অর্ঘ্য ঘোষ
( এই কলমে এমনই কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা ধারাবাহিক ভাবে তুলে ধরা হবে যারা নিতান্তই প্রান্তজীবি। বৃহত্তর সমাজে তাদের স্থান নেই বলেলেই চলে। তাদের জন্ম মৃত্যু এমনকি আসল নামও আজ সংগ্রহ করা কঠিন।তাদের পরিবারের লোকেরাও সে তথ্য ঠিকঠাক দিতে পারেন নি।প্রচলিত নামেই তারা আজও এলাকার কারও কারও মনে ধুসর স্মৃতি হয়ে রয়েছেন। স্মৃতির চাদর সরালেই অবয়বটা স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। আমার ছোটবেলায় দেখা মনের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নেওয়া ওইসব চরিত্রের সঙ্গে আপনিও মিল খুঁজে পেতে পারেন আপনার দেখা কোন মানুষের মধ্যে )
শিবু মোড়লের কথা
( ৫৭ )
দুঃখের পরে নাকি সুখ আসে। কিন্তু সেই সুখের নাগাল দুঃখ ভোগ করা মানুষেরা সব সময় পায় না। পেলেও তাদের ভাগ্যে সুখ এত ক্ষণস্থায়ী হয় যে সে কখন এলো কখন গেল তা ভুক্তভোগী মানুষগুলো টেরও পায় না। শিবু মোড়লের কথা ভাবলেই আমার সেই কথাই মনে হয়।
শিবু মোড়লের ভালো নাম ছিল শিবপদ মণ্ডল। বাড়ি ছিল সাঁইথিয়ার ধোবা গ্রামে। শোনা যায় নলহাটিতে নাকি কোন চাকরি করতেন। কিন্তু তার ছিল বিরাটাকার হাইড্রোসিল। হাইড্রোসিলের ভারে ভালো করে চলাফেরা করতে পারতেন না। সেইজন্যই চাকরি হারাতে হয় তাকে। তারপরই জীবন জীবিকার তাগিদে স্বপরিবারে এসেছিলেন শ্বশুরবাড়ি ময়ূরেশ্বরের বেলেড়া গ্রামে।জীবিকা অর্জণের কোন পথ খুঁজে না পেয়ে বেছে নিতে হয়েছিল ভিক্ষাবৃত্তি। কিন্তু লজ্জায় সেখানে ভিক্ষাও করতে পারতেন না। তাই লোকপাড়া বাবুপাড়া দুর্গামন্দির সংলগ্ন একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।
তার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড়ো ছেলে গনেশদা তখন হাইস্কুলের ছাত্র। ছোট তপন আমাদেরই সমবয়সী। মেয়ে মালা প্রাইমারি স্কুলে পড়ত। তাদের মানুষ করতে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে বেড়াতেন শিবু মোড়ল। আর মুড়ি ভেজে বেড়াতেন তার স্ত্রী ভৈরবী। তপনের সূত্রেই তাদের বাড়ি যাতায়াত ছিল।আজও মনে পড়ে কি নিদারুণ দারিদ্র আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছিল পরিবারটিকে। অধিকাংশ দিন নুন আর লঙ্কা দিয়ে ভাত খেতে দেখেছি তাদের। তাও সবদিন জুটত না।কারণ হাইড্রোসিলের যন্ত্রনায় সবদিন ভিক্ষায় বেরোতেও পারতেন না। যেদিন বেরোতেন সেদিনও বেশি বাড়ি ঘুরতে পারতেন না , কয়েক পা গিয়েই হাঁফাতেন। আমার বেশ মনে আছে আমাদের বাড়ি ভিক্ষা করতে এসে আমার মাকে একবার বলেছিলেন , মা গো আজ দুটো বেশি করে চাল দিও। আর পাঁচবাড়ি ঘুরতে পারছি না। আজ আমার গনেশের পরীক্ষা। চাল নিয়ে যাব তবে ওর মা ওকে দুটো ভাত ফুটিয়ে দিতে পারবে।
গনেশদার পড়াশোনাতে নাকি মাথা ছিল।আগ্রহও ছিল , কিন্তু পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা ছিল তাদের অর্থাভাব। বাবার তো টিউশানি মাস্টার , বইপত্র কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না।কিন্তু নিজের প্রচেষ্টার কোন ঘাটতি ছিল না। মনে পড়ে , সে সময় কবিকাকুর ডোমপাড়ার বাড়িতে গোপাল ঠাকুরের ম্যাজিক হয়েছিল। গনেশদা তা দেখে কিছু ম্যাজিক রপ্ত করে ছিল। শিবতলায় সে আমাদের সেই ম্যাজিক দেখাত। টিকিট ছিল একটি কিম্বা দুটি করে ঘুঁটে। সেই ঘুঁটে বিক্রি করে গনেশদা খাতা পেন কিনত।
আর একটা ঘটনা চোখের সামনে আজও ছবির মতো ভাসে। সে সময় গনেশদাদের বাড়ির পাশেই নিত্য পিওন থাকতেন। তার ছেলে সমীর ছিল আমার বন্ধু। সেই সুবাদে ওদের বাড়িও নিত্য যাওয়া আসা ছিল। একদিন দেখি ওদের বৈঠকখানা ঘরে সমীরের দাদা সন্তোষ আর তার এক সহপাঠী অবনীদাকে পড়াচ্ছেন ঢেকার স্বাক্ষী মণ্ডল। আর গনেশদা গোপনে পাশের জানলা থেকে তা শুনে শুনে লিখে নিচ্ছে। অবনীদারা ছিল গনেশদারই সহপাঠী।এইভাবেই গনেশদা টিউশানির ঘাটতি পূরণ করে নিত।এভাবেই সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে গণেশদা। এমন কি ভারতীয় নৌবাহিনীতে চাকরিও পায়।
কিন্তু সেই সুখ ভোগ করা হয় নি তার বাবার। ছেলের চাকরি পাওয়ার আগেই মৃত্যু হয় তার। মা'কে অবশ্য মুড়ি ভাজতে হয় নি আর। কিন্তু তিনিও বেশিদিন সুখ ভোগ করতে পারেন নি। ছেলের চাকরি পাওয়ার বছর খানেকের মধ্যে মৃত্যু হয় তারও।এমনকি গণেশদাও বেশিদিন সুখভোগ করতে পারে নি। মস্তিক বিকৃতির কারণে মাঝপথে চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে যায় ।তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।মস্তিক বিকৃত অবস্থায় এখন তার দিন কাটছে ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে। আর একদিন মাঠের মাঝে তপনের অস্বাভাবিক দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। মানসিক অবসাদের জেরেই নাকি সে আত্মহত্যা করেছিল।তপনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী বহু কষ্ট করে দুই ছেলে মেয়েকে মানুষ করেন। মেয়ের বিয়ে দেন।তার ছেলে গোপাল এখন বি,এস,এফ, কর্মী।
শিবু মোড়লের কথা আজও ভুলি নি। আজও মনে পড়ে হাইড্রোসিলের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে ভিক্ষা করে বেড়ানোর সেই ছবিটি। সব জায়গায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা কুড়িয়ে বেঁচে থাকার সেই করুণ জীবনযাপনও ভুলি নি। তার ছেলের বয়সী ছেলে-মেয়েরাও তাকে কোন সম্বোধনে ডাকার পরিবর্তে শিবু মোড়ল বলেই ডেকেছে আর হাইড্রোসিল নিয়ে কটাক্ষ করেছে। হয়তো আমিও তার ব্যতিক্রম নয়। একজন ভিক্ষারীও যে কাকা- জ্যাঠা কিম্বা দাদু হতে পারে তা বোধহয় মনেই করত না তদানীন্তন তথাকথিত ভদ্রসমাজ।
----০----
হারা ভল্লার কথা
( ৫৮ )
হারা ভল্লার বাড়ি ছিল ময়ূরেশ্বরের ভগবতীপুর গ্রামে। ভালো নাম ছিল হারাধন ভল্লা। জীবিকা নির্বাহের জন্য হেন কাজ নেই যা তাকে করতে হয় নি। দোকানের বয় থেকে পাণ্ডাগিরি। খুব রসিক মানুষ হিসাবে পরিচিতি ছিল তার।মুখে একটা নির্ভেজাল হাসি লেগেই থাকত। ডাঙ্গাপাড়ার ময়রাদের মিষ্টির দোকানে নাকি বয়ের কাজ করতেন। সে সব আমার শোনা কথা। তবে তার নিজের দোকানের কথা আমার ভালো মনে আছে।
লোকপাড়া ফুটবল মাঠ সংলগ্ন এলাকায় জয় টকিজ নামে যে সিনেমা হল ছিল সেখানে দোকান করেছিলেন তিনি। তার সেই দোকানে লবংলতিকা আর চপ ছিল বিখ্যাত। লবংলতিকা যে কত খেয়েছি তার ঠিক নেই। সেই স্বাদ যেন এখনো মুখে লেগে আছে। লাল রঙের তেকোনা সে লবংলতিকায় কামড় বসালেই পুচুত করে রস ছিটকে লাগত জামায়। তেলে-ভাজা আর মিষ্টি তৈরির হাতটি ছিল চমৎকার। তাস্বত্ত্বেও পেটের ভাত হয়নি তার।
১৯৭৮ সালের বন্যায় সিনেমা হলের সঙ্গে তার দোকানও ভেঙে যায়। তারপর থেকেই নানা উঞ্ছবৃত্তি করে সংসার চালাতে হয়েছে তাকে। শেষ বয়েসটা কেটেছে চরম কষ্টে।সে সময় তার টি,বি ধরা পড়ে। দীর্ঘদিন দুররাজপুর নিরাময় হাসপাতালে কাটিয়েও পুরোপুরি সুস্থতা ফেরে নি তার।ডাক্তার বলেছিলেন , বিশ্রাম নিতে আর ভালো মন্দ খেতে।
দুটোই ছিল তার নাগালের বাইরে।তখন আর ভারী কাজ কিছু করতে পারতেন না।তাই ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। সেই সময় কথায় কথায় বলতেন ' জয় গুরু'। একসময় ভিক্ষা করাও তার শরীরে পোষাত না। শোনা যায় সেই সময় তিনি নাকি কপালে সিঁদুরের টিপ আর গলায় পৈতে নিয়ে বিভিন্ন ধর্মস্থানে পাণ্ডাগিরিও করেছেন। তা করতে গিয়ে একবার ধরাও পড়ে যান।
সেবারে পাণ্ডার বেশ ধরে হারু ভল্লা নাকি আসন পেতে বসেছিলেন সাঁইথিয়ার নন্দিকেশ্বরী মন্দির চত্বরে। তা দেখে এক বৃদ্ধা তাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন।আর হারুও তার মাথায় হাত রেখে বলে উঠেন ' জয়গুরু'। পান্ডার গলার আওয়াজটা বৃদ্ধার কেমন চেনা চেনা লাগে। তারপর মুখের দেখে চেয়ে বলেন , হ্যারে হারা তুই ? তুই ভল্লার ছেলে হয়ে গলায় পৈতে নিয়ে পাণ্ডা সেজে বসে আছিস ? হারু ভল্লা দেখেন , বৃদ্ধা আর কেউ নন , তাদের পাশের গ্রাম নবগ্রামের সম্পন্ন চাষি তারাচরণ মণ্ডলের মা। আর যাই কোথা , হারু বৃদ্ধার পা জড়িয়ে ধরেন।চুপি চুপি বলেন , কাকিমা সবই তো বুঝছো।তুমি আর কথাটা পাঁচকান কোর না।
উপস্থিত অন্য পাণ্ডা - ভক্তরা অবাক হয়ে যান ওই পট পরিবর্তনে। যে বৃদ্ধা কিছুক্ষণ আগেই পাণ্ডাকে প্রণাম করলেন , ক্ষণমুহুর্ত পরে তাকেই কেন পাণ্ডা প্রণাম করছেন তার ব্যাখা তারা খুঁজে পান না। হারু ভল্লা অবশ্য তাদের জানিয়ে ছিলেন , উনি আসলে আমার সম্পর্কে কাকীমা হন তো। দীর্ঘদিন দেখা নেই বলে চিনতে পারেন নি। তাই প্রণাম করে ফেলেছেন। তার আমার গলার স্বর শুনেই তো চিনতে পারলেন।এখন আমি যদি ঘুরিয়ে প্রণাম না করি তাহলে পাপে আমার জায়গা থাকবে ? আজ ভাবি মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তাকে কত কিছুই না করতে হয়।হারু ভল্লা নেই , কিন্তু এই ঘটনার কথাটি আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
( চলবে )
পড়ুন / পড়ান
নজর রাখুন / সঙ্গে থাকুন
১৯ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০ টার মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে
ধারাবাহিক উপন্যাস
সালিশির রায়
সালিশি সভার রায়ে সর্বস্ব হারানো এক আদিবাসী তরুণীর ঘুরে দাঁড়ানোর , অন্যকে দাঁড় করানোর মর্মস্পর্শী কাহিনী অবলম্বনে ধারাবাহিক উপন্যাস --
খুব কাছে থেকে দেখা আদিবাসী সমাজের এক তরুণীর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনা । একসময় ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেক ঘটনা।সেই ঘটনাই তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীতে। আদিবাসী সমাজের ভাষা আলাদা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ভাবের প্রকাশও আলাদা। কিন্তু দুঃখ , জ্বালা , যন্ত্রণার অভিব্যক্তি মনে হয় মানুষ মাত্রেরই এক।সেই সব জ্বালা যন্ত্রনার অভিব্যক্তি বৃহত্তর সমাজের উপযোগী ভাষা এবং ভাবের প্রকাশ ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ত্রুটি -বিচ্যুতি থাকাটাই স্বাভাবিক।তাই সবিনয়ে আগাম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। একটাই প্রার্থনা , ভালো লাগলে বলুন , বলুন খারাপ লাগলেও।ধন্যবাদ।



No comments:
Post a Comment