অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
হারুদার কথা
( ৬৬ )
'' ডাঙ্গাপাড়ার হারু ,
খায় নারকলের নাড়ু /
নারকেল দামে বড়ো চড়া,
তাই হারুর চোখ ছানাবড়া।
চায়ের ঠেকে বসে থাকতে থাকতে হারুদাকে নিয়ে মজা করে মুখে মুখে এই রকম কত ছড়া যে আমরা বানিয়েছি তার ঠিক নেই।আমাদের পাশে বসে চায়ের কাপ হাতে হারুদা সেইসব শুনত আর নিঃশব্দে হাসত। আসলে হারুদার হাসিটাই ছিল নিঃশব্দে। কখনও শব্দ করে তাকে হাসতে শুনেছি বলে মনে পড়ে না। হারুদাদের আসল বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের ঝিকরহাটি গ্রামে।বেশ কয়েক বছর আগে তারা সপরিবারে ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কোনাই পাড়ায় বাড়ি করে বসবাস শুরু করে।মিষ্টি স্বভাবের জন্য সে অনেকেরই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তার নাম ছিল হারাধন কোনাই।
হারুদা পেশায় ছিল দিনমজুর। দিনমজুরির আয়ে কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে চলত তার অভাবের সংসার।কিন্তু অভাব কখনও ছায়া ফেলতে পারে নি তার আচার-আচরণে। বরং খুব মজার মানুষ ছিল হারুদা। তাকে নিয়ে আমি , আমার বন্ধু উত্তম , সুভাষকাকুরা নানা রকম মজা করতাম।সে'ও সজ্ঞানে সে সব উপভোগ করত।আসলে খুব সরল আর ভালোমানুষ ছিল হারুদা।
নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় মদ্যপানের অভ্যাস ছিল হারুদার। আমাদের কাছে মাঝে মধ্যে তার জন্য কিছু করে টাকা চাইত। আমরা বলতাম , হারুদা তুমি প্রতিদিন মদ খাও কেন ? হারুদা বলেছিল , গরীবদের শখ আহ্লাদ বলতে তো ওইটুকুই গো।মদ পেটে পড়লে ভুলে যায় সব জ্বালা যন্ত্রণা। তারপর আর কিছু বলতে পারতাম না আমরা। মদ পেটে পড়লে যে হারুদা সব ভুলে যায় তার প্রমাণও বিভিন্ন সময় পেয়েছি।
কোনদিন হয়তো আমাদের কাছে টাকা নিয়ে মদ কিনে বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার ফিরে এসে আমাদের চুপিচুপি ডেকে নিয়ে গিয়েছে নিরালা কলেজ গ্রাউণ্ডে।আমরা ভেবেছি, নেশা পূর্ণ হয় নি , হারুদা ঠিক আবার টাকা চাইবে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে হারুদা চাদরের আড়াল থেকে বের করে সামনে ধরেছে শালপাতায় মোড়া কষা মাংস। অবাক দৃষ্টি চাইতেই এক গাল হেসে হারুদা বলেছে , বাড়ির পোষা হাঁস।বৌ রান্না করছিল , দেখলাম খুব সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে। ভাবলাম একা খাব , তাই তোমাদের জন্য কয়েক পিস নিয়ে এলাম। খেয়ে দেখ , শীতে হাঁসের মাংস ভালো লাগবে।হারুদার কথা শুনে সেদিন আমরা কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না যে লোকটা একটু আগেই মদ খাওয়ার জন্য ঝুলোঝুলি করে ৩০ টাকা নিয়ে গেল সেই লোকটাই নুন্যতম প্রায় ৮০/১০০ টাকা মুল্যের এক প্লেট মাংস আমাদের মুখের সামনে কি করে তুলে ধরল ? আসলে আমাদের মতো তথাকথিত ভদ্রসমাজের মতো হারুদারা অত হিসাব করে চলতে শেখে নি।তারা বোঝে ভালবাসা।ভালোবাসা না থাকলে কষা মাংস দেখে কি অনাত্মীয় মানুষের কথা এমনি ভাবে মনে পড়ে ? আজ যেখানে এক ছাদের তলায় থেকেও ভালো কিছু রান্না হলে আমরা দাদা- ভাই কিম্বা বাবা-মায়ের কথা ভুলে যায় , যেখানে ওইসব আপনজনদের কাছে ভালো কিছু রান্নার গন্ধ পৌঁচ্ছোনোর আশংকায় রান্নাঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে দিই , সেখানে হারুদার এই দৃষ্টান্ত কি সহজে ভোলা যায় ?
হারুদার মদ্যপান নিয়েও কতবার কত মজা করেছি।কখনও বলেছি হারুদা , তোমার তো আর চিন্তা নেই গো।সরকার এবার থেকে রেশনেও দৈনিক ১ লিটার হারে মদ দেবে। বি,ডি,ও অফিস থেকে কার্ড দিচ্ছে। হারুদাও তখন ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলেছে , তাই নাকি , খুব ভালো হবে তাহলে।কালই যাব কার্ড আনতে। আমরা মনে মনে ভেবেছি , যাক ঘুরে আসুক বোকা বনে , খুব মজা হবে তখন। পরদিন সকালে চায়ের আসরে আমরা হারুদাকে নিয়ে মজা করার জন্য মুখিয়ে আছি।ওঃ বাবা , দেখি হারুদা পাশা উল্টে দিয়ে আমাদের সঙ্গেই মজা করতে শুরু করছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হারুদা সেদিন বলেছিল , হ্যা গো তোমাদের কথা শুনে কাল বি,ডি,ও অফিস গিয়েছিলাম।সব শুনে বি,ডি,ও সাহেব বললেন , তুমি যে অভাবের জন্য মদ কিনে খেতে পারছ না সেটা তোমার পরিচিত কেউ এসে স্বাক্ষী দিলে তবেই তুমি রেশনের কার্ড পাবে।তা আমার তো তোমরা ছাড়া স্বাক্ষী দেওয়ার সেইরকম কেউ নেই। এখন তোমরা কবে যাবে বলো ? আমাদের তখন কিল খেয়ে কিল হজম করার মতো মুখের অবস্থা।
এই রকমই মজার মানুষ ছিল হারুদা। বোলানের দলে নাচিয়ে , ধর্মরাজের পুজোয় সঙ কিম্বা যাত্রায় কমেডিয়ানের চরিত্র সহ সবক্ষেত্রেই ছিল তার বিচরণ। ব্যক্তিগত জীবনের মতো ওইসব ভূমিকায় তাকে দিব্যি মানিয়ে যেত। কোথাও কোন ভোজ কাজ হলে সেখানেও ছিল তার অবাধ গতি।কাঠ চেলানো , উনুনে জ্বাল দেওয়া কিম্বা ভাতের হাঁড়ি নামানো মতো কাজে দেখা মিলত তার। সবক্ষেত্রে নিমন্ত্রণের তোয়াক্কাও করত না।বছর দেড়েক আগে আমার বাবার পারলৌকিক কাজেও হারুদা উনুন তৈরি থেকে কাঠ চেলানোর কাজ করেছিল।কিন্তু ভোজের আগেই হৃদরোগে মৃত্যু হয় তার। বাবার কাজের পর বেশ কিছু কাঠ বেঁচে গিয়েছিল। তার পরিবারের লোকেরা হারুদার ভোজের জন্য সেই কাঠ নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন মনে মনে ভেবেছিলাম , হারুদা কি নিজের পারলৌকিক কাজের কাঠ এভাবেই যোগাড় করে রেখে গিয়েছিলেন ? নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারে যে সব মানুষ , তাদের পক্ষেই বোধ হয় সব সম্ভব। আজ হারুদা নেই , কিন্তু মাঝে মধ্যেই আপনা থেকেই বেড়িয়ে আসে তাকে নিয়ে মজা করে বানানো ছড়াগুলি। আর মনে হারুদা যেন চায়ের গ্লাস হাতে পাশেই বসে রয়েছে।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment