অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
পবিত্র বায়েনের বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ছামনা গ্রামে। বেঁটে খাটো চেহারা , মুখে সবসময় লেগে থাকত হাসি। সে ছিল আমার দাদু ( মাতামহ ) প্রয়াত উমাশঙ্কর মজুমদারের মাহিন্দার । মামা - মাসিরা তাকে পবিত্রদা বলে ডাকতেন। দেখাদেখি আমিও তাই বলতাম। গরু - মোষ দেখাশোনার পাশাপাশি তার কাজ ছিল নবান -ভাইফোঁটা সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে লোকপাড়া থেকে কাঁধে করে মামার বাড়ি নিয়ে যাওয়া আসা করা। প্রায় ১২ কিমি দুরের মামারবাড়ি যে কতবার তার কাঁধে চেপে গিয়েছি তার ঠিক নেই। মাঝে মাঝে কাঁধ থেকে নামিয়ে আলে বসে বিড়ি খেয়ে নিতেন। সেই সময় আমি মাঠে মাঠে ছুটে ফড়িং ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম । আর তখন আমাকে ধরতে তার ঘাম ছুটে যেত। তবু একটুও বিরক্ত হতেন না। বরং খুব মিষ্টি করে বলতেন , বাবু ও রকম কোর না।দেরি হলে তোমার দাদু আমাকে বকবে। সেই কথা শুনেই আমি ছুটে গিয়ে তার কাঁধে চেপে পড়তাম।যেতে যেতে কত রকম গান গল্প যে বলতেন তার ঠিক নেই।
তার সঙ্গে যাওয়া আসার অনেক স্মৃতি জমা হয়ে আছে মনের মণিকোঠায়।কিন্তু একটা স্মৃতির কথা মনে পড়লে আজও অপরাধ বোধে ভুগি। সেবারে মামার বাড়ি থেকে সবাই বৈদ্যনাথ ধাম যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যথারীতি আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পবিত্রদাকে পাঠানো হয়।আমাকে নিয়ে পবিত্রদা সেদিন প্রথমে রামসাগর পাড়ে যান।সেখানেই ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়িতে তাকে কাঁচা পেঁয়াজ আর সরষের তেল মাখানো মুড়ির সঙ্গে কাঁচের গ্লাসে দেওয়া হয়েছিল তালের তাড়ি।আমিও মাঝে মধ্যে সেই থালা থেকে মুড়ি আর পবিত্রদার গ্লাস থেকে চুমুক দিয়ে খাচ্ছিলাম তাড়ি। পবিত্রদা বার কয়েক আমাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি শুনি নি।কারণ তখন তাড়ি সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। চা কিম্বা সরবতের মতোই আর পাঁচটা খাবার মনে করতাম। আর পবিত্রকাকাকেও নিজের লোকই ভাবতাম।তাই বাবা-কাকাদের পাতা থেকে যেমন খেতাম , সেদিন সেই ভাবেই তার থালা থেকে খেতেও আমার কোন কিছু মনে হয় নি।কিন্তু দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন পবিত্রদা।আমকে বলেছিলেন -- বাবু তোমার দাদুকে বলে দিও না যেন। তাহলে আর আমার আস্ত রাখবে না।
তারপর সন্ধ্যের মুখে আমাকে নিয়ে অফিসে ( ছামনা বাসস্ট্যান্ডকে এলাকার মানুষজন এখনও অফিসই বলে থাকেন। সম্ভবত কোনকালে হয়তো কোন সরকারি অফিস ছিল। এখন আর অফিস নেই , কিন্তু নামটা থেকে গিয়েছ ) পৌঁছোন তখন সন্ধ্যা নেমেছে।সাঁইথিয়াতে ট্রেণ ধরার জন্য গোরুর গাড়ি সবে ছেড়েছে।চিৎকার করে সেই গাড়ি থামিয়ে আমাকে চাপিয়ে দেন পবিত্রদা।পরে মাসিদের মুখে শুনেছি আমি নাকি সেসময় নেশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম।আমার মুখ থেকে কাঁচা পেঁয়াজ আর তাড়ির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরে চেতনা ফিরলে সবাই আমাকে চোটে-পাটে ধরেছিলেন।আমার মনে পড়ে গিয়েছিল পবিত্রদার দাদুকে না বলার সাবধান বানী।
কিন্তু ছোটদের মধ্যে বোধহয় যা নিষেধ করা হয় সেটা করারই প্রবনতা বেশি থাকে। মনে হয় সেই প্রবনতার বশেই সব বলে দিয়েছিলাম।দাদু শুনে শুধু বলেছিলেন , দাঁড়া আসি ফিরে। ওই কথা শোনার পরই অবশ্য আমার খুব আফশোস হচ্ছিল। একে আমি তখন পরিবারের প্রথম নাতি , বলতে গেলে আদরের ধন , তার উপরে আমার দাদু ছিলেন জোতদার মানুষ । পবিত্রদার কপালে যে কষ্ট নাচছে তা আর বুঝতে বাকি ছিল না।
দিন চারেক পর বৈদ্যনাথ থেকে ফিরি আমরা। সেইদিনের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।সেদিন দুপুরবেলা , দাদু তখন মদ খেয়ে টোর হয়ে রয়েছেন।নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যাস ছিল।বাড়ির আলমারিতেই সাজানো থাকত নামী দামি সব মদ , চানাচুর , ভুজিয়া সহ হরেক রকম খাবার।মদ খেতেন কিন্তু কখনও দাদুকে মাতলামো করতে দেখিনি।বরং নেশা তীব্র হয়ে গেলে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন। সেই নেশাপ্রস্থ অবস্থায় ডেকে পাঠান পবিত্রকে। মাসি -দিদিমা - বড়মারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকেন। তারা বোধহয় আন্দাজ করতে পারেন পবিত্রদার কপালে আজ কষ্ট আছে। আন্দাজ আমিও করতে পারছিলাম। কিন্তু আমারও আর কিছু করার ছিল না।কারণ ওই অবস্থায় দাদুর কাছে যাওয়ার সাহস হত না কারও। তাই মনে মনে চাইছিলাম অল্পের উপর দিয়েই যেন পেরিয়ে যায়।
যথাসময়ে পবিত্রদা এসে পৌঁচ্ছোন। দাদু তাকে শান্ত স্বরেই বলেন , হামারে (ধান রাখার গোলা ) ঢুকে দেখ তো ধানগুলো কেমন আছে। তারপর হামারের ছোট্ট দরজাটা খুলে ধরেন।হামারে তখন ডাঁই করা ধান। হামারের টিনের চাল তেতে ফাল তাতা হয়ে আছে। সেই অবস্থায় পবিত্রদা হামারে ঢুকতেই দাদু ঝপ করে দরজাটা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেন। তারপর চাবিটা বালিশের নীচে রেখে শুয়ে পড়েন। সবাই বুঝতে পারেন এখন আর কিছু করার নেই। কিছুক্ষণ পরেই দাদুর নাক ডাকতে শুরু করে। মাসিরা তখন বালিশের তলা থেকে চাবিটা নিয়ে হামার খুলে পবিত্রদাকে ভাত জল ঢুকিয়ে দিয়ে বলেন , খাওয়া দাওয়ার পর বাসনপত্র গুলো একপাশে সরিয়ে রেখ।তারপর ফের তালাবন্ধ করে চাবিটা দাদুর বালিশের তলায় রেখে দেন। দাদু জানতেও পারেন না ঘটনার কথা।আজ ভাবি , সে সময় ধানকে দিদিমা - বড়মারা সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী হিসাবে জ্ঞান করতেন। তাই সেই ধানের উপরে সাধারণ অবস্থায় ভাত খাওয়ার কথা বোধহয় কল্পনাও করতে পারতেন না।কিন্তু মানুষের চেয়ে সংস্কার যে বড়ো হতে পারে না তা তাদের মতো স্বল্প শিক্ষিত মহিলারা কি করে উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন কে জানে ?
পবিত্র বায়েনের কথা
( ৪৫ )
পবিত্র বায়েনের বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ছামনা গ্রামে। বেঁটে খাটো চেহারা , মুখে সবসময় লেগে থাকত হাসি। সে ছিল আমার দাদু ( মাতামহ ) প্রয়াত উমাশঙ্কর মজুমদারের মাহিন্দার । মামা - মাসিরা তাকে পবিত্রদা বলে ডাকতেন। দেখাদেখি আমিও তাই বলতাম। গরু - মোষ দেখাশোনার পাশাপাশি তার কাজ ছিল নবান -ভাইফোঁটা সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাকে লোকপাড়া থেকে কাঁধে করে মামার বাড়ি নিয়ে যাওয়া আসা করা। প্রায় ১২ কিমি দুরের মামারবাড়ি যে কতবার তার কাঁধে চেপে গিয়েছি তার ঠিক নেই। মাঝে মাঝে কাঁধ থেকে নামিয়ে আলে বসে বিড়ি খেয়ে নিতেন। সেই সময় আমি মাঠে মাঠে ছুটে ফড়িং ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম । আর তখন আমাকে ধরতে তার ঘাম ছুটে যেত। তবু একটুও বিরক্ত হতেন না। বরং খুব মিষ্টি করে বলতেন , বাবু ও রকম কোর না।দেরি হলে তোমার দাদু আমাকে বকবে। সেই কথা শুনেই আমি ছুটে গিয়ে তার কাঁধে চেপে পড়তাম।যেতে যেতে কত রকম গান গল্প যে বলতেন তার ঠিক নেই।
তার সঙ্গে যাওয়া আসার অনেক স্মৃতি জমা হয়ে আছে মনের মণিকোঠায়।কিন্তু একটা স্মৃতির কথা মনে পড়লে আজও অপরাধ বোধে ভুগি। সেবারে মামার বাড়ি থেকে সবাই বৈদ্যনাথ ধাম যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যথারীতি আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পবিত্রদাকে পাঠানো হয়।আমাকে নিয়ে পবিত্রদা সেদিন প্রথমে রামসাগর পাড়ে যান।সেখানেই ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরবাড়িতে তাকে কাঁচা পেঁয়াজ আর সরষের তেল মাখানো মুড়ির সঙ্গে কাঁচের গ্লাসে দেওয়া হয়েছিল তালের তাড়ি।আমিও মাঝে মধ্যে সেই থালা থেকে মুড়ি আর পবিত্রদার গ্লাস থেকে চুমুক দিয়ে খাচ্ছিলাম তাড়ি। পবিত্রদা বার কয়েক আমাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি শুনি নি।কারণ তখন তাড়ি সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। চা কিম্বা সরবতের মতোই আর পাঁচটা খাবার মনে করতাম। আর পবিত্রকাকাকেও নিজের লোকই ভাবতাম।তাই বাবা-কাকাদের পাতা থেকে যেমন খেতাম , সেদিন সেই ভাবেই তার থালা থেকে খেতেও আমার কোন কিছু মনে হয় নি।কিন্তু দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন পবিত্রদা।আমকে বলেছিলেন -- বাবু তোমার দাদুকে বলে দিও না যেন। তাহলে আর আমার আস্ত রাখবে না।
তারপর সন্ধ্যের মুখে আমাকে নিয়ে অফিসে ( ছামনা বাসস্ট্যান্ডকে এলাকার মানুষজন এখনও অফিসই বলে থাকেন। সম্ভবত কোনকালে হয়তো কোন সরকারি অফিস ছিল। এখন আর অফিস নেই , কিন্তু নামটা থেকে গিয়েছ ) পৌঁছোন তখন সন্ধ্যা নেমেছে।সাঁইথিয়াতে ট্রেণ ধরার জন্য গোরুর গাড়ি সবে ছেড়েছে।চিৎকার করে সেই গাড়ি থামিয়ে আমাকে চাপিয়ে দেন পবিত্রদা।পরে মাসিদের মুখে শুনেছি আমি নাকি সেসময় নেশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম।আমার মুখ থেকে কাঁচা পেঁয়াজ আর তাড়ির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। পরে চেতনা ফিরলে সবাই আমাকে চোটে-পাটে ধরেছিলেন।আমার মনে পড়ে গিয়েছিল পবিত্রদার দাদুকে না বলার সাবধান বানী।
কিন্তু ছোটদের মধ্যে বোধহয় যা নিষেধ করা হয় সেটা করারই প্রবনতা বেশি থাকে। মনে হয় সেই প্রবনতার বশেই সব বলে দিয়েছিলাম।দাদু শুনে শুধু বলেছিলেন , দাঁড়া আসি ফিরে। ওই কথা শোনার পরই অবশ্য আমার খুব আফশোস হচ্ছিল। একে আমি তখন পরিবারের প্রথম নাতি , বলতে গেলে আদরের ধন , তার উপরে আমার দাদু ছিলেন জোতদার মানুষ । পবিত্রদার কপালে যে কষ্ট নাচছে তা আর বুঝতে বাকি ছিল না।
দিন চারেক পর বৈদ্যনাথ থেকে ফিরি আমরা। সেইদিনের কথা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে।সেদিন দুপুরবেলা , দাদু তখন মদ খেয়ে টোর হয়ে রয়েছেন।নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যাস ছিল।বাড়ির আলমারিতেই সাজানো থাকত নামী দামি সব মদ , চানাচুর , ভুজিয়া সহ হরেক রকম খাবার।মদ খেতেন কিন্তু কখনও দাদুকে মাতলামো করতে দেখিনি।বরং নেশা তীব্র হয়ে গেলে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়তেন। সেই নেশাপ্রস্থ অবস্থায় ডেকে পাঠান পবিত্রকে। মাসি -দিদিমা - বড়মারা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকেন। তারা বোধহয় আন্দাজ করতে পারেন পবিত্রদার কপালে আজ কষ্ট আছে। আন্দাজ আমিও করতে পারছিলাম। কিন্তু আমারও আর কিছু করার ছিল না।কারণ ওই অবস্থায় দাদুর কাছে যাওয়ার সাহস হত না কারও। তাই মনে মনে চাইছিলাম অল্পের উপর দিয়েই যেন পেরিয়ে যায়।
যথাসময়ে পবিত্রদা এসে পৌঁচ্ছোন। দাদু তাকে শান্ত স্বরেই বলেন , হামারে (ধান রাখার গোলা ) ঢুকে দেখ তো ধানগুলো কেমন আছে। তারপর হামারের ছোট্ট দরজাটা খুলে ধরেন।হামারে তখন ডাঁই করা ধান। হামারের টিনের চাল তেতে ফাল তাতা হয়ে আছে। সেই অবস্থায় পবিত্রদা হামারে ঢুকতেই দাদু ঝপ করে দরজাটা বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেন। তারপর চাবিটা বালিশের নীচে রেখে শুয়ে পড়েন। সবাই বুঝতে পারেন এখন আর কিছু করার নেই। কিছুক্ষণ পরেই দাদুর নাক ডাকতে শুরু করে। মাসিরা তখন বালিশের তলা থেকে চাবিটা নিয়ে হামার খুলে পবিত্রদাকে ভাত জল ঢুকিয়ে দিয়ে বলেন , খাওয়া দাওয়ার পর বাসনপত্র গুলো একপাশে সরিয়ে রেখ।তারপর ফের তালাবন্ধ করে চাবিটা দাদুর বালিশের তলায় রেখে দেন। দাদু জানতেও পারেন না ঘটনার কথা।আজ ভাবি , সে সময় ধানকে দিদিমা - বড়মারা সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী হিসাবে জ্ঞান করতেন। তাই সেই ধানের উপরে সাধারণ অবস্থায় ভাত খাওয়ার কথা বোধহয় কল্পনাও করতে পারতেন না।কিন্তু মানুষের চেয়ে সংস্কার যে বড়ো হতে পারে না তা তাদের মতো স্বল্প শিক্ষিত মহিলারা কি করে উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন কে জানে ?
সন্ধ্যের মুখে দাদুর নেশা ছুটি হয়। তখন মনে পড়ে যায় পবিত্রদার কথা। আর এক মাহিন্দার সুকদেবকে বলেন , যা তো হামারটা খুলে হারামজাদাটাকে বের করে নিয়ে আয়। ততক্ষণে মহাদেবের মতো মেজাজে ফিরেছেন দাদু। পবিত্রদা মাথা নিচু করে সামনে এসে দাঁড়াতেই বলেন , আর কোনদিন হবে এমন কাজ ? পবিত্রদা মাথা নাড়েন। দাদু বলেন , যা হাত পা ধুয়ে এসে ভাত খেয়ে নে। আমিও চাট্টি খেয়ে নিই। পবিত্রদা পড়েন মহা বিড়ম্বনায়।কিছুক্ষণ আগেই ভরপেট খেয়েছেন , আবার ভাত খাওয়ার কথা শুনেই তার অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু না খেয়েও উপায় নেই। হামারে খাওয়ার কথা জানাজানি হলেই আবার উল্টো বিপত্তি হওয়ার আশংকা।তাই ফের ভাত খেতে হয় তাকে।যাওয়ার সময় দাদু তাকে কিছু চাল , টাকা আর সিকি বোতল বিদেশি মদ দেন।আর হাসি মুখে বাড়ি চলে যান পবিত্রদা।
পরে আমি পবিত্রদাকে ধরেছিলাম - হামারের ভিতরে তোমার কষ্ট হয় নি ? ভয় করে নি ? পবিত্রদা বলেছিলাম , ধুর কষ্ট হবে কেন ? আমি তো খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে গিয়েছলাম। তার কথা শুনে আমার অপরাধ বোধ কিছুটা হালকা হয়েছিল। পরে পবিত্রদারা স্বপরিবারে শ্বশুরবাড়ি আমাদের পঞ্চায়েত এলাকার রামসাগর পাড়ে এসে বসবাস শুরু করেন। আজ পবিত্রদা নেই। তার ছেলে প্রশান্ত রয়েছে।মাঝে মধ্যেই তার সঙ্গে দেখা হয়। আর পবিত্রদার কথা মনে পড়ে যায় আমার।
শানু বায়েনের কথা
( ৪৬ )
শানু বায়েনের ভালো নাম ছিল শান্তিরাম বায়েন। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের কুলিয়াড়া গ্রামে।পেশায় ঢাকি।তার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার দুর্গাপুজোর স্মৃতি। সে সময় আমাদের আত্মীয় দুর্গাচরণ ঘোষের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় ভোরবেলায় ধুমুল বা জাগান দিতে আসতেন তিনি। বোধনের দিন থেকেই দুর্গামন্দিরের সামনে ডুগি- তবলা জাতীয় দুটি বাদ্য যন্ত্র ঘণ্টা খানেক ধরে ডুগ ডুগ করে বাজাতেন।আর আমরা ছুট লাগাতাম মন্দির চত্বরের দিকে। টুপটাপ ঝড়ে পড়ত ভোরের শিউলি।তার মাথা ঢেকে যেত শিউলি ফুলে।তখন যেন তাকে ছবির মানুষের মতো দেখাত। তার ওই বাজনাই আমাদের জানিয়ে দিত দুর্গাপুজো আসছে।
জাগান বাজালেও অবশ্য ওই পুজোয় ঢাক বাজানোর সুযোগ ছিল না তার । কারণ দারিদ্র ক্লিষ্ট চেহেরার মতোই হতশ্রী ছিল তার ঢাকের চেহেরাও। না ছিল ফুলকো , না রঙ বাহারি কাপড়ের ঝালর। নেঁড়া একটা ঢাক ছিল তার সম্বল। নিজেও একটা পাতলা হয়ে যাওয়া খাটো ধুতি আর শতছিন্ন জামা পড়ে বাজাতে আসতেন।
পরে স্কুল এবং ক্লাবের সরস্বতী পুজোয় তাকে ঢাক বাজাতে বায়না করেছি।তার ছেলে চরণ আমাদের বন্ধু স্থানীয়। সে তখন বাবার সঙ্গে কাঁসি বাজাত। পুজো শেষে সেই কাঁসিতে ডাঁই করে প্রসাদ নিয়ে বাপ-ছেলে বসে বসে খেত।সেই দৃশ্য আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।তখন বেশি পরিমানে প্রসাদ দাবি করায় মনে মনে একটু বিরক্ত হতাম।তখন তো আর বুঝতাম না বাড়িতে খাবার থাকলে কেউ ওইভাবে প্রকাশ্যে বসে কাঁসিতে প্রসাদ খায় না।
আজ শানু বায়েন নেই । বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই ভোরের বাজনা । শরত শিউলিরা অভিমানে মাটিতেই পড়ে থাকে। কিন্তু আমি আজও ভুলি নি সারা মাথা ফুলে ভরা শানু বায়েনের সেই জাগান বাজানোর দৃশ্যটি।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment