Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মনিকোঠায় -- ১১ সত্য ঠাকুর কান্ত দাস

  

             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                           অর্ঘ্য ঘোষ



( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )



           সত্য ঠাকুরের  কথা 


                    (  ২১ )


তার আসল নাম ছিল সত্যকিঙ্কর মিশ্র। লোকে সত্য ঠাকুর বলে ডাকতেন। ময়ূরেশ্বরের কুমারপুর গ্রামে ছিল তাদের বাড়ি। একসময় তাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢেকার রাজা রামজীবনের কুলপুরোহিত। রাজা রামজীবনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজো আজও চালু রয়েছে তাদের পরিবারে।


                                                 রাজার কুলোপুরোহিতের বংশধর হলেও সত্য ঠাকুরের ছিল চরম অভাবের সংসার।ক্ষুণ্ণিবৃত্তির তাগিতে কার্যত সারা জীবন তাকে লড়াই করতে হয়েছে। পেটের দায়ে লোকপাড়া হাইস্কুলের সূচনা পর্ব থেকে হোস্টেলে যৎসামান্য বেতনে রাধুনীর কাজও করতে হয়েছে । সেই সময়ই দেখেছি তার সর্বাঙ্গে অভাবের ছাপ। মুখ থেকে খেদোক্তিও ঝড়ে পড়েতে শুনেছি।

   
                                                তার রান্না নিয়ে তৎকালীণ ছাত্র - শিক্ষকদের মধ্যে মজার মজার কথা প্রচলিত আছে আজও। তার মধ্যে অন্যতম হলো ' সত্যদার ছোঁক'। সে সময় যৎসামান্য তেল মশলায় রান্না করতে হত। রান্না শেষে সত্যদা নাকি হাতায় তেল বুলিয়ে নিয়ে গোটা কতক লংকাকে ভালোরকম গরম করে ডালের হাঁড়িতে ডুবিয়ে দিতেন। আর তার শব্দ গোটা হোস্টেলময় ছড়িয়ে পড়ত। আর সেই শব্দ শুনেই আবাসিকরা বই পত্র গোটাতে শুরু করত। কারণ ওই ছোঁকের শব্দই সত্যদার রান্না শেষ হওয়ার ইঙ্গিত বহন করত। 

                               
                                 তেল মশলার বরাদ্দ কম থাকলেও সত্যদার রান্নার কিন্তু কুখ্যাতি ছিল না। বরং তার হাতের আলুপোস্তের কদর ছিল ছাত্রমহলে। আমরাও সেই স্বাদ পেয়েছি। কাছে বাড়ি হওয়ায় আমরা অবশ্য হোস্টেলে থাকতাম না।কিন্তু মাঝে মধ্যে সহপাঠী সুখেন সান্যালের গেষ্ট হয়ে থেকে যেতাম হোস্টেলে। আর সত্যদার হাতে গরম গরম আলুপোষ্ট আর টক যে কত খেয়েছি তার ঠিক নেই।সেই স্বাদ যেন আজও মুখে লেগে আছে।

                                     
                                    অভাবের মাঝে তার রসবোধও ছিল। রান্না করে সংসার চলত না বলে পুরোহিতগিরিও করতেন। ঢেকা ছিল তার যজমানদের গ্রাম। সত্যদা একবার ওই গ্রামের এক সম্পন্ন পরিবারে সত্য নারায়ণের পুজো করতে গিয়েছেন। গিয়ে দেখেন গাদা ফুল আর বেলপাতা।কিন্তু ফলমূল, বাতাসা মণ্ডা নেই বললেই চলে। ঘটের পাশে দক্ষিণাও নামানো রয়েছে চার চানা।দেখেই তো সত্যদার মেজাজ গিয়েছে খচে। ফুল বেলপাতা সব একসঙ্গে ধরে ঘটের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে নমো নমো করে পুজোর সমাপ্তি ঘোষণা করে দিয়েছেন।

                                
                                        গৃহকর্ত্রীর পুজোটা ঠিক মনোপুত: হয় নি। সকাল থেকে কত কষ্ট করে এত এত ফুল বেলপাতা সংগ্রহ করছেন , আর পুজো হলো মাত্র এইটুকু।তাই সত্যদাকে তিনি বলেন , হ্যাগো ঠাকুরমশাই এরই মধ্যে পুজো হয়ে গেল ? সত্যদা সবিনয়ে বলেন , হ্যা মা চার আনার পুজো হলো , বলো তো আর চার আনার পুজো আবার করতে পারি।বলাবাহুল্য তারপর আর পুজোর আগ্রহ দেখান নি কৃপণ গৃহকর্ত্রী। সত্যদা ওই গ্রামেই আমার এক সহপাঠীর বাড়িতে পুজো করতে গিয়ে মজা করে বলেছিলেন সেই কথা।স্কুলজীবনে সেই সহপাঠীর মুখ থেকেই বেশ কয়েকবার কথাটা শুনেছি। 


                  সত্যদার বড়ো ছেলে পরবর্তীকালে পোস্টমাস্টারের চাকরি পান।তার এক নাতিও শিক্ষকতা করেন। আজকের সুখের দিন সত্যদা দেখে যেতে পারেন নি।আজ সত্যদা নেই , কিন্তু তার সেই দারিদ্র ক্লিষ্ট চেহেরাটা আজও চোখের সামনে ভাসে।

             
                               -----০-----                                                                     

                                                               

              কান্তে তাঁতির  কথা 



                     (  ২২ )



তার ভালো নাম ছিল রাধাকান্ত দাস । লোকে বলত কান্তে তাঁতি । ময়ূরেশ্বরের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে ছিল তার বাড়ি।মূলত  বাবুদের জমি  ভাগ চাষ করতেন। আর লোকপাড়া মুদিপাড়ায় ছিল তার ছোট্ট নটকোনের দোকান। প্রতিদিন বিকালে ঝুড়ি ভর্তি করে মালপত্র নিয়ে সেই দোকানে যেতে দেখতে পেতাম তাকে। আমার বাবা তাকে কাকা বলতেন। সেই হিসাবে তাকে আমার দাদু বলার কথা। কিন্তু এলাকার বেশিরভাগ মানুষ তাকে কাকাই বলতেন। দেখাদেখি আমরাও কাকা বলতাম। শুনে তিনি বলতেন , বাঃ , বাবার কাকা ছেলেরও কাকা। তা ভালোই, দাদু শুনতে কেমন বুড়ো বুড়ো লাগে। একটা সম্পর্ক ধরে ডাকলেই হলো।      

                                   বাস্তবিকই,  মানুষটা যতদিন বেঁচে ছিলেন মনের দিক থেকে কখনও বুড়ো হননি। বরং বলা যায় বহাল তবিয়তে ছিলেন। বেঁটে খাটো মানুষটি এলাকায় বেশ জনপ্রিয় ছিলেন । আবার ডাকাবুকোও ছিলেন। কেউ কোন বিপদে আপদে পড়লেই ঝাঁপিয়ে পড়ার অভ্যাস ছিল।মাঝে মধ্যে মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে পাড়া মাত করেও দিতেন। পরক্ষণেই শিবের মতো হয়ে যেতেন।এলাকার মানুষজন তার ওই স্বভাবের কথা জানতেন বলেই তাকে রাগিয়ে দিতেন ওইসব কথা শোনার জন্য।

                                      
                                এলাকায় কিছু হলেই তাকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা যেত। সে ব্যাঙের বিয়েই হোক কি ধর্মরাজ পুজোয় কেষ্টযাত্রা কিম্বা পঞ্চরসই হোক , তার সরব উপস্থিতি থাকতই। অনাবৃষ্টিতে ধান মরছে , সবাই গিয়ে ধরলেন কান্তকাকাকে। আর তিনি দিব্যি বরকর্তা হয়ে পালকি , বাজনা , ভোজ ভাত সহ ব্যাঙের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন।

                                                   তাকে এলাকার মানুষের বোধহয় সব থেকে বেশি মনে আছে লড়াইয়ের উদ্যোক্তা হিসাবে। সেসময় গ্রাম জীবনে তেমন একটা বিনোদন ছিল না বললেই চলে। নিস্তরঙ্গ সেই গ্রাম্য জীবনে কিছুটা বৈচিত্রের স্বাদ এনে দিয়েছিল কান্ত দাস আয়োজিত লড়াই। বর্ষার চাষ শেষ হলেই গ্রামে গ্রামে ঢোল দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হত সেই লড়াইয়ের কথা। সাধারণত বর্তমান লোকপাড়া হাট সংলগ্ন এলাকায় লড়াইয়ের আয়োজন করা হত।

                                
                               নিদ্দিষ্ট দিনে গিয়ে দেখতাম বাঁশের ব্যারিকেটের চারদিকে লোকে লোকারণ্য। ব্যারিকেটের উপরে বাঁধা একটা লাঠি থেকে লাল ফিতে দিয়ে ঝোলানো রয়েছে সার সার তামার মেডেল।ব্যারিকেটের ভিতরে  দশাসই কোন লড়িয়েকে নিয়ে পাকে পাকে ঘুরছেন কান্তকাকা। আর প্রতিযোগীকে আহ্বান করে বলছেন , কে আছো এই লড়িয়ের সঙ্গে লড়তে এগিয়ে এসো। নাহলে কিন্তু  শুধু শুধু ওকে সেরা মেডেলটা দিয়ে দিতে হবে।তার ওই প্ররোচনাপূর্ন কথা শুনে কেউ না কেউ ঠিক ঝাঁপিয়ে  ব্যারিকেটের ভিতরে প্রবেশ করত। তারপর নেমে পড়ত লড়াইয়ে।কায়দা কৌশলে যে প্রতিপক্ষকে চিৎ করতে পারত তারই হতো জিত। তখন তার গলায় কান্তকাকা পড়িয়ে দিতেন মেডেল।  ১০/১৫  বার একই ভাবে ওই ঘটনা আর্বতিত হতো। আজ কান্ত দাস নেই। কিন্তু এলাকার মানুষের মনে তার স্মৃতি আজও রয়ে গিয়েছে।                            

   

            ( চলবে )

                




             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


 আগামী রবিবার  ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হবে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

                 

               ------০------ 


2 comments:

  1. অনেকদিন আপনার কোনো লেখা সেভাবে পড়া হয় নি ॥ মনের মণিকোঠায় -- সকলের মনের পরিচিত চরিত্র ॥ সুন্দর ও হৃদয়গ্রায়ী লেখা ॥

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ । সঙ্গে থাকুন ।

      Delete