Short story, Features story,Novel,Poems,Pictures and social activities in Bengali language presented by Arghya Ghosh

মনের মণিকোঠায়-- ৩৫ ( কন্ঠ ভান্ডারির কথা)


             মনের মণিকোঠায়                  



                                                      
                        


                      অর্ঘ্য ঘোষ


( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )





                    কণ্ঠ ভাণ্ডারীর কথা  





                     ( ৬৫ )




কণ্ঠর বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের তিলডাণ্ডা গ্রামে। পোশাকি নাম ছিল নীলকণ্ঠ ভান্ডারী। কিন্তু বেশিরভাগ লোকই তাকে কণ্ঠ নামেই চিনতেন।বালক অবস্থায় সে আমাদের আত্মীয় দূর্গাচরণ ঘোষের বাড়িতে পরিচারক হিসাবে যোগ দেয়।পরে দক্ষতার কারণে ওই পরিবারের ম্যানেজারও হয়ে ওঠে সে। আমার বাবা- কাকাদের দাদা এবং মা-কাকীমাদের বৌদি সম্বোধন করত। আমাকে বলত ভাইপো , আমি অবশ্য কণ্ঠই বলতাম।সে প্রায় আমার সমবয়স্ক ছিল , হয়তো বয়সে কিছুটা বড়োও হতে পারে।কিন্তু কিছুতেই ছোট ছিল না। তবু সে কোনদিন সরাসরি আমার নাম ধরে ডাকে নি। কিন্তু যে বাড়িতে সে থাকত সেই বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ছোটবেলায় তাকে নাম ধরে ডাকতে শুনে আমিও তা রপ্ত করে নিয়েছিলাম। তারপর থেকে সে আমার কাছে কন্ঠই হয়ে গিয়েছিল। কারণ কেউ আমার ভুল শুধরে তাকে কোন সম্বোধনে ডাকার কথা বলে দেয় নি। আসলে মনে হয় সে সময় বাবার বয়সী পরিচারকদেরও অবলীলায় নাম ধরে ডাকাটাই দস্তুর ছিল। পরিচারকরা আবার দাদা-কাকা কিম্বা জ্যাঠা হতে পারে নাকি ? আর্থিক কৌলিন্যের উচ্চকোটিতে থাকা অধিকাংশ মানুষজন হয়তো সেই ধরণাই পোষণ করতেন।  


                                   তাবলে কিন্তু কণ্ঠর সঙ্গে আমার কোন দুরত্ব ছিল না। বরং বন্ধুর সমগোত্রীয়ই ছিল সে। অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে তার সঙ্গে বহুবার ফিষ্ট করেছি। তার রান্নার হাতটি ছিল চমৎকার। সেই সুবাদে সে আমাদের অনেকের কাছেই মুসকিল আসান হয়ে উঠেছিল। যখনই কিছু সমস্যায় পড়েছি তাকে বলেতেই , সে বলেছে তুমি অত ভেব না তো ভাইপো , সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।সে প্রতিবাদ ক্লাবের ফুটবল প্রতিযোগিতায় বগিরাগত প্লেয়ারদের খাওয়া ,  ক্লাব পরিচালিত সবুজকলি বিদ্যাপীঠের বাচ্চাদের পিকনিক কিম্বা যাত্রাকমিটির শেয়ার হোল্ডারদের গ্রাণ্ড ফিষ্ট সবতেই অপরিহার্য ছিল কণ্ঠ। ম্যানেজারির কাজ সামাল দিয়ে উনুন তৈরি থেকে  কাঠ চেলানো , রান্না থেকে হাঁড়ি কড়াই মাজার দায়িত্ব পালন করেছে হাসি মুখে। আর ওইসব কাজের পাশাপাশি  মজার মজার কথা বলে অন্যদেরও জমিয়ে রাখত সব সময়। মাঝে মধ্যে পারিশ্রমিক  বাবদ টাকা দিতে গিয়েছি তখন সে রাগ করে বলেছে,  টাকা দিয়ে রান্না করানোর লোকের কি অভাব আছে ? টাকা দিতে হলে এরপর থেকে তাদেরই ডেক। আমাকে আর ডেক না।তার ওই কথা শুনে হাত গুটিয়ে নিতে হয়েছে। 

                   
                                        শুধু ক্লাব বা স্কুলেই নয় , আমাদের বাড়িতেও ভোজকাজে সে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত। এইতো বছর দেড়েক আগেও আমার বাবার পারলৌকিক কাজেও সে ওই ভূমিকা পালন করেছে বিনা পারিশ্রমিকে। আমাদের পরিবারেই নয় , গরীব মানুষের ভোজেও সে'ই ছিল মুসকিল আসান। পরোপকারী হিসাবেও পরিচিতি ছিল তার। কোথাও হয়তো কিছু জায়গার অভাবে কেউ যাতায়াতের রাস্তা পাচ্ছে না , কেউ হয়তো একটা গাছ অভাবে বাড়ির কড়িকাঠ তৈরি করাতে পারছে না , এমন লোকেদেরও মুসকিল আসান করে দিয়েছে সে। নিজের মালিকদের বলে কয়ে জায়গা কিম্বা গাছের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কণ্ঠর এই পরোপকারের বিষয়টা অনেকেরই জানা। কিন্তু লোকপাড়া কলেজ স্থাপনে তার নেপথ্য ভূমিকার কথা খুব কমজনই জানেন।


                                  কন্ঠ না থাকলে লোকপাড়ায় কলেজ হতো কিনা কে জানে। লোকপাড়ায় অবশ্য কলেজ গড়ার প্রথম উদ্যোগটি নিয়েছিলেন তদানীন্তন লোকপাড়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রয়াত নবকিশোর হাজরা। এলাকার শিক্ষানুরাগীদের নিয়ে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে টাকা সংগ্রহ করেন। কলেজ গড়ার জন্য সেই সময় লোকপাড়া  হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ বজরহাট মৌজায় তাদের ফুটবল মাঠ লাগোয়া তিন একর জমি দান করেন।কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সে সময় কলেজ হয়নি। ২০০৯ সালে বাম সরকার স্থানীয় মানুষজনদের নিয়ে কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগে সামিল হয়েছিলাম আমিও। প্রয়াত প্রধান শিক্ষকের সংগৃহিত টাকা এবং জমি সম্বল করেই কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ শুরু হয়। কিন্তু কলেজের নামকরণ নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। স্থানীয় বজরহাট গ্রামের বাসিন্দারা দাবি তোলেন কলেজের নামকরণ করতে হবে বজরহাটের নামে , নচেৎ তারা বজরহাট মৌজার ওই জমিতে কলেজ গড়তে দেবেন না। অন্যদিকে বৃহৎ অংশ এবং শাসকদল চেয়েছিল যেহেতু লোকপাড়ার নামেই কলেজ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সেইহেতু লোকপাড়ার নামেই কলেজ হোক। 


                                       এই দোটানায় কলেজ স্থাপন অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। উদ্যোক্তারা পড়েন মহা মুসকিলে। তখন মুসকিল আসান হয়ে এগিয়ে আসে কণ্ঠ।  সে'ই বিকল্প জায়গার সন্ধান দেয়। প্রতিবাদ ক্লাব থেকে ঢেকা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত জায়গা দেখিয়ে সে আমাকে বলেছিল , ভাইপো এই জায়গাটা হলে তোমাদের হবে না ? ওই জায়গার মধ্যে ছিল একটি পুকুর সহ স্কুলের ছিল ২ একর ৬০ শতক জায়গাও।ছিল কণ্ঠর মালিক সহ ব্যক্তি মালিকানার বেশ কিছু জমি। প্রস্তাবটা আমার ইতিবাচক মনে হয়।আমি অন্যান্য উদ্যোক্তাদের জানায় , তাদেরও মনোঃপুত হয়। কন্ঠ নিজের মালিকের তো বটেই আরও বেশ কিছু জমি মালিকের সঙ্গে কথা বলে অনেক কম দামে ওই জমির ব্যবস্থা করে দেয়।এমন কি মালিকদের বলে কিছু জমি দানেরও ব্যবস্থা করে দেয় সে। আমরা গ্রামে গ্রামে টানা তিনমাস কার্যত ভিক্ষা করে কণ্ঠর চিহ্নিত প্রায় সাড়ে সাত একর জায়গা সংগ্রহ করি। যার সিংহভাগই জমিদাতারা নুন্যতম দামে দেন। স্কুল সহ বাকিটা দানের। সেই জায়গার উপরেই গড়ে উঠেছে লোকপাড়া মহাবিদ্যালয়।কলেজের মাঠটিও আজ হয়ে উঠেছে এলাকার অমূল্য সম্পদ।                                                                                         



                                      চলতি বছর ভাদ্র মাসে ক্যানেসারে মৃত্যু হয় কন্ঠর। ডাক্তাররা জবাব দেওয়ার পর বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল তাকে । বন্ধু উত্তমের দে'র সঙ্গে দেখতে গিয়েছিলাম তাকে। সে হয়তো তখনও আন্দাজ করতে পারে নি মৃত্যু কড়া নাড়ছে দুয়ারে। তাই হাতের ইশারায়  কাছে ডেকে বসিয়ে পেটে হাত বুলাতে বুলাতে ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞেস করেছিল --- ভাইপো ভালো হবে তো ?  ওই প্রশ্নে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল আমার।প্রশ্নকর্তার জানা না থাকলেও আমি জানতাম পরিনতির কথা।তাই বলেছিলাম , তুমি ভালো না হয়ে উঠলে আমরা ভালো থাকব কি করে ? আজ ভাবি সত্যিই তো , যদি কোন মুসকিলে পড়ি তাহলে মুসকিল আসান হয়ে কে এসে বলবে -- ভাইপো তুমি অত ভেব না তো , সব ঠিক হয়ে যাবে।            
                         

      ( চলবে )

                

                  পড়ুন / পড়ান 



             নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন 


          ১৯  নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে





                ধারাবাহিক উপন্যাস 



                       সালিশির রায় 

                                                                

সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --

                   


                                                                  


খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ। 

   

              ------০-----


                                          

No comments:

Post a Comment