Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায় -- ৩৩ ( ঠাকরুন মায়ের কথা)


             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                      অর্ঘ্য ঘোষ


( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )


                     ঠাকুরুন মায়ের কথা 



                       ( ৬৩ )



ঠাকুরুন মায়ের আসল নাম ছিল অন্নপূর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া গ্রামে। পেটের দায়ে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে বেড়াতেন।ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করলেও আদতে ছিলেন পড়তি জমিদার বাড়ির গৃহিনী।তাই ভিক্ষা করলেও অনেকেই তাকে ঠাকরুন মা বলেই সম্বোধন করতেন। লোকপাড়া বাবুপাড়ার দুর্গাতলার কাছে ছিল  তাদের এক কামরার মাটির চালের পর্ণ কুটির। স্বামী , পাঁচ মেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে ছিল তার অভাবের সংসার।তার মধ্যে এক মেয়ে ছিল প্রতিবন্ধী। বড়ো ছেলে উত্তম প্রাইমারী স্কুলে আমার সহপাঠী ছিল।সেই সুবাদে ছোটবেলা তাদের বাড়ি আমার যাওয়া আসা ছিল। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়ই বাস চাপা পড়ে উত্তমের মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক সেই দৃশ্য আজও যেন আমার চোখের সামনে ভাসে।    


                             উত্তমের মৃত্যুর পরও আমার তাদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় নি।কারণ ততদিন ওই জায়গা আমাদের খেলার জায়গা হয়ে উঠেছিল।ওই খানেই ছিল আমাদের খেলার সাথী সমীর , পার্বতী , তপনদেরও বাড়ি। সে সময় অনেকেই উত্তমদের বাড়ি মূলত এড়িয়ে চলত। কারণ তাদের বাড়িটিকে সে সময় অনেকে চোরের বাড়ি বলত।উত্তমদের ছিল অভাবের সংসার , জমিদারির ছিটেফোঁটাও ছিল না। তাই তার বাবা ঘারুবাবু অন্য কোন কাজ  না পেয়ে সংসার চালাতে বেছে নিয়েছিলেন চুরি। সে সময় এলাকায় কোথাও কিছু চুরি হলেই লোকে ধরেই নিত সেটা উত্তমের বাবারই কাজ।তখন মাঝে মধ্যেই শুনতে পেতাম অমুক জায়গায় ঘারুবাবু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তমুক জায়গায় ঘারুবাবুকে গাছে বেঁধে বেধড়ক মারধোর করা হয়েছে।আবার  মাঝে মধ্যেই সন্দেহ বশে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধোরের কথাও কানে আসত। 


                                                           
                                                তেমনই সন্দেহের বশে গ্রামেরই আর এক জমিদার পরিবার ১৯৭৪ সালে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় নৃশংস ভাবে পিটিয়ে খুন করে ঘারুবাবুকে।তারপর থেকেই বিপর্যয় নেমে আসে ঠাকরুন মায়ের সংসারে। ছেলে - মেয়েদের মুখে দু'বেলা দুটি ভাত তুলে দিতে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে তুলে নিতে হয় তাকে। লজ্জায় নিজের গাঁয়ে ভিক্ষা করতে পারতেন না।চলে যেতেন দুর-দুরান্তে। ফিরতেন সন্ধ্যার মুখে। ফিরেই ধপ করে বসে পড়তেন মাটিতে। বেশ কিছুক্ষণ হাঁফাতেন।তখন তাকে দেখে মনে হত দারিদ্রের কশাঘাতে ক্ষতবিক্ষত একটি মানুষ।যার একটু বিশ্রাম দরকার।কিন্তু তা নেওয়ার উপায় নেই তার। কার্যত ৩৬৫ দিনই জ্বর-জ্বালা উপেক্ষা করে তাকে ভিক্ষা করতে বেরোতে হত। না হলে হাঁড়ি চড়ত না তাদের।


                                                 অভাবের সংসার ভালো করে খাওয়া পড়া জুটত না ।কিন্তু ঠাকুরনমায়ের ছেলে-মেয়েরা কিন্তু দেখতে শুনতে বেশ সুন্দর ছিল। তাস্বত্ত্বেও অর্থাভাবে মেয়েদের পাত্রস্থ করতে পারেন নি। তারা বিয়ের নামে কার্যত বিকিয়ে যায়।মাথার উপর কোন অভিভাবক না থাকায় একমাত্র ছেলে মিহির ওরফে গোবরও বখে যায়। মায়ের ভিক্ষায় খেয়ে প্রায়ই মায়ের উপর অত্যাচার করত সে।সেই অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে আমরা কিছুদিন ঠাকরুন মাকে প্রতিবাদ ক্লাবের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলাম। ছেলেকে মায়ের কাছে ঘেঁসতে দিতাম না। মাতৃস্নেহের কাছে কোন কালে কোন নিষেধাজ্ঞা বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি।এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটে না। তখন প্রায়ই কারও না কারও চোখে পড়তে গভীর রাতে যে ছেলে একদিন মায়ের উপরে নানা অত্যাচার করেছে সেই ছেলেকেই ভাত বেড়ে খাওয়াচ্ছেন মা। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার পরই ফের মা ছেলে নিজেদের বাড়িতেই ফিরে যান।


                                              বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাঁয়ে গাঁয়ে ভিক্ষা করার ক্ষমতা কমে আসে  ঠাকরুন মায়ের । কিন্তু পেট তো বাগ মানে না। তাই সেই সময়  মাঝে মধ্যেই আসতেন আমার কাছে। তখন আমার একটা হাস্কিং মিল ছিল। সেখানে এসে কোনদিন বলতেন , দাদুভাই আজ পূর্ণিমার উপোস।রাতে রুটি খেতে হয়,  চাট্টি ময়দা দেবে ? আবার কোন দিন বলতেন , বাতের ব্যাথায় খুব কষ্ট পাচ্ছি ওষুধ কিনতে হবে , ১০ টা টাকা দেবে ? সে সময় খুব করুণ দেখাত তার মুখ। বুঝতে পারতাম অজুহাতটা মিথ্যা , কিন্তু অভাবটা তার মিথ্যা ছিল না। তাই ময়দার সঙ্গে চাল-টাকাও দিতাম। আর তারপরই কপালে হাত ঠেকিয়ে বলতেন , ভগবান তোমার মঙ্গল করুন ভাই।পরক্ষণই আবার বলতেন , সেই মুখপোড়া তো আবার আমার কথা শুনতে পায় না। নাহলে লোকটাকে মিথ্যা অপবাদে সবার সামনে যারা পিটিয়ে মারল তাদের কোন সাজা  হয় না  ? এই আক্ষেপ আমি বহুবার তার মুখে শুনেছি। বাস্তবিক সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে তার স্বামী খুনে অভিযুক্তদের কোন সাজাই হয় নি।



                                                  শেষ বয়েসটা ঠাকুরুন মায়ের কিছুদিন সেবা যত্ন জুটেছিল। সেই সময় তার কেটেছিল গ্রামেরই জগন্নাথ হাজরার বাড়িতে। নিজের ঘর ভেঙে যাওয়ায় ঠাকুরনমা তখন নিরাশ্রয় হয়ে পড়েছিলেন। তাই দেখে স্বেচ্ছায় ঠাকুরুন মায়ের দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন দিনমজুর জগন্নাথ আর তার স্ত্রী শ্রীমতি।মাতৃজ্ঞানে তারা ঠাকরুনমায়ের সেবা করেন। আমরা কয়েকজন তাকে সাহার্য্য করতাম। জগন্নাথের বাড়িতেই ঠাকরুন মায়ের মৃত্যু হয়। নিজের ছেলের হাতে মুখে আগুনটুকু পর্যন্ত জোটে নি তার। তথাকথিত 'জলঅচল'  জগন্নাথ হাজরার হাতেই মুখে আগুন জোটে তার। জগন্নাথই পেটের ছেলের মতো অশৌচ পালন থেকে শুরু করে  পারলৌকিক কাজ করেছিল। আজ ঠাকরুনমা নেই , কিন্তু তার সেই আক্ষেপটা আজও যেন কানে বাজে -- সেই মুখপোড়া তো আমার কথা শুনতে পায় না। নাহলে খুনেদের কোন সাজা হয় না ?   
                      

    ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 



             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

   

              ------০-----

                                                                                  

No comments:

Post a Comment