অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
বাঁকু পটুয়ার কথা
( ৪৯ )
ময়ূরেশ্বরের ষাটপলশা গ্রামে ছিল চিত্রকর বাঁকু পটুয়ার বাড়ি। গ্রামে গ্রামে পট দেখিয়ে কার্যত ভিক্ষা করাই ছিল তার অন্যতম জীবিকা। কিন্তু পট দেখিয়ে পেট ভরত না বলে নানা উঞ্ছবৃত্তিও করতে হয়েছে তাকে।সাংবাদিকতার সূত্রেই তার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ।আমি তখন দিদিভাই পত্রিকায় হাত পাকানো শুরু করেছি। তার ওই দুরবস্থা নিয়ে দিদিভাই থেকে দৈনিক রাজপথ , দৈনিক বঙ্গলোক , দৈনিক প্রাত্যহিক সংবাদ এমন কি আনন্দবাজার পত্রিকাতেও সংবাদ প্রকাশ করেছি। শুধু আমিই নয় , বীরভুমের অধিকাংশ সাংবাদিক তাকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাকে নিয়ে তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে। বহু জায়গায় সংবর্ধনাও পেয়েছেন। এক কথায় বলা যায় তাকে এবং তার শিল্পকর্মকে ভাঙিয়ে আমরা অনেকেই সমৃদ্ধ হয়েছি , কিন্তু দুর্দশা ঘোচে নি তার।
সংবাদ সংগ্রহের কাজে যখনই ওই এলাকায় গিয়েছে একবার করে দেখা করতে গিয়েছে তার সঙ্গে।কিন্তু প্রতিবারই দেখেছি তার পরিবারের হাল বেহাল থেকে বেহালতর হয়ে পড়েছে।এক চিলতে কাদাছিটের চালা ঘরে ছিল তার বাস।সে ঘরের চালের ফুটো দিয়ে দেখা যেত রাতের তারাভরা অনন্ত আকাশ। বৃষ্টির জল অঝোর ধারায় ঝরনা হয়ে ঝরত সারা ঘরে। আর সেই বৃষ্টি ধারা থেকে বাঁচাতে কচি ছেলেমেয়েদের নিয়ে স্ত্রী ঘরের একোন--ওকোন করতেন, তখন তিনি নিজের শিল্পকর্ম বুকে চেপে ঠাই ভিজেছেন।
তারই মাঝে এঁকেছেন একের পর মুল্যবান পট।বেঁধেছেন পটের গান । বসিয়েছেন সুরও। কিন্তু অভাবের তাড়নায় নামে মাত্র মুল্যে বিক্রি করে দিতে হয়েছে সেইসব পট। আর টাকা ফুরোলেই ফের পট কাঁধে গাঁয়ে গাঁয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করেছেন। একবার যমপট সম্পর্কে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন , অর্ঘ্য এই যে আমরা পটে নরক যন্ত্রনার বিভিন্ন ছবি দেখায় , কিন্তু গরীব মানুষরাই জীবদ্দশায় প্রকৃত নরক যন্ত্রণা ভোগ করেন।সেই খবর আমরা কে'ই বা রাখি ? আবার কখনও বা বলেছেন , আমরা এত শিল্পী-শিল্পী করি কিন্তু শিল্পীর প্রকৃত কদর কেউ কি করে ? একটা মানপত্র কিম্বা ফুলের তোড়ায় মন হয়তো ভরে , মন ভরলে শিল্পীর হয়তো চলে যায় , কিন্তু শিল্পীর ছেলে-মেয়ে পরিবারের তো চলে না। মানুষের মতো তাদেরও তো পেট আছে।তারা যদি খিদের জ্বালায় কাঁদে তাহলে শিল্পী কি করে তার শিল্পকর্মে মন দেবে ?
তার এই খেদোক্তিই বলে দেয় দারিদ্র তাকে কেমন ভাবে নাগপাশে বন্দী করে রেখেছিল। তাবলে হার মানার পাত্র তিনি ছিলেন না। বরং ওই পর্ণ কুটিরেই রাজার মেজাজে কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। কারণ ওই কুটিরেরই চার দেওয়ালে শোভা পেতে দেখেছি তারই সঙ্গে ডিনারে রাজকীয় খাদ্য সামগ্রীর সামনে এক টেবিলে বসা দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী সহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপুরুষদের ছবি। ওই ডিনারের একটি প্লেটের খরচেই অনায়াসে ছাওয়ানো হত তার ঘরের ফুটো চাল। জোড়াতালি দেওয়া সংসারে সুসার হতো। আসলে ভারত উৎসবে দেশের প্রতিনিধি হিসাবে বিভিন্ন সময়ে পট এবং পটের গান নিয়ে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়া , ফান্স প্রভৃতি দেশ মাতিয়ে এসেছেন। এদেশের লোকশিল্পকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ওইসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সংগে রাজকীয় ডিনার টেবিলে বসা তার ছবি উঠেছে।
কিছু টাকা , ওইসব ছবি , আর শংসাপত্র নিয়ে ফিরেছেন তিনি। তাতে পেট ভরে নি। পট নিয়ে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করেছেন। মন চায় নি, তবু ক্ষুন্নিবৃত্তির তাগিদে তাকে আঁকতে হয়েছে স্বাক্ষরতা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক ফরমায়েসি পট। বাঁধতে হয়েছে গানও। তাতেও হাল ফেরেনি সংসারে। শেষ বয়সে মাসিক ১০০০ টাকা অক্ষম ভাতা বরাদ্দ হয়েছিল তার নামে। ওই টাকাটুকু ওষুধ কিনতেই খরচ হয়ে গিয়েছে। তাই বৃদ্ধ বয়েসে অসুস্থ শরীরে তাকে পট নিয়ে ঘুরতে হয়েছে সেই গ্রামে গ্রামে।
২০০৬ সালের ১৪ জুলাই মৃত্যু হয় তার। স্ত্রী ভৈরবী পটুয়ার এখন স্বামীর ভাতার টাকাটুকুই সম্বল। ৫ ছেলের মধ্যে ২জনই মাত্র পট আঁকেন। একজন মাসিক যৎসামান্য কিছু শিল্পী ভাতা পেলেও অন্যজনের তা জোটেনি। দুজনকেই বাবার মতোই পট নিয়ে আজও গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হয়। নিত্য নতুন শিল্প ভাবনার অবকাশই পান না তারা। ক্ষুন্নিবৃত্তির তাগিদে তাদেরও আঁকতে হয় শৌচাগারের ফরমায়েশি পট। আজও আঁধার ঘোচে নি পটুয়া পরিবারে। আজও সেই আঁধারেই আমি বাঁকুদাকে খুঁজে পাই।
------০-----
টমের কথা
( ৫০ )
আমরা দুই ভাই যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ি তখন সে আমাদের বাড়ি এসেছিল। অযাচিতভাবে ভাবে নিজেই এসে হাজির হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। রোগা প্যাটকা ওই রকম একটা বংশ মর্যাদাহীনকে কেই বা যেচে আনতে যাবে ? তাই সচরাচর যা হয় , প্রথমদিকে বিস্তর লাথি ঝাঁটা খেয়েই পড়ে থাকতে হয় তাকে। তারপর আস্তে আস্তে সবার কেমন মায়া পড়ে যায় তার উপরে। একটু একটু করে যত্ন আত্তিও পেতে শুরু করে সে। শরীরটাও সাড়ে। ক্রমে সে হয়ে ওঠে আমাদের খেলার সঙ্গীও।
কিন্তু তার একটা বদ অভ্যাস গড়ে ওঠে। আমরা যেখানেই যায়, তারও যাওয়া চায়। সে মুদিখানার দোকানই হোক কিন্বা স্কুল সব জায়গায় আমাদের পিছু ধরে। কিন্তু সবাই তো আর তাকে পচ্ছন্দ করত না। বিশেষ করে স্কুলের স্যাররা , বলতেন আবার ওকে সঙ্গে এনেছিস ? স্যারদের বলতে পারতাম না , কিছুতেই ও বারণ শুনতে চায় না স্যার। তাহলে অবধারিত ভাবে ওর কপালে মার জুটত। এমনিতেই কতজন ওকে লাঠি পেটা করত, নয়তো ঢিল ছুড়ে মারত। খুব কষ্ট হত চআমাদের। আবার রাগও হত। মনে মনে বলতাম , এত করে বারণ করলাম আমাদের পিছনে পিছনে আসিস না। সেই এলি , খা এইবার মার।
বাস্তবিকই সে খুব অবাধ্য ছিল। কিছুতেই কথা কানে তুলত না। মা তার জন্য আলাদা বিছানা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের বিছানা ফেলে আমাদের বিছানায় গিয়ে শুত। আর তাকে প্রশয় দেওয়ার জন্য মায়ের কাছে আমাদের বকুনি শুনতে হত। অভিমানও ছিল খুব। বাড়ির কেউ কিছু বললে কিম্বা গায়ে হাত তুললে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকত। খেতেও চাইত না। তখন সাধ্য সাধনা করে তার মান ভাঙাতে হত। আবার দায়িত্ব বোধ ছিল প্রখর। তার একটা দায়িত্ববোধের কথা খুব মনে পড়ে। সেটা ছিল ইংরেজীর ১৯৭৮ সালের কথা। সেবারের বন্যায় আমাদের বাড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। আমরা আমাদের আত্মীয় দূর্গাচরণ ঘোষের পাকা বাড়িতে উঠে যায়।
যাওয়ার সময় তাকেও নিয়ে যাওয়ার বিস্তর চেষ্টা করি। কিন্তু সে কিছুতেই বাড়ি ছেড়ে যেতে চায় না। মনে হয় , বাড়ি পুরো ফাঁকা ফেলে রেখে যেতে চায় নি সে। এতদিন আমরা বারণ করেছি সঙ্গে যেতে। এই প্রথম সে ডাকা স্বত্ত্বেও আমাদের সঙ্গে যেতে রাজী হলো না। অগত্যা প্রাণ বাঁচাতে তাকে ফেলেই আমাদের উঠে যেতে হয়। আর সে প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে বাড়ি আগলে পড়ে থাকে। যে বাড়িতে একদিন তার লাথি ঝাঁটা বরাদ্দ ছিল।তিনদিন পর আমরা বাড়ি ঘরের পরিস্থিতি দেখতে আসি। দেখি দোতলা মাটির বাড়িটি ভেঙে পড়ে আছে। ছোট্ট পাকা ঘরের মেঝেতে তখনও হাটুর উপর জল।
আমাদের শোওয়ার খাটটা ভাসছে। আর সেই খাটের উপর মুখ নামিয়ে শুয়ে আসে সে। আমাদের আওয়াজ পেয়েই বেরিয়ে আসে। একবার করে ভাঙা ঘরটার কাছে যায় আর একবার করে আমাদের কাছে ফিরে আসে। যেন বোঝাতে চায় , কিচ্ছু খোওয়া যায় নি। সব ঠিকঠাক আছে , দেখে নাও। সেদিন তাকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করছিলাম। তারপর জোর করে সংগে নিয়ে গিয়েছিলাম। তার কয়েক বছর পরই সে মারা যায়। তার মৃতদেহ আঁকড়ে আমরা দু'ভাই খুব কেঁদেছিলাম। আজও তার কথা ভুলি নি। তার নাম ছিল টম। সে ছিল নিতান্তই একটি রাস্তার কুকুর। বাস চাপা পড়ে তার দুই সহদর সহ মায়ের মৃত্যুর পর সে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।




No comments:
Post a Comment