Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মনিকোঠায় -- ৩২ ( শিখর মুর্মর কথা)


             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                      অর্ঘ্য ঘোষ


( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )





                      শিখর মুর্মর কথা 

                                       

    ( এই বাড়িই এলাকায় বড়োবাড়ির খেতাব                                            দিয়েছে শিখর  মুর্মর পরিবারকে )               

                             ( ৬২ ) 



প্রান্তজীবি বলতে যাদের বোঝায় শিখর মুর্ম কিন্তু সেই পর্যায়ে পড়েন না। বরং বেশ উচ্চ বিত্ত হিসাবেই পরিচিতি রয়েছে তাদের পরিবারের। আর্থিক সংগতির নিরিখে পরিবার উচ্চ কোটিতে থাকলেও শিখর মুর্মর জীবন - যাপন ছিল কিন্তু নিতান্তই প্রান্তজীবি মানুষদের মতোই।তার সেই জীবন যাপনের ছবিটি আজও আমার মনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে রয়েছে।
                                                                              

                          ( সস্ত্রীক শিখর মুর্ম )

 
                                  শিখর মুর্মদের আদি বাড়ি ছিল ঝাড়খণ্ডের শিকারিপাড়ার বাঁশপাহাড়ি গ্রামে। ৩ পুরুষ আগে সেখান থেকে শিখর মুর্মর দাদু , ঠাকুমা আর এক পিসি ' হাত আর পা , খাট আর খা ' এই মন্ত্র সম্বল করে ফাওড়া আর ঝুড়ি কাঁধে জীবিকার খোঁজে বীরভূমে আসেন। তারপর বিভিন্ন জায়গায় ঠোক্কর খেতে খেতে তারা হাজির হন ময়ূরেশ্বরের নান্দুলিয়া গ্রামে প্রয়াত রজনীকান্ত মুখোপাধ্যায়ের কৃষি ফার্মে। রজনীকান্তবাবুর ছেলে প্রয়াত রাধারমণ মুখোপাধ্যায়  নাকি ছিলেন স্থানীয় ময়ূরেশ্বর ২ নং পঞ্চায়েত সমিতির তদানীন্তন সভাপতি। সেখানেই তিনজনের স্থায়ী কাজ জোটে। 


                                 তারপর থেকেই চিত্রটা বদলাতে শুরু করে।ওই পরিবারের বর্তমান সদস্যদের কথা অনুযায়ী , ফার্মে কাজ করার পাশাপাশি তাদের পূর্বপুরুষেরা শুয়োর থেকে ছাগল এবং তা থেকে গরু মোষ পালন শুরু করেন।আর সে সব বিক্রি করে কিছু কিছু করে জমিজমাও কিনতে শুরু করেন।তা থেকেই নাকি পরিবারে আর্থিক স্বাচ্ছল্য বাড়তে থাকে। শিখর মুর্মর আমলে তা চরম শিখরে পৌঁছোয়। বনেদী বাড়ির মতো গোলাভরা ধান , গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ এমন কি বন্দুকও ওই পরিবারের করায়ত্ত হয়। ১৯৭০ সালে ওই এলাকায় সর্বপ্রথম ওই পরিবারেই বিরাট দোতলাবাড়ি নির্মিত হয়। তারপর থেকেই পরিবারটি এলাকায় বড়ো বাড়ি হিসাবে খেতাব লাভ করে। আজও এলাকার মানুষজন পরিবারটিকে বড়োবাড়ি হিসাবেই চেনেন।
                                          
                                                      শুধু আর্থিক সমৃদ্ধিই নয় , শিক্ষাবিস্তারেও পরিবারটি নজির সৃষ্টি করেছে।একসময় পরিবারটি ছিল একান্নবর্তী। শিখর মুর্মরা ছিলেন দুই ভাই। ভাই কানু একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও শিখরের বিদ্যার দৌড় ছিল ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত।কিন্তু ওই পরিবারের অধিকাংশই শিক্ষিত এবং সরকারি চাকুরীজীবি। শিখরের ১ ছেলে ৪ মেয়ে। বড় মেয়ে কার্মি মুর্ম উচ্চ মাধ্যমিক পাশ এবং নান্দুলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। শোনা যায় , তদানীন্তন স্কুল বোর্ডের চেয়ারম্যান অরুণ চৌধুরী ওই গ্রামে একটি স্কুলের উদ্বোধন করতে এসে কার্মির উচ্চ মাধ্যমিক  পাশের খবর শুনে নিজে উদোগী হয়ে ওই চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। আজ ১২ লাখী দরের চাকরি বিক্রির বাজারে এমন সদিচ্ছা স্বপ্নপ্রায়। 


                                   মেজমেয়ে সুহাসিনী বি,এ পাশ , মহম্মদবাজার সুধাকৃষ্ণ হাইস্কুলের শিক্ষিকা। সেজ প্রমীলা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ , ছোট শর্মিলা এম , এ পাশ কালিকাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।ছেলে কার্তিক মাধ্যমিক পাশ উঁচপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিক। অন্যদিকে কানু মুর্মর তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় আবংমেজ মেয়ে প্রাথমিকের গণ্ডী ছাড়াতে না পারলেও ছোট মেয়ে কলাবতী উচ্চ মাধ্যমিক  পাশ করে আশা কর্মী হিসাবে কর্মরত।ছেলে ছোটুলাল উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মহম্মদবাজারে আই ,সি , ডি, এস প্রকল্পের আপার ডিভিশন ক্লার্ক হিসাবে কর্মরত। বড়বাড়ির এই নজির ওই গ্রামে অন্যদের মধ্যেও শিক্ষা বিস্তারে সাড়া ফেলেছে। আদিবাসী অধ্যুষিত ওই গ্রামে প্রায় ২১০ টি পরিবারের বাস। একসময় অধিকাংশ পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার চল ছিল না বললেই চলে। এখন প্রতিটি পরিবারের ছেলেমেয়েই স্কুলে যায়। গ্রামে বি,এ পাশ রয়েছেন ৫ জন , উচ্চ মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক পাশের সংখ্যা যথাক্রমে ১০ এবং ২০ জন।সব ক্ষেত্রেই ছেলে এবং মেয়েদের আনুপাতিক হার প্রায় সমান সমান। বড়োবাড়ির দেখেই  এই প্রবণতা বেড়েছে বলে গ্রামবাসীরা মনে করেন। 


                                                  ছেলেমেয়েরা আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর হলেও পরিবারের কর্তা কিন্তু ছিলেন শিখর।চাষবাস সহ অন্যান্য আয়ের টাকা তার কাছে জমা হত। পাশাপাশি নিজের ছেলেমেয়ে তো বটেই ভাইয়ের ছেলেমেয়েদেরও বেতনের টাকাও জমা পড়ত সেই তার কাছেই। তারপর ছেলে মেয়েদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন কিম্বা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার টাকাও চেয়ে নিতে হত তার কাছে। তার মুখেই শুনেছি একথা। তাকে নিয়ে সংবাদ করতে গিয়ে তার সঙ্গে আমার বার চারেক দেখা হয়েছে। তখনই তার চরিত্রের একটা দিক আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। কোটিপতি হয়েও তিনি তাদের পুরনো অবস্থাকে ভোলেন নি।নিজের চোখেই দেখেছি বৃদ্ধ বয়েসেও প্রতিদিন সকালে একটা খাটো ধুতি পড়ে একপাল ছাগল নিয়ে চড়াতে যেতেন নদীর পাড়ে। বগলে থাকত একটা ছোট্ট ঝোলা। তাতে বিড়ি দেশলাইয়ের পাশাপাশি থাকত কিছু নগদ টাকা আর ব্যাঙ্কের টাকা তোলার ফর্ম আর একটা পেন। হঠাৎ কিছু প্রয়োজন পড়লে টাকার জন্য বাড়ির লোককে তার কাছেই নদী পাড়ে ছুটতে হত। সেখান থেকেই নগদ টাকা কিম্বা ফর্মে সই করিয়ে আনতে হত। 
  
                               
                                        কারণ ছাগল নিয়ে ফিরতে ফিরতে তার দুপুর গড়িয়ে যেত। ফেরার সময় কেটে আনতেন সর পাতা। বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়ার পর বসতেন প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট ছেঁড়া দিয়ে দড়ি তৈরি করতে।তারপর সেই দড়ি আর সর দিয়ে ঝাঁটা তৈরি করতেন।সেই ঝাঁটা অনেক সময় নিজে স্থানীয় ষাটপলশা হাটে বসে বিক্রি করতেন। একবার প্রশ্ন করেছিলাম , আপনার তো আর এসব না করলেও চলে , তাহলে করেন কেন এসব ? উত্তরে তিনি যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হলো , আদিবাসীরা মরে দুটো কারণে।এক হলো আজকে পেট ভরলে কাল কি খাবে তা ভাবে না, আর এক হলো তারা মদ খায় না, মদেই তাদের খায়। আমাদের পরিবার ওই দুটো বিষয়ে খুব সজাগ।কোন জায়গা থেকে আমরা উঠেছি তা ভুলি নি ।আব মদ আমরা মাত্রা রেখে পাল-পরবে খায়।কিন্তু মদ আমাদের খেতে পারে না।আজ শিখর মুর্ম নেই।কিন্তু তার ওই কথা গুলো খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তাই কথা গুলো আজও আমার মনে আছে। 

                                         
                                                                              

           ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 




             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

   

              ------০-----

                         

No comments:

Post a Comment