অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
অনিলদা'র কথা
( ৬৪ )
কথা বার্তা থেকে পোশাক আশাক , সবেতেই নিপাট ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় অনিলদা ছিলেন তাই। সাদা ধুতি - ফুলসার্ট জামা আর কালো ফ্রেমের চশমা চোখের মানুষটিকে দেখে সহজেই আন্দাজ করে নেওয়া যেত তার পেশা শিক্ষাকতা। পেশায় শিক্ষক হলেও শুধু বিদ্যালয়ের গণ্ডীতেই আবদ্ধ ছিল না তার বিচরণ ক্ষেত্র। জেলার গণ্ডী ছাড়িয়ে রাজ্যময় অবাধ গতি ছিল তার। আসলে তার সৃষ্টি ছড়িয়ে ছিল সারা রাজ্যময়।
( বাউলের মাঝে অনিলদা )
অনিলদা মূলত ছিলেন লোকগান রচিয়তা। তার লেখা বহু গান লাভপুরের ধনডাঙ্গা গ্রামের কার্তিকদাস বাউলের গলায় এখনও সমান জনপ্রিয়। একসময় তার লেখা ' জামাইয়ে ভেঙ্গেছে পাথর বাটি লো 'র মতো বহু লোকগান মানুষের মুখে মুখে ফিরত।অনিলদা গান লিখতেন মেঠো ভাষায় , মাটির মানুষদের নিয়ে। তার গানে মাটির মানুষেরা নিজেদের প্রাণ খুঁজে পেতেন। তাই শুধু শিল্পীরাই নন , লাঙ্গল চালাতে চালাতে কৃষক থেকে শুরু করে নৌকার মাঝির গলাতেও শোনা যেত তার গান। মাটি মাখা ওইসব গানের জন্যই আকাশবানীর স্বীকৃত গীতিকারও হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালিখির পাশাপাশি সংবর্ধিত হয়েছেন বহু জায়গায়। কোথাও কেউ ডাকলেও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভুলে দিব্যি ঝোলা কাঁধে হাজির হয়ে যেতেন।কোন নাক উঁচু ভাব ছিল না তার মধ্যে। শেষের দিকে জড়িত ছিলেন কলেশ্বর নেতাজী সংস্কৃতি মঞ্চের সঙ্গেও।
( নেতাজী সংস্কৃতি মঞ্চের অনুষ্ঠানে অনিলদা )
শুধু গান রচনাই নয় , কবিতা গল্প , প্রবন্ধ সব ধরণের রচনাতেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন অনিলদা।কিন্তু সবসময় তার রচনায় প্রাধান্য পেয়েছে মূলত গ্রাম এবং গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা। মুর্শিদাবাদের ছোটকাপসা গ্রামে বাড়ি ছিল অনিলদা ওরফে অনিল চক্রবর্তীর। আজ যে এই লেখালিখি করার দুঃসাহস দেখাতে পারছি যে কয়েকজন মানুষের সাহসে ভর করে তাদের অন্যতম হলেন মাসিক দিদিভাই পত্রিকার সম্পাদক সন্তুদা আর অনিলদা। কোটাসুরের দিদিভাই আশ্রমেই অনিলদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। সেদিনের কথা আজও আমার মনের মনিকোঠায় স্মৃতির সঞ্চয় হয়ে রয়েছে।
আমি তখন স্কুলের ছাত্র। কবিতা লেখার অদম্য উৎসাহে ছাইপাশ লিখতে শুরু করেছি। আমার ওইসব লেখা মেজে ঘষে সন্তুদা নিয়মিত দিদিভাই পত্রিকায় ছেপে দিতেন। আর ছাপার অক্ষরে নিজের নামটি দেখে লেখার উৎসাহ আরও বেড়ে যেত। আরও ছাঁইপাশ লিখে জমা দিতাম সন্তুদার হাতে। একদিন অনিলদাও হাজির ছিলেন। সেদিন সন্তুদার কাছে জমা দেওয়ার আগে অনিলদা আমার কাছে লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়েন। তারপর বলেন , খুব সুন্দর হয়েছে। তারপর থেকে বহুবার একই ঘটনা ঘটেছে। আজও আমার কাছে সেইসব ছাইপাশ লেখার খাতাটি রয়েছে। নিজেরই সন্দেহ হয় সেগুলো আদৌ লেখা কিনা। অথচ অনিলদা কেমন অবলীলায় সেই সব লেখার প্রশংসা করেছিলেন। আজ বুঝতে পারি আমাকে উৎসাহিত করার জন্যই সন্তুদা ওইসব লেখা গ্রহণযোগ্য করে ছাপতেন আর অনিলদা প্রশংসা করতেন। সেদিন যদি তারা ওই ভূমিকা পালন না করতেন তাহলে হয়তো লেখালিখির উৎসাহটাই হারিয়ে যেত।
আমার সঙ্গে অনিলদার বয়েসের ফারাক ছিল অনেকটাই , বলা যেতে পারে প্রায় পিতৃতুল্য। আমার বাবাও শিক্ষকতা করতেন। সেই সুবাদে বাবাকে দাদা বলে সম্বোধন করতেন উনি।আবার আমি তাকে দাদা বলতাম।তাই আমাকে ভাইয়ের মতোই দেখতেন। মনে পড়ে দিদিভাই আশ্রমের বকুল তলায় বসে সন্তুদার অনুরোধে তিনি সদ্য লেখা লোকগান গেয়ে শোনাতেন। আর সেই গান শুনতে শুনতে অবাক হয়ে আমি ভাবতাম কি করে অত সুন্দর লেখেন উনি ? আর মনের ভাব আন্দাজ করে উনি বলতেন , ভাই তোমাকে আমার হিংসা হয় জানো। কি সুন্দর কবিতার লাইন সাজাও তুমি। আজ বুঝি সেও ছিল অনিলদার উৎসাহ দেওয়ার প্রয়াস।
শুধু আমার সামনেই লেখার প্রশংসা করতেন তাই নয় , দিদিভাই আশ্রম , ময়ূরেশ্বর থেকে ছবি সরকার সম্পাদিত ' অনিকেত ' পত্রিকা গোষ্ঠীর সাহিত্য সভায় যখনই কোন কবিতা পড়েছি লক্ষ্য করে দেখেছি প্রথম হাততালিটা দিয়ে উঠেছেন অনিলদা।তার দেখাদেখি সৌজন্যতার খাতিরে অন্যদেরও হাত তালি দিতে হয়েছে।স্নেহের টানে তার বাড়ি বহুবার গিয়েছি , তিনিও এসেছেন।মনে আছে তার ডাকে একবার বেলগ্রাম প্রাইমারি স্কুল চত্বরে খড়গ্রামের পূর্বাভাস সাহিত্যগোষ্ঠীর মাসিক সাহিত্য সভায় যোগ দিতে গিয়েছিলাম।সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন অনিলদা।দুই জেলার প্রচুর কবি-সাহিত্যিক হাজির ছিলেন ওই সাহিত্য সভায়। সবাই একটা করেই রচনা পাঠের সুযোগ পাবেন কিনা তার ঠিক ছিল না।
সেই পরিস্থিতিতে আচমকা অনিলদা ঘোষণা করে বসেন , এবারে আমার ভ্রাতৃপ্রতিম কবি অর্ঘ্য ঘোষের কাছে ৪ টে কবিতা শুনব। ঘোষণা অনেকেই বিরক্ত হয়েছিলেন।আমাকে অতিরিক্ত সুযোগ দেওয়ার জন্য মনে মনে হয়তো তারা অনিলদার উপরে রেগেও উঠেছিলেন।আমার দিকে তাদের তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে সে কথাই মনে হচ্ছিল সেদিন।তাই খুব ইতঃস্তত করছিলাম।কিন্তু অনিলদা সব কিছু অগ্রাহ্য করে আমার হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দেন।বাধ্য হয়ে আমায় পড়তে হয় চারটি কবিতা। পড়তে পড়তেই লক্ষ্য করছিলাম , প্রতিটি কবিতা পড়ার শেষে অনিলদা হাততালি দিয়ে উঠেছেন। দেখাদেখি অন্যদের দিতে হচ্ছে। সেখানেই ক্ষান্ত হন নি অনিলদা , মধ্যাহ্ন ভোজের আসরে সবাইকে ধরে ধরে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি লেখার খুব প্রশংসা করছিলেন আর আমি অস্বস্তিতে পড়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
সেই পরিস্থিতিতে আচমকা অনিলদা ঘোষণা করে বসেন , এবারে আমার ভ্রাতৃপ্রতিম কবি অর্ঘ্য ঘোষের কাছে ৪ টে কবিতা শুনব। ঘোষণা অনেকেই বিরক্ত হয়েছিলেন।আমাকে অতিরিক্ত সুযোগ দেওয়ার জন্য মনে মনে হয়তো তারা অনিলদার উপরে রেগেও উঠেছিলেন।আমার দিকে তাদের তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে সে কথাই মনে হচ্ছিল সেদিন।তাই খুব ইতঃস্তত করছিলাম।কিন্তু অনিলদা সব কিছু অগ্রাহ্য করে আমার হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দেন।বাধ্য হয়ে আমায় পড়তে হয় চারটি কবিতা। পড়তে পড়তেই লক্ষ্য করছিলাম , প্রতিটি কবিতা পড়ার শেষে অনিলদা হাততালি দিয়ে উঠেছেন। দেখাদেখি অন্যদের দিতে হচ্ছে। সেখানেই ক্ষান্ত হন নি অনিলদা , মধ্যাহ্ন ভোজের আসরে সবাইকে ধরে ধরে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি লেখার খুব প্রশংসা করছিলেন আর আমি অস্বস্তিতে পড়ে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
সেদিন আমার সঙ্গে গিয়ে কবিতা পাঠ করেছিলেন ঘুষকড়ার স্কুল শিক্ষক সুবল ভল্লাও। আমাকে নিয়ে অনিলদার আতিশয্য দেখে বলেছিলেন , অনিলদা দেখছি তোকে খুব স্নেহ করেন।বাস্তবিকই অনিলদা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আজকে তার মতো অন্যের গুণগ্রাহিতার গুণের বড়ো অভাব।কেউ কাউকে এভাবে উৎসাহ দেন কিনা জানা নেই।কিন্তু অনিলদার মধ্যে আমি সেই গুণ খুঁজে পেয়েছিলাম। আজ অনিলদা নেই , কিন্তু আমারলেখালিখির উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তার পদচিহ্ন।সেই পদচিহ্ন অনুসরণ করেই তো হেঁটে চলেছি।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment