা পরিচিতি পত্র দেখিয়ে আমাকে বলেছিলেন -দ্যাখেন তো দাদা, কার্ড দেখাচ্ছি , তাও এরা বিশ্বাস করছে না। যা মন তাই বলছে। আমি ছেলেগুলোকে বকে সরিয়ে দিই। তারপর থেকেই রাজুভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
তারপর একদিন টাওয়ার নির্মাণ হয়। রাজুভাই সেখানে একাধারে অপারেটর তথা নাইটগার্ড হিসাবে বহাল হন। সন্দেহের অবকাশ থেকে রেহাই পান। কিন্তু জ্বালাতন কমে না।স্কুলের পড়ুয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ , কখনও বা তার মোবাইলের কোম্পানীর লোকেরাও তাকে নানা ভাবে উত্যক্ত করত। আর মাঝে মধ্যেই মেজাজ হারিয়ে ছুটে আসতেন আমার কাছে। কখনও ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলতেন , দ্যান তো ভাই জুৎ করে খানিক দ্যান তো। আমি সবই বুঝতাম। ফোনটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি হয়তো আমারই কোন পরিচিত গলা। তাই সংক্ষেপে বলেছি , কেন ভালো মানুষ পেয়ে লোকটাকে রাগাচ্ছিস ? আর রাজুভাইকে বলেছি , আপনি অত রাগেন কেন ? রাগেন বলেই তো ওরা মজা পেয়ে যায়। তারপর চা খাইয়ে আবার টাওয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছি।
রাজুভাই আমাদের ক্লাবে তাসের সান্ধ্য আসরে মাঝে মধ্যে যোগ দিতেন । সাধারণত আমার পার্টনার হতেন। খুব মজার মজার কথা বলতেন।সবাই খুব উপভোগ করত তার কথা। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে কথা বলানোর চেষ্টা করত সবাই।কিন্তু তার ভিতরে ছিল যন্ত্রনা। সবাই তা জানত না। তিনিও হাসি দিয়ে চাপা দিয়ে রাখতেন সেই যন্ত্রনা।কথায় কথায় আমাকে মাঝে মধ্যে বলতেন সেই যন্ত্রনার কথা। দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে ছিল তার অভাবের সংসার। খুব যৎসামান্য বেতন পেতেন। সেই টাকায় সংসার চলত না। তাই মাঝে মধ্যে ২০০/৫০০ টাকা ধার নিতেন। আবার মাইনে পেয়ে ফেরতও দিতেন। অভাবের জন্য দুবেলা রান্নাও করতেন না। এক বেলা ডালে ভাতে করতেন , রাতে তাতেই চলে যেত। নাহলে মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিতেন। তাই ক্লাবে কিম্বা বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে আমি সর্বাগ্রে তাকে নিমন্ত্রণ করতাম। যাতে সেই দিনটা অন্তত রাজুভাইয়ের ভালো খাওয়া জোটে।
উনিও পরবে বাড়ি থেকে আমার জন্য নিয়ে আসতেন বিভিন্ন রকম খাবার।তার বড়ো মেয়ের বিয়ের পর বেশ কয়েকজন শিক্ষক , ছাত্র সহ তার প্রিয়জনদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন স্কুলে। তিনি নিজেকে বলতেন 'নন ম্যাট্রিক'। কিন্তু তার চিন্তা চেতনার প্রসারতা ছিল অনেক শিক্ষিত মানুষের চেয়ে বেশি।মসজিদে নমাজ পড়তে যেতেন না। কিন্তু ইসলাম বিরোধীও ছিলেন না। বরং ঈদ - মহরমে গরীব দুস্থদের ৫০/১০০ টাকা জাকাত দিতেন। বলতেন - যত্তসব, নিজের বাবা মা'কে ভাত দেয় না। মসজিদে মৌলবীকে থালা ভর্তি খাবার পাঠায়। নমাজ পড়ে কপাল কালো করার থেকে কবিতা লেখা, বই পড়া ভালো।
বাস্তবিকই কাজের ফাঁকে রাজুভাই বই পড়তেন , কবিতা লিখে ভর্তি করতেন খাতার পর খাতা। সাহিত্যগুণ থাক বা নাই থাক হাতের কাছে যাকেই পেতেন ধরে ধরে শোনাতেন সেইসব কবিতা। আমাকেও শোনাতে আসতেন। কবিতা পাঠ শেষে বলতেন, অর্ঘ্যদা স্কুলের মাষ্টার মশাইরা কবিতা শোনার পর খুব হাসাহাসি করে। আমি তখন মজা করে বলেছিলাম, রাজুভাই এবার থেকে আপনি প্রতিটি কবিতার শেষে ' নাসিম আহমের এই কবিতা শুনে ভাই /যদি কেউ হাসে বুঝবো তার মাথাই কোন বুদ্ধি নাই' লাইন দুটো যোগ করে দেবেন। দেখবেন আর কেউ হাসবে না। বলা বাহুল্য, তারপর থেকে ভনিতার মতো রাজুভাইয়ের কবিতায় যুক্ত হতে থাকে পঙক্তি দুটি। কাজও হয়। হাসি গিলতে বাধ্য হন অনেকেই। বোকা বনতে কেইবা চায় ? আমি শুধু ভাবি কতটা সরল আর কতটা বিশ্বাস থাকলে মজা করে বলা কথাতেও এমনটা করা যায়।
বছর খানেক আগেই রাজুভাই মারা গিয়েছেন।তার কয়েক মাস আগে টাওয়ারে চুরি করতে এসে চোরেরা তার হাতপা ভেঙ্গে দেয়। তারপর থেকেই নানা রোগে ভুগছিলেন। মারা যাওয়ার আগে পরিবারের কাছে তার ঋণের কথা লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। পরিবারের লোকেরা সেইসব ঋণ মিটিয়েও দিয়েছেন। আজ বড়ো অপরাধ ভুগি।নিজে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করি। অথচ রাজুভাইয়ের একটা কবিতাও তাতে ছাপতে পারি নি। সাহিত্য গুণের বিষয়টিই সেদিন বড়ো হয়েছিল। তার মতো স্বল্প শিক্ষিত নুন আনতে পান্তা ফুরানো লোকের সাহিত্যনুরাগটা একবারও চোখে পড়ে নি। একটা কবিতা মেজে ঘসে ছাপলেই তার চোখে যে স্বর্গীয় খুশী ঝরে পড়ত তা তো আর দেখা হল না। আফশোস একটাই জীবদ্দশায়, রাজুভাইয়ের রচনা আমাদের হাসির খোরাক হয়েই থেকে গেল। সে কথা ভুলি কি করে ?
শঙ্করকাকুর ভালো নাম ছিল শক্তিপদ মণ্ডল। আমরা বলতাম শঙ্করকাকু । ময়ূরেশ্বরের ঢেকা গ্রামে ছিল বাড়ি। প্রথম দিকে ডাক্তার রমাপতি চট্টোরাজের ডিসপেনসারিতে কম্পাউন্ডারি করতেন। সে সময় ডাক্তারবাবুর দলুইপাড়া সংলগ্ন চেম্বার খুলেই তাকে দু'হাতে স্যালাইনের দুটো খালি বোতলে টিউওয়েল থেকে জল আনতে দেখতাম।সেই দৃশ্যটা আজও আমার মনে পড়ে
আমার কাকুদের বন্ধু স্থানীয় ছিলেন সেই সুবাদে আমাদের বাড়ি যাওয়া আসা ছিল। তার ছেলে শৈলেনও আমার বন্ধু স্থানীয়। তাই তাদের বাড়িও মাঝে মধ্যে গিয়েছি। সেই সুবাদে শঙ্করকাকুকে কাছে থেকে দেখেছি। চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা অভিজ্ঞতার কথাও অনেক শুনেছি তার মুখ থেকে। পরে নিজে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা করতেন। এলাকার মানুষজন , বিশেষ করে গরীব মানুষের কাছে সে সময় তিনি অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন।
সব সময় বেশ ফিটফাট থাকতেন। ধুতি পাঞ্জাবি পাজামা যাই পড়তেন , তাকে সবেতেই মানিয়ে যেত।সাইকেলের হ্যান্ডেলে ব্যাগটি ঝুলিয়ে নিয়ে ডাকে যেতেন। আমাদের বাড়িতেও রোগ বালাই হলে তাকেই ডাকা হত। সে দুপুরে ভাত খাওয়ার সময়ই হোক কিম্বা রাত্রি দুপুরই হোক ডাক পেলেই ঠিক ব্যাগটি নিয়ে হাজির হতেন। আমার বেশ মনে পড়ে শঙ্করকাকু পৌঁছোলেই বাড়ি লোকের মুখ থেকে দুঃচিন্তার মেঘ সরে যেত।সবাই ভাবত , যাক শঙ্কর এসে গ্যাছে , এবার রূগী চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
শঙ্করকাকুও রোগী এবং পরিবারকে ভরসা দিতেন। স্যালাইন দিতে হলে যতক্ষণ তা চলত ততক্ষণ রোগীর ঘর ছেড়ে নড়তেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যেত সকাল হতে না হতেই রোগী চাঙ্গা হয়ে উঠেতেন। তবেই বাড়ি ফিরতেন শঙ্করকাকু। আজ ভাবি কোন ডাক্তারি ডিগ্রি দুরের কথা , যৎসামান্য বিদ্যা নিয়েই শঙ্করকাকু সেদিন স্রেফ আন্তরিকতা দিয়েই কেমন ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। তাকে ঘিরে সেই ভরসার কথা আজও আমাদের পরিবারে আলোচিত হয়।
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।
রাজুভাইয়ের কথা
( ৩৭ )
রাজু ভাইয়ের আসল নাম ছিল নাসিম আহমেদ।লোকে তাকে রাজু মিয়াঁ বলে ডাকতেন। আমি বলতাম রাজু ভাই। উনি আমাকে অর্ঘ্যদা বলতেন। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বর গ্রামে।যৎসামান্য বেতনে কাজ করতেন লোকপাড়ার হাইস্কুল চত্বরের একটি বেসরকারি মোবাইল টাওয়ারে। থাকতেন টাওয়ার লাগোয়া একটি ছোট্ট ঘরে।
রাজুভাই অবশ্য লোকপাড়ায় আসা যাওয়া শুরু করেছিলেন টাওয়ার নির্মাণের বেশ কয়েকমাস আগে থেকে। কালো রঙের একটি ব্যাগ কাঁধে সকালের দিকেই প্রতিদিন হাজির হতেন।তার পর লোকপাড়া মোড়ের দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতেন। কখনও বা কোন গাছতলা কিম্বা বন্ধ দোকেনের বেঞ্চে বসে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তেন , কিম্বা ডায়রি খুলে কি সব লিখতেন।কেউ পরিচয় জানতে চাইলে বলতেন টাওয়ারের কর্মী।কিন্তু লোকে সেই কথা বিশ্বাস করত না।কারণ সেই সময় টাওয়ার নির্মাণের কোন উদ্যোগই শুরু হয়নি। তার উপরে সেই সময় টাওয়ার বসিয়ে দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছিল।তাই ওই পরিচয় দেওয়ায় মাঝে মধ্যে তাকে অপদস্ত হতে হচ্ছিল।
একদিন তাকে সেরকমই অপদস্ত হতে দেখে এগিয়ে গিয়ে আলাপ করি । উনি সেদিন টাওয়ার কোম্পানীর দেওয়া একটা পরিচিতি পত্র দেখিয়ে আমাকে বলেছিলেন -দ্যাখেন তো দাদা, কার্ড দেখাচ্ছি , তাও এরা বিশ্বাস করছে না। যা মন তাই বলছে। আমি ছেলেগুলোকে বকে সরিয়ে দিই। তারপর থেকেই রাজুভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
তারপর একদিন টাওয়ার নির্মাণ হয়। রাজুভাই সেখানে একাধারে অপারেটর তথা নাইটগার্ড হিসাবে বহাল হন। সন্দেহের অবকাশ থেকে রেহাই পান। কিন্তু জ্বালাতন কমে না।স্কুলের পড়ুয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ , কখনও বা তার মোবাইলের কোম্পানীর লোকেরাও তাকে নানা ভাবে উত্যক্ত করত। আর মাঝে মধ্যেই মেজাজ হারিয়ে ছুটে আসতেন আমার কাছে। কখনও ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলতেন , দ্যান তো ভাই জুৎ করে খানিক দ্যান তো। আমি সবই বুঝতাম। ফোনটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি হয়তো আমারই কোন পরিচিত গলা। তাই সংক্ষেপে বলেছি , কেন ভালো মানুষ পেয়ে লোকটাকে রাগাচ্ছিস ? আর রাজুভাইকে বলেছি , আপনি অত রাগেন কেন ? রাগেন বলেই তো ওরা মজা পেয়ে যায়। তারপর চা খাইয়ে আবার টাওয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছি।
রাজুভাই আমাদের ক্লাবে তাসের সান্ধ্য আসরে মাঝে মধ্যে যোগ দিতেন । সাধারণত আমার পার্টনার হতেন। খুব মজার মজার কথা বলতেন।সবাই খুব উপভোগ করত তার কথা। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে কথা বলানোর চেষ্টা করত সবাই।কিন্তু তার ভিতরে ছিল যন্ত্রনা। সবাই তা জানত না। তিনিও হাসি দিয়ে চাপা দিয়ে রাখতেন সেই যন্ত্রনা।কথায় কথায় আমাকে মাঝে মধ্যে বলতেন সেই যন্ত্রনার কথা। দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে ছিল তার অভাবের সংসার। খুব যৎসামান্য বেতন পেতেন। সেই টাকায় সংসার চলত না। তাই মাঝে মধ্যে ২০০/৫০০ টাকা ধার নিতেন। আবার মাইনে পেয়ে ফেরতও দিতেন। অভাবের জন্য দুবেলা রান্নাও করতেন না। এক বেলা ডালে ভাতে করতেন , রাতে তাতেই চলে যেত। নাহলে মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিতেন। তাই ক্লাবে কিম্বা বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে আমি সর্বাগ্রে তাকে নিমন্ত্রণ করতাম। যাতে সেই দিনটা অন্তত রাজুভাইয়ের ভালো খাওয়া জোটে।
উনিও পরবে বাড়ি থেকে আমার জন্য নিয়ে আসতেন বিভিন্ন রকম খাবার।তার বড়ো মেয়ের বিয়ের পর বেশ কয়েকজন শিক্ষক , ছাত্র সহ তার প্রিয়জনদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন স্কুলে। তিনি নিজেকে বলতেন 'নন ম্যাট্রিক'। কিন্তু তার চিন্তা চেতনার প্রসারতা ছিল অনেক শিক্ষিত মানুষের চেয়ে বেশি।মসজিদে নমাজ পড়তে যেতেন না। কিন্তু ইসলাম বিরোধীও ছিলেন না। বরং ঈদ - মহরমে গরীব দুস্থদের ৫০/১০০ টাকা জাকাত দিতেন। বলতেন - যত্তসব, নিজের বাবা মা'কে ভাত দেয় না। মসজিদে মৌলবীকে থালা ভর্তি খাবার পাঠায়। নমাজ পড়ে কপাল কালো করার থেকে কবিতা লেখা, বই পড়া ভালো।
বাস্তবিকই কাজের ফাঁকে রাজুভাই বই পড়তেন , কবিতা লিখে ভর্তি করতেন খাতার পর খাতা। সাহিত্যগুণ থাক বা নাই থাক হাতের কাছে যাকেই পেতেন ধরে ধরে শোনাতেন সেইসব কবিতা। আমাকেও শোনাতে আসতেন। কবিতা পাঠ শেষে বলতেন, অর্ঘ্যদা স্কুলের মাষ্টার মশাইরা কবিতা শোনার পর খুব হাসাহাসি করে। আমি তখন মজা করে বলেছিলাম, রাজুভাই এবার থেকে আপনি প্রতিটি কবিতার শেষে ' নাসিম আহমের এই কবিতা শুনে ভাই /যদি কেউ হাসে বুঝবো তার মাথাই কোন বুদ্ধি নাই' লাইন দুটো যোগ করে দেবেন। দেখবেন আর কেউ হাসবে না। বলা বাহুল্য, তারপর থেকে ভনিতার মতো রাজুভাইয়ের কবিতায় যুক্ত হতে থাকে পঙক্তি দুটি। কাজও হয়। হাসি গিলতে বাধ্য হন অনেকেই। বোকা বনতে কেইবা চায় ? আমি শুধু ভাবি কতটা সরল আর কতটা বিশ্বাস থাকলে মজা করে বলা কথাতেও এমনটা করা যায়।
বছর খানেক আগেই রাজুভাই মারা গিয়েছেন।তার কয়েক মাস আগে টাওয়ারে চুরি করতে এসে চোরেরা তার হাতপা ভেঙ্গে দেয়। তারপর থেকেই নানা রোগে ভুগছিলেন। মারা যাওয়ার আগে পরিবারের কাছে তার ঋণের কথা লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। পরিবারের লোকেরা সেইসব ঋণ মিটিয়েও দিয়েছেন। আজ বড়ো অপরাধ ভুগি।নিজে একটা পত্রিকা সম্পাদনা করি। অথচ রাজুভাইয়ের একটা কবিতাও তাতে ছাপতে পারি নি। সাহিত্য গুণের বিষয়টিই সেদিন বড়ো হয়েছিল। তার মতো স্বল্প শিক্ষিত নুন আনতে পান্তা ফুরানো লোকের সাহিত্যনুরাগটা একবারও চোখে পড়ে নি। একটা কবিতা মেজে ঘসে ছাপলেই তার চোখে যে স্বর্গীয় খুশী ঝরে পড়ত তা তো আর দেখা হল না। আফশোস একটাই জীবদ্দশায়, রাজুভাইয়ের রচনা আমাদের হাসির খোরাক হয়েই থেকে গেল। সে কথা ভুলি কি করে ?
-----০-----
শঙ্করকাকুর কথা
( ৩৮ )
শঙ্করকাকুর ভালো নাম ছিল শক্তিপদ মণ্ডল। আমরা বলতাম শঙ্করকাকু । ময়ূরেশ্বরের ঢেকা গ্রামে ছিল বাড়ি। প্রথম দিকে ডাক্তার রমাপতি চট্টোরাজের ডিসপেনসারিতে কম্পাউন্ডারি করতেন। সে সময় ডাক্তারবাবুর দলুইপাড়া সংলগ্ন চেম্বার খুলেই তাকে দু'হাতে স্যালাইনের দুটো খালি বোতলে টিউওয়েল থেকে জল আনতে দেখতাম।সেই দৃশ্যটা আজও আমার মনে পড়ে
আমার কাকুদের বন্ধু স্থানীয় ছিলেন সেই সুবাদে আমাদের বাড়ি যাওয়া আসা ছিল। তার ছেলে শৈলেনও আমার বন্ধু স্থানীয়। তাই তাদের বাড়িও মাঝে মধ্যে গিয়েছি। সেই সুবাদে শঙ্করকাকুকে কাছে থেকে দেখেছি। চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা অভিজ্ঞতার কথাও অনেক শুনেছি তার মুখ থেকে। পরে নিজে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা করতেন। এলাকার মানুষজন , বিশেষ করে গরীব মানুষের কাছে সে সময় তিনি অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন।
সব সময় বেশ ফিটফাট থাকতেন। ধুতি পাঞ্জাবি পাজামা যাই পড়তেন , তাকে সবেতেই মানিয়ে যেত।সাইকেলের হ্যান্ডেলে ব্যাগটি ঝুলিয়ে নিয়ে ডাকে যেতেন। আমাদের বাড়িতেও রোগ বালাই হলে তাকেই ডাকা হত। সে দুপুরে ভাত খাওয়ার সময়ই হোক কিম্বা রাত্রি দুপুরই হোক ডাক পেলেই ঠিক ব্যাগটি নিয়ে হাজির হতেন। আমার বেশ মনে পড়ে শঙ্করকাকু পৌঁছোলেই বাড়ি লোকের মুখ থেকে দুঃচিন্তার মেঘ সরে যেত।সবাই ভাবত , যাক শঙ্কর এসে গ্যাছে , এবার রূগী চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
শঙ্করকাকুও রোগী এবং পরিবারকে ভরসা দিতেন। স্যালাইন দিতে হলে যতক্ষণ তা চলত ততক্ষণ রোগীর ঘর ছেড়ে নড়তেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যেত সকাল হতে না হতেই রোগী চাঙ্গা হয়ে উঠেতেন। তবেই বাড়ি ফিরতেন শঙ্করকাকু। আজ ভাবি কোন ডাক্তারি ডিগ্রি দুরের কথা , যৎসামান্য বিদ্যা নিয়েই শঙ্করকাকু সেদিন স্রেফ আন্তরিকতা দিয়েই কেমন ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। তাকে ঘিরে সেই ভরসার কথা আজও আমাদের পরিবারে আলোচিত হয়।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment